শিশুর হাঁটতে শেখা

শিশুর প্রথম হাঁটা 

জন্মের প্রথম বছরে শিশু তাঁর শরীরের হাড়, পেশী এবং নার্ভাস সিস্টেম সম্পূর্ণভাবে গড়ে তোলা এবং এদের মধ্যে সমন্বয় করণের কাজ করে। প্রথম দিকে শিশু বসতে শিখে, একপাশ থেকে অন্যপাশে গড়াতে শিখে, এরপর হামাগুড়ি দেয় এবং শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে হাঁটতে শেখে।১১ মাস বয়স থেকেই যেকোনো সময় বাবু হাঁটতে শুরু করতে পারে।

প্রতিটি বাচ্চাই আলাদা, তাই ঠিক কোন সময় আপনার সন্তান হাঁটতে শুরু করবে, তা বলা মুশকিল। নিচে বাচ্চার ২ বছর পর্যন্ত বয়স অনুযায়ী হাঁটতে শেখার ধাপ সম্পর্কে কিছু ধারনা দেয়া হোল। তবে মনে রাখতে হবে এটা শুধুমাত্র একটা গাইডলাইন। সব বাচ্চা যে এই টাইমলাইন মেনেই হাঁটতে শিখবে তেমনটা নয়। যদি বাচ্চার বিকাশ নিয়ে আপনার কোন উদ্বেগ থাকে তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করা উচিত।

জন্ম থেকে ২ মাস

এই সময় বাচ্চার স্টেপ রিফ্লেক্স থাকে। বাচ্চাকে সোজা করে ধরে শক্ত কিছুর উপড়ে ধরে রাখলে সে এমনভাবে পা নাড়াবে যেন সে হাঁটছে। এই রিফ্লেক্স ২ মাস বয়স হতে হতে চলে যায়।

৩-৪ মাস

এই সময় বাচ্চা ছোট ছোট বুক ডন দেয়া শুরু করে। এর মনে হোল সে পেটের উপর ভর দিয়ে হাতের সাহায্যে মাথা এবং বুক উপরের দিকে তুলতে চেষ্টা করে। বাচ্চার এই মুভমেন্ট শরীরের উপরের মাংসপেশী মজবুত করে যা হাঁটার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৫ মাস

বাচ্চাকে দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে সোজা করে ধরে রাখলে উপর নিচে ঝাঁকুনি দিতে থাকে। এই ধরণের মুভমেন্ট বাচ্চার পায়ের শক্তি বৃদ্ধি করে। বাচ্চা কে বসিয়ে দিলে সামনের দিকে ঝুঁকে হাত ভর দিয়ে বসে।

৬-৯ মাস

এই সময়ের মধ্যে বাচ্চা বসতে শেখে। সাপোর্ট ছাড়া বসতে পারার জন্য বাচ্চার গলার পেশী শক্তিশালী হওয়া, মাথার নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য রক্ষা করতে পারা ইত্যাদি ক্ষমতা অর্জন করতে হয় যেগুলো হাঁটার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ বাচ্চাই ৭-১০ মাসের মধ্যে হামাগুড়ি দিতে শিখে যায়। তবে কেউ কেউ আবার হামাগুড়ি দেয়া ছাড়ায় হাঁটতে শুরু করে দেয়।

এই সময়ের মধ্যে বাচ্চা কোন কিছু ধরে দাঁড়াতে পারবে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাচ্চা কোন কিছু ধরে দু এক কদম হাঁটতে পারবে।যদি বাচ্চা ৭ মাসে আপনি সোজা করে ধরলে পায়ে ভর দিতে না পারে এবং ৯ মাসের মধ্যে সাহায্য ছাড়া বসতে না পারে তবে ডাক্তার কে তা জানান উচিত।

৯-১২ মাস

এ সময় বাচ্চা শক্ত কিছু যেমন- সোফা বা টেবিলের পায়া ধরে নিজে নিজে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া দাঁড়ানোর পড় হাঁটু বাঁকা করে কিভাবে বসতে হয় সেটাও শেখে।কোন কিছুর সাহায্যও ছাড়া কয়েক সেকেন্ডের জন্য দাঁড়াতে পারবে এবং হাত ধরে হাঁটতেও পারবে। এ সময়ের মধ্যেই বাচ্চা তার প্রথম হাঁটা শুরু করতে পারে।

১২-১৫ মাস

বাচ্চা এখন হাঁটতে শুরু করবে যদিও তা দেখতে অদ্ভুত রকম হবে। তার সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে হাঁটা আসলে তার ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। অল্প সময়ের মধ্যেই বাচ্চা নিজে নিজে বসতে এবং আবার উঠে দাঁড়াতে শিখে যাবে।

বাচ্চা যদি ১৪-১৫ মাসের মধ্যে হাঁটা শুরু না করে তবে ডাক্তারকে জানান। এ সময়ের মধ্যে না হাঁটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবু এর অন্য কোন কারণ আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার এখন ভালো সময়।

১৬-১৮ মাস

সাহায্য নিয়ে বাচ্চা এই বয়সে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা নামা করতে পারবে। এমনকি সে হয়তো পেছন দিকে হাঁটতে পারবে এবং গানের সুরে নাচতেও পারবে।

১৯-২৪ মাস

এই সময় বাচ্চার হাঁটার গতি বাড়বে। তার দ্বিতীয়  জন্মদিনের মধ্যে সে বলে লাথি মারতে, হাতে কিছু বহন করতে বা অল্প উঁচু কোন জায়গা থেকে লাফ দিতে পারবে।

শিশুকে হাঁটতে শিখতে কিভাবে সাহায্য করবেন?

নয় থেকে বারো মাস বয়সেই অধিকাংশ শিশু তাদের প্রথম হাটা শুরু করে আর চোদ্দ, পনের মাস বয়সে তারা বেশ ভালোই হাটতে শিখে যায়। আপনার শিশু যদি কফি টেবিল অথবা অন্য কিছুর সাপোর্ট নেয় তাহলেও চিন্তিত হবেন না। শিশুর ১৫ অথবা ১৬ মাস বয়সে অথবা তারও বেশী বয়সে প্রথম পায়ে হাটা শুরু করাটাও স্বাভাবিক বলেই মনে করা হয়।

আপনার শিশুকে হামাগুড়ি ও হাটতে উৎসাহ দিন, তাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার অনেক সুযোগ তৈরি করে দিন আর তাকে বেশী কোলে না রেখে নিজে নিজে চলাচল করতে দিন। আপনার শিশু হাটতে শুরু করলে তাকে উৎসাহিত করতে আপনার ঘরের আসবাব গুলোকে তার হাটার পথে সারিবদ্ধ করে সাজিয়ে দিতে পারেন যাতে সে নিরাপদ একটা কিছু ধরে হাটা শিখতে পারে।

বিপদজনক কোন কিছু থাকলে সেগুলো সরিয়ে ফেলুন যেগুলো সে ধরতে পারে , যেমন, ঝুলানো টেবিল ক্লথ অথবা বৈদ্যুতিক তার। আপনার শিশু যদি টলতে টলতে হাটে, সে আপনার আঙ্গুল ধরে হাটতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে, অথবা সে যদি তার হাতগুলো শুন্যে তুলে রাখে তাহলে তার হাত ধরে আপনি তার পেছন পেছন হাটতে পারেন।

জন্মের পর শিশুর কোমল দেহে ক্রমেই পেশিগুলো সুগঠিত হতে থাকে। অভিভাবকরা এক্ষেত্রে শিশুর হাত-পা প্রসারণ ও সঙ্কোচন করার মাধ্যমে পেশি সুগঠিত করতে সহায়তা করতে পারেন। খেলনা বা আকৃষ্ট হবে এমন জিনিসগুলো শিশুর নাগালের বাইরে রাখলে নিজ থেকেই তার মধ্যে সেগুলো ধরার প্রেরণা তৈরি করবে, যা তাকে হাত-পা নড়াচড়া করতে শেখাবে। একটা সময় সে নিজেই বসতে শিখে যাবে।

বসতে শেখার পর শিশুর দেহের ভারসাম্য তৈরি হওয়া মুখ্য। এই সময়ে দৃষ্টি সীমানার মধ্যে খেলনাজাতীয় বস্তু ধরে তার মধ্যে আলোড়ন তৈরি করতে হবে। তখন সে সেসব খেলনা ধরার জন্য হামাগুড়ি দেওয়া শিখতে শুরু করবে। আর এই সময়ে শিশুর মেরুদণ্ড, ঘাড়, পা ও বাহু শক্ত হয়ে হাঁটার উপযোগী হতে শুরু করে।

দাঁড়াতে শেখার পর শিশু নিজ থেকেই কোনো কিছু ধরে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে। শিশুকে দুই হাতে ধরে সামনে-পেছনে হাঁটানোর মাধ্যমে পায়ের কদম ফেলতে সহায়তা করা যায়। এতে শিশুর হাঁটতে শেখার সময় কমিয়ে আনা সম্ভব। একটা সময় সে নিজ থেকেই হাঁটতে চাইবে। শুরুতে ঘরের আসবাব বা দেয়াল ধরে সে একাই হাঁটার চেষ্টা করবে।

ড্রয়ারগুলোতে লক লাগানো আর সিঁড়ির মুখে গেট লাগানো পছন্দ নয় অনেকেরই। কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা অনেক। বাবুর হাঁটতে শুরু করার পর পর তার ভারসাম্য ঠিক থাকে না। দুলে দুলে হাঁটার সময় তারা যেন কোথাও বাড়ি খেয়ে ব্যথা না পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

বাবুকে সাহস যোগান। বাবুরা হাঁটবে নিজে নিজেই, এটা হবে তার সময় মতোই। কিন্তু যদি দেখেন যে আপনার বাবু একটু দ্বিধাগ্রস্ত, হাঁটতে গিয়েও ভয় পাচ্ছে, তখন তাদের সাহস দিন। বাবুর সামনে তার পছন্দের খেলনা ধরে তাকে কাছে আসতে উৎসাহ দিন।

বাসায় বাবুকে সবসময় খালি পায়ে হাঁটার উৎসাহ দিন।বাচ্চাকে ঠেলে এগুনোর মতো একটি খেলনা দিন, যাতে ভর দিয়ে দাঁড়ানো, হাঁটা দুইটাই করা যাবে। কিন্তু তাকে ওয়াকার দেবেন না, ওয়াকারে বাচ্চারা ব্যথা পায় বেশী।

শিশু পড়ে গেলে তাকে তুলে আবার হাঁটতে উৎসাহ দিন বা হাত ধরে ধরে তার সাথে হাঁটুন। বাচ্চারা হাঁটতে শুরু করার পরে আবার থেমে গিয়ে কয়েকদিন হামাগুড়ি দিয়ে চলা শুরু করতে পারে। এতে ভয় পাবেন না বা দুশ্চিন্তা করবেন না। তাদের হাঁটার উৎসাহ দিন।

পড়ে যাওয়া নিয়ে ভাববেন না। বাচ্চারা হাঁটা শুরু করলেই, বাবা-মায়ের মনে দুর্ঘটনার ভয় যুক্ত হয়। তারা পড়বে, ব্যথা পাবে, উঠবে, হাঁটবে, আবার ব্যথা পাবে। এই চক্র চলবেই। এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না।

[ আরও পড়ুনঃহামাগুড়ি দেয়া ও সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুর নিরাপত্তা ]

বাচ্চার জন্য ওয়াকার ব্যাবহার করা কি উচিত?

অনেক অভিভাবককেই দেখা যায় তার শিশুর হাঁটা শেখা তরান্বিত করতে ওয়াকার দেওয়ার বিষয়ে বেশ আগ্রহী। তবে সেসব অভিভাবক হয়ত জানেন না, এটি বেশ বিপদজনক এবং হাঁটা শিখতে তেমন সহায়তা করে না, বরং নিজের পায়ে হাঁটার আগ্রহ নষ্ট করে দেয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, এটি ব্যবহারের ফলে শিশুর দেহ সুগঠিত হয় না। অনেকক্ষেত্রে হাঁটতে শেখায় বিলম্ব ঘটায়। এসব বিষয় বিবেচনা করেই কানাডায় এই ওয়াকার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের পেডিয়াট্রিক একাডেমিও সেদেশে এরকম নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছে।

ওয়াকারে থাকা অবস্থায় শিশু চলাচলের অনেক সময়েই ঘরের বিভিন্ন জায়গায় পরে থাকা বিপদজনক বস্তুগুলোর সংস্পর্শে চলে আসতে পারে।ফলে শিশুরা বিভিন্ন রকম দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়।

শিশুর পায়ের জুতা কখন থেকে পরানো উচিত?

হাঁটতে শুরু করার পর যে বিষয় অভিভাবকদের মাথায় ঘোরে তা হল- জুতা। অনেকেই ভাবেন জুতা কখন পরাবেন, বা কেমন পরাবেন।

সাধারণত ঘরের মধ্যে শিশুকে খালি পায়ে হাঁটানো বুদ্ধিমানের কাজ। এতে শিশু সহজেই পিচ্ছিল মেঝেতেও পা ফেলতে পারবে আর ভারসাম্য ধরে রাখতেও সহায়তা করে।

তবে একটি বয়সের পর বাইরে জুতা ব্যবহার করা উচিত। বিজ্ঞান বলে সকালের শিশুর পায়ের যে আকার থাকে বিকেলের মধ্যে তা পাঁচ শতাংশ স্ফীত হয়ে ওঠে। তাই পায়ের আকারের চেয়ে একটু বড় জুতা ব্যবহারই বুদ্ধিমানের কাজ।

অনেক শিশুই দেরিতে হাঁটে। এতে মা-বাবা চিন্তিত হন। বংশগত কারণেও এমনটা হতে পারে । তবে শিশুর বয়স দুই বছরের বেশি হলেও হাঁটতে না পারলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.