শিশুর চুষনি বা প্যাসিফায়ারের ব্যাবহার এবং এর সম্পর্কে বিস্তারিত

একজন নতুন মায়ের অনেক নতুন বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হয়। এক্ষেত্রে শিশুকে শান্ত রাখার ব্যাপারটাই অধিক গুরুত্ব পায়। এবং এ ব্যাপারে চুষনি (সুথার/প্যাসিফায়ার/ডামি) বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

কিছু বাচ্চাকে দোলনা দুলিয়ে বা জড়িয়ে ধরে শান্ত করা যায় এবং খাওয়ার সময়ই কেবল চুষতে চায়। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে তারা ক্ষুধার্ত নয় এমন অবস্থায়ও যেন দুধ চোষার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যথেষ্ট বুকের দুধ বা ফর্মূলা খাওয়ানোর পরও যদি আপনার শিশু খেতে চায়, তবে এই সমস্যাতে চুষনি বা প্যাসিফায়ার একটি সমাধান হতে পারে।

প্যাসিফায়ার বা চুষনি অবশ্যই শিশু পালনের বা খাদ্যের বিকল্প না।কিন্তু খাওয়ানো, ঢেকুর তোলা, আদর, দোলানো বা খেলার পরেও যদি বাচ্চা শান্ত না হয় তখন তাকে চুষনি বা প্যাসিফাইয়ার দিয়ে দেখতে পারেন তাকে শান্ত করা যায় কি না।

প্যাসিফায়ার ব্যবহারের আরেকটি সুফল হলো-

কিছু গবেষণায় দেখানো হয়েছে, যেসব বাচ্চা শোয়া বা ঘুমানোর সময় প্যাসিফায়ার ব্যবহার করে তাদের SIDS (Sudden infant death syndrome বা নবজাতক শিশুর হঠাৎ মৃত্যুর উপসর্গ) তুলনামূলক কম। গবেষণায় এটি দেখানো হয়নি যে প্যাসিফায়ার SIDS প্রতিরোধ করে। এখানে কেবল দেখানো হয়েছে,প্যাসিফায়ারের  ব্যবহার এবং  SIDS এর নিম্নঝুকিঁর সংযোগ রয়েছে।

pacifier and sids
ছবিঃ গুগল

এছাড়াও  চুষনির অভ্যাস ছাড়ানো অঙ্গুল চোষার অভ্যাস ছাড়ানোর থেকে অনেক সহজ।

চুষনি বা প্যাসিফায়ার ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে সকল বিষয় মাথায় রাখতে হবে

চুষনির  ব্যবহার শিশু এবং নতুন বাচ্চাদের কানের ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সাধারণত এসব ঝুঁকি একদম নতুন বাচ্চাদের কম থাকে। তাই বাচ্চার অর্ধবছর হবার আগ পর্যন্ত (যখন তার স্তন্যপানের দরকার সবোর্চ্চ) প্যাসিফায়ার ব্যবহার করা যেতেই পারে। যদি না তার কানের ইনফেকশনের প্রবণতা থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে চুষনিতে অভ্যস্ত শিশুদের পেটে গ্যাস হবার পাশাপাশি খাবারের রুচি কমে যাবার প্রবণতা দেখা দেয়।

বুকের দুধে অভ্যস্ত করানোর সময় চুষনিতে অভ্যস্ত করানোর পরামর্শ দেয়া হয় না। এতে নবজাতকদের দুধ খাবার প্রবণতা কমে যায়। পুষ্টি ও ওজনের ক্ষেত্রে যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আগে ভাবা হতো যে, যেসব বাচ্চাদের বুকের দুধ খাওয়া ভালোভাবে শেখার পূর্বেই প্যাসিফায়ার বা চুষনি দেয়া হয় তারা কখনো কখনো নিপল কনফিউশনে (Nipple Confusion) বা বোঁটা বিভ্রান্তিতে  ভোগে যেটা সফল স্তন্যদানে বাধা দেয়। কিন্তু এক্সপার্টদের মতে, গবেষণাটি সাংঘর্ষিক এবং বিষয়টি কোনো গবেষণায় পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি।

তার পরও আপনার শিশু যদি বুকের  দুধ খায় তাহলে সে ঠিক ভাবে খেতে না শেখা পর্যন্ত প্যাসিফায়ার দিতে অপেক্ষা করতে পারেন।প্যাসিফায়ার চোষা এবং স্তন চোষা ভিন্ন এবং American Academy of Pediatrics  পরামর্শ দেয়,বাচ্চা ভালো মত স্তন্যপান করা এবং দুধের সাপ্লাই চালু থাকা পর্যন্ত অপেক্ষা করার।

বাবুর একমাস বয়স থেকে চুষনি দেয়া শুরু করতে পারেন। যদিও এটি শুধুমাত্র গাইডলাইন। যদি বাচ্চার নার্সিং ভালো হয়, ওজন বাড়ে এবং তার খাওয়ার শিডিউল ঠিক থাকে তাহলে আপনি আগেই শুরু করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে তার খাওয়া শেষ হওয়ার পর তাকে চুষনি দেয়া উচিত।

প্যাসিফায়ার চোষা সহজেই অভ্যাসে পরিণত হতে পারে এবং এ কারনে অনেক মা-বাবা বাচ্চাকে প্যাসিফায়ার দিতে চান না কারন তারা পরবর্তীতে অভ্যাস বদলানোর সমস্যাটার সাথে ডিল করতে চান না(অথবা তারা তিন বছরের বাচ্চা মুখে প্যাসিফায়ার নিয়ে ঘোরার ভাবনাটা  পছন্দ করেন না)।

যদি আপনার বাচ্চাকে চুষনি দিতে চান কিন্তু ছাড়ানোর সময়ের সমস্যা এড়াতে চান তাহলে বাচ্চার একবছর বয়স থেকে চুষনি দেয়া বন্ধ করে দিতে পারেন।প্যাসিফায়ারের অতিরিক্ত ব্যবহারের দিকে নজর রাখলেই আপনার বাচ্চার চুষনির  উপর নির্ভরতা এড়ানো যায়।

ছবিঃ গুগল

যেভাবে প্যাসিফায়ার বা চুষনির  ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন

যদি প্যাসিফায়ার ব্যবহার করতে চান সেক্ষেত্রে নিচের গাইডলাইন মনে রাখতে পারেন-

আপনার সিদ্ধান্ত শিশুকে বুঝতে দিন। যদি সে মানে,ওকে! কিন্তু যদি সে না মানে, জোর করবেন না।পরবর্তীতে আবার চেষ্টা করতে পারেন। অথবা তার পছন্দকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যাপারটি ছেড়ে দিন।

খাওয়ানোর সময় যখন বুঝবেন বাচ্চা ক্ষুধার্ত না তখন প্যাসিফায়ার দিতে পারেন।

আপনার শিশুকে খাওয়ানোর পরিবর্তে বা তার প্রতি আপনার মনোযোগের পরিবর্তে চুষনি ব্যবহার করবেন না। কিন্তু কখনো কখনো বাচ্চাকে খাওয়াতে বা শান্ত করতে সময়ের দরকার হয় (যেমন: গ্রোসারি লাইনে বা বাসা থেকে পাচঁ ব্লক দূরে কার সিটে) তখন চুষনি দেয়া যেতে পারে।

ঘুমানোর সময় শিশুকে চুষনি  দেবার চেষ্টা করতে পারেন (কিন্তু যদি তা তার মুখ থেকে পড়ে যায় তাবে পুনরায় দিববেন না)। বাচ্চা যদি খিটখিটে আচরণ করে তাহলে প্রথমে তাকে জড়িয়ে নিয়ে,দোল দিয়ে বা গানের মাধ্যমে শান্ত করার চেষ্টা করুন।

প্যাসিফায়ার শিশুর গলাতে বাধঁবেন না। ফিতায় তার শ্বাসরোধ হতে পারে।প্যাসিফায়ার ক্লিপের মাধ্যমে কাপড়ে লাগিয়ে দেয়াটা নিরাপদ।

চুষনির  যত্ন

আপনার বাচ্চার জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত প্যাসিফায়ার (BPA safe) নির্বাচন করুন।কুসুম গরম পানিতে প্যাসিফায়ার আলতো করে ধুবেন। ছোট ছিদ্র বা নষ্ট হবার কোনো চিহ্ন দেখা মাত্র তা রিপ্লেস করবেন।

ধোয়ার পর চুষনিটিকে শুকিয়ে নেবার পর পরিষ্কার বন্ধ পাত্রে রেখে দিতে হবে।

মুখে নিয়ে চুষনি পরিষ্কার করবেন না। The American Dental Association এর মতে, শিশুর মাড়ির সংস্পর্শে আসলে বড়দের মুখের লালাতে থাকা  ব্যাকটেরিয়া আপনার শিশুর দাতঁ ছিদ্র করতে পারে(এবং আপনার বাচ্চার চুষনি জুস বা চিনিযুক্ত পানিতে ডুবানো উচিত না। কারন,এটাও ক্যাভিটিসের জন্ম দিতে পারে)

নির্দিষ্ট সময় পর পর চুষনি বদলে দিবেন।একটি চুষনি কেবলমাত্র একটি শিশুর জন্যই হতে হবে

ভালো কোম্পানির তৈরি ভালো চুষনি ব্যাবহার করুন। অনেক কোম্পানি তাদের চুষনিতে অর্থডন্টিক নিপল এবং মায়ের স্তনের মত বলে দাবী করে। এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

শিশুকে যখন চুষনি দিবেন না

যে শিশুটি ওজন বৃদ্ধিজনিত সমস্যাতে ভুগে তাকে  চুষনি  না দেয়াই ভাল। যদি আপনার বাচ্চার খেতে সমস্যা হয় (অথবা মায়ের দুধ যোগানে সমস্যা হয়) তাহলে আপাততের জন্য প্যাসিফায়ার ব্যাবহার না করাটাই ভালো।আপনার শিশু যদি বার বার কানের ইনফেকশনে ভুগে সেক্ষেত্রেও চুষনির ব্যবহার না করাই ভালো।

কিন্তু আপনার শিশু যদি প্রিম্যাচিওরড হয় এবং এর কারনে ওজন না বাড়ে তাহলে সম্ভবত, চুষনি খুব একটা প্রভাব ফেলে না। আর চুষনি একটা প্রিম্যাচিওরড বেবিকে SIDS থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই একেবারেই না করে দেবার চেয়ে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিতে পারেন।

যদি আপনার সদ্যজাত শিশুকে চুষনি দিতে না চান, বিশেষত যদি বুকের দুধ দিতে চান, সেক্ষেত্রে নার্সদের আগে থেকেই জানিয়ে রাখুন। যদিও এক বা দুইদিন ব্যাবহার করলে তা অভ্যাসে পরিণত হবে না।কিন্তু যদি পরবর্তীতে চুষনি দিতে না চান তবে অভ্যস্ত করানোর যুক্তিসংগত কারন নেই।

প্যাসিফায়ার বা চুষনি কি শিশুর দাঁতের ক্ষতি করে?

যদি দুই বা তিন বছরের মধ্যে শিশু প্যাসিফায়ার ব্যবহার বন্ধ করে দেয়, কোনো ক্ষতি হয় না। আর সাধারনত শিশুদের সম্ভবত এতদিন ব্যবহার করতে দেয়া হয় না।বেশিরভাগ শিশু সাধারণত দুধ দাঁত উঠা অবধিই প্যাসিফাইয়ার ব্যবহার করে (ছয় বছর থেকে পার্মানেন্ট দাতঁ উঠে)।

এর মানে হলো, একটি শিশু যত বেশি দিন চুষনির ব্যবহার করে তা শিশুর দাঁতের বিকাশে প্রভাব বিস্তার করার সম্ভবনা তত বাড়িয়ে দেয়। যদি এই ব্যাপারটি আপনাকে চিন্তায় ফেলে দেয় আপনি শিশুর চোয়াল ও দাতেঁর বিকাশ নিয়ে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে পারেন।

সাধারণত চুষনির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিশুর ক্ষতি করে না।  চুষনির উপর শিশুর নির্ভরশীলতার দিকটা লক্ষ্য রেখেই ব্যবহার করা উচিত।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment