নবজাতক শিশুর যৌনাঙ্গের ৯টি সাধারণ সমস্যা

কখনো এমন হয়ে থাকে যে আপনার শিশু এমনভাবে জন্ম গ্রহণ করে যে তার যৌনাঙ্গে সেটার প্রভাব ফেলে আবার প্রথম কয়েক বছরের জন্য তার যৌনাঙ্গে কিছু সমস্যা দেখা যেতে পারে। শিশুর যৌনাঙ্গের যত্ন নেয়া সম্পর্কে জেনে নেয়াটা সহজ একটা ব্যাপার, কিন্তু কখনো শিশুর যৌনাঙ্গে এমন কিছু সমস্যা দেখা যায় যে সেই যত্ন নেয়ার বিষয়টি আরেকটু কঠিন হয়ে উঠে।

যদিও বেশিরভাগ সময় এই সমস্ত সমস্যাগুলো সাময়িক এবং এর জন্য আলাদা ভাবে চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু মাঝেমধ্যে আপনার নবজাতক শিশুর এই সমস্যাগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্যও হয়ে থাকে।

এই আর্টিকেলে আমরা নবজাতক শিশুর যৌনাঙ্গ সম্পর্কিত কিছু সাধারণ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করব এবং এ সম্পর্কে আপনার কী করনীয় সে ব্যাপারেও কিছু পরামর্শ দিব।

ছেলে শিশুর কিছু সাধারণ সমস্যা

১। শুক্রাশয় নীচের দিকে না নামা Cryptorchidism

ছেলে নবজাতকের শুক্রাশয় দুটো শিশুর তলপেটে গঠিত হয় এবং জন্মের কিছুক্ষণ আগে সাধারণত শুক্রাশয় দুটো তার অণ্ডকোষের থলের মধ্যে চলে আসে, কিন্তু কখনো দেখা যায় যে, যে কোন একটি অথবা উভয় অণ্ডকোষ থলের মধ্যে সঠিক অবস্থানে থাকে না। এই সমস্যাটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে Cryptorchidism বলা হয়ে থাকে। এই সমস্যা জন্মের পর করা শারীরিক পরীক্ষাতেই ধরা পরে।

আবার কখনো এমন দেখা যায় যে, ছেলে শিশু তার স্বাভাবিক অণ্ডকোষ নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে এবং তার পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে যে কোন সময়ে তার অণ্ডকোষ থলে থেকে আবার তলপেটের মধ্যে চলে যেতে পারে।

মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণেও ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ শরীরের ভীতরে চলে যেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলা হয় retractable testicles, তবে যদি বেশিরভাগ সময়েই শুক্রাশয় শিশুর অণ্ডকোষের থলের মধ্যে থাকে তাহলে এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

এই ধরনের সমস্যা দেখা গেলে আপনি কি করবেন?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্যার জন্য কোন প্রকার চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজন হয় না এবং সাধারণত ছয় মাসের মধ্যেই শুক্রাশয় শিশুর অণ্ডকোষের থলের মধ্যে চলে আসে।

তবে কখনো এটাকে তার সঠিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য ছোট একটা অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। সাবালক হওয়ার পর কোন ধরনের জন্মদান ক্ষমতা সম্পর্কিত যে কোন সমস্যা এড়ানোর জন্য এই অপারেশন সাধারণত ছয় মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে যে কোন এক সময় করা হয়ে থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে ডাক্তাররা হরমোন থেরাপির জন্যও বলে থাকেন।

 ২। Hypospadias

এই সমস্যাটির তিনটি লক্ষণ দেখা যেতে পারে, সেগুলো হলঃ

  • মূত্রনালি শুরুটা তার সঠিক অবস্থানে থাকে না
  • লিঙ্গ বাঁকা হয়ে থাকে
  • লিঙ্গের মাথার চামড়ার কিছু অংশ থাকে না

যদিও এই সমস্যার প্রকৃত কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং এটা জন্মসূত্রে পাওয়া কোন রোগও নয়। তবে এমনটা দেখা যায় যে, পরিবারের মধ্যে যদি পূর্বে কারো এমন সমস্যা থেকে থাকে তাহলে এই ধরনের সমস্যা ছেলে শিশুর মধ্যে বেশি হয়।

এক্ষেত্রে আপনার করনীয় কি?

কোন ক্ষেত্রে যদি দেখা যায় যে, দেখতে আদতে বাঁকা হলেও লিঙ্গ একটু শক্ত হলে এটা আবার সোজা দেখা যায় এবং প্রস্রাবের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হচ্ছেনা তাহলে এজন্য কোন চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। অপরদিকে গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে মূত্রনালির মুখ তার সঠিক অবস্থানে আনার জন্য, লিঙ্গ সোজা করার জন্য অথবা লিঙ্গের চামড়ার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণত বয়স দুই বছর হওয়ার আগেই এই অপারেশন করে ফেলা হয়।

৩। Inguinal hernia

এটা হল এক ধরনের মাংসপিণ্ড যেটা কুঁচকির অংশে বৃদ্ধি পায়। এটা সাধারণত অন্ত্রের অংশ বিশেষ অথবা ফ্যাটি টিস্যু হয়ে থাকে। জন্মের সময় তলপেট থেকে শুক্রাশয় যে পথ ধরে অণ্ডকোষের থলের মধ্যে নেমে আসে সেখানে এই ধরণের হার্নিয়ার উৎপত্তি হতে পারে। একই ধরনের সমস্যা মেয়ে শিশুর মধ্যেও দেখা যেতে পারে তবে বেশিরভাগ সময় এমন সমস্যা ছেলে শিশুর মধ্যেই বেশি পরিলক্ষিত করা যায়।

এক্ষেত্রে আপনার করনীয় কি?

ডাক্তাররা সাধারণত কিছুদিন অপেক্ষা করে থাকেন এটা দেখার জন্য যে এই অন্ত্র-পিণ্ডটি নিজে থেকেই কমে যায় কি না। আবার কখনো কখনো তারা এটাকে বিভিন্ন রকমের চাপের মাধ্যমে আবার তলপেটে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে চেষ্টা করেন। মাঝেমধ্যে এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য অপারেশনেরও প্রয়োজন পড়ে তাদের।

৪। Hydrocele

নবজাতকের অণ্ডকোষের এক পাশে অথবা উভয় পাশে কিছু তরল জমে থাকার কারণে ফুলে থাকাকে ডাক্তারি ভাষায় Hydrocele বলা হয়ে থাকে। যদি এমনটা হয়ে থাকে তাহলে অণ্ডকোষ অনেকটা ফুলে থাকে এবং এটা লাল হয়ে যায় আর অনেক সময় এটা ব্যথার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। কখনো এই সমস্যাটি inguinal hernia এর কারণেও  হয়ে থাকে। এমনকি কোন প্রকার আঘাতজনিত কারণে অথবা ইনফেকশনের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরও এই সমস্যা দেখা যেতে পারে।

এক্ষেত্রে আপনার করনীয় কি?

সাধারণত নবজাতকের জন্মের এক বছরের মধ্যে জমে থাকা তরলগুলো তার শরীর শোষণ করে নেয়। যার কারণে নিজে থেকেই এটা ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু কখনো দেখা যায় যে এটা ঠিক হচ্ছেনা এবং সমস্যাটি আরো বড় আকার ধারণ করে। এক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন রয়েছে।

৫। Balanitis

নবজাতক ছেলে শিশুর লিঙ্গের একদম মাথায় এক ধরনের ইনফেকশন অথবা প্রদাহকে ডাক্তারি ভাষায় Balanitis বলা হয়ে থাকে। এর লক্ষণগুলো হল আক্রান্ত অংশ ফুলে যাওয়া, লাল হয়ে যাওয়া, ব্যথা এবং ঐ অংশ থেকে অস্বাভাবিক গন্ধ আসা।

খৎনা করানো বা না করানো উভয় শিশুর ক্ষেত্রেই ডায়াপার র‍্যাশ থেকে অথবা ঠিকমত পরিষ্কার না রাখা বা খুব বেশী পরিষ্কার রাখার চেষ্টার কারণে এমনটা হতে পারে। কখনো কখনো কিছু ওষুধের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও এমন লক্ষণ দেখা যায়।

এক্ষেত্রে আপনার করনীয় কি?

সাধারণত এর একমাত্র চিকিৎসা হল, নবজাতক শিশুর লিঙ্গ কুসুম গরম পানি দিয়ে ধৌত করা এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যাকটেরিয়া নিরোধক অথবা প্রদাহ নিরোধক ক্রিম লাগিয়ে দিলে এক সপ্তাহের মধ্যেই এটা ঠিক হয়ে যায়। যদি এরপরেও এই সমস্যা থেকে যায় তাহলে খৎনা করা হয়নি এমন শিশুর ক্ষেত্রে খৎনা করানোর পরামর্শ দেয়া হয়।

নবজাতক মেয়ে শিশুর কিছু সাধারণ সমস্যা

৬। Labial fusion অথবা labial adhesion

কখনো নবজাতক মেয়ে শিশুর যৌনাঙ্গের উপরের দুই পাপড়ি একে অপরের সাথে পাতলা এক আবরণের মাধ্যমে জোড়া লেগে থাকে। যদিও এই ধরনের সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়াটা খুবই বিরল, সাধারণত এই সমস্যা জন্মের প্রথম এক অথবা দুই বছরের মধ্যে হয়ে থাকে। ডাক্তাররা এখনো এর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত নন, কিন্তু এটা কখনো ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের মাধ্যমেও হয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে আপনার করনীয় কি?

সাধারণত এই সমস্যার জন্য কোন চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজন হয় না, এটা বয়ঃসন্ধি কাল শুরু হওয়ার আগেই ঠিক হয়ে যায়। ডাক্তাররা এজন্য অপারেশন করাতে নিষেধ করেন, কেননা অপারেশন করলে  এই সমস্যা আবার ফিরে আসতে পারে । কখনো বিশেষ ক্রিম এর ব্যাপারে ডাক্তাররা উপদেশ দিলেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এটাকে নিজ থেকেই ঠিক হয়ে যাওয়ার জন্য এভাবেই রেখে দিতে বলেন।

৭। Hymenal skin tags

মায়ের হরমোন নবজাতক শিশুর শরীরের চলে যাওয়ার কারণে তার সতিপর্দা মাঝে মধ্যে ফুলে যেতে পারে। কখনো নরম ও পাতলা চামড়া সামনের দিকে সম্প্রসারিত হয়ে যেতে পারে। প্রায় দশ শতাংশ নবজাতক মেয়ে শিশুর যৌনাঙ্গে এই ধরনের সমস্যা দেখা যায় এবং এতে কোন ক্ষতি হয়না ও এটাকে খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার হিসেবে গণ্য করা হয়।

এ সম্পর্কে আপনার করনীয় কি?

এই ধরনের সতী-পর্দা অর্থাৎ হাইমেনের সমস্যা সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে নিজ থেকেই ঠিক হয়ে যায়। কখনো এটা ঠিক হয়ে যেতে আরো দীর্ঘ সময়ও লেগে যেতে পারে, এক্ষেত্রে ডাক্তাররা অভিভাবককে ধৈর্যশীল হতে উপদেশ দিয়ে থাকেন এবং কোন প্রকার চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।

ছেলে ও মেয়ে উভয় নবজাতক শিশুর ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো দেখা যায়

৮। জন্মের পর যৌনাঙ্গ ফুলে থাকে

নবজাতক মেয়ে ও ছেলে উভয় ধরনের শিশুর ক্ষেত্রেই এটা একটা খুব সাধারণ সমস্যা যেটা প্রায়শই লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে জন্মের পর যৌনাঙ্গ কিছুটা ফুলে যায় এবং লাল হয়ে থাকে। এ ধরনের সমস্যা বেশ কিছু কারণেই হতে পারে। যেমন প্রসবের সময় আঘাতজনিত কারণে অথবা জন্মের পূর্বে মায়ের শরীর থেকে হরমোনের সংমিশ্রণের কারণে।

নবজাতকের শরীরে অনেক ধরনের অতিরিক্ত তরল থেকে থাকে, আর একারণেও কিছু কিছু অংশ এমন ফুলে থাকতে দেখা যায় বিশেষ করে যৌনাঙ্গ এবং চেহারার অংশে। মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে কখনো কখনো যৌনাঙ্গ দিয়ে কিছুদিন রক্তও বের হতে দেখা যায়, যেটা কিনা মাত্র কয়েকদিন স্থায়ী হয়।

এক্ষেত্রে আপনার করনীয় কি?

নবজাতকের যৌনাঙ্গ এমন ফুলে থাকার জন্য সাধারণত কিছু করার দরকার হয় না। প্রতিটি নবজাতক শিশুরই জন্মের পর চিকিৎসা সম্পর্কিত বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় এবং যৌনাঙ্গ পরীক্ষাও তার একটা অংশ হয়ে থাকে।

৯। Unirary tract infection (UTI)

প্রস্রাবের রাস্তায় ইনফেকশন”সমস্যাটি মূলত মুত্রথলি, কিডনি এবং মূত্রনালির কিছু সমস্যার কারনে হয়। এটা নবজাতক শিশুর মধ্যে খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। প্রায় সময় অন্ত্র বা মল থেকে প্রস্রাবের রাস্তায় ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ফলে এমনটা হয়ে থাকে। এ ধরনের সমস্যা হলে প্রস্রাবের সময় বেশ জ্বালাপোড়া হয়ে থাকে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা হলে শিশুর জ্বর হয়। কখনো কোন প্রকার লক্ষণ দেখা না দিয়েও শিশু এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

এ সম্পর্কে করনীয় কি?

এই ধরনের সমস্যা হলে প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয় এবং এন্টি-বায়োটিক ওষুধের মাধ্যমে এর চিকিৎসা করা হয়। যদি আপনার নবজাতক শিশুর এই ধরনের সমস্যা দেখা যায় তাহলে ডাক্তার কিডনি এবং মুত্রথলির আল্ট্রাসনগ্রাফিও করার জন্য বলতে পারেন। ক্ষেত্র-বিশেষে ডাক্তার আরো পরীক্ষা দিয়ে থাকেন যেগুলো নবজাতক শিশুর জন্য একটু কষ্টকরই বটে। এই ধরনের এক পরীক্ষার নাম হল MCU। নবজাতক শিশুর মুত্রথলিতে ক্যাথিটারের মাধ্যমে এক ধরণের রঙ ঢুকিয়ে এই পরীক্ষাটি করা হয়ে থাকে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.