গর্ভাবস্থায় সাদা স্রাব বা লিউকোরিয়া

প্রত্যেকটি মেয়েরই বয়ঃশন্ধির এক বা দু বছর আগে থেকে ভ্যাজিনাল ডিসচার্জ বা স্রাব নির্গত হতে পারে যা মেনপজ এর পর বন্ধ হয়ে যায়। সাদা স্রাব নির্গত হওয়ার পরিমান বিভিন্ন সময় পরিবর্তিত হতে পারে। সাধারনত পিরিয়ডের আগে এর পরিমান বেড়ে যায়। এ স্রাব সাধারণত গন্ধবিহীন বা হাল্কা গন্ধযুক্ত, দুধের মত সাদা বা পরিষ্কার হয়ে থাকে যা লিউকোরিয়া নামেও পরিচিত।

 

গর্ভাবস্থায় সাদা স্রাব নির্গত হওয়া কি স্বাভাবিক?

গর্ভাবস্থায় সাদা স্রাব নির্গত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। অন্য সময়ের তুলনায় গর্ভাবস্থায় এর পরিমাণও বেশী থাকে কারণ গর্ভাবস্থায় এস্ট্রজেন হরমোন এর পরিমান বেড়ে যায় এবং যোনীর আশপাশে এসময় রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। গর্ভাবস্থায় জরায়ুমুখ (Cervix) এবং যোনীর দেয়াল নরম হয়ে যায়। তাই এ সময় স্রাবের নির্গত হওয়ার পরিমান বেড়ে যায় যাতে যোনী থেকে কোন সংক্রমণ উপরের দিকে জরায়ুতে পৌছাতে না পারে।

প্রসবের সময় যত এগিয়ে আসে স্রাবের পরিমান তত বাড়তে থাকে। এর কারণ হোল প্রসবের সময় যত এগিয়ে আসে বাচ্চার মাথা তত বেশী জরায়ুমুখের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। এর ফলে স্রাব আরও বেশী পরিমানে নির্গত হয়।

গর্ভাবস্থার শেষের দিকে স্রাবের পরিমান এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে তা প্রস্রাবের মত মনে হতে পারে। শেষ এক বা দু শপ্তাহ আগে স্রাবের সাথে ঘন শ্লেষ্মা বা রক্তের রেখা দেখে যেতে পারে। এর নাম “শো” (show)। এটা হয় যখন জরায়ুতে যে শ্লেষ্মাগুলো জরায়ুমুখ সীল করে রাখে (মিউকাস প্লাগ) তা স্রাবের সাথে বেড়িয়ে আসে। এটা মায়ের শরীরের প্রসবের জন্য তৈরি হওয়ার লক্ষন। প্রসব যন্ত্রণা শুরু হওয়ার আগে দু তিনবার এ ধরনের “শো” দেখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় প্রসবের সময় কাছাকাছি।

যদিও গর্ভাবস্থায় সাদা স্রাব নির্গত হওয়া স্বাভাবিক তারপরও সবার উচিত এর দিকে নজর রাখা এবং কোন পরিবর্তন দেখা গেলেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া।

ভ্যাজিনাল ডিসচার্জ বা স্রাব নির্গত হওয়া কখন ঝুঁকির কারনঃ

নির্গত হওয়া স্রাব যদি সবুজ বর্ণের হয়, গন্ধযুক্ত হয় বা মায়ের যদি ব্যাথা অনুভুত হয় বা কোন কারণে তা অস্বাভাবিক মনে হয় তবে তা ইনফেকশন বা অন্য কোন সমস্যার লক্ষন হতে পারে। যদি নিচের লক্ষনগুলো দেখা দেয় তবে দেরী না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করুন-

আপনার যদি ৩৭ সপ্তাহ হওয়ার আগেই স্রাবের পরিমান বেড়ে যায় বা স্রাবের ধরন পরিবর্তন হয়ে যায় তবে তা ডাক্তারকে জানান। উদাহরণস্বরূপ, যদি স্বচ্ছ বা পানির মত তরল নির্গত হয় বা স্রাব দেখতে ঘন এবং থকথকে হয়ে যায় তবে তা প্রি-টার্ম লেবারের লক্ষন হতে পারে।

যদি ভাল্ভা বা যোনিমুখ ফুলে যায় বা গন্ধবিহীন সাদা স্রাব নির্গত হয় যার ফলে প্রস্রাবের সময় ও শারীরিক মিলনের সময় ব্যাথা হয়, চুলকানি বা জ্বলুনি হয় তবে তা  ইস্ট ইনফেকশনের লক্ষন হতে পারে।

যদি মেছো গন্ধযুক্ত, পাতলা, সাদা বা ধুসর বর্ণের স্রাব নির্গত হয় যা শারীরিক মিলনের পরে বেশী বোঝা যায় ( স্রাব যখন বীর্যের সাথে মিশে যায়) তবে তা ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস বা যৌনাঙ্গের ইনফেকশনের লক্ষন হতে পারে।

নির্গত হওয়া স্রাব যদি হলুদ বা সবুজ বর্ণের হয় এবং গন্ধযুক্ত হয় তবে তা  trichomoniasis এর লক্ষন হতে পারে যা একটি যৌন বাহিত রোগ। এ রোগের অন্যান্য লক্ষনগুলো হোল- ভাল্ভা বা যোনী লাল হয়ে যাওয়া, চুলকানি হওয়া এবং প্রস্রাব ও শারীরিক মিলনের সময় ব্যাথা অনুভুত হওয়া।

যদি স্রাবের ধরন ও পরিমান স্বাভাবিকের চাইতে পরিবর্তিত হয়ে যায় বা তীব্র গন্ধযুক্ত হয় তবে দেরী না করে ডাক্তারকে জানানো উচিত।

মনে রাখা উচিত লক্ষনগুলো  নির্ণয় করা আপনার পক্ষে কঠিন হতে পারে। সাধারণ লক্ষনগুলো যেমন চুলকানি, জ্বলুনি ইত্যাদি দেখা না দিলেও আপনি ইনফেকশনের শিকার হতে পারেন। যদি মনে হয় আপনি ইনফেকশনের শিকার হয়েছেন তবে নিজে নিজে তার চিকিৎসা করতে যাবেন না। এক্ষেত্রে লজ্জা বা অস্বস্তি বোধ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়াটা সবচাইতে বেশী প্রয়োজন।

স্রাব নির্গত হচ্ছে নাকি এমনিওটিক ফ্লুইড, তা কিভাবে বোঝা যাবে?

গর্ভাবস্থায় তিন ধরনের তরল নির্গত হয়- স্রাব, প্রস্রাব এবং এমনিওটিক ফ্লুইড। প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে তাই হয়তো ভালোভাবে খেয়াল করলে আপনি হয়তো পার্থক্য বুঝতে পারবেন।

এমনিওটিক ফ্লুইড

  • এমনিওটিক ফ্লুইডের সাধারণত নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো থাকে-
  • এটা সাধারনত বর্ণ ও গন্ধবিহীন হয়। মাঝে মাঝে মিষ্টি গন্ধযুক্ত হতে পারে।
  • হাল্কা রক্ত বা সাদা শ্লেষ্মার চিহ্ন থাকতে পারে।
  • এমনিওটিক ফ্লুইড সাধারণত একটানা নির্গত হতে থাকে। এটি ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরতে পারে বা হঠাত ফিনকি আকারেও বেড়িয়ে আসতে পারে।
  • প্রস্রাবের পর ব্লাডার খালি হয়ে যাওয়ার পরও যদি তরল নির্গত হতে থাকে তবে তা এমনিওটিক ফ্লুইড হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।

প্রস্রাব

  • প্রস্রাবের সাধারণত নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো থাকে-
  • স্বচ্ছ হলুদ বর্ণের বা আরও গাঁড় বর্ণের হয়।
  • অ্যামোনিয়ামের গন্ধ যুক্ত হয়।
  • গর্ভাবস্থার শেষের দিকে প্রস্রাব বেড়িয়ে আসা স্বাভাবিক কারণ এ সময় বাচ্চা ব্লাডার এর উপর চাপ প্রয়োগ করে।

স্রাব

  • সাধারণত সাদা বা হলুদ বর্ণের হয়।
  • এমনিওটিক ফ্লুইড এবং প্রস্রাবের চাইতে ঘন হয়।
  • গন্ধযুক্ত বা গন্ধবিহীন হতে পারে কিন্তু প্রশ্রাবের মত গন্ধ হবে না।
  • স্রাব সাধারণত বিক্ষিপ্তভাবে, এবং অল্প পরিমানে নির্গত হয়।

আপনার যদি মনে হয় এমনিওটিক ফ্লুইড নির্গত হচ্ছে তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। এটা খুবই জরুরী কারণ তা প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার লক্ষন হতে পারে।

স্রাব নির্গত হওয়ার ব্যাপারে কি করা যেতে পারে

গর্ভাবস্থায় স্রাব নির্গত হওয়া স্বাভাবিক বিষয় তাই এটি বন্ধ করার কোন উপায় নেই যদি না তা কোন ইনফেকশনের কারণে হয়। তবে নিচের কিছু উপায় অবলম্বন করে যৌনাঙ্গ পরিষ্কার ও রোগমুক্ত রাখা যেতে পারে।

  • হট টাব বা বাথ টাব এ গোসল না করে শাওয়ার নেয়ার চেষ্টা করুন। গোসলের পর যৌনাঙ্গ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে এবং শুষ্ক রাখতে হবে। সুগন্ধি যুক্ত ও রুক্ষ সাবান পরিহার করুন। পরিষ্কার করার সময় সবসময় সামনে থেকে পেছনের দিকে মুছুন।
  • সুতি কাপড় নরম এবং অধিক ত্বকবান্ধব। বায়ু চলাচল ও দ্রুত আদ্রতা শুষে নেয় সুতি কাপড়।নিয়মিত পড়ার জন্য সুতি কাপড়ের অন্তর্বাস সবচেয়ে ভালো।
  • টাইট জামাকাপড় এড়িয়ে চলুন। কারণ এই ধরনের পোশাক বায়ু চলাচলে বাধা তৈরি করে।
  • Douche ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এমনিতেও গর্ভাবস্থায় Douche এর ব্যাবহার উচিত নয়। এর ফলে যৌনাঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.