আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা বা এনেমিয়া

আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা বা এনেমিয়া কি?

রক্তের একটি বিশেষ উপাদান হলো লোহিত রক্তকণিকা বা রেড ব্লাড সেল। লোহিত রক্তকণিকায়  হিমোগ্লোবিন নামে একটি বিশেষ ধরনের রঞ্জক পদার্থ থাকে, যা ফুসফুস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে শরীরের সব কোষকে উজ্জীবিত রাখে এবং প্রতিটি কোষের বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ কার্বন ডাই-অক্সাইড ফুসফুসের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। আমাদের শরীরে যথেষ্ট পরিমান লোহিতকণিকা উৎপাদনের জন্য আয়রনের প্রয়োজন যাতে এই হিমোগ্লোবিনের পরিমান সঠিক পর্যায়ে থাকে। শরীরে যদি কোন কারণে আয়রনের ঘাটতি হয় তাহলে হিমোগ্লোবিন এর অভাবে এনেমিয়া বা রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।

মহিলাদের ক্ষেত্রে এনেমিয়া বা রক্তস্বল্পতা অস্বাভাবিক কিছু নয় বিশেষ করে তারা যখন সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত বয়সে পৌছায়। আয়রনের অভাব এনেমিয়া বা রক্তস্বল্পতার একমাত্র কারণ নয়। নিম্নলিখিত কারণে এনেমিয়া হতে পারে-

১। রক্তের লোহিত কণিকার উৎপাদনজনিত সমস্যার কারণে :

  • আয়রনের ঘাটতিজনিত এনিমিয়া।
  • ভিটামিন-বি, ফলিক এসিডের ঘাটতিজনিত এনিমিয়া।
  • এপ্লাস্টিক এনিমিয়া (অস্থিমজ্জার উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হলে হয়)।
  • বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি অসুখের (যেমন—কিডনি বিকল, লিভার বিকল, থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা ইত্যাদি) কারণে এনিমিয়া।
  • লিউকেমিয়া বা রক্তের ক্যান্সারজনিত কারণে

২। রক্তের লোহিত কণিকা দ্রুত ভেঙে যাওয়ার কারণে :

  • জন্মগত কারণ (যেমন—থ্যালাসেমিয়া)।
  • বিশেষ কিছু ইনফেকশনের কারণে (যেমন—ম্যালেরিয়া)।
  • শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জটিলতার কারণে

৩। রক্তক্ষরণজনিত কারণে :

  •  কৃমি, পেপটিক আলসার, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার ওষুধ, পাইলস, অতিরিক্ত ঋতুস্রাব
  • দুর্ঘটনাজনিত হঠাৎ রক্তক্ষরণ।

তবে শতকরা ৭৫-৯০ এনেমিয়ার কারণ আয়রন এর অভাব। তাই আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু Iron Deficiency Anemia বা আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতা।

গর্ভাবস্থায় কি এনেমিয়া বা রক্তস্বল্পতা হওয়ার ঝুঁকি থাকে ?

হ্যা। গর্ভাবস্থায় এনেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মহিলার দৈনিক ১৮ মি.গ্রা আয়রনের প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ মি.গ্রামে। এ সময় বাড়তি লোহিতকণিকা তৈরি, প্লাসেন্টা এবং উদরে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্য এ বাড়তি আয়রন এর প্রয়োজন পড়ে। এ ছাড়াও এ বাড়তি আয়রন সন্তান জন্মদানের সময় যে রক্তক্ষরণ হবে তার জন্য আপনার শরীরকে প্রস্তুত করে।

এছাড়াও আরও কিছু কারনেও এর ঝুঁকি বাড়তে পারে –

  • খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণ লৌহের যোগান না পেলে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
  • দীর্ঘমেয়াদী কোনও রোগ, প্রোটিন বা আমিষ জাতিও খাবার কম খেলে, হজমে সমস্যা, পাকস্থলীর বাইপাস অপারেশন ইত্যাদি কারনে পাকস্থলির খাবার থেকে লৌহ শোষণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং এর ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
  • ভিটামিন- সি জাতীয় খাবার কম খেলে। ( এ ধরনের খাবার আয়রন শোষণে সাহায্য করে)
  • এমন খাবার বেশী খেলে যায় আয়রন শোষণ বাধাগ্রস্থ করে। যেমন- ডেইরি প্রোডাক্ট, চা কফি ইত্যাদি।
  • দুবার গর্ভধারণের মধ্যে অল্প বিরতি থাকলে।
  • ২০ বছরের নিচে গর্ভধারণ করলে।
  • পূর্বে সন্তান জন্মদানের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঘটনা ঘটলে।

আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতার লক্ষণগুলো কি কি ?

মৃদু এনেমিয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোন লক্ষণই দেখা যায়না। শুধুমাত্র ক্লান্ত লাগায় হয়ত একমাত্র লক্ষণ যা আপনি টের পাবেন। আর যেহেতু গর্ভাবস্থায় ক্লান্ত লাগা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার তাই অনেক মা ই বুঝতে পারেন না যে আয়রন এর অভাবেই তার ক্লান্ত লাগছে বা তিনি রক্তশল্পতায় ভুগছেন।

রক্তশূন্যতা প্রকট হলে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে-

  • অবসাদ, দুর্বলতা, ক্লান্তি
  • বুক ধড়ফড় করা
  • স্বল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট
  • মাথা ঝিমঝিম করা
  • চোখে ঝাপসা লাগা
  • মাথা ব্যথা করা
  • হাতে পায়ে ঝিনঝিন করা, অবশভাব হওয়া
  • হাত, পা, সমস্ত শরীর ফ্যাকাশে হয়ে আসা
  • অস্বাভাবিক খাদ্যের প্রতি আসক্তি জমায়
  • মুখের কোণায় ঘা হয়
  • জিহ্বায় ঘা বা প্রদাহ
  • খাদ্য গিলতে অসুবিধা
  • নখের ভঙ্গুরতা ও চামচের মতো আকৃতির নখ হয়ে যাওয়া

কিভাবে এনেমিয়ার চিকিৎসা করা হয়-

রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করলেই রক্তশূন্যতা ধরা পড়ে। রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করে রক্তে লোহিত রক্তকণিকা ও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা দেখা হয়। আয়রনের মাত্রা দেখার জন্য সিরাম আয়রন ও সিরাম ফেরিটিন পরীক্ষা করা হয়। টিআইবিসি বলে এক ধরনের পরীক্ষাও করা হয়।

যেকোনো ধরনের রক্তশূন্যতায় চিকিৎসা দেওয়া হয় রক্তশূন্যতার পেছনের কারণটিকে বিবেচনা করে।আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতায় কী কারণে আয়রনের ঘাটতি হলো তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। অপুষ্টিজনিত কারণে হলে আয়রন সাপ্লিমেন্ট হিসেবে দেওয়াটাই মূল চিকিৎসা। সঙ্গে আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের পরামর্শ দেওয়া হয়। কচু শাক,  ডাঁটা শাক,  পালং শাক,  শিম ও শিমের বিচি,  কাঁচা কলা,  সামুদ্রিক মাছ,  কলিজা,  গিলা, গরু-খাসির মাংসে প্রচুর আয়রন থাকে। আয়রন সাপ্লিমেন্ট দুভাবে দেওয়া হয়। মুখে খাবার জন্য ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল আকারে,  শিরায় ইনজেকশন হিসেবে। কোন উপায়ে রোগী এটা নেবেন তা রোগীর অবস্থা বুঝে চিকিৎসক পরামর্শ দেবেন। পেপটিক আলসার,  অতিরিক্ত ঋতুস্রাব,  পাইলস থাকলে তার চিকিৎসা করতে হবে।

এনেমিয়া বা রক্তস্বল্পতা গর্ভাবস্থায় কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?

গর্ভাবস্থায় এনেমিয়া হলে উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। তবে মৃদু এনেমিয়া যদি ঠিক সময়ে ধরা পড়ে এবং চিকিৎসা করা হয় তাহলে গর্ভাবস্থায় তেমন কোন অসুবিধা হয়না। কিন্তু যদি তা মারাত্মক পর্যায়ে চলে যায় বা চিকিৎসা নেয়া না হয় এবং অনেক দিন ধরে থাকে তবে তা যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ।

আপনার চিকিৎসক যদি আপনাকে সাপ্লিমেন্ট নিতে বলে এবং আপনি তা মেনে চলেন তবে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া স্বাভাবিক। যদি তা মারাত্মক আকার ধারন করে তবে হয়ত আপনাকে IV সাপ্লিমেন্ট দেয়া হবে। যদি হিমোগ্লোবিন এর মাত্রা ৬ g/dl বা তার নিচে নেমে যায় তাহলে হয়ত বা রক্ত দেয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে।

গর্ভাবস্থায় যদি আয়রনের অভাব থাকে তাহলে খুব সহজেই আপনি আপনি ক্লান্ত হয়ে পরবেন। যেহেতু গর্ভাবস্থা এমনিতেই অনেক ক্লান্তিজনক তাই নিজের যত্ন নিন।

মৃদু আয়রনের অভাব গরভস্থ শিশুর উপর তেমন কোন প্রভাব ফেলেনা কিন্তু গবেষকদের মতে যদি তার যথাযথ চিকিৎসা না হয় এবং তা মারাত্মক আকার ধারন করে, বিশেষ করে প্রথম দুই ট্রাইমেস্টারে তবে বাচ্চার জন্মের সময় ওজন কম হতে পারে। আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতার কারণে এমন কি গর্ভে সন্তানের মৃত্যু বা নবজাতক অবস্থায় মৃত্যু ঘটতে পারে।

গর্ভাবস্থায় আয়রনের অভাবে এনেমিয়া বা রক্তস্বল্পতা রোধে কি করা যায়?

গর্ভধারণের আগেই যদি বুঝতে পারেন যে আপনার রক্তস্বল্পতা আছে তাহলে তা আপনার চিকিৎসককে জানান। এর ফলে তিনি গর্ভধারণের সময় এবং পুরো গরভকালীন সময়ে আপনার করনীয় সম্পর্কে আপনাকে নির্দেশনা দিতে পারবেন।

গরভকালীন সময়ে নিয়মিত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী প্রি-ন্যাটাল ভিটামিন গ্রহন করুন। তিনি আপনাকে আয়রন সাপ্লিমেন্ট এর পরামর্শ দিতে পারেন বা আপনার খাদ্যাভ্যাস  এর ব্যাপারে পরামর্শ দিতে পারেন।

এ রোগের প্রাথমিক অবস্থায় প্রচুর পরিমাণে লৌহ সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন কচু, ধনেপাতা, আটা, কালোজাম, চিড়া, শালগম, কলিজা, চিংড়ি, ডাঁটা শাক, আমচুর, পাকা তেঁতুল, ফুলকপি, শুঁটকি মাছ এবং পালংশাক ইত্যাদি খেতে হবে। এর সাথে সাথে ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ টক জাতীয় ফল খেতে হবে।  ভিটামিন সি জাতীয় খাবার রক্তে আয়রন শোষণে সাহায্য করে।

কিছু ঔষুধ এবং খাবার যেমন- দুগ্ধজাতীয় খাবার, এন্টাসিড ওষুধ, চা ও কফি ইত্যাদি মানুষের পাকস্থলিতে অন্যান্য খাবার হতে লৌহ শোষণের মাত্রা কমিয়ে দেয়। সুতরাং, লৌহ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের আগে ও পরে এসব ঔষুধ অথবা খাবার গ্রহন থেকে বিরত থাকতে হবে।

আয়রন সাপ্লিমেন্ট নেয়ার আগে অবশ্যয় মনে রাখবেন যাতে সাথে সাথে বেশী খাবার গ্রহন করা না হয় এতে রক্তে আয়রন শোষণ ব্যাহত হয়।

এনিমিয়া বা রক্তশূন্যতা একটি প্রচলিত সমস্যা। শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে রক্তশূন্যতা হয়। সাধারণত মেয়েরা এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন। খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এনেও রক্তশূন্যতা দূর করা যায়। শরীর দুর্বল হলে বা ফ্যাকাসে হলেই অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজেরাই আয়রন সিরাপ বা ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন। এতে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি থাকে। যেমন- থ্যালাসেমিয়া রোগে রক্তশূন্যতা হয় ঠিকই কিন্তু শরীরে আয়রনের অভাব হয় না। বরং আয়রন জমা হয়ে সমস্যা সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজন হয়। যেকোনো ঔষধ প্রয়োজন হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে হবে।

সবাই ভাল থাকবেন, সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

2 Thoughts to “আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা বা এনেমিয়া”

  1. […] উল্লেখযোগ্যহারে বেড়ে যায়, যার ফলে এনেমিয়া দেখা দিতে পারে। তবে যে কোন […]

  2. […] উল্লেখযোগ্যহারে বেড়ে যায়, যার ফলে এনেমিয়া দেখা দিতে পারে। তবে যে কোন […]

Leave a Comment