গর্ভাবস্থায় আলট্রাসাউন্ড কেন করা হয়?

আলট্রাসাউন্ড কি ? 

মানুষের শ্রবণসীমার বাইরের কম্পাংকের শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে শরীরের ভেতরের ছবি নেয়ার পদ্ধতি হচ্ছে আলট্রাসনোগ্রাফি বা আলট্রাসাউন্ড। সাধারণত ২ থেকে ১৮ মেগাহার্জ কম্পাংকের শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করা হয় আলট্রাসনোগ্রাফিতে। এখন পর্যন্ত আলট্রাসনোগ্রাফিকে একটি নিরাপদ পরীক্ষা বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ এক্স-রে এর মত এতে কোন ক্ষতিকর প্রভাব নেই।

স্ক্যান এর আগে আপনাকে প্রচুর পানি পান করতে বলা হবে, কারন আপনার মুত্রথলি পূর্ণ হলে এটি আপনার জরায়ু কে ঠেলে উপরে উঠিয়ে দিবে, এতে স্ক্যানে ভাল ভাবে জরায়ুর ভিতরটা পরিক্ষা করা যায়। এরপর আপনি চিত হয়ে শুয়ে পড়বেন এবং আপনার পেটে জেলি জাতীয় একটি জিনিষ লেপে দেয়া হবে। একটি যন্ত্র আপনার পেটের উপর কিছুক্ষন আগেপিছে করা হবে এবং এর মাধ্যমে উচ্চ তরঙ্গ (high frequency) মাত্রার শব্দ আপনার জরায়ু তে প্রেরণ করা হবে। শব্দ প্রতিফলিত হয়ে ছবি তৈরি করবে এবং টিভির পর্দায় আপনি প্রথম বারের মতন আপনার শিশুকে দেখতে পাবেন। প্রথমবারের মত নিজের শিশুকে দেখে অনেকেই উত্তেজিত এবং আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

ছবিটি বিভ্রান্তকর মনে হলে অথবা কিছু বুঝতে না পারলে, সংকোচ না করে জিজ্ঞেস করুন।আপনার সাথে আপনার সঙ্গী উপস্থিত থাকতে পারবেন। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এর পর শিশুর অস্তিত্ব উভয়ের কাছে বাস্তব হয়ে ওঠে।

গর্ভাবস্থায় আলট্রাসাউন্ড কেন করা হয়?

গর্ভাবস্থায় এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মায়ের গর্ভে ভ্রূণ বেড়ে ওঠে। আর গর্ভস্থ শিশুর বেড়ে ওঠা, তার চারপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য আলট্রাসনোগ্রাফি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা।

সাধারণত যেসব কারণে আলট্রাসনোগ্রাফি করতে হয়-

গর্ভধারণ হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা হয় আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে। পূর্ববর্তী মাসিকের সাড়ে চার সপ্তাহের মধ্যে গর্ভাশয়ের থলে এবং পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভাশয়ের থলের মধ্যে আরেকটি ক্ষুদ্র থলে (ইয়ক স্যাক) দেখে শনাক্ত করা যায় গর্ভধারণ হয়েছে কি না। আর সাড়ে পাঁচ সপ্তাহ পর ভ্রূণ দেখা যায়।

হৃৎপিণ্ডের চলাচল পর্যবেক্ষণ

গর্ভধারণ করার পর ছয় সপ্তাহের মধ্যে পালস ডপলার সনোগ্রাফির মাধ্যমে ভ্রূণের হৃৎপিণ্ডের চলাচল বোঝা যায় এবং সাত সপ্তাহের মধ্যে সাধারণ গ্রে-স্কেল আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্রেও (যার মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যু দেখা হয়) ধরা যায়। আবার সাত মিলিমিটার উচ্চতার ভ্রূণের হৃৎপিণ্ডের চলাচল বুঝতে না পারলে ভ্রূণের মধ্যে প্রাণ নেই বলে সন্দেহ করতে হবে। তবে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে এর সাত থেকে ১০ দিন পর পুনরায় আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে ভ্রূণের হৃৎস্পন্দন আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া উচিত। এখানে বলে রাখা দরকার, আধুনিক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্রের সাহায্যে অপেক্ষাকৃত কম বয়সের ভ্রূণ শনাক্ত এবং সঙ্গে হৃৎস্পন্দনও বোঝা যায়।

ভ্রূণের বয়স নির্ধারণ

ভ্রূণের উচ্চতা, মাথার দুই প্রান্তের দূরত্ব, পায়ের বড় অস্থি ভ্রূণের বয়সের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সামঞ্জস্য রেখে বৃদ্ধি পায়। আর আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে এই পরিমাপগুলো নিয়েই ভ্রূণের বয়স নির্ধারণ করা হয়। পেটের পরিধির মাপ, পায়ের বড় অস্থি এবং মাথার দুই প্রান্তের দূরত্ব দিয়ে ভ্রূণের ওজন সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায়।

গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটি

আলট্রাসনোগ্রাফির সাহায্যে গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটি  নির্ণয় করা যায়। যেমন, মাথায় অতিরিক্ত পানি জমা, মাথাবিহীন ভ্রূণ, খর্বাকৃতি, মেরুদণ্ডের বিকৃতি, হৃৎপিণ্ডের সমস্যা, প্রস্রাবের থলের বা নালির সমস্যা, ঠোঁট ও মুখের তালুর সমস্যা ইত্যাদি।

গর্ভফুলের অবস্থান জানা 

গর্ভকালীন সময়ে তৈরি হয় গর্ভফুল, যা জরায়ুর ভেতরের দেয়ালে লেগে থাকে। মা ও ভ্রূণের যোগাযোগ এই গর্ভফুলের মাধ্যমে হয়। গর্ভফুল জরায়ুর কোন অবস্থানে আছে তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভফুল জরায়ুর নিচের দিকে থাকলে এ অবস্থাকে বলা হয় প্লাসেন্টা প্রিভিয়া

এসব ক্ষেত্রে গর্ভকালীন প্রচুর রক্তপাত হতে পারে। গর্ভফুল নিজেই স্বাভাবিক প্রসবের রাস্তা বন্ধ করে দিতে পারে। আলট্রাসনোগ্রাফি করে গর্ভফুলের অবস্থান নির্ণয় করা হয়।

ভ্রূণের সংখ্যা নির্ণয়

ভ্রূণের সংখ্যা এক, দুই, তিন বা এর চেয়ে বেশি হতে পারে। আলট্রাসনোগ্রাফি করেই ভ্রূণের সংখ্যা নির্ণয় করা হয়।

গর্ভাশয়ের পানির পরিমাণ বের করা

গর্ভাশয়ের থলে তরল দিয়ে পূর্ণ থাকে। এই তরলকে বলা হয় অ্যামনিয়টিক ফ্লুইড। এই তরলের মধ্যেই ভ্রূণ ডুবে থাকে। গর্ভাশয়ের থলের তরলের পরিমাণ খুব কমে গেলে বা বেশি হয়ে গেলে তা ক্ষতিকর। আলট্রাসনোগ্রাফির সাহায্যে এই পানির পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়।

এগুলো ছাড়াও গর্ভস্থ শিশুর প্রতি মিনিটে শ্বাস-প্রশ্বাসের সংখ্যা, হৃৎস্পন্দনসহ ভ্রূণের বাহ্যিক অবস্থা, জরায়ুর ভেতরই ভ্রূণের মৃত্যু (আইইউএফডি), জরায়ুর বাইরে ভ্রূণের অবস্থান, ব্লাইটেড ওভাম (গর্ভাশয়ের থলের ব্যাস ২৫ মিলিমিটার বা এর বেশি কিন্তু ভ্রূণের অনুপস্থিতি) ইত্যাদিও আলট্রাসনোগ্রাফি করলে বোঝা যায়।

ডপলার আলট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা

এটি হচ্ছে বিশেষ ধরনের আলট্রাসনোগ্রাফি, যার মাধ্যমে রক্তনালিতে রক্তের প্রবাহের দিক এবং রক্তের গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করা যায়। এর মাধ্যমে সাধারণত ভ্রূণের রক্তনালিগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়, যেমন হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ট, হৃৎপিণ্ড থেকে বের হওয়া প্রধান ধমনি, মস্তিষ্কের রক্ত সরবরাহকারী ধমনি, জরায়ুর ভেতরের রক্তনালি, বড় শিরা, যা হৃৎপিণ্ডে প্রবেশ করে। হৃৎপিণ্ডের ত্রুটি, রক্তশূন্যতা, অক্সিজেন-স্বল্পতা ডপলার অতিশব্দ পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায়। ত্রিমাত্রিক ও চতুর্মাত্রিক সনোগ্রাফির মাধ্যমে ভ্রূণের ত্রিমাত্রিক ছবি মনিটরে দেখা যায়।

কখন আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করতে হবে? 

গর্ভাবস্থায় আলট্রাসনোগ্রাফি বা অতিশব্দ পরীক্ষা করার কোনো নির্ধারিত সময়সূচি নেই। কোনো সমস্যা বা সন্দেহ থাকলে পরীক্ষাটা করতে হবে। গর্ভধারণ করার সাত সপ্তাহ পর আলট্রাসনোগ্রাফি করলে গর্ভস্থ শিশুকে দেখা যায় এবং হৃৎপিণ্ডের চলাচল বোঝা যায়। ১১ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে নাকের হাড় এবং ঘাড়ের পেছনের দিকের পানিপূর্ণ থলে দেখা হয়, যার মাধ্যমে মানসিক ও শারীরিক ত্রুটিযুক্ত শিশু প্রসবের আশঙ্কা থাকলে তা বোঝা যায়। ১৮ থেকে ২০ সপ্তাহের দিকে ভ্রূণের গঠনগত ত্রুটিগুলো ভালো বোঝা যায়। ৩২ সপ্তাহের সময় সাধারণত ভ্রূণের বৃদ্ধি, ওজন, বাহ্যিক অবস্থা দেখা হয়। আগে করা সনোগ্রাফিগুলোতে কোনো ত্রুটি সন্দেহ করলে এ পর্যায়ে তা মিলিয়ে দেখা হয়। ২৪ সপ্তাহের পর গর্ভস্থ শিশুর লিঙ্গ বোঝা যায়। তবে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিশেষ কারণ ছাড়া লিঙ্গ উল্লেখ না করাই ভালো। বিশ্বের অনেক দেশেই গর্ভস্থ শিশুর লিঙ্গ উল্লেখ না করার বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

আল্ট্রাসাউন্ড কতবার করানো উচিত ?

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অবস্টেট্রিক্স এবং গাইনোকোলজি বিভাগের ইন্সট্রাক্টর ডাক্তার মেন্ডিওলার মতে, বেশিরভাগ সুস্থ গর্ভবতীর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দুইবার আল্ট্রাসাউন্ডই যথেষ্ট। প্রথমবার, ঠিক কবে নাগাদ প্রসব হবে সেটা জানার জন্য গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসের মধ্যে এবং ১৮-তম সপ্তাহের মধ্যে গর্ভজাত শিশুটির সুস্থ স্বাভাবিক গঠন নিশ্চিত করণে দ্বিতীয়বার আল্ট্রাসাউন্ড করানো যেতে পারে(এসময় গর্ভের শিশুটি ছেলে নাকি মেয়ে আপনি চাইলে জেনে নিতে পারেন) ।

প্রেগন্যান্সির শুরুর দিকে একবার-

১. এক বা একাধিক ভ্রূণ নিশ্চিত করণের জন্য

২.  প্রসবের তারিখ নির্ধারণ বা ভ্রূণের বয়স নিরুপনের জন্য

পরে আরেকবার-

১. গর্ভজাত শিশুর সুস্থতা সুনিশ্চিত করতে

২. গর্ভফুলের সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করণে

৩. এমনিওটিক ফ্লুইড সঠিক পরিমানে আছে কিনা

৪. বাচ্চার সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করণে

৫.  বাচ্চার ওজন পরিমাপ করতে

প্রথম আল্ট্রাসাউন্ডে যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, অথবা ভ্রূণের সাইজে যদি গরমিল মনে হয় তবে পুনরায় আল্ট্রাসাউন্ডটি করানো উচিত। এছাড়াও, গর্ভবতী মায়ের যদি ডায়াবেটিস বা হাইপারটেনশন থেকে থাকে সেক্ষেত্রে দুবারের বেশি আল্ট্রাসাউন্ড করানো লাগতে পারে।

আলট্রা সাউন্ডের কোন ক্ষতিকর দিক আছে কি?

এক্স-রে, সিটিস্ক্যান ইত্যাদি পরীক্ষায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রশ্মি ব্যবহার করা হয়, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু আলট্রাসনোগ্রাফিতে অতিশব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করা হয়। এই তরঙ্গের উল্লেখ করার মতো ক্ষতিকর দিক এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এটাও বলে রাখা ভালো যে সনোগ্রাফির মাধ্যমে তথ্য পাওয়ায় ক্ষেত্রে একটা ভালো যন্ত্র থাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনিভাবে যিনি পরীক্ষাটি করছেন তাঁর দক্ষতাও রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বলে গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন আলট্রাসনোগ্রাফি করা ঠিক নয়। নির্দিষ্ট কারণে বা কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষাটি করানো উচিত। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ে অপরিহার্য এই যন্ত্রটি ডাঃ আয়ান ডোনাল্ট  গ্লাসগোতে ১৯৫০ সালে প্রয়োগ করেন।বর্তমানে গর্ভাবস্থায় ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করা হয় উত্তর আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন এবং ইউরোপে। বিগত ৫০ বছরে দশ কোটিরও বেশি নারীর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করে এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন রকম বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করে শিশুর ওপর এর কোনো ক্ষতিকারক প্রভাব এখনও পাওয়া যায়নি। গর্ভাবস্থায় নিয়মমাফিক আলট্রাসাউন্ড করা ব্রিটেন ও ইউরোপে ভালোভাবে স্বীকৃত এবং আমাদের দেশেও কোনো কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে এটা নিয়মমাফিক করা হয়।

 

সবার জন্য শুভকামনা

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.