হাইপারথাইরয়েডিজম। গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যা

Updated on

হাইপারথাইরয়েডিজম Hyperthyroidism কি?

হাইপারথাইরয়েডিজম হল এমন একটি অবস্থা যা আপনার মেটাবোলিজম অর্থাৎ শরীরে খাদ্য থেকে শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে দেয়। (মেটাবোলিজম বলতে আপনার শরীরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কেমিক্যাল রিয়েকশনের মাধ্যমে খাদ্য থেকে বেঁচে থাকার শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বুঝায়।)

আপনার থাইরয়েড গ্রন্থি যখন প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত হরমোন নিঃসৃত করে তখনই আপনি হাইপারথাইরয়েডিজম নামক সমস্যায় ভুগেন। আর এই অতিরিক্ত হরমোন নিঃসৃত করার কারণে এই অবস্থাকে মাঝেমধ্যে ওভাররিকেটিভ থাইরয়েড অর্থাৎ অতিরিক্ত কাজ করা থাইরয়েডও বলা হয়ে থাকে।

আপনার ঘাড়ের সামনের দিকে অবস্থিত প্রজাপতি আকৃতির গ্রন্থিকে থাইরয়েড বলা হয়ে থাকে, আর এই থাইরয়েড দুই ধরনের হরমোন নিঃসৃত করে। একটি হল Triiodothyronine (T3) এবং thyroxine (T4)। এই দুই ধরনের হরমোন আপনার শরীরের খাদ্য থেকে শক্তি উৎপাদন করার প্রক্রিয়ার গতি প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

আপনি জখন গর্ভধারণ করেন তখন আপনার শরীর আগের থেকে পঞ্চাশ ভাগ বেশি T3 এবং T4 হরমোন উৎপন্ন করে থাকে, কেননা এই দুই ধরনের হরমোন আপনার গর্ভের শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে এই দুই ধরনের হরমোন যদি মাত্রাতিরিক্ত নিঃসৃত হয় তাহলে গর্ভাবস্থায় আপনার বেশ কিছু ধরনের জটিলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে যেমন গর্ভপাত, প্রিক্ল্যাম্পসিয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শিশুর প্রিম্যাচিউর জন্ম গ্রহণ করা। এছাড়া আপনার গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপরেও হাইপারথাইরয়েডিজম ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তার করে।

তবে কখনো কখনো আপনার শরীর প্রয়োজন অনুসারে হরমোন উৎপাদন করতে পারে না। আর এই ধরনের শারীরিক অবস্থাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়ে থাকে। প্রয়োজন অনুসারে হরমোন উৎপাদন করতে না পারার কারণে এই অবস্থাকে underactive thyroid অর্থাৎ অকার্যকর থাইরয়েডও বলা হয়ে থাকে।

হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলো কি?

একেকজনের মধ্যে একেক ধরনের লক্ষণ দেখা যেতে পারে, তবে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলো নিম্নে বর্ণিত হলঃ

  • ওজন কমে যাওয়া (অথবা গর্ভাবস্থায় শরীরের ওজন বৃদ্ধি না হওয়া)
  • মানসিক চাপ অনুভূত হওয়া অথবা মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া।
  • মন মেজাজ বারবার পরিবর্তন হওয়া।
  • অবসাদগ্রস্ত অথবা ক্লান্ত লাগা।
  • পেশীর শক্তি কমে আসা
  • হাত কাঁপা
  • হৃৎস্পন্দন দ্রুত অথবা অনিয়মিত হয়ে যাওয়া
  • অতিরিক্ত গরম লাগা
  • ঘুমাতে সমস্যা হওয়া
  • বারবার পেটে সমস্যা হওয়া অথবা ডায়রিয়া হওয়া
  • ঘাড়ের সামনের অংশ ফুলে যাওয়া।

গর্ভাবস্থায় হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণ কি?

Autoimmune disorder অর্থাৎ শরীরের এন্টিবডি যখন ভালো কোষগুলোকে আক্রমণ করে তার কারণেই বেশিরভাগ সময় গর্ভাবস্থায় হাইপারথাইরয়েডিজম দেখা যায়, এই ধরনের সমস্যাকে Graves’s disease ও বলা হয়ে থাকে।

আপনি যখন Graves’s disease এ আক্রান্ত হবেন তখন আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা thyroid-stimulating immunoglobulin (TSI) নামক এক ধরনের এন্টিবডি তৈরি করে, যেটা থাইরয়েড গ্রন্থির সাথে সংযুক্ত থাকে এবং থাইরয়েড থেকে বেশি পরিমাণে হরমোন নিঃসৃত করতে প্রভাবিত করে। এই ধরনের grave’s disease খুবই বিরল এবং প্রতি ১০০০ গর্ভবতী নারীর মধ্যে প্রায় দুইজনের মধ্যে কেবলমাত্র দেখা যায়।

এছাড়া আপনার শরীর যদি গর্ভকালীন সময়ে প্রচুর পরিমাণ human chorionic gonadotropin (hCG) নামক হরমোন নিঃসৃত করে তাহলেও আপনার থাইরয়েড প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশি কাজ করা শুরু করবে। এই ধরনের অবস্থাকে ডাক্তারি ভাষায় gestational transient thyrotoxicosis বলা হয়ে থাকে।

গর্ভাবস্থার একদমই প্রাথমিক সময়ে আপনার শরীর এই hCG নামক হরমোন তৈরি করা শুরু করে, এবং আপনার রক্তে এই হরমোনের পরিমাণ প্রথম ট্রাইমেস্টারে প্রচুর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। আর রক্তে hCG এর পরিমাণ খুব বেশি বৃদ্ধি পেয়ে গেলে সেটা থাইরয়েডকে প্রভাবিত করা শুরু করে এবং ফলস্বরূপ আপনি হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

যে সকল নারীদের গর্ভে একের অধিক সন্তান থাকে এবং গর্ভকালীন সময়ে যাদের খুব বেশি বমি  ভাব আসে ও বমি করে (হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম) তাদের রক্তে hCG নামক হরমোনের পরিমাণ বেশি থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

গর্ভধারণের কারণে আপনি যদি খুব বেশী অসুস্থ হয়ে পড়েন অথবা আপনার গর্ভে যদি যমজ অথবা তার বেশী শিশু থাকে তাহলে ডাক্তার শুরুতেই আপনার থাইরয়েড পরীক্ষা করে নিবেন। তবে আশানুরূপ তথ্য হল এই ধরনের অবস্থা গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসের মধ্যেই নিজ থেকেই ঠিক হয়ে যায়।

হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণে গর্ভাবস্থায় কি কি জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে?

হাইপারথাইরয়েডিজমে ভোগার পরেও সবার মধ্যে গর্ভকালীন সময়ে জটিলতা সৃষ্টি হয় না। হাইপারথাইরয়েডিজম যদি অল্প থাকে তাহলে সাধারণত এর কারণে আপনার এবং গর্ভের শিশুর কোন ধরনের সমস্যা তৈরি হয় না। আর এমতাবস্থায় আপনার ডাক্তার এর চিকিৎসা না করে বরং শুধুমাত্র হাইপারথাইরয়েডিজমের গতি প্রকৃতির উপর লক্ষ্য রাখবেন।

তবে তীব্র আকার ধারণ করা হাইপারথাইরয়েডিজমের যদি সঠিক চিকিৎসা না হয় তাহলে এর কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে, যেমনঃ

আপনি যদি জানেন যে আপনার হাইপারথাইরয়েডিজম আছে, তাহলে গর্ভধারণ করার আগেই এই ধরনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসুন। এতে করে গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থেকে আপনি বেঁচে থাকবেন।

এর মানে হল এক মাস পরপরই দুইবার আপনার থাইরয়েডের পরীক্ষা করাতে হবে এবং পরীক্ষার ফলাফল এরূপ নিয়ে আসতে হবে যে আপনার থাইরয়েড স্বাভাবিক আছে এবং সঠিক পরিমাণে হরমোন নিঃসৃত করছে।

এছাড়া গর্ভধারণ করার পর নিয়মিত থাইরয়েড পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুসারে ওষুধ গ্রহণ করার মাধ্যমে বিবিধ জটিলতা থেকে দূরে থাকা সম্ভব।

গর্ভাবস্থায় আপনাকে কি হাইপারথাইরয়েডিজমের পরীক্ষা করা হবে?

সাধারণত যে সকল নারীরা গর্ভধারণের আগে নিজেদের শারীরিক অবস্থা ভালো আছে এ সম্পর্কে জানে, ডাক্তাররা তাদের ক্ষেত্রে শুরুতেই থাইরয়েডের পরীক্ষা দিয়ে থাকেন না।

ব্যাপারটা আদতে এমন হয় যে আপনি যখন গর্ভধারণ করার পর প্রথম বারের মত ডাক্তার দেখাতে যাবেন, তখন ডাক্তার আপনার পূর্বের স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। আপনাকে হয়ত থাইরয়েডের পরীক্ষা করানো হবে যদি আপনার মধ্যে নিম্নবর্তী কোন অবস্থা দেখা যায়ঃ

  • হাইপারথাইরয়েডিজম এর কোন লক্ষণ যদি আপনার মধ্যে দেখা যায় যেমন হৃৎস্পন্দন দ্রুত হওয়া অথবা হাত কাঁপা।
  • অতীতে আপনার মধ্যে থাইরয়েড জনিত কোন ধরনের সমস্যা দেখা গিয়েছিল অথবা আপনাকে থাইরয়েডে কোন ধরনের চিকিৎসা করা হয়েছিল।
  • যদি আপনার থাইরয়েড এন্টিবডি পরীক্ষায় (TSI antibodies) সুস্পষ্ট কোন প্রমাণ পাওয়া যায়।
  • আপনার যদি গলগণ্ড হয়ে থাকে।
  • আপনার পরিবারের কারো যদি অতীতে থাইরয়েডের সমস্যা দেখা গিয়ে থাকে।
  • আপনার বয়স যদি ত্রিশ থেকে বেশি হয়ে থাকে।
  • অতীতে আপনি যদি এক বারের বেশি গর্ভধারণ করে থাকেন।
  • গর্ভধারণ করতে যদি আপনি যদি কোন ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হন।
  • অতীতে যদি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আপনার কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকে।
  • অতীতে যদি আপনার গর্ভপাত হয়ে থাকে অথবা মৃত শিশু প্রসব হয়ে থাকে।
  • আপনার BMI যদি ৪০ অথবা ততোধিক হয়।
  • আপনার যদি টাইপ-১ ডায়াবেটিকস হয় অথবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জনিত কোন ধরনের সমস্যা আপনার মধ্যে দেখা যেয়ে থাকে।

আপনার থাইরয়েড কতটুকু স্বাভাবিক ভাবে কাজ করছে তা পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তার আপনার রক্ত পরীক্ষা করে দেখবেন যে আপনার রক্তে কি পরিমাণ thyroid-stimulating hormone (THS) এবং T4 হরমোন বিদ্যমান আছে।

আপনার মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি TSH তৈরি করে, এটা এমন এক ধরনের হরমোন যা আপনার থাইরয়েডকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আপনার রক্তে T4 হরমোনের পরিমাণ যখন খুব বেড়ে যায় তখন মস্তিষ্ক TSH হরমোন তৈরি করা বন্ধ করে দেয়। তাই আপনার রক্তে যদি T4 হরমোনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে এবং TSH হরমোনের পরিমাণ কম থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনি হাইপারথায়রয়েডিজম সমস্যায় ভুগছেন।

এছাড়া আপনার রক্তে TSI এন্টিবডি রয়েছে কি না সেটাও ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখবেন, কেননা এই TSI antibody আপনার Grave’s disease এর মূল কারণ। ডাক্তারি ভাষায় একে TSH receptor antibodies ও বলা হয়ে থাকে।

গর্ভাবস্থায় হাইপারথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা কি?

আপনার মধ্যে যদি Grave’s disease ধরনের সমস্যা দেখা যায় তাহলে আপনার শরীরের হরমোন তৈরি কমিয়ে আনার জন্য আপনার ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। তবে গর্ভকালীন সময়ে তৈরি হরমোন hCG এর কারণে আপনার থাইরয়েডিজমের সমস্যা দেখা গিয়ে থাকে তাহলে তেমন কোন দুশ্চিন্তার কারণ নেই, কেননা আপনার গর্ভধারণের দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের মধ্যেই কোন প্রকার চিকিৎসা ছাড়াই এই সমস্যা ধীরে ধীরে কমে আসবে।

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের মধ্যে আপনার শরীরের hCG নামক হরমোন  স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে এবং যার ফলে আপনার থাইরয়েডের হরমোনের পরিমাণও স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে।

গর্ভাবস্থায় যখন আপনার হাইপারথাইরয়েডিজমের চিকিৎসার প্রয়োজন হবে তখন বেশীরভাগ ডাক্তারই আপনাকে methimazole (MMI) অথবা propythiouracil নামক ওষুধ গ্রহণের পরামর্শ দিবেন।

এই ধরনের ওষুধ খুব অল্প পরিমাণেই প্লাসেন্টাকে অতিক্রম করে আপনার আপনার গর্ভের শিশু পর্যন্ত পৌঁছে। যার ফলে এই ধরনের ওষুধ আপনার শিশুর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ডাক্তাররা আপনার গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশুর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কমানোর জন্য খুবই অল্প ডোজের ওষুধ দেবেন।

এছাড়া আরেকটি বিষয়ে জেনে রাখা আপনার জন্য খুবই জরুরী, সেটা হল যখন আপনার থাইরয়েড জনিত সমস্যার কারণে ওষুধ খাওয়া প্রয়োজন তখন আপনি যদি ওষুধ গ্রহণ না করেন তাহলে এটা আপনার এবং গর্ভের শিশু উভয়ের উপরেই ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তার করবে। আর তাই আপনি যদি আপনার গর্ভের শিশুর উপর ওষুধের প্রভাব জনিত কারণে দুশ্চিন্তা করে থাকেন তাহলে সেটা আপনার ডাক্তারের সাথে আলাপ করে নিন। তিনি আপনাকে গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের ওষুধ গ্রহণের উপকারিতা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে জানার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সাহায্য করতে পারবেন।

সর্বোপরি মূল কথা হল আপনার হাইপারথাইরয়েডিজম এর চিকিৎসা নির্ভর করে আপনার অবস্থার উপর। নিম্নে কিছু সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে বর্ণনা করা হলঃ

আপনি ওষুধ গ্রহণ বন্ধ করে দিতে পারেন। Grave’s disease এর কারণে কিছু নারীদের মধ্যে সামান্য হাইপারথাইরয়েডিজমের প্রকোপ দেখা যেতে পারে। তারা গর্ভধারণের পর চাইলে থাইরয়েডের ওষুধ গ্রহণ বন্ধ করে দিতে পারেন।

আপনার ডাক্তার আপনাকে এই পরামর্শ দিবেন যদি তিনি দেখেন যে হাইপারথাইরয়েডিজম বেশ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে অথবা খুব বেশি সমস্যা না থাকার কারণে আপনি এর আগে খুব অল্প পরিমাণ ওষুধ গ্রহণ করতেন। (থাইরয়েডের ওষুধ ধীরে ধীরে সেই সমস্ত এন্টিবডি কমিয়ে আনে যেগুলার কারণে Grave’s disease অসুখটি হয়ে থাকে) 

গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায়ে আপনি চাইলে ওষুধ পরিবর্তন করে নিতে পারেন। আপনি যদি গর্ভধারণের আগেই MMI ওষুধ গ্রহন করেন, তাহলে আপনার ডাক্তার আপনাকে হয়ত গর্ভধারণের অন্তত ১৬ সপ্তাহ পার না হওয়া পর্যন্ত PTU তে অর্থাৎ antithyroid medication এ পরিবর্তন করে দিবেন।

গর্ভধারণের প্রাথমিক অবস্থা শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর খুবই প্রভাব বিস্তার করে আর তাই এই সময়ে PTU আপনার জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটা বিকল্প। তবে আপনি যদি দীর্ঘ সময় ধরে PTU গ্রহণ করে থাকেন তাহলে আপনার লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সামান্য কিছু সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই যখন আপনার গর্ভধারণের প্রাথমিক অবস্থাটি পার হয়ে যায় তখন ডাক্তার হয়ত আপনাকে পুনরায় MMI তে পরিবর্তন করে দিবেন।

গর্ভাবস্থার শেষের দিকে আপনি চাইলে ওষুধ পরিবর্তন করে নিতে পারেন। কোন কোন নারীদের জন্য গর্ভধারণের তৃতীয় ট্রাইমেস্টারের সময় ওষুধ বন্ধ করে দেয়া বা কমিয়ে নিয়ে আসা একটা বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে সাধারণত thyroid-stimulating immunoglobin antibodies এর প্রকোপ বেশ কমে আসতে থাকে। শতকরা চার ভাগের একভাগ নারীই তাদের গর্ভাবস্থার শেষের দিকে ডাক্তারের পরামর্শে এই ধরনের থাইরয়েডের ওষুধ গ্রহণ বন্ধ করে দিতে পারেন।

সন্তান প্রসবের পর ওষুধ পরিবর্তন করা যেতে পারে। সন্তান প্রসবের পরবর্তী সময়ে এই ধরনের এন্টিবডি’র প্রকোপ আবার বেড়ে যেতে পারে। এমতাবস্থায় আপনাকে হয়ত আবার আগের মত ওষুধ গ্রহণ করতে হতে পারে, এমনকি ওষুধের পরিমাণও বৃদ্ধি করতে হতে পারে।

হাইপারথাইরয়েডিজম থাকার পরেও কীভাবে স্বাস্থ্যকর ভাবে গর্ভধারণ করা যেতে পারে?

আপনি যদি জেনে থাকেন যে আপনার এই ধরনের কোন সমস্যা আছে, তাহলে আদর্শিক অবস্থা হল গর্ভধারণের আগেই আপনার পূর্ব প্রস্তুতি থাকা। এছাড়া আপনার যদি মাসিক হতে দেরী হয়, অথবা গর্ভধারণের কোন লক্ষণ দেখা যায়, অথবা গর্ভধারণের পরীক্ষায় ফলাফল আসে যে আপনি গর্ভধারণ করেছেন তাহলে তাৎক্ষনিক ভাবে আপনার ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। কেননা গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায়েই আপনার থাইরয়েডজনিত ওষুধগুলো সম্পর্কে পুনঃ বিবেচনা করা উত্তম।

এছাড়া গর্ভাবস্থায় আপনার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য প্রতিনিয়ত ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করান। কেননাঃ

আপনার ডাক্তার যদি ওষুধ গ্রহণ বন্ধ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তাহলে গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসের সময় আপনার থাইরয়েডের অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। আপনার থাইরয়েডের অবস্থা যদি সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে তাহলে দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার থেকে প্রতি চার সপ্তাহ পরপর থাইরয়েডের ডাক্তারের কাছে গেলেও চলবে।

আপনার ডাক্তার যদি আপনাকে থাইরয়েডের ওষুধ গ্রহণ করা অব্যাহত রাখতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনাকে প্রতি দুই অথবা চার সপ্তাহ পরপর ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

এছাড়া আপনার গাঁইনোকোলজিস্ট এর সাথে সাথে আপনাকে একজন endocrinologist অর্থাৎ হরমোন জনিত অবস্থার উপর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও দেখাতে হবে। এত ডাক্তার এবং এত পরীক্ষা নিরীক্ষার সাথে গর্ভাবস্থায় মানিয়ে চলাটা সত্যি বলতে একটু কষ্টকরই বটে। তবে হরমোনের স্বাভাবিক পরিমাণ ধরে রাখাটা আপনি ও আপনার শিশু উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রত্যেকবার ডাক্তারের কাছে গেলেই হয়ত আপনার TSH, T4 এবং T3 হরমোন পরিমাপ করার জন্য আপনাকে রক্ত পরীক্ষা করাতে হতে পারে। আপনার ডাক্তার এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখবেন যে থাইরয়েড সঠিকভাবে কাজ করছে কি না অথবা আপনার ওষুধের মধ্যে কোন ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে কি না। কেননা অতিরিক্ত থাইরয়েডের ওষুধ গ্রহণের ফলে আপনার গর্ভের শিশুর থাইরয়েডের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।

এছাড়া আপনার যদি Grave’s disease থাকে, তাহলে আপনার TSI এন্টিবডি এর পরিমাণও পরীক্ষা করাতে হতে পারে, যার মাধ্যমে আপনার বর্তমান অবস্থায় TSI কতটা সক্রিয় আছে সে সম্পর্কে জানা যাবে। যদি আপনার গর্ভাবস্থার শেষের দিকে TSI antibody সক্রিয় থাকে তাহলে গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যের দিকে একটু বিশেষ ভাবে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।

থাইরয়েডের অবস্থার সাথে মানিয়ে চলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তবে একটি স্বাস্থ্যকর গর্ভাবস্থা বজায় রাখার জন্য আরো অনেক কিছুই করতে পারেন।

  • আপনি গর্ভাবস্থার জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতে পারেন
  • নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করতে পারেন
  • মানসিক চাপ কম রাখতে পারেন

এই ধরনের কাজের মাধ্যমে আপনার শিশুর সুন্দর এবং স্বাস্থ্যকর একটা শুরু আপনি সুনিশ্চিত করতে পারেন।

হাইপারথাইরয়েডিজম গর্ভের শিশুর উপর কতটা প্রভাব বিস্তার করে?

বেশীরভাগ শিশুরাই মায়ের হাইপারথাইরয়েডিজম থাকার পরেও তারা কোন প্রকার জটিলটা ছাড়াই জন্ম গ্রহণ করে থাকে।

তবে যদি আপনার Grave’s disease থেকে থাকে, তাহলে ক্ষুদ্র একটা সম্ভাবনা আছে যে আপনার TSI antibody প্লাসেন্টা অতিক্রম করে শিশুর রক্তের সাথে মিশে যেতে পারে। আপনার হাইপারথাইরয়েডিজম যদি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না থাকে অথবা আপনার রক্তে উচ্চ মাত্রায় TSI antibody থাকে তাহলে সেটা আপনার শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

যদিও ব্যাপারটা খুবই বিরল, তবে Grave’s hyperthyroidism এ ভোগা নারীদের সন্তান যখন জন্ম নেয় তখন প্রতি একশ জনের মধ্যে শতকরা ১ থেকে ৫ জন শিশু অতিরিক্ত মাত্রায় সক্রিয় থাইরয়েড নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। শিশুর মধ্যে হাইপারথাইরয়েডিজম এর কিছু লক্ষণ নিম্নে দেয়া হলঃ

  • সবসময় অস্বস্তির মধ্যে থাকা এবং শান্ত ভাবে কোথাও রাখা যদি বেশ কষ্টকর হয়ে থাকে।
  • ওজন বৃদ্ধি না হওয়া।
  • শিশুর মাথায় নরম অংশ যেগুলো সফট স্পট বলা (ফন্টানেল) হয়, সেগুলো দ্রুত বন্ধ হয়ে যাওয়া,
  • হৃদযন্ত্র জনিত সমস্যা থাকা।
  • শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা থাকা।

আপনার ডাক্তার যদি মনে করে থাকেন যে আপনার গর্ভের শিশুও হাইপারথাইরয়েডিজমের ঝুঁকিতে আছে তাহলে একটা বিশেষজ্ঞ টিম গর্ভাবস্থায় আপনার স্বাস্থ্যগত বিষয়ে নজর রাখবেন। আপনার একটু অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকতে হবে এবং প্রতিনিয়ত আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার শিশুর মধ্যে হাইপারথাইরয়েডিজম আছে কি না তা পরীক্ষা করা হবে। এছাড়া জন্ম গ্রহণের পরেও শিশুর হাইপারথাইরয়েডিজমের পরীক্ষা করা হবে।

সব শিশুকেই জন্মের দুই থেকে চারদিনের মধ্যে হাপারথাইরয়েডিজমের পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। তবে সাধারণত নবজাতকদের মধ্যে হাইপারথাইরয়েডিজম দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং এক থেকে তিন মাসের মধ্যেই সেটা ঠিক হয়ে যায়। তবে মধ্যবর্তী সেই সময়ে আপনার শিশুর জন্য থাইরয়েডের ওষুধের প্রয়োজন আছে এবং ওষুধের পরিমাণ শিশু স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে থাকার সাথে সাথে কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে।

থাইপারথাইরয়েডিজম থাকার পরেও কি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে?

সাধারণত, এর উত্তর হল হ্যাঁ এই অবস্থায় শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে এবং হাইপারথাইরয়েডিজমে ভোগা কিছু কিছু নারীর বুকে প্রচুর পরিমাণ দুধ তৈরি হয়। বুকের দুধ খাওয়ানো কিছু নারীদের মধ্যে letdown reflex অর্থাৎ দুধ বের হওয়ার সময় একটু অস্বস্তিকর অনুভূত হওয়া এবং শিশু বুকের দুধ পান না করা অবস্থাতেও নিপল থেকে দুধ বের হওয়ার মত সমস্যা হতে দেখা যায়।

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে যদি সমস্যা হয় তাহলে আপনার প্রয়োজনীয় সাহায্যের জন্য ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

বেশীরভাগ নারীদের ক্ষেত্রেই থাইরয়েডের ওষুধ খাওয়া অবস্থাতেও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো নিরাপদ, তবে আপনি যদি অতিরিক্ত মাত্রায় থাইরয়েডের ওষুধ সেবন করে থাকেন তাহলে সেটা নিরাপদ নয়। খুব অল্প পরিমাণে ওষুধ আপনার বুকের দুধের সাথে মিশতে পারে, কিন্তু সেটা শিশুকে ক্ষতি করার মত পরিমাণে নয়। আমেরিকান থাইরয়েড এসোসিয়েশনের মতে, বুকের দুধ পান করানো মায়েদের জন্য দৈনিক ২০ মিলিগ্রাম MMI অথবা ৪৫০ মিলিগ্রাম PTU থেকে বেশি সেবন করা উচিৎ নয়।

আপনি হাইপারথাইরয়েডিজমের ওষুধ খাচ্ছেন বলেই আপনার শিশুকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখতে হবে ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। তবে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং পরিপক্বতা হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তার শিশুর রুটিন চেকআপের সময় শিশুকে এমনিতেই পর্যবেক্ষণ করবেন। 

সবার জন্য শুভকামনা।

তথ্যসূত্রঃ

ACOG. 2011. Thyroid disease. American College of Obstetricians and Gynecologists. http://www.acog.org/Patients/FAQs/Thyroid-Disease [Accessed June 2018]

ACOG. 2015. Practice bulletin 148: Thyroid disease in pregnancy. American College of Obstetricians and Gynecologists. [Accessed June 2018]

Alexander EK et al. 2017. 2017 Guidelines of the American Thyroid Association for the diagnosis and management of thyroid disease during pregnancy and the postpartum. Thyroid 27(3). http://online.liebertpub.com/doi/full/10.1089/thy.2016.0457 [Accessed June 2018]

Drugs.com. 2017. Methimazole pregnancy and breastfeeding warnings. https://www.drugs.com/pregnancy/methimazole.html [Accessed June 2018]

HHN. Undated. Pregnancy and thyroid disease. Hormone Health Network. http://www.hormone.org/diseases-and-conditions/thyroid/pregnancy-and-thyroid-disease [Accessed June 2018]

NIDDK. 2012. Pregnancy and thyroid disease. National Institute of Diabetes and Kidney and Digestive Diseases. https://www.niddk.nih.gov/health-information/endocrine-diseases/pregnancy-thyroid-disease [Accessed June 2018]

NIDDK. 2016. Hyperthyroidism (overactive thyroid). National Institute of Diabetes and Kidney and Digestive Diseases. https://www.niddk.nih.gov/health-information/endocrine-diseases/hyperthyroidism [Accessed June 2018]

Ross DS et al. 2016 American Thyroid Association guidelines for diagnosis and management of hyperthyroidism and other causes of thyrotoxicosis. Thyroid 26(10):1343-1421. http://online.liebertpub.com/doi/pdf/10.1089/thy.2016.0229[Accessed June 2018]

Speller E and Brodribb W. 2012. Breastfeeding and thyroid disease: A literature review. Breastfeeding Review 20(2):41-47. [Accessed June 2018]

বেবি সেন্টার থেকে অনূদিত

Related posts