শিশুর স্লীপ অ্যাপনিয়া

Updated on

স্লীপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea) আসলে কি?

শিশুর স্লীপ অ্যাপনিয়া এক ধরনের গুরুতর সমস্যা। এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের ঘুমের মধ্যে নিঃশ্বাস নিতে প্রবল সমস্যা দেখা যায়। যথাসময়ে যদি এর জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করা না হয় তাহলে পরবর্তীতে হৃদযন্ত্র জনিত সমস্যা ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সহ আরো বড় ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে শিশু।

অতীতে ধারনা করা হত, এই রোগের কারণে নবজাতক শিশুদের আকস্মিক মৃত্যু (SIDS) হত। তবে গত দুই যুগ ধরে করে আসা বিভিন্ন গবেষণার পর নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যু রোগের সাথে এই sleep apnea এর কোন সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

Sleep apnea মূলত তিন ধরনের হয়ে থাকেঃ

Obstructive sleep apnea (OSA) এটা মূলত শ্বাসনালীর উপরের দিকে কোন প্রতিবন্ধকতার জন্য হয়ে থাকে।

Central Sleep apnea (CSA) এই ধরনের সমস্যায় শ্বাসনালীতে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে না তবে মস্তিষ্ক নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য পেশিতে সংকেত পাঠাতে ব্যর্থ হয়। মস্তিষ্ক থেকে সঠিক সংকেত না পাওয়ায় শ্বাস প্রশ্বাসের মাংসপেশী মাঝে মাঝে কাজ বন্ধ করে দেয়।

Mixed apnea উপরের দুই ধরনের sleep apnea এর লক্ষণ এই রোগে একই সাথে দেখা যায়।

বেশীরভাগ নবজাতক শিশু ও প্রিম্যাচিউর শিশুর মধ্যে CSA অর্থাৎ Central Sleep apnea নামক সমস্যাটি দেখা যায়। তবে যে সব প্রিম্যাচিউর বাচ্চারা একটু তুলনামূলক ভাবে ছোট হয় তাদের মধ্যে সাধারণত mixed apnea সমস্যাটি দেখা যায়। এছাড়া এক বছর এবং পূর্ণ বয়স্কদের মধ্যে সাধারণত OSA নামক সমস্যাটি দেখা যায়।

কোন ধরনের শিশুরা এই রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকে?

যে কোন ধরনের শিশুদের মধ্যেই এই sleep apnea নামক সমস্যাটি দেখা যেতে পারে, তবে প্রিম্যাচিউর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের অপেক্ষাকৃত বেশি দেখা যায়। গর্ভ ধারণের ৩৭ সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই জন্ম নেয়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যদি এই ধরনের সমস্যা দেখা যায় তাহলে একে apnea of prematurity বলা হয়ে থাকে।

তবে ৩৭ সপ্তাহ পার হওয়ার পর জন্ম নেয়া বাচ্চাদের এই ধরনের সমস্যা দেখা গেলে তাকে apnea of infancy বলা হয়ে থাকে। শিশু যত প্রিম্যাচিউর হবে, এই ধরনের সমস্যায় ভোগার ক্ষেত্রে তার ঝুঁকিও তত বেশি হবে।

Down syndrome এবং অন্যান্য জন্মগত যেসব সমস্যা শ্বাসনালীর উপরের দিকে প্রভাব ফেলে তার কারনেও sleep apnea দেখা যেতে পারে। Down syndrome এ আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুর ক্ষেত্রেই sleep apnea দেখা যায়।

স্লীপ অ্যাপনিয়া এর কারণ কি?

শিশুর মস্তিষ্কের যে অংশ শ্বাস প্রশ্বাস নিতে সহায়তা করে সে অংশের অপরিপক্বতা এবং শ্বাসনালীর যে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতার কারণে sleep apnea দেখা যেতে পারে। এছাড়া নিম্ন বর্ণীত কারনেও sleep apnea দেখা যেতে পারেঃ

  • মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ
  • ড্রাগ অথবা বিষক্রিয়ার কারণে
  • জন্মগত ক্রুটি
  • ইনফেকশন
  • শ্বাসনালী সংক্রান্ত রোগ
  • খাদ্য নালীতে সমস্যা (যেমন reflux)
  • শরীরে অন্যান্য অসামঞ্জস্যতার কারণে
  • হৃদযন্ত্র এবং রক্ত কণিকায় সমস্যা দেখা যাওয়ার কারণে

স্লীপ অ্যাপনিয়া রোগের লক্ষণগুলি কি?

ঘুমের মধ্যে প্রায় ২০ সেকেন্ড অথবা তারও বেশি সময় শিশুর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে থাকা sleep apnea এর একটি অন্যতম ও প্রধান লক্ষণ। অন্যান্য কিছু লক্ষণ হল, অল্প কিছু সময়ের জন্য শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, চেহারা ফ্যাকাসে বা নীলচে হয়ে যাওয়া, অথবা ঘুমের মধ্যে হৃৎস্পন্দন কমে যাওয়া।

তবে এটা জেনে রাখা ভালো যে, ছয় মাস অথবা তার ছোট শিশুদের মধ্যে সামান্য অনিয়মিত শ্বাস প্রশ্বাস একদমই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এর নাম হল, “periodic breathing” এবং সাধারণত এটা দ্রুত নিঃশ্বাসের সাথে শুরু হয় এরপর ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে থাকে এবং তারপর পাঁচ থেকে দশ সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাসের একটা বিরতি থাকে। ছোট শিশুদের মধ্যে এমন দেখা গেলে সেটার জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সাধারণত ছয় মাস বয়স পার হওয়ার পরপর শিশুদের এই সমস্যাগুলো ঠিক হয়ে যায়।

Sleep apnea এর জন্য কি বড় ধরনের কোন ক্ষতি হতে পারে?

শিশুর স্লীপ অ্যাপনিয়া এর জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে এবং কোন সময় এর জন্য শিশু মারাও যেতে পারে। বিশেষ করে যে সব প্রিম্যাচিউর শিশুর জন্ম ২৮ সপ্তাহ গর্ভকালীন সময় পার হওয়ার আগেই হয়ে যায়।

যখন শিশু নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়, তখন তার রক্তের মধ্যে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যেতে থাকে এবং কার্বন-ডাই- অক্সাইড বেড়ে যেতে থাকে। এর জন্য শিশুর হৃদযন্ত্রের গতি কমে যেতে পারে এবং শিশু অচেতনও হতে যেতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে গ্রোথ হরমোন রিলিজ হওয়া ব্যহত হয়।স্বাভাবিক শিশুদের থেকে পিছিয়ে পড়ে।

স্লীপ অ্যাপনিয়া হয়েছে কি না কীভাবে বুঝা যাবে?

যদি আপনার শিশুর ডাক্তার কোন কারণে সন্দেহ করেন যে শিশুর স্লীপ অ্যাপনিয়া হয়েছে তবে তিনি বেশ কিছু ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন। এরমধ্যে অন্যতম পরীক্ষা হল রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ নির্ধারণ এবং হৃৎস্পন্দনের স্বাভাবিক গতি আছে কি না তা পরীক্ষা করা। এছাড়াও ডাঃ শিশুর এক্স-রে ও করাতে পারেন।

এরপর আপনার শিশুর ডাক্তার পরিপূর্ণ ভাবে নিশ্চিত হতে শিশুকে অন্য ঘুম বিশেষজ্ঞ, ফুসফুস বিশেষজ্ঞ অথবা apnea বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে পারেন।  

সাধারণত এই রোগ নির্ধারণের জন্য যে পরীক্ষাটি করা হয় তার নাম হল, “polysomnogram”। এ ধরনের পরীক্ষায় শিশু কোন ধরনের ব্যথা পায় না এবং পরীক্ষাটি করা হয় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত টেকনিশিয়ানের দ্বারা। এই পরীক্ষায় শিশুর মস্তিষ্কের তরঙ্গ, চোখের নাড়াচাড়া, নিঃশ্বাস এবং রক্তে অস্কিজেনের পরিমাণ দেখা হয়। এছাড়াও শিশু ঘুমের মধ্যে নাক ডাকছে কি না অথবা অন্য কোন ধরনের শব্দ হচ্ছে কি না সেটাও পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।

Sleep apnea এর চিকিৎসা কি?

এটা আসলে রোগ কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে তার উপর নির্ভর করে। আপনার ডাক্তার হয়ত একটা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে শিশুর ঘুমের সময় হৃদযন্ত্রের গতির উপর চোখ রাখতে বলবেন অথবা শিশুর নার্ভ সিস্টেমের জন্য কোন ধরনের ওষুধ দিতে পারেন।

Obstructive Apnea  দ্বারা আক্রান্ত শিশুর সার্বক্ষণিক নিঃশ্বাসের পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য CPAP নামক এক ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করতে ডাক্তাররা সাধারণত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সিপিএপি চিকিৎসায় রোগীকে ঘুমের সময় অক্সিজেন মাস্কের মতো নাক এবং মুখ ঢেকে দেয়া একটি মাস্ক পড়তে দেয়া হয়। মাস্কের অপরপ্রান্ত একটি যন্ত্রের সাথে লাগানো থাকে যেটির মাধ্যমে নাকে অনবরত বাতাস প্রবাহ চলতে থাকে। স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি। (তবে Central sleep apnea এর ক্ষেত্রে সাধারণত এই CPAP যন্ত্রটি রোগের লক্ষণগুলো দূরভীত করে না।

সৌভাগ্য বশত, নবজাতক শিশুর মধ্যে এই ধরনের সমস্যা খুব দীর্ঘ দিন ধরে থাকে না। সাধারণত শিশুর বড় হওয়ার সাথে সাথে এই ধরনের সমস্যাও ঠিক হয়ে যায়। বেশিরভাগ প্রিম্যাচিওর বাচ্চার বয়স তার কন্সেপশন থেকে ৪৪ সপ্তাহ হতে হতে এই সব লক্ষণ মিলিয়ে যায়।  

ঘুমের মধ্যে যদি শিশুর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তখন আপনার কি করা উচিৎ?

শিশুকে স্পর্শ করুন অথবা হালকা নাড়িয়ে দিয়ে দেখুন সে কি কোন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে কি না? যদি তার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখা যায় তাহলে সাথে সাথে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে যান। আপনার শিশুর কপাল ও শরীর যদি নীল বর্ণ ধারণ করে তাহলে বুঝতে হবে আপনার শিশু কোন বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। তবে এটা জেনে রাখবেন শিশু যখন কাঁদে অথবা একটু ঠাণ্ডার মধ্যে থাকে তখন তার হাত পা ও মুখ কিছুটা অংশ নীল বর্ণ ধারণ করতে পারে, এটাতে ভয়ের কিছু নেই।

যদি নবজাতক শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাস জনিত জরুরী চিকিৎসা (infant CPR) সম্পর্কে আপনার কোন ধারনা থেকে থাকে তাহলে তাৎক্ষনিক জরুরী চিকিৎসা শুরু করে দিন এবং দ্রুত শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। যদি আপনি শিশুর সাথে একা থাকেন, তাহলে প্রথমে CPR দিন দুই মিনিট ধরে, এরপর এ্যাম্বুলেন্স এ কল করুন এবং আবার শিশুকে CPR দিতে থাকুন। শ্বাস প্রশ্বাস জনিত জরুরী চিকিৎসা (infant CPR) ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না এ্যাম্বুলেন্স চলে আসে অথবা আপনার শিশুর শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে।

কিভাবে infant CPR দিতে হয় এটা সকল বাবা মায়েদের জেনে রাখা উচিৎ বিশেষ করে যাদের শিশুর স্লীপ অ্যাপনিয়া আছে। আপনার বাসার আশেপাশের হাসপাতালে অথবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শ্বাস প্রশ্বাস জনিত জরুরী চিকিৎসা (infant CPR) দেয়ার ব্যবস্থা আছে কি না জেনে রাখুন।    

সবার জন্য শুভকামনা।   

Related posts