স্ক্রীন টাইম কিভাবে শিশুর ভাষার বিকাশে (Language Development) প্রভাব ফেলে

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

বর্তমান সময়টা হলো তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। অনেক অভিভাবক এখন বাচ্চাদেরকে বিভিন্ন ডিভাইসের স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে রেখে নিজেদের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করেন বা বাচ্চাকে শান্ত করার জন্য স্ক্রীন ব্যবহার করে থাকেন। মজার ব্যাপার হলো, এই কৌশলটি বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ঠিকই কাজ করে। ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের স্ক্রীন যেভাবে একটি শিশুর মনোযোগ ধরে রাখে তা সম্ভবত অন্য কোনো কিছুর পক্ষে সম্ভব হয় না। বাচ্চাকে স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে দিলে বাবা, মা যেন একটু স্বস্তিতে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু কখনো কি মাথায় প্রশ্ন জেগেছে এতে বাচ্চার কী কী সমস্যা হতে পারে? একজন শিশুর আসলে সর্বোচ্চ কতক্ষণ স্ক্রিনের সামনে থাকা উচিত?

মস্তিষ্ক গবেষকগণ শিশুদের মস্তিষ্ক নিয়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের গবেষণা করে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা যত প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন ততগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি। তবে এখনো পর্যন্ত গবেষণার ফলে যা যা জানা গিয়েছে, সেগুলো যদি কোনো বাবা, মার জানা থাকে এবং তারা যদি সেই মোতাবেক কাজ করেন, তাহলে তা শিশুর বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য অনেক মঙ্গল বয়ে আনবে; এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

স্ক্রীন টাইমের অনেকগুলো ক্ষতিকর দিকের একটি হোল ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলপমেন্ট বা ভাষার বিকাশ। এটি নিয়েই আজকের বিস্তারিত আলোচনা।

স্ক্রীন টাইম কী?

শিশু যে সময়টুকু চালু থাকা কোনো ডিভাইসের স্ক্রিনের সামনে থাকে সেটাই স্ক্রীন টাইম। টেলিভিশন, সিনেমা হলের স্ক্রীন, মোবাইল, ট্যাব, ভিডিও গেমস, কম্পিউটার ইত্যাদি ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে বাচ্চা যতক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেই সময়টুকুকে স্ক্রীন টাইম হিসেবে ধরা হয়। আপনার শিশু স্ক্রিনে শিক্ষণীয় ভিডিও দেখছে নাকি ভিডিও গেমস খেলছে তা এখানে বিবেচনার বিষয় নয়। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেই সেটাকে স্ক্রীন টাইম হিসেবে ধরা হবে।

স্ক্রীন টাইম কীভাবে শিশুর ভাষার বিকাশের সময়টুকু কেড়ে নেয়?

অন্য আরেকজন মানুষের সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকার মাধ্যমে, তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন এবং কথা বলতে চাওয়ার মধ্য দিয়েই মূলত শিশু ধীরে ধীরে কথা বলতে শেখে। যত উন্নত প্রযুক্তিই আসুক না কেন, সেই আদিকাল থেকে এখনো পর্যন্ত শিশুরা এই পদ্ধতিতেই কথা বলতে শিখেছে, সামনেও শিখবে। শিশুর জীবনের প্রথম কয়েকটি বছর তার ভাষার বিকাশের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নতুন ভাষা শেখার জন্য এবং ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করার পন্থা শেখার জন্য এই সময়ে শিশুর ব্রেন সবচেয়ে বেশি সক্ষম, গ্রহণক্ষম এবং ধারণক্ষম হয়ে থাকে। এই বয়সে শিশু যা শেখে তা তার সাথে আজীবন থেকে যায়।

একবার এই শেখার জানালা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের পক্ষে ভাষা শেখা এবং দক্ষতার বিকাশ ঘটানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। মূলত এজন্যই বয়স বেড়ে গেলে বা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় নতুন কোনো ভাষা শিখতে গেলে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।

স্ক্রিনের সাথে কাটানো প্রতিটি মিনিটের মাধ্যমে শিশু ভাষা শেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষতা থেকে দূরে সরে যায়। বিষয়টা অনেকটা এরকম- এক মিনিট স্ক্রীন দেখা মানে ভাষা শেখার ব্যাপারে এক মিনিট কম ব্যয় করা। যে সময়টুকু শিশুর উচিত ছিল তার বাবা, মা বা পরিবারের বড় কারো সাথে কাটানো, তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা, ভাষা ও শব্দের সাহায্যে যোগাযোগ স্থাপন এবং মনের ভাব আদান-প্রদান করার চেষ্টা করা; স্ক্রীন টাইম সেই সময়ের ভেতরে এসে ভাগ বসায় এবং শিশুর ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করে।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, আপনি আপনার সন্তানকে নিয়ে গাড়িতে করে কোথাও যাচ্ছেন। তার হাতে একটা স্মার্টফোন ধরিয়ে দিয়েছেন, সেটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে চুপচাপ সে তার পছন্দের কার্টুন শো দেখছে। এরকম পরিস্থিতিতে আপনি হয়তো তার সাথে কোনো কথাই বলতে চাইবেন না। কারণ আপনি কথা বললে তার কার্টুন দেখায় ছেদ পড়বে, সে বিরক্তও হতে পারে।

এবার ভাবুন, আপনার সন্তানের হাতে কোনো ডিভাইস নেই। তাহলে কী হবে? এবার আপনার কথা বলার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আপনার সন্তান যদি পাল্টা কোনো সাড়া দিতে বা কথা বলতে না পারে তারপরেও হয়তো আপনি তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করবেন। কারণ কোনো ডিভাইস থেকে আওয়াজ না এলে আমরা সাধারণত কথা বলতে কম দ্বিধা করি।

আপনি কথা বলতে থাকলে একটা সময় আপনার সন্তানও হয়তো কথা বলবে বা কথা বলার চেষ্টা করবে। এভাবেই তার ভাষার বিকাশ ঘটবে, সে কথা বলায় দক্ষ হয়ে উঠবে। অথচ হাতে থাকা ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে সেটা সম্ভব হবে না।

স্ক্রীন টাইম কীভাবে শিশুর ভাষা বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায়?

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুরা ১২ মাস বয়স হওয়ার আগেই টিভি দেখতে শুরু করেছে এবং দিনে ২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে টিভি দেখেছে, তাদের দেরিতে কথা বলার সম্ভাবনা সাধারণ শিশুর চেয়ে ৬ গুণ বেশি!

অন্য আরেকটি গবেষণায় জানা গেছে, যেসব শিশু দিনে ২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে টিভি দেখে তারা যোগাযোগ স্থাপন করার ক্ষেত্রে খুব অল্প স্কোর তুলতে সক্ষম হয়।

এরকম বিভিন্ন গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, শিশুদেরকে অল্প বয়সে টিভি দেখায় অভ্যস্ত করলে তারা দেরিতে কথা বলতে শেখে এবং পরবর্তীতে স্কুল জীবনেও তাদের কথা বলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।

অতিরিক্ত স্ক্রীন টাইম শিশুদের মনোযোগ সংক্রান্ত সমস্যার সৃষ্টি করে। পাশাপাশি স্বল্প-মেয়াদী স্মৃতি সমস্যা (শর্ট-টার্ম মেমোরি প্রবলেম), সামাজিক এবং আবেগীয় সমস্যা এবং অক্ষর পড়ার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে। এসবের কারণে শিশুর পক্ষে ভাষা শিখতেও সমস্যা হয়।

ভাষার বিকাশ : শিশুদের বয়স ২.৫ (আড়াই) বছর হওয়ার আগপর্যন্ত তারা কোনো ভিডিও দেখে ভাষা শিখতে পারে না। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৪ বছরের কম বয়সী শিশুরা যত বেশি পরিমাণ সময় টেলিভিশন বা অন্য কোনো ডিভাইসের স্ক্রিনের সাথে ব্যয় করেছে তারা তত কম শব্দ শিখেছে।

তবে আশার কথা হলো, ১২ মাস বয়স বয়সী শিশুরা ডিজিটাল স্ক্রীন দেখেও নতুন শব্দ শিখতে পারে যদি পাশে তাদের বাবা, মা থাকে। বাবা, মা তাদের বাচ্চাদের সাথে স্ক্রীন দেখার পাশাপাশি ডিভাইস থেকে শোনা বিভিন্ন শব্দ বারবার উচ্চারণ করার সাথে সাথে শব্দগুলোর অর্থ বুঝিয়ে দিলে শিশুরা নতুন শব্দ শিখতে পারে। কারণ শিশুরা মূলত তাদের বাবা, মায়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার মাধ্যমেই ভাষা, শব্দ শেখে, শরীরি ভাষা, ইঙ্গিত আয়ত্ব করে, চোখে চোখ রাখা শেখে, চোখ দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে শেখে। এভাবে বিভিন্ন জিনিস শেখার পাশাপাশি শিশু একা একা বসে খেলার ছলে বিভিন্ন ধরনের শব্দ করবে, নিরর্থক আওয়াজ করবে এবং নিজের কণ্ঠ নিয়ে পরীক্ষা চালাবে।

সামাজিক সংযোগ এবং আবেগের বিকাশ : শিশুরা বাবা, মায়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে সামাজিক হতে শেখে। কিন্তু ডিজিটাল স্ক্রীন তাদের মনোযোগ কেড়ে নেয় এবং তাদের সামাজিক হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। এক গবেষণায় জানা গেছে, রুমে টেলিভিশন চালু থাকলে বাবা, মা সাধারণত বাচ্চার সাথে কম কথা বলেন। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে- যেসব বাবা, মা তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে যত বেশি ব্যস্ত থাকেন তারা তাদের বাচ্চার সাথে তত কম সংযুক্ত থাকেন।

স্ক্রীন মনোযোগের স্থায়ীত্ব কমিয়ে দেয় : বাচ্চাকে সফল হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাকে অবশ্যই মনোযোগী হওয়া শেখাতে হবে। শিশু বয়স থেকেই তার মস্তিষ্ক মনোযোগ হওয়ার ব্যাপারটি আয়ত্ব করে নিতে পারে। এসময় শিশুর মস্তিষ্ক আশেপাশের পরিবেশ, পরিস্থিতি নিয়ে অনেক স্পর্শকাতর থাকে। মস্তিষ্ক যথাযথ বিকাশের ক্ষেত্রে বাইরের জগত থেকে ইনপুট হিসেবে প্রয়োজনীয় তথ্য এবং উদ্দীপনা পাওয়া জরুরি।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- সেইসব তথ্য এবং উদ্দীপনাকে শিশুর মস্তিষ্কে সাজিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। শিশুকে কোনো গল্প পড়ে শোনালে সে গল্পের শব্দগুলোকে নিজের মাথায় সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়, সেখান থেকে সে ছবি এবং শব্দ কল্পনা করে নিতে পারে। কিন্তু সরাসরি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে শিশু সেধরনের কোনো সুযোগ পায় না। স্ক্রীন তাকে কল্পনা করার সুযোগ দেয় না। স্ক্রীন তাকে সরাসরি একের পর এক দৃশ্য, ছবি, আওয়াজ সরবরাহ করে চলে। ফলে শিশুর কল্পনা করা শক্তি এবং সময় নিয়ে মনোযোগ সহকারে কিছু ভাবার দক্ষতা কমে যায়। ফলাফলঃ বাচ্চার দেরীতে কথা বলা।

স্ক্রীন আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় : শিশুকে সবসময় উত্তেজনা এবং আনন্দের মাঝে রাখা যাবে না। তাকে কিছুটা সময় বোরিং, বিরক্তিকর সময়ের মধ্যে দিয়েও যেতে হবে। বোরিং সময় কাটানোর মাধ্যমে তারা নিজের আবেগ, হতাশা, রাগ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে। কিন্তু কোনো শিশু যদি সবসময় স্ক্রীন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, বোরিং অনুভব হওয়া মাত্রই যদি সে স্ক্রীন থেকে বিনোদন পেতে শুরু করে তাহলে অবধারিতভাবে সে ধীরে ধীরে নিজের রাগ, হতাশা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হবে। স্ক্রীন ছাড়া, বিনোদন ছাড়া সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, নিজের সাথে নিজেই সময় কাটাতে পারবে না। এভাবে সে আরো হতাশ এবং বিষণ্ন হয়ে উঠবে এবং তার কল্পনাশক্তি হ্রাস পেতে থাকবে।

স্ক্রীন সহমর্মিতা কমিয়ে দেয় : গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রীন টাইমের কারণে কারো মুখ দেখে তার মনের ভাব আন্দাজ করতে পারার দক্ষতা কমে যায় এবং সামাজিক দক্ষতা শেখার ব্যাপারে তারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। অথচ এই দুটো জিনিস সহমর্মিতা বিকাশ হওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুখে কিছু না বলা হলেও শুধু চেহারার অভিব্যক্তি দেখে মনের ভাব অনুধাবন করতে পারার দক্ষতা অর্জন করার জন্য সরাসরি কোনো মানুষের সাথে সংযুক্ত থাকা জরুরি।

শিশুর ভাষার বিকাশ হওয়ার আগপর্যন্ত তারা যেসব প্রক্রিয়ায় মনের ভাব আদান-প্রদান করে তার সবই ঘটে চেহারা দেখে এবং চেহারায় ফুটে ওঠা অভিব্যক্তি বোঝার মাধ্যমে। শিশু তার সামনে থাকা ব্যক্তির মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করে সেই ব্যক্তি তার সাথে খুশি নাকি তার ওপর রাগ করেছে। শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের ক্ষেত্রে সরাসরি মানুষের সাথে ভাবের এধরনের আদান-প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

শিশু যখন স্ক্রীন নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে তখন তার মানুষের চেহারা দেখে আবেগ বোঝার দক্ষতা কমতে থাকে এবং তার পক্ষে নিজের হতাশা, ফ্রাস্ট্রেশন নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে যায়। স্ক্রীন টাইমের কারণে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। স্ক্রীন নিয়ে পড়ে না থেকে যদি শিশু অন্য কোনো শিশুর সাথে খেলতো তাহলে তার মস্তিষ্কের বিকাশ ত্বরান্বিত হতো।

যদি নিতান্তই বাচ্চাকে স্ক্রীন টাইম দিতেই হয় তাহলে সময়টুকু সীমিত করে দিতে হবে এবং সেই সময়ে সে স্ক্রিনে কী দেখছে সে-ব্যাপারে নজর রাখতে হবে।

 অনেকেই বলেন টিভি বা মোবাইলে দেখা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কারণে শিশু বেশ কিছু শব্দ শিখছে এবং বলতে পারছে। এসব কি আসলেই শিশুর ভাষা বিকাশে সাহায্য করছে?

ভিডিও যত শিক্ষণীয়ই হোক না কেন, সেটা দিনশেষে ভিডিও-ই। শব্দ শেখা এবং বুঝতে পারা ভাষা শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা ভাষা বিকাশের পুরো ব্যাপারটির একটি খুব ক্ষুদ্র অংশ। ভাষার বিকাশ বলতে বোঝানো হয় অন্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারা এবং পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে সে অনুযায়ী কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া।  শুধুমাত্র কিছু শব্দ জানা এবং বোঝার মাধ্যমে এই কৌশল কখনোই পুরোপুরি রপ্ত করা যায়না।

বক্তা তার শ্রোতার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরি ভাষা এবং সাড়া দেওয়ার ধরনের ওপর ভিত্তি করে নিজের বক্তব্যে পরিবর্তন আনেন। অন্যদিকে শ্রোতা বক্তার বক্তব্যে থাকা শব্দগুলোর পাশাপাশি শব্দবিহীন অংশে থাকা বিরতি এবং ইঙ্গিত থেকে বক্তব্যের গভীরে অর্থ খোঁজার চেষ্টা করে থাকেন। অতএব, দুজন মানুষ যখন একে অন্যের সাথে সরাসরি কথা বলেন তখন একই সাথে অনেক কিছু ঘটতে থাকে। একটা ভিডিওতে বলতে গেলে তার কিছুই থাকে না। তাই তথাকথিত শিক্ষামূলক ভিডিও সমূহ কোনোভাবেই ব্যক্তির সাথে সরাসরি কথা বলা বা ভাবের আদান-প্রদান করার বিকল্প হতে পারে না।

অভিব্যক্তিপূর্ণ ভাষা বা Expressive language (যার মাধ্যমে আমরা মনের কথা প্রকাশ করি) হলো ভাষার তিনটি শাখার মধ্যে একটি। অন্যান্য শাখাগুলো হলো : গ্রহণযোগ্য ভাষা ba Receptive language (যা আমরা শুনি বা বুঝি), সামাজিক ভাষা ba Pragmatic language (যেভাবে আমরা সমাজে মিথষ্ক্রিয়া বা যোগাযোগ বজায় রাখি)।    

যদিও এসব নিয়ে আরো গবেষণা হওয়া প্রয়োজন, তবে গবেষকগণ এতটুকু নিশ্চিত করেছেন- স্ক্রিনের সামনে বসে কোনো ভিডিও দেখলে ভাষার তিনটি শাখার মাঝে বিদ্যমান অনেক উপাদান থেকেই শিশু বঞ্চিত হয়।

কথোপকথন এবং অন্যান্য মানবীয় যোগাযোগ

শিশুরা কী পরিমাণ ভাষাগত শব্দ শুনছে সেটার ওপর তার ভাষাগত দক্ষতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। শিশু যখন কথা বলতে শেখেনি, তখন কেউ যখন তার সাথে কথা বলে সেই মুহূর্তে শিশুর ভেতরে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। শিশু শব্দ শোনে, কণ্ঠস্বরের কাজ লক্ষ্য করে, শরীরি ভঙ্গি এবং মুখভঙ্গি খেয়াল করে; এভাবে প্রত্যেকটি বিষয়কে সমন্বয় করে সে বক্তার বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করে। সরাসরি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া ছাড়া শিশুর পক্ষে এধরনের অভিজ্ঞতা কোনো যন্ত্রের সাহায্যে অর্জন করা সম্ভব নয়।

তথ্য বাছাই করতে শেখা

ভাষা শেখার ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আশেপাশে চলমান বিভিন্ন ঘটনা থেকে নিজের প্রয়োজনীয় অংশটুকুর দিকে মনোযোগ দিতে পারা। আমরা এটা বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ, পরিস্থিতির মাঝে থাকতে থাকতে শিখে নিই। আমরা খেয়াল করি আমাদের আশেপাশে কী কী ঘটছে এবং তারপর নিজের পছন্দমতো বা প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট একটি জায়গায় মনোযোগ স্থাপন করি।

বাচ্চা যখন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে তখন স্ক্রিনের ওই ছোট্ট অংশটুকুই সরাসরি নির্ধারণ করে দেয় তাকে কোথায় মনোযোগ দিতে হবে। তখন বাচ্চা আর আশেপাশের কিছু লক্ষ্য করতে পারে না। শুধুই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং স্ক্রিনের সীমিত জায়গায় যা ঘটছে শুধুমাত্র সেদিকে তার মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে। ফলশ্রুতিতে কীভাবে বিভিন্ন ঘটনা থেকে তথ্য বাছাই করে নিজের মতো করে আলাদাভাবে মনোযোগ দিতে হয়; সেটা বাচ্চার শেখা হয়ে ওঠে না।

এভাবে চলতে চলতে একপর্যায়ে তাদের তথ্য বাছাই করা বা ফিল্টার করার ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। এক কাজ থেকে অন্য কাজের দিকে তারা মনোযোগ সরাতে পারে না। এক ক্ষেত্র থেকে অন্য ক্ষেত্রে মনোযোগ না দিতে পারার কারণে তাদের জীবনে অনেক বড় বড় সমস্যার সৃষ্টি হয় যেমন : রাস্তায় হাটার সময় আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে না পারা, স্কুলের বোর্ডে শিক্ষকের লিখে দেওয়া কিছু দেখে দেখে নিজের খাতায় নোট করতে সমস্যা হওয়া, নিজের রুম পর্যবেক্ষণ করে কিছু খুঁজে বের করতে অসমর্থ হওয়া, বইপত্র পড়তে কষ্ট হওয়া ইত্যাদি।

খেলাধূলা

সরাসরি খেলনা নিয়ে খেলা বা কোনো মানুষের সাথে খেলা করলে বাচ্চা একসাথে অনেক কিছু শেখার সুযোগ পায়, যা অল্পকথায় ব্যাখ্যা করাও কঠিন!

বাচ্চা যখন কোনো ত্রি-মাত্রিক (থ্রিডি) খেলনা দিয়ে খেলে তারা একই সাথে অনেক ধরনের নতুন বিষয় সম্পর্কে ধারণা পেতে শুরু করে যেমন : আকার, গঠন, গড়ন, পরিমাণ, সংখ্যা ইত্যাদি। মোবাইল বা টিভির সমতল স্ক্রিনে দেখে কোনোভাবেই সেভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব নয়। 

বাচ্চার সাথে যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ খেলে তখন তারা খেলার পাশাপাশি মাতৃভাষাটাও শিখতে থাকে। তারা নতুন নতুন শব্দ শোনে, ব্যাকরণ শেখে, কথা সাজাতে শেখে এবং বাস্তব পরিস্থিতির সাথে সেগুলোকে সমন্বয় করার দক্ষতা অর্জন করতে থাকে। এভাবে বাচ্চারা একটা পর্যায়ে গিয়ে প্রিটেন্ড প্লে বা নিজে একটা কিছু সেজে বা নিজেকে কোনো একটা চরিত্রে কল্পনা করে সেই মোতাবেক খেলতে শুরু করে। বাচ্চারা আশেপাশে যা দেখে, সেখান থেকে যে জিনিসটা বা চরিত্রটা তার কাছে অনেক আকর্ষণীয় বলে মনে হয় সে তখন সেটাকে নকল করার চেষ্টা করে, নিজেকে সেভাবে সাজাতে পছন্দ করে। এধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে সম্ভব নয়।

বাচ্চা অস্থির হয়ে উঠলে তাকে মোবাইল নিয়ে খেলতে দেওয়া যাবে?

এটা ঠিক যে, বাচ্চা জ্বালালে বা বিরক্ত করলে তার হাতে চট করে ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনটা তুলে দিয়ে তাকে প্রায়ই শান্ত করে ফেলা যায়! বাবা, মাকে আর কষ্ট করে বাচ্চার পেছনে অনেক সময় খরচ করতে হয় না, কথা বলতে হয় না। একটা ডিভাইস বাচ্চার যাবতীয় মনোযোগ কেড়ে নেয়, বাচ্চাকে ভুলিয়ে রাখে। বাচ্চাকে শান্ত করার জন্য ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দেওয়াটা খুব সহজ একটা সমাধান বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এধরনের চর্চা উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতিই সাধন করে থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বাচ্চার স্ক্রীন টাইম বেশি বা বেশি সময় ধরে কোনো ডিভাইসের স্ক্রীন টাইমের দিকে তাকিয়ে থাকে তারা নিজেরা নিজেদেরকে সহজে শান্ত রাখতে পারে না। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাচ্চা যদি বেশি স্ক্রীন টাইম পায় তাহলে তার আচরণগত সমস্যাও দেখা দেয়।

বাচ্চার যথাযথ বিকাশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়া, কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারাটা খুবই জরুরি। বাবা, মায়ের সাথে কোথাও ঘুরতে গিয়ে সে বোরিং অনুভব করতে পারে, বাবার সাথে মুদির দোকানে গিয়ে কেনাকাটা করতে গিয়ে বাচ্চাকে কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরতে হতে পারে, সময়ে-অসময়ে বাচ্চা চাইলেই চকলেট নাও পেতে পারে ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

মূলত, বাচ্চাকে নিজের চাওয়ার বিপরীতে না পাওয়ার হতাশাটা নিয়ন্ত্রণ করা জানতে হবে। বাচ্চা এটা মায়ের পেট থেকে শিখে আসে না, হতাশা নিয়ন্ত্রণ করা শেখানো বাবা, মায়ের দায়িত্ব। বাচ্চার মন খারাপ বা বাচ্চা একটু জ্বালাচ্ছে বলে আপনি যদি সবসময় তার হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেন, তার মানে আপনি বাচ্চাকে তার হতাশা নিয়ন্ত্রণ করা শেখা হতে বঞ্চিত করলেন। বাচ্চা যেটা চাচ্ছে সেটা না দিয়ে বরং তাকে তার আবেগ, চাহিদা, হতাশা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতে শেখান।

সবসময় বাচ্চাকে শান্ত করার জন্য সবচেয়ে সহজ পন্থাটা বেছে নেবেন না। কখনো কখনো সন্তানের মঙ্গলের একটু বাঁকা, কষ্টকর পথেও হেঁটে দেখুন।  

বাচ্চাদের জন্য কতটুকু স্ক্রীন টাইম প্রযোজ্য?

দি আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (AAP) তথা আমেরিকান শিশু বিশেষজ্ঞ একাডেমি থেকে জানানো হয়েছে, শিশুর ১৮ মাস বয়স পর্যন্ত তাকে সবধরনের স্ক্রীন থেকে দূরে রাখতে হবে। বয়স তারচেয়ে বাড়লে কিছু স্ক্রীন টাইম দেওয়া যেতে পারে। তবে বাচ্চার বয়স ২ বছর বা তার বেশি হলে তাকে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা স্ক্রীন টাইম দেওয়া যাবে।

AAP থেকে আরো বলা হয়েছে, শুধু এই সময় বেধে দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়। বাবা, মাকে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে সেই সময়টুকুতে বাচ্চা যা দেখছে সেটার মান যেন উন্নত হয়। বাচ্চারা যে শো দেখছে বা গেম খেলছে সেগুলো যেন তাদের ক্ষতির কারণ না হয়। বাচ্চাদের হাতে মোবাইল বা ট্যাব তুলে দিয়ে বাবা, মা নিজেদের মতো অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে চলবে না। বাচ্চা কী দেখছে বা কী খেলছে বাবা, মাকে সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

বাবা, মার উচিত বাচ্চার সাথে স্ক্রীন টাইম শেয়ার করা, তার সাথে ভিডিও, কার্টুন ইত্যাদি দেখা এবং তাকে বিভিন্ন শব্দ, বিষয়-বস্তু সম্পর্কে বুঝিয়ে বলা। মোদ্দাকথা, স্ক্রিনের সামনে থাকলেও বাচ্চা যেন সরাসরি মানুষের সাথে সংযুক্ত থাকে, এটা নিশ্চিত করা। তাহলে স্ক্রীন টাইমের কারণে শিশুর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশেই কমে আসবে।

অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) থেকে বলা হয়েছে, বাচ্চার বয়স ২ বছর না হওয়া পর্যন্ত তাকে কোনো প্রকার স্ক্রীনটাইম দেওয়া যাবে না। বাচ্চার বয়স ২ বছর থেকে ৪ বছরের মাঝে থাকলে তাকে দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা স্ক্রীন টাইম দেওয়া যেতে পারে।

বাচ্চার যদি প্রযুক্তি বা প্রোগ্রামিং সম্পর্কে আগ্রহ থাকে সে ক্ষেত্রে কি করণীয়?

সব বাবা, মা-ই চান তাদের সন্তান বড় হতে হতে প্রযুক্তি সচেতন হোক, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখুক। আজকের সন্তানই হয়তো অনাগত ভবিষ্যতে সাড়া জাগানো প্রযুক্তি উদ্ভাবক হয়ে উঠবে। কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বাচ্চার হাতে প্রযুক্তি ‍তুলে দেওয়া বা তাকে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখানোই শেষ কথা নয়, বরং তাকে প্রযুক্তি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখানোটাই আসল কথা।

বাবা, মাকে অন্য সব ক্ষেত্রের মতো এখানেও শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। বাচ্চাকে শেখাতে হবে- প্রযুক্তির সাহায্যে কীভাবে জ্ঞান, বিজ্ঞান আদান-প্রদান করা যায়, কীভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যোগাযোগ স্থাপন করা যায়, কীভাবে প্রযুক্তির সাহায্যে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় ইত্যাদি। কাজ করার জন্য যেমন বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রের প্রয়োজন হয়; প্রযুক্তিকেও তেমনটি একটি যন্ত্র বা একটি টুল হিসেবে ভাবতে শেখাতে হবে।

ধরা যাক, আপনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাচ্ছেন। তখন বাচ্চাকে ফোন বা ট্যাবের সাহায্যে ম্যাপ দেখাতে পারেন, ম্যাপে তাকে দেখিয়ে দিতে পারেন আপনাদের গাড়ি কোন দিকে যাচ্ছে, আপনাদের গন্তব্য কোথায় ইত্যাদি। এভাবে আপনি নিজের সন্তানকে প্রযুক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন এবং প্রযুক্তির বিভিন্ন ব্যবহার দেখিয়ে তার সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন।

যদি আপনার সন্তান প্রযুক্তি নিয়ে বিস্তর আগ্রহ দেখায়, যদি জানতে চায় প্রযুক্তি কোত্থেকে এসেছে, তাহলে তাকে পুরো বিষয়টা খুলে বলুন- কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, প্রোগ্রামার ইত্যাদি পেশায় জড়িত মানুষরা বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সেগুলো মানুষের ব্যবহার উপযোগী করার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। চাইলে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করে তুমিও তাদের মতো হতে পারবে।

বাচ্চার যদি এসবে খুব আগ্রহ থাকে তবে আপনার সন্তানকে অবশ্যই বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করতে শেখাবেন, এই বিষয়ক শিক্ষামূলক বিষয়াদি দেখতে দেবেন। কিন্তু তাই বলে তাকে ঘরকুনো করে রাখবেন না। তাকে অবশ্যই বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সাথে খেলতে উৎসাহিত করবেন, তাকে একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন সবার আগে।

বাচ্চার স্ক্রীন টাইম নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল সমূহ

বাচ্চার হাতে জলদি টেক ডিভাইস তুলে দেবেন না

বাচ্চার হাতে তাড়াহুড়ো করে, আগেভাগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস তুলে দেওয়ার জন্য চাপ নেবেন না। একটু দেরিতে ডিভাইস দিলে আপনার বাচ্চা তার সমবয়সী বাচ্চাদের চেয়ে অনেক বেশি পিছিয়ে পড়বে না। তারা ঠিকই অল্প সময়ের মধ্যে মোবাইল ফোন কিংবা ট্যাব চালানো শিখে যাবে। তাই বাচ্চার হাতে অল্প বয়সে টেক ডিভাইস তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাচ্চার জন্য নিজস্ব কোনো ডিভাইস কিনে দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। কারণ ডিভাইসটি যদি আপনার বাচ্চার “নিজস্ব” না হয় তাহলে অভিভাবক হিসেবে আপনি খুব সহজেই সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

সীমারেখা বেধে দিন

নির্দিষ্ট করে দিন কখন এবং কোথায় স্ক্রীন দেখে বিনোদন নেওয়া যাবে। কোনো কোনো বাবা, মা নিয়ম করে দেন রাতের খাবার খাওয়ার আগে ৩০ মিনিট স্ক্রীন দেখা যাবে কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে স্ক্রীন টাইমের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় বরাদ্দ রাখেন। এছাড়া আপনি চাইলে বাসার বিভিন্ন অংশকে স্ক্রীন-ফ্রি জোন হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন। অর্থাৎ, বাসার সেই স্থানগুলোতে কোনো মোবাইল, ট্যাব, টিভি দেখা চলবে না যেমন : বেডরুম, খাওয়ার টেবিল ইত্যাদি। স্ক্রীন-ফ্রি জোনের জন্য স্থান নির্ধারণ করার সময় খেয়াল রাখুন, সেই সব স্থানে যেন নিয়মটা পরিবারের সবার পক্ষে মানা সম্ভব হয়, সবাই যেন নিয়মটাকে সম্মান করতে পারে।

বাচ্চার সাথে কথা বলুন

বাচ্চাকে একাকী কোনো ডিভাইসের সামনে বসিয়ে দেবেন না। তার পাশে বসে আপনিও মনোযোগ দিয়ে খেয়াল রাখুন সে কী দেখছে বা কোন গেম খেলছে। তাকে তার দেখা কার্টুন বা গেমের ব্যাপারে কৌতুহলী হয়ে টুকটাক প্রশ্ন করুন। দেখুন সে কীভাবে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেয়।

চাইলে আয়োজন করে সপ্তাহে একদিন বা দুইদিন রাতের বেলা পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে বসে, একটি সিনেমা দেখতে পারেন বা গেম খেলতে পারেন। তারপর সেটা নিয়ে বাচ্চার সাথে আলাপ করতে পারেন। কী দেখলেন, কেমন লাগলো, কোন অংশ বেশি মজার ছিল, কোন অংশ ভাল লাগেনি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনার সন্তান ধীরে ধীরে সোস্যাল মিডিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করলে তাকে নিরাপত্তা, প্রাইভেসি, ডিজিটাল আইন ইত্যাদির ব্যাপারে প্রাথমিক তথ্য ও পরামর্শ দিন।

মজার বিকল্প কিছুর ব্যবস্থা করুন

যদি আপনার বাচ্চার নির্দিষ্ট সময়ের বেশি স্ক্রীন টাইম দাবি করে বা ডিভাইস নিয়ে থাকতে চায় তাহলে তাকে অন্য কোনো মজার কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করুন।

নিজের ব্যাপারে সতর্ক হোন

বিজ্ঞাপণ
Loading...

বাচ্চারা দেখে শেখে। আপনি নিজে যদি সবসময় ফোন, কম্পিউটার, টিভি, ট্যাব ইত্যাদি নিয়ে পড়ে থাকেন তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আপনি বাচ্চার স্ক্রীন টাইম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও বাচ্চা আপনার কথা শুনবে না। কারণ আপনি নিজেই কোনো না কোনো ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন!

ডিভাইসগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিন

প্রযুক্তি সচেতন একজন মায়ের কথা বলি। তিনি তার পুরোনো ট্যাবে আগের সবকিছু আনইন্সটল করে তার ৩ বছর বয়সী ছেলের উপযোগী কিছু গেম ডাউনলোড করেছিলেন। কিন্তু ট্যাবটা তিনি সহজে বাচ্চার হাতে দিতেন না। যখন তার ছেলে বই, স্টিকার ইত্যাদি নিয়ে সময় কাটাতে কাটাতে বিরক্ত হয়ে যেত তখন তিনি ছেলের হাতে ট্যাব তুলে দিতেন। আপনিও এই মায়ের কৌশলটি অনুসরণ করতে পারেন।

আপনার বাচ্চার বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনাকে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ট্যাব/মোবাইল ইত্যাদি ডিভাইসে আপনার বাচ্চা যেসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে, সেগুলোর ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ডগুলো আপনার দখলে আছে- এটা নিশ্চিত করুন। তাহলে সে কী কী ডাউনলোড করছে সে-ব্যাপারে আপনার স্পষ্ট ধারণা থাকবে এবং আপনি তার ব্যবহৃত ডিভাইসগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

পারিবারিক চুক্তি প্রণয়ন করুন

পরিবারের সবাই কখন, কতটুকু সময় স্ক্রীন দেখতে পারবে বা ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবে সে-ব্যাপারে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম জারি করুন। তারপর সবার সুবিধার্থে নিয়মগুলো লিখে বাসার এমন কোনো জায়গায় টানিয়ে দিন যেন সবাই দেখতে পারে। নিশ্চিত হয়ে নিন- আপনার বাচ্চা নিয়মগুলো বুঝতে পেরেছে এবং সে মেনে চলতে রাজি হয়েছে। চাইলে নিয়ম লেখা কাগজের নিচে বাচ্চার স্বাক্ষর নিতে পারেন। এভাবে সে সুশৃঙ্খল জীবন-যাপনের পাশাপাশি স্বাক্ষর করে নিজের মত প্রদান করার মতো অফিসিয়াল একটি বিষয় সম্পর্কেও ধারণা পাবে।

সন্তানকে তার কর্মফল সম্পর্কে জানিয়ে রাখুন

নিয়ম লঙ্ঘন করলে তার পরিণতি কী হবে সে-ব্যাপারে সন্তানকে আগেই জানিয়ে রাখুন। অনেক অভিভাবক শাস্তি হিসেবে বাচ্চার কাছ থেকে ডিভাইসটি কেড়ে নিয়ে থাকেন।

যদি নিতান্তই দিতে হয় তবে ভিডিও কন্টেন্টের পরিবর্তে অডিও বা শ্রবণযোগ্য কনটেন্টের দিকে নজর দিন। মোবাইলে একটা ছড়া চালু করে ডিভাইসটিকে বাচ্চার নাগালের বাইরে রাখতে পারেন কিংবা নিজেই একটা গান গেয়ে আপনার বাচ্চাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে পারেন।

তাদেরকে গল্প বলে শোনান। কবিতা, ছড়া, গল্প; এসব বাচ্চার শব্দ ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। বাচ্চাকে খেলাধূলা করতে দিন, নিজেও তাদের সাথে খেলুন। খেলার মাধ্যমে বাচ্চাদের সৃজনশীলতা এবং কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায়। খেলতে খেলতে বাচ্চা নতুন দক্ষতা অর্জন করে এবং তার আশেপাশে পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে সংযোগ স্থাপন করে।

বাচ্চাকে ব্লক বিল্ডিং (শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি প্লাস্টিকের টুকরো দিয়ে খেলনা ভবন নির্মাণ), রোল প্লেয়িং (বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে খেলা) ইত্যাদি খেলার সাথে সম্পৃক্ত করে তাদের কল্পনাশক্তিকে জোরদার করার চেষ্টা করতে পারেন। তাদেরকে বাসার বাইরে নিয়ে যেতে পারেন। প্রকৃতি, বন, আকাশ, বাতাস ইত্যাদির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। এভাবে তার ইন্দ্রিয়গুলো অভিজ্ঞতা অর্জন করবে এবং সে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment