যেভাবে কর্মজীবি মায়েরা চাকরি এবং পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন (এবং সুখী হতে পারেন)

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

আজকের দুনিয়ায় অনেক মায়েরা ঘরে এবং বাইরে উভয় জায়গাতেই কাজ করেন। । কিন্তু চাকরি এবং সংসার উভয় ক্ষেত্রে কি পারফেক্ট ব্যালান্স আনা আসলেই সম্ভব? চাকরি এবং সংসারের নিখুঁত ভারসাম্য বলতে বোঝায় দুটিকেই সমান ধরে দুইয়ের মধ্যে সমান সময় ভাগ করে নিতে পারা। এভাবে করলেই তো বাসা এবং চাকরি- উভয় ক্ষেত্রেই সুখ ও সন্তুষ্টি বজায় থাকার কথা। তাইনা?

বাস্তবতা হচ্ছে আপনি পার্ট-টাইম, ফুল টাইম, বাসায় থেকে বা আপনার সুবিধামত যে সময়েই কাজ করুন না কেন, সবসময় সবকিছু নিখুঁত হবে না। কোথাও না কোথাও কিছুটা কমতি থেকেই যাবে। চাকরি আর সংসারের ভারসাম্য রক্ষা করা বিষয়টি একেকজনের জন্য একেক রকম কারণ সবারই প্রয়োজন এবং প্রায়োরিটি ভিন্ন। কারো চাকরি হয়তোবা তার কাছে একটু বেশি ডিমান্ড করে ফলে সংসারে কিছুটা ছাড় দিতে হয় আবার কেউ হয়তো চাকরিতে কিছুটা ছাড় দিয়ে সংসারকেই বেশি প্রায়োরিটি দেন। যেটাই আপনার প্রয়োজন এবং প্রায়োরিটি হোক না কেন, এই দুইয়ের মাঝে সুন্দরভাবে জীবন চালিয়ে নেয়াই হোল মুখ্য উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

[ আরও পড়ুনঃ কর্মজীবী মায়েরা প্যারেন্টিং এর ক্ষেত্রে যেসব ভুল করে থাকেন ]

আপনার ভারসাম্যের সংজ্ঞা ঠিক করুন

সবসময় একসাথে দুই দিকই নিখুঁতভাবে ঠিক রাখার কথা বললে হয়তো সেটা অবাস্তব লাগবে। কারণ কখনও কখনও একদিকের দায়িত্ব অন্য দিকের দায়িত্বের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেমন- যদি আপনার বাচ্চা অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে মা হিসেবে আপনার দায়িত্ব শতভাগ হয়ে ওঠে। আবার অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজের তাড়া থাকলে আপনার পরিবারের কাজে কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করতে হতে পারে।

প্রথমে আপনার নিজের কাছে চাকরি আর সংসারের মধ্যকার ভারসাম্যের সংজ্ঞাটা খুঁজে বের করতে হবে এবং নিজেকে অন্যদের সাথে তুলনা করা বন্ধ করতে হবে।

ধরুন আপনি বেশ বড় চাকরি করেন। বড় চাকরি মানে বড় দায়িত্ব। হয়ত এর জন্য আপনি আপনার বাচ্চাদের স্কুল ছুটির পরে তাদের আনতে যেতে পারবেন না অথবা তাদের স্কুলের দুয়েকটা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না। তার মানে এই না যে আপনি মা হিসেবে খুব খারাপ কিছু করলেন। কিন্তু দিন শেষে হয়তো আপনাকে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ার পর সংসারের কাজকর্ম সেরে নিতে হয়। অর্থাৎ আপনার বিশ্রামের সময়টুকু স্যাক্রিফাইস করতে হয়। এটাই আপনার চাকরি এবং সংসারের মধ্যে ভারসাম্য ঠিক রাখার উপায়।

আবার অন্য একজন মা হয়তো চাকরি আর পরিবারের ভারসাম্য বলতে সপ্তাহে অল্প কয়েকদিন কাজ করাকেই বোঝান। তিনি হয়ত পরিবারের প্রধান জীবিকা অর্জনকারী হতে চান না অথবা হওয়ার দরকারও নেই। তাই তার পার্ট-টাইম চাকরি করলেও খুব বেশি সমস্যা নেই। তিনি অনায়াসেই সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসতে পারেন এবং স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন এবং অন্যান্য ঘরোয়া কাজকর্মে মনোযোগ দিতে পারেন। আর দিন শেষে বাচ্চারা ঘুমানোর সময় রেস্ট নিতে পারেন বা পছন্দের কোন কাজ করতে পারেন। এটাই তার ব্যালান্সের সংজ্ঞা।

এখন আপনি যদি পরের জনের মত করেই বাচ্চার ঘুমানোর সময়টুকু ব্যয় করতে চান তবে সেটা আপনার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ হবেনা এবং পরের জন যদি আপনার মতই বাচ্চাদের স্কুলের দায়িত্বটুকু বাদ দিতে চান তবে সেটাতে তার ভারসাম্য নষ্ট হবে। দুটি ক্ষেত্রেই আবার যদি সাহায্যকারী থাকে তখন তাদের পরিস্থিতিও পাল্টে যাবে।

মূল কথা হচ্ছে আপনার জীবনের ভারসাম্যের সমীকরণটি আপনার চাকরির ধরণ, আপনার চাহিদা, সাপোর্ট এবং প্রায়োরিটির ওপর নির্ভর করবে। আপনার সঠিক সমীকরণ যা আপনাকে ভালো রাখবে, আপনার পরিবারের জন্যও ঠিকঠাক হবে- হয়তো সেটা আপনার প্রতিবেশীর থেকে আলাদা হবে। আবার যখন আপনার চাকরির পরিবর্তন আসবে, আপনার সন্তানরাও বড় হয়ে যাবে, আপনার পরিবার আর চাকরির মধ্যে ভারসাম্য রাখার পদ্ধতিও হয়তো পাল্টাবে। এমনটাই স্বাভাবিক।

তাই কখন, কোনটা আপনার জন্য ঠিক তা আগে বোঝার চেষ্টা করুন। আপনার সঙ্গীর সাথে আপনার প্রয়োজন, চাওয়া এবং সুখের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে মন খুলে আলোচনা করুন।বাস্তবসম্মত আশা রেখে এবং কিছু ট্রায়াল অ্যান্ড এরোর অর্থাৎ বিভিন্ন কম্বিনেশনে চেষ্টা করলেই হয়তো আপনি আপনার সঠিক ভারসাম্য পেয়ে যাবেন যেটার মাধ্যমে আপনি ও আপনার পরিবার দীর্ঘমেয়াদে সুখী হবেন।

[ আরও পড়ুন- মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মক্ষেত্রে ফেরা সহজ করবে যে কাজগুলো ]

চাকরি-সংসার ভারসাম্য: এটা ভালো কেন?

সন্তানদের জন্য ভালো

বেড়ে ওঠা, শেখা এবং বেঁচে থাকার জন্য শিশুদের আপনার আদর, মনোযোগ এবং আপনার সাথে সুন্দর সময় কাটানো জরুরী।

আপনার চাকরি আর সংসারের ভারসাম্য যদি ঠিকঠাক থাকে তাহলে আপনার সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার জন্য আরো বেশি মানসিক শক্তি থাকবে ও আবেগ কাজ করবে। আপনার সন্তানদের সাথে আরো বেশি কোয়ালিটি টাইম কাটাতে পারবেন- যে সময়টাতে আপনি শুধুমাত্র আপনার সন্তানদের নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন।

আপনার জন্য ভালো

নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন- কাজ, শখ, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং পরিবারকে সময় দেওয়াও নিজের যত্ন নেওয়ারই অংশ। যখন আপনি আপনার চাকরি ও সংসারের ভারসাম্য খুঁজে পাবেন তখন আপনি হয়তো-

  • অপেক্ষাকৃত কম মানসিক চাপ ও ক্লান্তি অনুভব করবেন।
  • সময়ের উপর বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন।
  • সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করতে পারবেন।
  • শারীরিকভাবে স্বাস্থ্যবান থাকবেন।

একটা ভারসাম্যপূর্ণ চাকরি এবং পরিবারজীবন কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি রোধেও সহায়তা করতে পারে।

আপনার সম্পর্কের জন্য ভালো

একসাথে ভালো সময় কাটানো যেকোনো সম্পর্ক ভালোভাবে গড়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই চাকরি আর সংসারের ভারসাম্য থাকলে আপনার সঙ্গী ও সন্তানের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়তে সাহায্য করবে।

[ আরও পড়ুনঃ মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মক্ষেত্রে ফেরা সহজ করবে যে কাজগুলো ]

যেভাবে কর্মজীবি মায়েরা চাকরি ও পরিবারের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন

অপরাধবোধ ত্যাগ করুন

কিছু মায়ের বাসায় থাকার কোনো সুযোগই থাকে না, আবার কিছু মা ক্যারিয়ার ত্যাগ করতে চান না বলে চাকরিতেই থেকে যান। কারণ যেটাই হোক না কেন, একজন কর্মজীবি মা হওয়ার ইচ্ছা বা অভিমতকে যেটা সবারই সম্মান করা উচিৎ এবং এটা কোনোভাবেই অপমান করার বিষয় নয়। আপনার সন্তানের সাথে সবসময় না থাকার জন্য যদি আপনার অপরাধবোধ কাজ করে তাহলে এই অপরাধবোধ ঝেড়ে ফেলার এখনই সেরা সময়!

আপনার চাকরি এবং আয় দিয়ে আপনি আপনার সংসার চালাতে আপনার সঙ্গীকে সহায়তা করতে পারেন এবং সন্তানের জন্য কাঙ্ক্ষিত সুশিক্ষা নিশ্চিতকরণে ব্যয় করতে পারেন। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করা যেকোনো মায়েরই প্রাথমিক কাজ এবং এতে কোনো অপরাধবোধের জায়গা নেই। একজন মা অপরাধবোধে ভুগলে তাকে দিয়ে কারোই উপকার হয় না। যখন আপনার সন্তান আপনাকে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখে তখন সে মানবিক গুণাবলি শিখে ফেলে। এর জন্য নিজেকে অপরাধী ভাববেন না।

পজিটিভ বিষয়গুলোর দিকে নজর দিন যেমন- আপনার কাজ দিয়ে আপনি পরিবারে কিছু অবদান রাখছেন। আত্মবিশ্বাসী হোন- আপনি সন্তান, পরিবার এবং নিজের জন্য আপনার সর্বোচ্চটা করছেন। আপনার সন্তান অববশ্যই আপনার ভালোবাসাটা অনুভব করবে এবং আপনার ত্যাগটা বুঝবে।

বাসা এবং কাজের ক্ষেত্র আলাদা করুন

বলার থেকে করা অনেক কঠিন। কিন্তু করতে পারলে সেটা বেশ ফলপ্রসু হয়। কখনও আপনার সন্তানের সাথে সময় কাটানোর সময়ে অফিসের কাজ নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করতে হয়েছে? কিংবা কাজের সময়ে সন্তান নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করতে হয়েছে? এটা সব ধরনের কর্মজীবি মায়ের সাথেই ঘটে থাকে। এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে কাজ ও পরিবারের সীমারেখা নির্ধারণ করে নেওয়া।

উদাহরণস্বরূপ, আপনি একটি নিয়ম করে নিতে পারেন যে যখন আপনি সন্তানদের সাথে থাকবেন তখন কাজ করবেন না এবং যখন কাজ করবেন তখন সন্তানদের জন্য কাজ করবেন না। এটা অবশ্য সবার জন্য কার্যকরী নাও হতে পারে, যেহেতু অনেকের অফিস এবং বাসা- উভয় জায়গাতেই কিছু অতিরিক্ত চাওয়া থাকতে পারে। অনেক মায়েরা বাসায় থাকাকালে ফোন সাইলেন্ট মোডে রাখেন এবং কোনো ইমেইল, ফোন কল অথবা মেসেজের উত্তর দেন না। এর বিপরীতটা হয়তো সম্ভব না, যেহেতু অধিকাংশ মায়েরাই কর্মক্ষেত্রে ফোন সাইলেন্ট মোডে রাখতে পারেন না। তবে আপনি একটি নিয়ম করে নিতে পারেন যেমন- শুধু দুপুরের খাবারের বিরতির সময়ে বাচ্চাদের খোঁজ নিবেন।

বাসার কাজ ভাগাভাগি করে নিন

বাসার কাজের চাপ পুরোপুরি নারীদের কাঁধেই থাকা উচিৎ নয়। এই একটা জায়গা যেখানে আপনার সঙ্গী আপনাকে সাহায্য করতে পারেন, বিশেষভাবে যদি আপনার অন্য কোনো বিশেষ কাজ যেমন- সন্তানকে দুগ্ধপান করানো, ঘুম পাড়ানো ইত্যাদি করার থাকে।

যদি আপনার সন্তানরা বড় হয় তাহলে তাদের কিছু ছোটখাটো কাজ করতে দিন যাতে তাদের সু-অভ্যাস গড়ে ওঠে এবং পরিবারে কিছু কিছু ভূমিকা রাখতে পারে।

একজন ভালো সঙ্গী জীবনকে অনেক সহজ করে দিতে পারে। আপনার সঙ্গীর সাথে কথা বলুন এবং আপনার কাজের চাপ শেয়ার করুন। সমাজের সব বাঁধাধরা নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দম্পতি এবং পিতামাতা হিসেবে আপনারা আপনাদের নিজস্ব নিয়মকানুন তৈরি করবেন। যেমন- যখন আপনি রাতের খাবার তৈরি করবেন তখন আপনার সঙ্গী আপনার সন্তানদের পড়াবে কিংবা হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করবে। যখন আপনি লম্বা এক ক্লান্তিকর কর্মদিবস শেষে বাসায় ফিরবেন তখন আপনার সঙ্গীকে কাজ করতে দিন এবং নিজে সন্তানকে সময় দিন।

কাজের প্রাধান্য ঠিক করে নিন

নিকট ভবিষ্যতে আপনার যেসব কাজ করতে হবে তার সবগুলো নিয়ে না ভেবে কোন কাজটা আগে করা জরুরি সেটাতে মনোযোগ দিন। কোনো নির্দিষ্ট দিনে আপনার করা দরকার এমন ৩-৪টি কাজ লিস্ট করুন। একেকটি কাজ সফলভাবে শেষ করার পরে একধরণের সন্তুষ্টি আসে এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় যে আপনি একদিনে বাকি কাজগুলোও শেষ করতে পারবেন। বাসা এবং অফিস উভয় ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন।

আগামীর পরিকল্পনা করুন এবং গুছিয়ে নিন

একজন কর্মজীবি মায়ের জন্য কার্যকর সময় ব্যবস্থাপনা খুবই দরকারি। এর ফলে সময়ের পূর্ণ ব্যবহার এবং প্রত্যেক মুহূর্ত সম্পূর্ণরূপে উপভোগ করতে পারবেন। কী রান্না করবেন সেটা ঠিক করে নিন এবং অফিসের জন্য দুপুরের খাবার আগেই প্যাক করে নিন।

আপনি আরো রিল্যাক্সড অনুভব করবেন যদি সপ্তাহে একদিনেই সকল প্রয়োজনীয় বাজার করে ফেলেন। বিভিন্ন বিল এবং সন্তানের স্কুলের বকেয়া পাওনা লিস্ট করে রাখুন। গুরুত্বপূর্ণ তারিখ যেমন ডেন্টিস্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট, শিক্ষক-অভিভাবক সাক্ষাৎ বা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু লিখে রাখতে ক্যালেন্ডারের সাহায্য নিন। এটা আপনার দিনগুলো কম ক্লান্তিকর রাখতে এবং মানসিকভাবে সুখী হতে সাহায্য করবে।

অন্যান্য দায়িত্ব পুনঃমূল্যায়ন করুন

মানুষজনকে “না” বলতে শেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যেন আপনি নিজেকে বেশি চাপে ফেলে না দেন। অবশ্যই সব কাজ বা সুযোগকে না করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু এমনভাবে কাজ নিবেন না যাতে আপনার পরিবারের সাথে সময় কাটানোর সুযোগই থাকে না।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

সেইসব বিষয়ে “হ্যাঁ” বলুন যাতে আপনার পরিবার একত্রিত হওয়ার সুযোগ থাকে যেমন- পরিবার ও বন্ধুদের সাথে পুনর্মিলনী, শিশুবান্ধব রেস্টুরেন্টে ডিনার কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠান যাতে সব বয়সী লোকজন উপস্থিত থাকে। আপনার সন্তানকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করলে তারা তাদের আগ্রহের বিষয় সহজে খুঁজে পাবে এবং সামাজিক দক্ষতা বাড়বে।

সাহায্য চান

যদি আপনার মনে হয় যে আপনি একইসাথে বাসা ও চাকুরি পরিচালনা করতে পারছেন না তাহলে আপনার বাচ্চাকে দেখাশোনা করার জন্য কাউকে নিয়োগ করতে পারেন। কেউ কেউ দাদা-দাদী বা নানা-নানীর কাছে সন্তানদের রাখতে পারেন। ডে-কেয়ারে রাখাও একটি ভাল উপায় হতে পারে।

দাদা-দাদী বা নানা-নানীরা তাদের নাতি-নাতনিকে সম্ভবত সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন! তাই যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তাদের ডাকতে লজ্জাবোধ করবেন না। এতে আপনার সন্তানেরও ভালো সময় কাটবে এবং দুই প্রজন্মের দারুণ মেলবন্ধন হবে। ফলে আপনি আপনার কাজ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারবেন।

আপনার কাজ ঠিকঠাক মনোযোগ দিয়ে করার জন্য আপনার সন্তান নিয়ে দুঃশ্চিন্তা এড়ানো জরুরী। এজন্যই আপনার সন্তানকে যেখানেই রাখুন না কেন, অবশ্যই আপনার বিশ্বস্ত কোনো জায়গায় রাখুন। সম্ভব হলে সারাদিনই খোঁজ-খবর নিন।

আপনার ম্যানেজারের সাথে ভালো যোগাযোগ রাখুন

একজন কর্মজীবি মা মানেই এই না যে আপনি কম কর্মক্ষম কর্মী হবেন। তবে প্রায়শই জীবনে পরিবর্তন আসে।

মায়েরা সাধারণত বাচ্চার অসুস্থতার ক্ষেত্রে প্রাথমিক অভিভাবক হয়ে থাকেন। এবং কাজের শেষে বাচ্চাকে নিয়ে যাওয়ার কাজটিও মায়েরাই করে থাকেন। তাই কর্মজীবি মায়েদের রুটিনে প্রায়ই একটু ফ্লেক্সিবিলিটি প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক সময় কর্মজীবি মায়েরাই সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হয়ে থাকেন। কাজের জন্য লাঞ্চ ব্রেক এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্যয় করতেও তারা দ্বিধা করেন না।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আপনার ম্যানেজারকে বুঝতে দেওয়া যে আপনার কী প্রয়োজন এবং তাদের নির্ধারিত কাজ আপনি কীভাবে শেষ করবেন। আশা করা যায় তিনি আপনার সমস্যা বুঝতে পারবেন এবং আপনার স্বচ্ছতা এবং পরিবার ও কাজের প্রতি আত্মনিয়োগের প্রশংসা করবেন।

যোগাযোগ তৈরির জন্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করুন

একজন কর্মজীবি মায়ের ক্ষেত্রে সময় একটু বেশিই মূল্যবান।

কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সাথে আড্ডা যদি আপনার কাজে ব্যঘাত ঘটায় তাহলে আড্ডায় সংযত হোন। দীর্ঘ মধ্যাহ্ন বিরতি পরিহার করুন এবং ইন্টারনেটে সময় কম ব্যয় করুন যাতে করে আপনার কাজের সময়ের যথাযথ ব্যবহার করতে পারেন।

যখন বাসায় থাকবেন তখন আপনার মনোযোগ ফোন অথবা টিভির দিকে না দিয়ে সঙ্গী ও সন্তানের দিকে দিন যাতে করে একসাথে কাটানো সময়টুকু অর্থবহ হয়।

অনেক মায়েরা বলেন যে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করাটা তাদের দুঃশ্চিন্তা থেকে অনেকটাই মুক্তি দিয়েছে। ফলে তিনি প্রতি মুহূর্তই উপভোগ করতে পারছেন।

যখন আপনি বর্তমান নিয়ে আরো বেশি ব্যস্ত থাকবেন তখন আপনি বেশি খুশি আর কম দুঃশ্চিন্তাগ্রস্তই থাকবেন না, সাথে আপনার ভুলে যাওয়ার প্রবণতাও হ্রাস পাবে।

সঙ্গীর সাথে সংযোগ স্থাপন

একটা সুখী পরিবারের সূচনা হয় একটা সুখী দাম্পত্যজীবন থেকে। আপনার দাম্পত্যজীবকে প্রাধান্য দিন কারণ আপনার জীবনের সবকিছুতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

যদি সম্ভব হয় বাচ্চাকে কারো জিম্মায় রেখে ডেটে যান। পিতামাতা হওয়ার আগে যেসব জিনিস আপনারা উপভোগ করতেন সেই জিনিসগুলো করুন। আপনার সঙ্গীর সাথে সন্তান কিংবা চাকরি বাদে নানা বিষয়ে মনখোলা আলাপ করুন এবং তার কী বলার আছে তাও শুনুন।

আপনার দিন কেমন গেল তা নিয়ে আলাপ করুন। অফিসে কী কী করলেন তা শেয়ার করুন, তার অফিস কেমন গেল তা জিজ্ঞেস করুন। কর্মক্ষেত্রে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে কিংবা একই সাথে বাচ্চা ও অফিস সামলানো কঠিন মনে হলে তাও সঙ্গীর সাথে শেয়ার করুন। এটা আপনার জীবনকে আরো অনেক সহজ করে দিবে।

কিছু পারিবারিক সময় উপভোগ করুন

পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার জন্য প্রিয়জনদের সাথে কিছু সময় কাটানো জরুরি। হোক সেটা প্রিয় বোর্ড গেম বা নিকটস্থ পার্কে ঘোরাঘুরি কিংবা এমন কিছু করা যেটা সবাই পছন্দ করবে।

সপ্তাহের একটি দিন রাখুন মজার কিছু করার জন্য। চিড়িয়াখানা বা থিম পার্কে যেতে পারেন অথবা বাসায় থেকেই সৃজনশীল কোনো কাজ যেমন- কেক বানানো কিংবা বাচ্চাদের নিয়ে আঁকিবুকি করতে পারেন।

সকালগুলো সুন্দর করুন

আগের রাতেই পরের দিনের জন্য সবকিছু ঠিকঠাক করে রাখুন, যাতে করে পরের দিনের সকালটা সহজতর হয় এবং বেশি চিন্তা না করতে হয়। সন্তানের স্কুলের জামাকাপড় ঠিক করে রাখুন, তাদের লাঞ্চের প্যাক রেডি করে ফ্রিজে রাখুন। আপনার সকল ফাইল এবং কাগজপত্রও আগের রাতেই গুছিয়ে রাখুন। যাতে করে পরের দিন যখন আপনি ঘুম থেকে উঠবেন তখন সবকিছু খুব সুন্দরভাবে হয়ে যায়।

কম প্রত্যাশা করুন

একজন মায়ের ওপর প্রতিদিন স্বাস্থ্যকর খাবার রান্না, ঘর পরিষ্কার রাখার চাপ থাকে। এর মধ্যেই আপনি নিজেকে একজন নিখুঁত মা হওয়ার প্রত্যাশায় ফেলে দেন। কেউ আপনার থেকে এতো বেশি কিছু চায় না যতটা আপনি নিজের থেকে আশা করতে শুরু করে দেন।

যখন আপনি নিজের থেকে প্রত্যাশা কমাবেন তখন দেখবেন আপনি নিজের ওপর থেকে অনেকখানি অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ সরিয়ে ফেলেছেন।

প্রতিবার কোনো অতিথি আসার সাথে সাথেই আপনার বাসাটা ধুয়ে-মুছে চকচকে করে ফেলাটা জরুরি না, বিশেষত যদি অতিথির নিজেদের বাচ্চা থাকে।

কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা নির্ধারণ করুন, প্রয়োজনে কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় বাদ দিয়ে দিন। উদাহরণস্বরূপ- যদি রাতে রান্নাঘর গুছিয়ে রাখা সকালে আপনাকে কিছুটা স্বস্তি দেয় তাহলে রাতে থালা-বাসনগুলো ধুয়ে রাখুন। আর যদি থালাবাসন না পরিষ্কার করলে আপনার খুব একটা সমস্যা না থাকে তাহলে সকালের জন্যই রেখে দিন। এভাবে যখন আপনি আপনার প্রয়োজনটা ঠিক করে ফেলবেন তখন অবশ্যই কম চাপ অনুভব করবেন।

নিজের জন্য সময় বের করুন

বিজ্ঞাপণ
Loading...

বাসা ও কর্মক্ষেত্রের ক্লান্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি ও আত্মার শান্তি পেতে নিজের জন্য সময় বের করা গুরুত্বপূর্ণ।

মায়েদের স্বভাবই হচ্ছে অন্যদের চাওয়াকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজের চাওয়াকে তলানিতে রেখে দেওয়া। কিন্তু আপনি যদি নিজের যত্নই ঠিকমত না নেন তাহলে অন্যদের যত্ন কীভাবে নিবেন?

এমন কোনো কাজ খুঁজে বের করুন যেটা আপনাকে কিছুটা আরাম দিবে। উদাহরণস্বরূপ- ইয়োগা, মেডিটেশন, ব্যায়াম, বই পড়া, লেখা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া অথবা নিজের যত্ন নেওয়া।

অন্যান্য কর্মজীবি মায়েদের সাথে যোগাযোগ রাখুন

আপনি একা নন। লাখ লাখ কর্মজীবি মা আছেন যারা আপনার মত একই কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিদিন।চাকরি না করা মায়েরা নিজেদের মধ্যে হয়তো সহজেই সাক্ষাৎ করতে পারেন। কর্মজীবি মায়েরাও চাইলে এই ধরনের কমিউনিটি গড়ে তুলতে পারেন।

আপনার সহকর্মীদের মধ্যে কেউ মা আছেন কিনা খোঁজ নিন। এইসব নারীরা আপনার সাথে বিভিন্ন বিষয় শেয়ার করতে পারবেন। সপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে কিছু সময় বা কাজের শেষে বাড়ি ফেরার পথে একসাথে কিছু সময় ব্যয় করতে পারেন, একসাথে আড্ডা দিতে পারেন, কিংবা নানা ঘটনা শেয়ার করতে পারেন।

দয়ালু হোন। অন্যকে বিচার করবেন না। সবার পরিস্থিতিই আলাদা।

The grass is always greener on the other side. হয়তো আপনি বাসায় থেকে চাকুরী করার কিংবা পার্ট-টাইম চাকুরির ইচ্ছা করছেন কারণ অন্য কোনো মায়ের জীবন আপনার কাছে সহজ কিংবা ভালো মনে হচ্ছে। সম্ভাবনা আছে এমন যে তিনিও হয়তো আপনার মতোই কোনো সমস্যা নিয়ে চিন্তিত।

হয়তো তার গল্পটা ঠিক আপনার মত না, কিন্তু তিনিও একজন ভালো মা হওয়ার চেষ্টা করছেন, তার বাচ্চাদের বড় করা নিয়ে ব্যস্ত এবং একইসাথে তার চাকরির জায়গাতেও ভালো করার চেষ্টা করছেন। তাকে বিচার করার পরিবর্তে তাকে জানতে চেষ্টা করুন। হয়তো এমন কিছু শিখতে পারবেন যেটা আপনার পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সাহায্য করবে।

শেষ কথা

মনে রাখবেন যে, আমরা সবাই এসবের মধ্যেই আছি। একটা শিশুকে বড় করতে অনেক কসরৎ ও ত্যাগের প্রয়োজন। কখনও কখনও মনে হতে পারে যে সবকিছুই আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কিন্তু আপনি যদি আপনার সাপোর্ট খুঁজে পান, নিজের প্রতি যত্নবান হোন, নিজের প্রতি সদয় হন এবং অন্যদের নিয়ে বেশি চিন্তা না করেন তাহলেই আপনি আপনার চাকরি আর পরিবারের ভারসাম্যের জায়গাটি খুঁজে পাবেন।

মাঝেমধ্যে হয়তো এদিক-সেদিক হতেই পারে কিন্তু এটাই সন্তান বড় করার পুরো প্রক্রিয়ার অংশ। প্রয়োজনে কারো সাহায্য চাইতে দ্বিধাবোধ করবেন না, কখনো কোনো পরিবর্তনে ভয় পাবেন না। আপনার শিডিউল পরিবর্তনশীল বা অপরিবর্তনীয় যেমনই হোক না কেন, আপনি ঠিকই একটা উপায় বের করতে পারবেন এবং আপনার সন্তানরা আপনাকে অবশ্যই ভালোবাসবে।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment