শিশুরা কেন অতিরিক্ত ঘামায় এবং এ সম্পর্কে বিস্তারিত

Updated on

শিশু যদি প্রচুর পরিমাণে ঘামায় তাহলে আমরা অনেকেই বিষয়টা স্বাভাবিকভাবেই নেই, কেননা জন্মের প্রথম দিন থেকেই সে বেশ ঘামাচ্ছে। তবে একটা সময়ে অন্যান্য শিশুদের তুলনা করলে আমরা দেখি যে নিজের শিশুটি হয়ত অন্যান্যদের তুলনায় একটু বেশিই ঘামাচ্ছে। তখন আপনার মনে হয়ত একটু উদ্বেগের ভাব চলে আসে যে, আপনি বিষয়টাকে যতটা স্বাভাবিক ভাবছিলেন, ব্যাপারটা আসলে ঠিক ততটা স্বাভাবিক নয়।

তবে এর মধ্যেই এত দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই, আসুন আগে আমরা বিষয়টা সম্পর্কে একটু জেনে নেই এবং বুঝে নেই আপনার শিশুর ক্ষেত্রে কি আদতেই এমন কোন উদ্বেগের বিষয় রয়েছে কি না।

 সব শিশুরাই কি ঘামায়?

হ্যাঁ! সব শিশুরাই কম বেশি ঘামায়। তবে আপনাকে এটা প্রথমেই মনে রাখতে হবে প্রত্যেকটি শিশুই আলাদা এবং প্রত্যেকেই একে অন্যজন থেকে একদমই ভিন্নভাবে বেড়ে ওঠে। আর তাই যদি অন্যান্য শিশুরা না ঘামায় আর আপনার শিশুটি অনেক ঘামাতে থাকে তাহলে এখনই আঁতকে উঠবেন না।

আনুষঙ্গিক অন্যান্য আরো কিছু অস্বাভাবিক লক্ষণের দিকে খেয়াল রাখুন। আর সেই লক্ষণগুলো মিলে গেলেই এই বিষয় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে, সেটা ভাবা শুরু করতে হবে।

শিশুরা কেন ঘামায়?

সাধারণ ভাবেই শিশুরা প্রচুর পরিমাণে ঘামায়, কেননা শিশুর ঘামের গ্রন্থিগুলো এখনো পরিপক্ব হয়নি। শরীরের অন্যান্য যে কোন অংশের মতই শিশুর ঘামের গ্রন্থিগুলোর অপরিপক্বতার কারণেই শিশুর প্রচুর পরিমাণ ঘামাতে পারে। তবে শিশু যত বড় হতে থাকবে এবং তার শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থিগুলো পরিপক্ব হতে থাকবে, শিশুর ঘামানোর পরিমাণ ততই কমতে থাকবে।

নবজাতক শিশুর মাথার দিকেই কেবলমাত্র অতিরিক্ত ঘাম হয়। আপনি হয়ত আপনার শিশুর ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই সেটা দেখেছেন। এর কারণ হল, নবজাতক শিশুর ঘামের গ্রন্থিগুলোর মধ্যে কেবল মাথার অংশের দিকের ঘামের গ্রন্থিগুলোই সক্রিয় থাকে। তাই নবজাতক শিশুর যখন গরম লাগবে তখন স্বাভাবিক ভাবেই তার মাথার দিকে প্রচুর ঘাম হবে।

এছাড়া পারিপার্শ্বিক আবহাওয়াও এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি রুমের তাপমাত্রা বেশি হয় অথবা বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি হয় তাহলে আপনার শিশু ঘামাতে পারে। এছাড়া শিশুর গায়ে যদি অতিরিক্ত জামা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখা হয় তাহলেও সে অতিরিক্ত ঘামাতে পারে এবং সাথে সাথে এটা শিশুর জন্য কিঞ্চিৎ ঝুঁকিপূর্ণও বটে।

আরো একটি কারণে শিশুর প্রচুর ঘাম হতে পারে, আর সেটা হল যদি আপনার শিশুর কোন ধরনের ইনফেকশন থাকে। (যেমন ইউরিন ইনফেকশন, ক্ষত জনিত ইনফেকশন অথবা শ্বাসতন্ত্রের কোন ধরনের ইনফেকশন)। শিশুর জন্য ইনফেকশনের একটা অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল প্রতিনিয়ত ঘামতে থাকা।

এছাড়া অন্যান্য আরো বড় ধরনের ও ছোটখাটো অসুখও শিশুর ঘামের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে শিশুর বড় ধরনের কোন অসুখ হয়েছে, এই রকম ধারণায় যাওয়ার আগে রোগের অন্যান্য লক্ষণগুলো সম্পর্কে অবগত হয়ে নিন। শুধুমাত্র ঘামের কারণে কখনই এমন ভাববেন না যে শিশুর বড় ধরনের কোন রোগ হয়েছে।

রাতের বেলায় শিশুদের ঘামানোর বিষয়টা বেশ সাধারণ একটা ঘটনা। ঘুমানোর সময়ে যদি শিশুর গায়ে অতিরিক্ত কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখা হয় তাহলে এর কারণে শিশু অতিরিক্ত গরম অনুভব করতে পারে, আর ফলাফল স্বরূপ ঘামানোটা একদমই স্বাভাবিক।

নবজাতক শিশু ঘুমের মধ্যে খুব একটা নড়াচড়া করে না আর তাই আপনি দেখবেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুকে যেভাবে শোয়াবেন সকালে দেখবেন শিশু একই অবস্থায় আছে। আর এই নড়াচড়া না করার কারণে শিশুর শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। ঠিক এই কারণেই রাতে ঘুমের মধ্যে আমরা বড়রা বেশ নড়াচড়া করি যখন আমাদের গরম লাগে। এই নড়াচড়া করার কারণে আমাদের শরীর ঠাণ্ডা হওয়ার সুযোগ পায়।

বুকের দুধ খাওয়ার সময়েও শিশু অনেক ঘামতে পারে এবং এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। কেননা আপনার শরীরের তাপ শিশুর শরীরকেও গরম করে দেয় এবং ফলাফল স্বরূপ শিশুর মধ্যে ঘাম দেখা যায়।

শিশুর অতিরিক্ত ঘামানো কি স্বাভাবিক ঘটনা?

সবসময় এটা খুব একটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়, কেননা অনেক ধরনের অসুখের কারণেও শিশু প্রতিনিয়ত প্রচুর পরিমাণে ঘামাতে পারে এবং এই অতিরিক্ত ঘামের কারণে শিশু বেশ অস্বস্তি বোধ করতেও পারে।

বিভিন্ন সময়ে আপনার শিশু ঘামাতে পারে এবং তারা মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত ঘামাতেও পারে। তবে আপনার শিশু যদি সবসময়েই অতিরিক্ত ঘামাতে থাকে তাহলে এটা বেশ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

শিশুর ঘাম কমানোর জন্য আপনি কি করতে পারেন?

শিশুকে অতিরিক্ত কাপড় দিয়ে জড়ানো থেকে নিজেকে বিরত রাখুন। এটা কিন্তু শিশুর জন্য খুবই ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে, কেননা শিশুর শরীর যদি অতিরিক্ত গরম হয়ে যায় তাহলে এর কারণে এমনকি  শিশুর মৃত্যুও (সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম) হতে পারে। এছাড়া শিশুর বিছানার চারপাশের দেয়ালে ফোম, কাপড় অথবা অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে রাখবেন না।

সাধারণ তাপমাত্রায় একটা চমৎকার বিছানা এবং একটা সাধারণ চাদরই শিশুর জন্য যথেষ্ট।  এছাড়া শিশুকে সুতির জামা কাপড় পরানোর চেষ্টা করবেন, কেননা এর মধ্য দিয়ে বাতাস আসা যাওয়া করতে পারে। আর তাই গরম কালে সুতির জামা কাপড় শিশুর জন্য বেশ ভালো ও আরামদায়ক।

রুমের তাপমাত্রা নির্ধারণ করে দিন। যদি রুমের তাপমাত্রা নির্ধারণ করার কোন যন্ত্র আপনার কাছে না থাকে তাহলে আপনি ঘরের জানালা খুলে রাখুন যাতে করে ঘরের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে বাতাস আসা যাওয়া করতে পারে।

শিশুকে নিয়মিত ও পরিমাণ মত পানি খাওয়ান, পানি শূন্যতায় শিশুকে ভুগতে দিবেন না। কেননা ঘামানোর কারণে শিশুর শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ মিনারেল, লবণ এবং পানি বের হয়ে যেতে পারে। আর তাই আপনার শিশু যদি শুধুমাত্র বুকের দুধ খায় তাহলে আপনাকে মিনারেল ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।

শিশুকে নিয়ে কখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে?

বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যগত কারণে শিশু প্রচুর পরিমাণে ঘামতে পারে। নিম্নে এমন কয়েকটি অবস্থা সম্পর্কে বর্ণিত হল যেগুলো সম্পর্কে আপনাদের জেনে রাখা খুবই প্রয়োজনীয়। তবে সেগুলো সম্পর্কে বলার আগে আরো কিছু লক্ষণ সম্পর্কে জেনে রাখা ভালো, যেই লক্ষণগুলো আপনার শিশুর অতিরিক্ত ঘামের কারণ হিসেবে ভিন্ন কিছুর দিকে নির্দেশ করে।

  • শিশুর হাত ঘামানো
  • ফ্যাকাসে ত্বক
  • ওজন বৃদ্ধি কমে যাওয়া অথবা একদমই ওজন না বাড়া
  • জ্বর
  • অস্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস যেমন নিঃশ্বাসের সময় শব্দ হওয়া এবং নাক ডাকা
  • নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া অথবা ঘুমের মধ্যে অতিরিক্ত নাক ডাকা

নিম্নে শিশুর অতিরিক্ত ঘাম সম্পৃক্ত কিছু অসুখ সম্পর্কে বর্ণিত হলঃ

Hyperhidrosis: এই ধরনের সমস্যা শিশু প্রচুর পরিমাণে ঘামায় এমনকি রুমের তাপমাত্রা যদি স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে তবুও ঘামায়। এছাড়া আপনি দেখবেন শিশুর ঘামানোর সময় এবং পরিমাণ সম্পর্কে আপনি কোন ধারনাই করতে পারছেন না।

শিশু যত বড় হতে থাকবে ততই তার বগল, পা এবং পিঠ বেশি করে ঘামানো শুরু হবে। তবে আশানুরূপ তথ্য এই যে, এই ধরনের সমস্যায় শিশুর বড় ধরনের কোন ক্ষতি হওয়ার আশংকা নেই এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই ধরনের রোগ সেরে উঠে।

Sleep Apnea: এটা শিশুর স্বাস্থ্যগত এমন একটা সমস্যা যেখানে, শিশু ঘুমের মধ্যে হঠাত করেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয় এবং তার স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাসের মাত্রায় সমস্যা হয়। আর এই ধরনের সমস্যার কারণে শিশু অতিরিক্ত ঘামাতেও শুরু করতে পারে। এছাড়া এই রোগের অন্যান্য লক্ষণগুলোর মধ্যে শিশুর ত্বক ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া অথবা নীল বর্ণ ধারণ করা, নিঃশ্বাসের সময় শব্দ হওয়া এবং নাক ডাকা অন্যতম।

Congenital Heart Disease:  এটা হৃদযন্ত্রের জন্মগত সমস্যা নামেও পরিচিত। এই রোগের অন্যতম লক্ষণ হল শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা, সাধারণ কাজ যেমন খাওয়া এবং খেলার সময় অতিরিক্ত ঘামানো।

Asthma (হাঁপানি): হাঁপানির কারণে শিশুর শ্বাসনালী সংকুচিত হয়ে আসে এবং শিশুর শ্বাস প্রশ্বাসে ব্যাঘাত ঘটায়। এই ধরনের সমস্যায় আপনি দেখবেন আপনার শিশুটি প্রচুর পরিমাণে ঘামাচ্ছে, শ্বাস প্রশ্বাসের সময় শব্দ হচ্ছে, বেশিরভাগ সময় নাক বন্ধ থাকে এবং অনেক জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

Sudden Infant Death Syndrome Or SIDS: এটা এমন একটা ভয়ানক অবস্থা যেটা ঘুমের মধ্যে অতিরিক্ত তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়। ঘুমের মধ্যে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় তাহলে শিশু ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যাবে, আর সে এতই তলিয়ে যাবে যে হয়ত আর কখনো ঘুম থেকে উঠবেই না।

অন্যান্য আরো অনেক কারণেই শিশু অতিরিক্ত ঘামতে পারে, কিন্তু কোন একটা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে অন্যান্য আরো লক্ষণগুলো আপনাকে যাচাই বাচাই করে নিতে হবে। প্রয়োজনে শিশু ঠিক কোন রোগের কারণে এত ঘামাচ্ছে, সেটা নির্ণয়ের জন্য শিশু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করুন। 

এক নজরে শিশুর অতিরিক্ত ঘাম ও তার প্রতিকার

যেহেতু শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা সামান্য কারণেই খুব দ্রুত বেড়ে যায় এবং সাথে সাথেই তারা ঘামতে শুরু করে তাই ছোট শিশুদের জন্য অতিরিক্ত ঘামানোটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। শিশুর শরীরের এই অতিরিক্ত ঘামানোর বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিম্ন বর্ণীত পদক্ষেপগুলো অবলম্বন করতে পারেনঃ

  • অতিরিক্ত কাপড় দিয়ে শিশুকে জড়িয়ে রাখা পরিহার করুন
  • শিশুর বিছানার দেয়ালে অতিরিক্ত কাপড়, কুশন ইত্যাদি দিবেন না, এতে করে বিছানার মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে বাতাস আসা যাওয়া করতে পারবে।
  • শিশুর রুমের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখুন
  • শিশুকে সঠিকভাবে জামা কাপড় পরিধান করান
  • শিশু যাতে পানি শুন্যতায় না ভুগে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন

এই পদক্ষেপগুলো মাধ্যমে আপনার শিশুর অতিরিক্ত ঘাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। উপরে বর্ণীত সবগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরেও যদি আপনার শিশু অতিরিক্ত ঘামাতে থাকে, এমনকি স্বাভাবিক তাপমাত্রার মধ্যেও তাহলে দ্রুত শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। মনে রাখবেন, কোন অবস্থাতেই খুব বেশি আতংকিত হবেন না এবং শান্ত থেকে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts