শিশুর ঘামাচি (Prickly heat) সারাতে ট্যালকম পাউডার কি আসলেই কাজ করে ?

টিভিতে প্রায়ই উপমহাদেশের বিখ্যাত এক নায়ককে দেখা যায় একটি পাউডারের বিজ্ঞাপনে বলছেন ‘ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা -কুল কুল’ -ভাবছি ফ্যান আর এসি কোম্পানিগুলো তাদের এতো বড় লস কেমনে সামলাবেন ! বিজ্ঞাপনের দেখানো হয় একজন ফিটফাট বাবু সাধারন পাউডার মেখে গরমে কেমন নাস্তানাবুদ হচ্ছে, অন্যদিকে আরেকজন স্মার্ট ব্যাক্তি ‘ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল’ পাউডারটি মেখে প্রচণ্ড গরমে কেমন বরফ-শীতল হাওয়া উপভোগ করছেন।  

এদিকে এই বিজ্ঞাপন দেখে আমরাও মহা উৎসাহে কেউ এই ‘কুল কুল’ পাউডার কিংবা কেউ বা অন্যান্য বিভিন্ন ধরণের ব্র্যান্ডের পাউডার নামক এক ধরণের গুঁড়ো কিনে প্রচন্ড দাবদাহে ‘কুল’ থাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টা অব্যহত রাখছি। শুধু বড়রাই নয়, ছোটদের কোমল ত্বককেও আমরা বিভিন্ন ক্যমিক্যাল সমৃদ্ধ এসব প্রসাধনী থেকে রেহাই দিচ্ছি না।

অবশ্য যে অঞ্চলে হরলিক্স কে হেলথ ড্রিংকস বলা হয় আর বাচ্চার বেড়ে ওঠার প্রয়োজনীয় পুষ্টি খাবার থেকে না পেলে কোন টেনশান না করে হরলিক্স গিলিয়ে যেতে বলা হয়, সেই অঞ্চলে ঘামাচির জন্য পাউডার ব্যবহার করতে বললে দোষ বেশি হয় না। বিশেষ করে আমাদের এই উপমহাদেশে -যেখানে বিজ্ঞাপন প্রচার নীতিমালা এখনো তেমন সমৃদ্ধ নয়।

প্রতিবছর গরম আসলেই ফেইরীল্যণ্ডের মা-বাবারা বলতে থাকেন, ‘ঘামাচির জন্য কোন ব্র্যান্ডের পাউডার ভালো হবে?’ কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করেন, ‘এতো পাউডার দিচ্ছি, ঘামাচি আবার উঠে কেনো?’ ।

অনেকবার এ বিষয়ে আলোকপাত করেছিলাম, মায়েদের নিরুৎসাহিত করে। কিন্তু প্রশ্ন শেষ হয় না। পরবর্তীতে ঠিক করলাম এটা নিয়ে বিস্তারিত লিখেই ফেলি। শুরু করলাম পড়াশোনা, বেশীরভাগ এক্সপার্ট এবং ডাক্তাররা ঘামাচির জন্য ট্যল্ক কিংবা ঘামাচি পাউডার ব্যবহারের বিপক্ষে কথা বলেছেন। গরমে পাউডার ব্যবহারের প্রবণতা যেহেতু এদিকার মানুষের মধ্যেই বেশি দেখা যায়, এই অঞ্চলের মানুষের উপর করা রিসার্চ এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক এক্সপার্টদের মন্তব্যগুলোতেই জোর দিয়েছি বেশি।

ইন্ডিয়ান ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় ডঃ গীতা মাথাই’র একটি বেশ তথ্যবহুল হেলথ-আর্টিকেল থেকে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য পেলাম, যার কিছুটা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো এই লেখায়।   

শিশুর ঘামাচি কি? 

ঘামাচি নিয়ে যেহেতু মাথা ঘামচ্ছি, প্রথমেই আসি ‘ঘাম কি’ এই প্রসঙ্গে- আমাদের শরীর বেঁচে থাকার জন্য তার নিজস্ব নিয়মে গড়ে ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) আভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বজায় রাখে। এবং এই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য শরীরের রোমকূপ দিয়ে যে তরল নির্গত করে সেটাকেই আমরা ঘাম বলি।

আশেপাশের তাপমাত্রা যখন বেশি গরম হয়ে যায়, আমাদের চামড়ার নিচের ঘামের গ্রন্থি থেকে তরল নির্গত হয়ে শরীরের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। তাই মায়েদের বলছি, গরমে বাচ্চা ঘেমে গেলে খুব ভীত হবার কিছু নেই, এটি খুব স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। শুধু খেয়াল রাখতে হবে   ঘেমে যাবার পর ঘাম থেকে ঠাণ্ডা লেগে যাচ্ছে কিনা কিংবা অতিরিক্ত ঘেমে যাবার কারনে পানিশূন্যতার লক্ষন দেখা যাচ্ছে কিনা।  

আর এই ঘাম থেকে ঘামাচির উৎপত্তি। ঘামাচি মানুষের খুব সাধারণ একটি ত্বক-জনিত সমস্যা এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে , শরীরের যেসব জায়গার ঘাম সহজে শুকিয়ে যায় না, বেশ কিছুক্ষণ ত্বকেই থাকে সেসব স্থানে ছোট ছোট, লালচে র‍্যাশ দেখা যায়।  বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কপাল, পিঠ কিংবা বুকে ঘামাচি বেশি উঠতে দেখা যায়।

অনেক সময় শরীরের বিভিন্ন ভাজেও ঘামাচি দেখা যায়। ঘামাচি হলে, জায়গাটিতে অস্বস্তি আর চুলকানি হয় যা কষ্টকর। কিন্তু এটি তেমন ক্ষতিকর সমস্যা নয়, নিজে থেকেই সেরে যায়। ঘামাচি থেকে সহজে এবং দ্রুত পরিত্রাণের উপায়ও লেখার পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হয়েছে।  

ঘামাচির অংশটি চুলকালে কিংবা তেল বা পাউডার জাতীয় কিছু ব্যাবহার করলে অবস্থার অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে বেশি চুলকালে, অনেক সময় হাতের নখ কিংবা আশেপাশের ধুলাবালি থেকে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হতে পারে, ফলশ্রুতিতে পুঁজ হতে পারে। কিংবা কারো কারো জ্বরও আসতে পারে। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের  পরামর্শ নিন।

ট্যালকম পাউডার ঘামাচি সারায় না, বরং বিভিন্ন ক্ষতির কারণ হতে পারে

বেশীরভাগ ব্র্যান্ডের বেবি পাউডার ট্যাল্কই হয়, আর ট্যাল্ক বিভিন্ন খনিজ উপাদান এবং কিছু রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি খুব সূক্ষ্ম গুঁড়ো যা সাধারণত ঘর্ষণ প্রতিরোধে কিংবা  কিছুকে মসৃণ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। আদতে, ঘামাচি ভালো করার সাথে কিংবা গরম কমানোর সাথে এই উপাদানগুলোর কাজের কোন সম্পর্ক নেই।

অন্যান্য বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হলেও, আমাদের শরীরের জন্য ট্যাল্ক হতে পারে মারাত্মক হুমকিস্বরূপ , কারণ বেশীরভাগ ট্যাল্কেই এমনকি বেবী পাউডারেও থাকতে পারে অ্যাসবেসটস (asbestos) নামক একটি উপাদান, যেটি হতে পারে ক্যান্সারের উল্লেখযোগ্য একটি কারণ।

আর সবচেয়ে বড় কথা , ঘামাচি প্রতিরোধের মূল শর্ত যেখানে শরীরের রোমকূপগুলোকে খোলা রাখা যেন ঘাম জমে না থেকে বেরিয়ে যায়, সেখানে পাউডার দিলে কয়েক মিনিটের জন্য ত্বকে আরাম অনুভূত হলেও, প্রকৃতপক্ষে এগুলো কিছুক্ষণ পর রোমকূপ-গুলোকে বন্ধ করে দেয়, যা ঘামাচি সারানোর পরিবর্তে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

ট্যাল্ক আরো কিছু স্বাস্থ্য-ক্ষতির কারণ হতে পারে, পাউডারের মিহি গুঁড়ো খুব সহজেই মানুষের নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে পৌঁছে যেতে পারে, এবং নিউমোনিয়া, প্রদাহ এবং শ্বাস-যন্ত্রের অন্যান্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

তাই, বাড়ির শিশু যখন পাউডারের ডিব্বা হাতের কাছে পেয়ে খেলতে থাকে, কিংবা নিজের সারা মেখে গায়ে ঢেলে ছোট্ট একটা সাদা ভুত হয়, তখন ফোনের ক্যামেরা অন করে ‘কি কিউট’ ধরণের ছবি না তুলে, তাৎক্ষনিকভাবে পাউডারের ডিব্বা বাজেয়াপ্ত করুন, এবং পাউডার কিংবা পাউডার জাতীয় মেক-আপের সরঞ্জাম শিশুর হাতের নাগালের বাইরে রেখে দিন।  

শিশুর ঘামাচি প্রতিরোধে করণীয় কি? 

এবার আসল কথায় আসি, কিভাবে গরমে আমাদের ছোট্ট সোনামণিদের ঘামাচি থেকে বাঁচানো যায় কিংবা ঘামাচি হলেও দ্রুত পরিত্রান পাওয়া যায় –      

খোলামেলা জায়গায় রাখতে হবে, যেখানে প্রচুর বাতাস চলাচল করতে পারে। শহুরে জীবনে এমনটা সম্ভব না হলে, অন্তত ফ্যান, এসি ইত্যাদির সাহায্য নিয়ে হলেও বাতাস চলাচল এবং তাপমাত্রা নিজেদের সাধ্যমত নিয়ন্ত্রন করতে হবে।

প্রচণ্ড দাবদাহে , কিংবা অতিরিক্ত ঘামাচির সবচেয়ে উপকারী বন্ধু পানি এবং গোসল। গোসলের ফলে জমে থাকা ঘাম এবং মৃত কোষ সরে যায়, যার ফলে, রোমকূপগুলো পরিষ্কার থাকে, দ্রুত ঘামাচি সারে আর বাচ্চাও আরাম পায়। 

বাচ্চাকে আপনি দিনে ২ থেকে ৩ বার গোসল করাতে পারেন, তবে খেয়াল রাখবেন গোসলের পানি যেন একই ধরণের তাপমাত্রার হয়, আপনার শিশু যদি নরমাল পানিতে গোসল করে থাকে, তাহলে সেটাই দিবেন, আর যদি কেউ হাল্কা গরম পানি (বিশেষ করে বেশি ছোট বাচ্চার ক্ষেত্রে ) ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে প্রতি গোসলে একই রকম দিবেন, আর অল্প সময়ের মধ্যেই সেরে ফেলবেন, চুল লম্বা হলে বার বার চুল ভেজাবেন না, শুধু গা ধুয়ে মাথা তা একটু মুছিয়ে দেবেন।

গোসলের পাশাপাশি মাঝে মাঝে শরীর স্পঞ্জও করে দিতে পারেন। তবে ঘামাচিতে ঘষা জেন না লাগে খেয়াল রাখতে হবে। ঘষা খেলে কিংবা চুলকালে ইনফেকশান হয়ে যেতে পারে।    

প্রচুর পানি এবং তরল খাবার নিশ্চিত করুন। ঘামাচি ছাড়াও সুস্থ ত্বকের জন্য প্রচুর তরল আবশ্যক।  নবজাতককে ঘন ঘন মাতৃদুগ্ধ পান করাবেন , ছয় মাস পর্যন্ত এটিই পানিশূন্যতা প্রতিরোধে এবং অন্যান্য শারিরিক সমস্যার একমাত্র সমাধান।

স্কুলগামী শিশুর স্কুল ড্রেস প্রতিদিন ধোওয়া খুব জরুরী।

গরমে সুতির নরম কাপড় ব্যাবহার করতে হবে, আজকাল বেশিরভাগ সুতি কাপড় বলে পরিচিত কাপড় প্রকৃতপক্ষে পলিস্টার মিশানো সুতি হয়। যার ফলে সুতি কাপড়ের মত সহজে বাতাস ত্বকে পৌছুতে পারে না। শিশুকে ঘেমে যাওয়া মাত্রই কাপড় বদলে দিন।

চাদর, বালিশ কাভার ইত্যাদি নিয়মিত ধুয়ে রোদে দিন।

রৌদ্রালোক ভালো, কিন্তু শিশুদের কড়া রোদে নেয়া থেকে বিরত থাকুন।

খুব জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাচ্চাদের বাড়ীর বাইরে কিংবা যানজটপূর্ন রাস্তায় না নেয়াই ভালো।  

কেমিক্যাল নির্ভর কস্মেটিক্স যথাসম্ভব বর্জন করুন – পাউডার, তেল, তৈলাক্ত ক্রিম বা লোশান  প্রয়োগ করবেন না। বিশেষ করে টেলিভিশনের মনমাতানো বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হবেন না।

মনে রাখবেন, অন্যান্য র‍্যাশ আর ঘামাচির র‍্যাশ কিন্তু এক না, আর এদের ট্রিটমেন্টও আলাদা। তাই অন্যান্য র‍্যাশের ওষুধ কিংবা কসমেটিকস ঘামাচির উপর প্রয়োগ করবেন না।

ঘামাচি খুব বেড়ে গেলে, অস্বাভাবিক কিছু মনে হলে কিংবা ইনেফেকশান হয়ে গেলে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।   

ঘামাচি কিংবা ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা কিংবা চুলকানি থেকে আরামের কিছু প্রাকৃতিক উপাদান হতে পারে নিম পাতা এবং আলোভেরা। আজকাল নিজের বাড়ির বারান্দায় কিংবা ছাদেও এসব গাছ লাগিয়ে নিয়ে পারেন। নিম গাছের জন্য একটু বড় পাত্র লাগলেও , অ্যালোভেরা খুব ছোট টবেও হয় ।

যথাসম্ভব প্রাকৃতিক জিনিস ব্যবহার করুন আর এই দূষণ আর ক্যামিকেলময় পৃথিবীতে বাঁচার যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য শিশুদের তৈরি করুন ।

সবার জন্য শুভকামনা।   

ফেইরীল্যান্ডের নিজস্ব লেখা, অনুমতি ব্যাতিত কপি করবেন না। লিঙ্ক শেয়ার করুন, সৎভাবে বাঁচুন ।    

Related posts