শিশুর ক্লাবফুট বা বাঁকা পায়ের পাতা

ক্লাবফুট বা মুগুর পা কিংবা বাঁকা পায়ের পাতা (talipes equinovarus নামেও ডাকা হয়) শিশুর এক ধরণের জন্মগত ত্রুটি। জন্মগত ত্রুটি শিশুর শরীরের এক ধরণের সমস্যা যা শিশুর জন্মের সময় থেকেই দেখা যায়।

এই ত্রুটি শিশুর এক বা একাধিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন ও কার্যকলাপে সাময়িক কিংবা স্থায়ীভাবে প্রভাব ফেলে। শিশুর স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলার পাশাপাশি শিশুর পুরো শরীরের গঠন ও বিকাশেও প্রত্যক্ষ ও বড় ধরণের প্রভাব ফেলে।

আপনার শিশু ক্লাবফুট নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে তার একটি পা কিংবা উভয় পা-ই ভিতরের দিকে বা নীচের দিকে বাঁকানো থাকবে। হাড়ের সাথে মাংসের সংযোগ ঠিকঠাক রাখতে টেন্ডন নামক একধরণের টিস্যু কাজ করে। টেন্ডনের দৈর্ঘ্য স্বাভাবিকের চেয়ে কম হলে পায়ের এ ধরণের বিকৃতি দেখা যায়। এছাড়াও শিশুর পায়ের হাড়, জোড়ার হাড় কিংবা মাংসের কোন সমস্যার কারণেও ক্লাবফুট হতে পারে।

ক্লাবফুট সারা বিশ্বেই বেশ পরিচিত এক জন্মত্রুটি। আমেরিকায় প্রতিবছর ১০০০ শিশুর মধ্যে একজন ক্লাবফুট নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

শিশুর ক্লাবফুট কেন হয়?

সত্যি বলতে, ক্লাবফুট কেন হয় তার কোন সুনিশ্চিত উত্তর নেই, এর প্রতিরোধও নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে শিশুর ক্লাবফুট হবার সম্ভাবনা বেশী থাকে। যেমন –

আপনার ছেলে শিশু হলে। মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের ক্লাবফুট হবার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ।

আপনার শিশুর অন্য কোন জন্মত্রুটি থাকলে যেমন সেরিব্রাল পালসি কিংবা স্পিনা বিফিদা প্রভৃতি।

আপনার পরিবারের কারোর পূর্বে ক্লাবফুটের ইতিহাস থাকলে। যদি আপনার, আপনার সঙ্গীর অথবা আপনার আগের কোন শিশুর ক্লাবফুট থাকে, সেক্ষেত্রে আপনার শিশুর ক্লাবফুট হয়ে জন্মানোর ঝুঁকি বেশী থাকে।

যদি আপনার ইতোমধ্যে একজন সন্তান থাকে যে ক্লাবফুট নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, সেক্ষেত্রে আপনার পরবর্তী শিশুরও ক্লাবফুট নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি প্রায় ৪% বেড়ে যায়। এ বিষয়ে আপনি একজন জেনেটিক কাউন্সিলরের সাথে কথা বলতে পারেন। জেনেটিক কাউন্সিলর একজন জেনেটিক্স বিশেষজ্ঞ যিনি পারিবারিক জন্মত্রুটি বা বিভিন্ন পারিবারিক অসুখ-বিসুখ সম্বন্ধে প্রশিক্ষিত।

গর্ভাবস্থায় আপনার ‘অলিগোহাইড্রামনিওস‘ হলে। শিশু গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় এক বিশেষ তরল পদার্থে ঘেরা থাকে, এই তরলকে এমনিওটিক তরল বলা হয়। যথেষ্ট এমনিওটিক তরলের অভাব হলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

আপনার কোন ইনফেকশন থাকলে অথবা মাদক সেবন কিংবা ধূমপান করলে। গর্ভাবস্থায় মাদক সেবন ও ধূমপান শিশুর জন্যে অত্যন্ত ক্ষতিকর।

ক্লাবফুট শিশুর কি ধরণের সমস্যা সৃষ্টি করে?

হালকা থেকে ভয়ানক – ক্লাবফুট বিভিন্ন মাত্রার হয়ে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, এটা ব্যাথা করে না, শিশু দাঁড়ানো কিংবা হাঁটতে শুরু করার আগ পর্যন্ত সে তেমন কোন সমস্যারও মুখোমুখি হয় না। তবে যদি এর চিকিৎসা না করা হয়, শিশুর হাটতে খুবই সমস্যা হবে।

সে হয়তো পায়ের এক পাশের উপর ভর দিয়ে হাটবে, এমনকি পা যদি বেশী বাঁকা হয়, সেক্ষেত্রে পায়ের পাতার বদলে পায়ের উপরের দিকে ভর দিয়ে হাটবে। এই অস্বাভাবিক হাঁটার ফলে শিশুর পায়ে ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকে, পায়ের চামড়া পুরু ও শক্ত হয়ে যায়।

দ্রুত ক্লাবফুট নিরাময় না করা গেলে আর্থ্রাইটিস অর্থাৎ বাতের ব্যাথার ঝুঁকি থেকে যায়। এতে শরীরে জোড়ায় জোড়ায় স্বল্প ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যাথা, শক্ত হয়ে যাওয়া, ফুলে যাওয়া প্রভৃতিও দেখা যেতে পারে।

কিভাবে ও কখন বুঝবো শিশু ক্লাবফুট নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে কি না?

শিশুর জন্মের পরপরই তার যে প্রাথমিক চেকআপ হয়, মূলত সেখানেই ক্লাবফুট কিংবা পায়ের পাতার কোন সমস্যা থাকলে সেটা ধরা পড়ে। আপনার ডাক্তার শিশুর পায়ের এক্স-রে করলে, তখনও ধরা পড়ে ক্লাবফুট।

কখনো কখনো সনোগ্রাম বা আল্ট্রাসাউন্ড টেস্টের মাধ্যমে শিশুর জন্মের আগেই জানা যায় শিশুর ক্লাবফুট আছে কি না। আল্ট্রাসাউন্ড টেস্টে মায়ের গর্ভে সাউন্ড ওয়েভ প্রদানের মাধ্যমে গর্ভের বর্তমান অবস্থার ছবি পাওয়া যায়। তবে শিশু জন্ম না নেওয়ার আগ পর্যন্ত এর নিরাময়ের কোন উপায় নেই। তবে ক্লাবফুট আছে এটা আগে থেকে জানা থাকলে এর চিকিৎসা প্ল্যান নিয়ে আপনি একটু আগে থেকেই সচেতন থাকতে পারবেন।

ক্লাবফুটের চিকিৎসা কিভাবে করা যায়?

একজন হাড় নিয়ে বিশেষজ্ঞ অর্থোপেডিক সার্জন শিশুর ক্লাবফুটের প্রকৃত অবস্থা এবং এর চিকিৎসা সম্বন্ধে আপনাকে সহযোগিতা করতে পারেন। আগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্লাবফুট সারানোর জন্যে অস্ত্রোপচার করানো হোতো। তবে এখন অস্ত্রোপচার ছাড়াই কিন্তু এর অধিকাংশের সমাধান সম্ভব।

চিকিৎসা যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যায়, ততই শিশুর জন্যে মঙ্গল- হতে পারে সেটা শিশুর ১ সপ্তাহ বয়স থেকেই। তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হলে, শিশু দ্রুতই জুতা পড়তে, হাটতে অর্থাৎ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে।

নিম্নোক্ত উপায়সমূহের মাধ্যমে ক্লাবফুটের চিকিৎসা করানো যায়:

স্ট্রেচিং(Stretching), কাস্টিং(Casting) করা (Ponseti method)

ক্লাবফুট নিরাময়ের অতিপরিচিত এবং সর্বজনীন চিকিৎসা এটি। একে ‘পনসেটি মেথড’ও বলা হয়ে থাকে। শিশুর দু’সপ্তাহ বয়স থেকেই এই চিকিৎসা শুরু করা যায়। এই পদ্ধতিতে, আপনার ডাক্তার শিশুর বাঁকা পা-কে টেনে সঠিক পজিশনে নিয়ে আসেন এবং পা কে একটি কাস্টের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেন।

কাস্ট-টি শিশুর পায়ের তালু থেকে রানের উপরিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। প্রতি ৪ থেকে ৭ দিন পর পর ডাক্তার কাস্টটি খুলে ফেলেন, বাঁকা পা’টিকে সঠিক পজিশনের কাছাকাছি নিয়ে এসে আবার কাস্ট করে দেন।

শিশুকে তার শেষ কাস্টটি লাগানোর আগে, ডাক্তার শিশুর পায়ের হিল কর্ড খানিকটা কেটে ফেলে দিতে পারেন। হিল কর্ড হলো সেই টেন্ডন যা শিশুর গোড়ালির সাথে হাটুর নিচের মাংসপেশীর সংযোগ স্থাপন করে। বাড়তি হিল কর্ড কেটে দেয়া হয় যাতে কাস্টটি পুরোপুরি খুলে ফেলার আগে তা বেড়ে স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যে আসতে পারে।

এই পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি দুই থেকে তিন মাস ধরে সম্পন্ন করতে হয়। এর পর ধীরে ধীরে শিশুর পা নিয়মিত টেনে টেনে সঠিক পজিশনে নিয়ে আসার অনুশীলনের মাধ্যমে শিশুর পা ঠিকঠাক রাখা যায়। এছাড়াও শিশুর হয়তোবা কয়েক বছরের জন্য বিশেষ কোন জুতা কিংবা রাতে বিশেষ ব্রেস বা বন্ধনী পরিধান করা লাগতে পারে।

টেনে সোজা করা, ট্যাপ ও স্প্লিন্ট লাগানো (Stretching, taping and splinting)

এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে, শিশুর ডাক্তার শিশুর পা-কে টেনে স্বাভাবিক পজিশনের কাছাকাছি এনে বিশেষ টেপ ও স্প্লিন্টের মাধ্যমে বেঁধে রাখেন। এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে ফ্রেঞ্চ মেথডও বলা হয়। শিশুর জন্মের পরপরই এই চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।

শিশুর দুই মাস বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং এর পর ২/৩ দিন বিরতি দিয়ে ছয় মাস পর্যন্ত এ চিকিৎসা চালু রাখতে হয়। এর পর থেকে শিশুকে নিয়মিত স্ট্রেচিং অনুশীলন এবং রাতে স্প্লিন্ট পড়িয়ে রাখার মাধ্যমে শিশুর পা-কে সঠিক পজিশনে রাখা হয়, যতদিন না পর্যন্ত শিশু হাটতে শেখে।

অস্ত্রোপচার (Surgery)

শিশুর ক্লাবফুট যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে থাকে, এবং স্ট্রেচিং প্রক্রিয়ায়ও পা সোজা না হয়, সেক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্লাবফুট ঠিক করা যায়। সেক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি পারা যায়, অর্থাৎ শিশু হাঁটতে শেখার আগেই অস্ত্রোপচার করিয়ে ফেললে ভালো।

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হিল কর্ডের পাশাপাশি পায়ের অন্য কোন সমস্যা থাকলে সেগুলোও সারিয়ে ফেলা যায়। অস্ত্রোপচারের পর, শিশুর পা-কে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের মত কাস্ট এর ভিতর রাখা লাগতে পারে।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর বো লেগ (Bow-leg) বা বাঁকা পা ]

অজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষই একে চিকিৎসার অযোগ্য একটি ভাগ্যের পরিহাস বলে মনে করে। ফলে অনেক শিশুরই চিকিৎসা আর হয়ে উঠে না। চিকিৎসার অভাবে এ সমস্যা শিশুটির সারা জীবনের জন্য খারাপ পরিণাম বয়ে আনে। উন্নত বিশ্বের কোন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ক্লাবফুট নিয়ে হাঁটতে দেখা যায় না। কারণ তারা শৈশবেই শিশুদের চিকিৎসা করিয়ে ফেলে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts