শিশুর সামনে ঠিক তেমনই আচরণ করুন যা আপনি ওর কাছ থেকে দেখতে চান

শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। ওদের সামনে যে যেটা করে ওরা ঠিক সেটাই অনুকরণ করে থাকে। তাই আপনি ওদের সামনে যাই করবেন খানিকক্ষণ পরে দেখবেন ওরা সেটাই করছে। খুব চাপে পরলে আপনি কি করেন, কেমন করে অন্যদের সাথে ব্যাবহার করেন, অথবা নিজের আনন্দ, রাগ কি করে প্রকাশ করেন এসব কিছুই কিন্তু আপনার ছোট্ট শিশুটি দেখছে আর শিখছে।

মাটি যেমন করে পানি শুষে নেয়, আপনার শিশু ঠিক তেমন করেই আপনার যাবতীয় ব্যাবহার ওর মনের মধ্যে নিয়ে নেয়। মনোযোগ দিক বা না দিক, ও কিন্তু আপনার সব কিছুই খেয়াল করছে।

শিশু দেখে, শেখে এবং জীবনে প্রয়োগ করে 

সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুসারে, অন্যেরটা দেখেই মানুষ শেখে। আর শিশুদের বেলায় তো এটা আরও সত্য। শিশু মনোবিজ্ঞানের একটি অন্যতম জনপ্রিয় পরীক্ষার নাম “বো বো পুতুল পরীক্ষা”। এতে দেখা যায়ে যে একটা খেলনা পুতুলের সাথে বড়রা যেমন ব্যাবহার করে, শিশুরা সেটা দেখে এবং ঠিক সেই ব্যাবহারটাই করে।

পুতুলটার সাথে যখন খুব খারাপ ব্যাবহার করা হয়েছে তখন ছোটরাও তার দেখাদেখি পুতুলটার সাথে দুর্ব্যাবহার করেছে। অন্যদিকে, যখন পুতুলটাকে কেউ আদর করেছে ছোটরাও ঠিক তাই করেছে।ওদের এই অনুকরণ প্রবণতা বুঝতে আসলে খুব বেশি গবেষণার দরকার পরেনা। মা বাবার দেখাদেখি আপনার শিশুটিও দেখবেন রান্না, পেপার পড়া, বা ঘর গোছগাছের চেষ্টা করছে।

মনে রাখবেন ছোটরা যা শোনে সেটাই বলে, আর সেটাই করে যা ওরা দেখে।

নিজের অজান্তেই শিশুকে ভুল কিছু শেখানোর ব্যাপারে সাবধান থাকুন

কখনো কখনো আমরা নিজের অজান্তেই শিশুদের সামনে ভুলে কিছু আচরণ করে থাকি যা ওদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তাই মা বাবা হিসেবে একটু সতর্ক থাকা দরকার যেন এমনটা শিশুর সামনে না হয়। নিচে তেমনই কিছু উদাহারন তুলে ধরা হোল-

  • শিশুর ভুল বয়স বলে কোন রেস্টুরেন্ট বা পার্কে বিশেষ সুবিধা নেয়াটা ঠিক নয়। বিশেষ করে শিশুর সামনে এমনটা করা একেবারেই উচিত নয়। এ কাজটা আমরা প্রায় সময় করি যখন বিমানের টিকেট কাটি।এতে ওরা মনে করবে যে প্রয়োজনে মিথ্যা বলাই যায়।
  • নিজে টিভির সামনে বসে থেকেও শিশুকে এর অপকারিতা সম্পর্কে নিয়মিত বলা বা তাকে টিভি না দেখে পড়তে বসতে বলাটা প্রতিটি ঘরেই হয়। এতে করে ওদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী মনভাব তৈরি হতে পারে।
  • শিশুকে আমরা সবাইকে সম্মান দেয়ার কথা বলি কিন্তু তার সামনেই টিভিতে বা সংবাদপত্রে দেখানো অন্যের বাহ্যিক চেহারা ও গঠন নিয়ে প্রায় সময় বিরূপ মন্তব্য করি। এটাও উচিত নয়।
  • ওদের সামনে কোনরকম দাম্পত্য সমস্যা নিয়ে উত্তেজিত হবেন না। এটা ওদের মনে অনেক কঠিন দন্দের সৃষ্টি করে।
  • আপনার বাচ্চাকে কোন কিছু করতে বারন করলে চেষ্টা করুন সেই কাজটা যেন আপনিও ওদের সামনে না করেন। যেমন আপনি হয়তো বাচ্চাকে মুখে বা নাকে হাত দিতে বারণ করেন কিন্তু দেখা যায় আপনি নিজেই সে কাজটা মনের অজান্তে তার সামনে করতে থাকেন।
  • আমরা আমাদের বাচ্চাদের বলি সবার সাথে দয়ালু আচরন করতে কিন্তু আমরাই দেখা যায় ছোটখাটো বিষয়ে বাসার কাজের লোক বা দোকানদারের সাথে চিৎকার করতে থাকি।
  • বাচ্চাকে সবসময় স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ আমরা সবাই দেয়। কিন্তু আমরা তাদের সামনে নিজেরাই সেটা মেনে চলিনা। যেমন- বাচ্চাকে আপনি হয়ত চিপস খেতে নিষেধ করেন, কিন্তু আপনি নিজেই হয়তো তার সামনে সেটা খান এবং তাকে বলেন বড়রা খেতে পারে”।
  • বাচ্চাকে আমরা শেখায় শেয়ার করতে বা দানশীল হতে, কিন্তু আমার নিজেরাই কখন এসব কাজ করিনা।

শিশুর সামনে নিয়ম মেনে চলুন

এটা সত্যি যে আজকের এই ব্যাস্ত জীবনে সবসময় শিশুর সামনে সঠিক ভাবে সব কিছু করাটা খুবই দুরূহ। কিন্তু আপনার বাচ্চার ভবিষ্যতের জন্য এটা খুবই জরুরী। সারাদিন না হলেও অন্তত যখনই ওদের সামনে থাকবেন চেষ্টা করুন সবকিছু সঠিক ভাবে করতে।

নিজেদের প্রয়োজনেই অনেক সময় আমরা অনেক সময় নিয়ম থেকে সামান্য হলেও সরে গিয়ে একটু আধটু বেনিয়ম করে ফেলি। কিন্তু একটা বাচ্চা এটা বুঝবে না। ও ভাববে যে চাইলেই নিয়ম ভাঙ্গা যায়। অফিসে অসুস্থ বলে ছুটি নিয়ে দিব্যি সবার সাথে ঘুরতে গেলে সেটা যত আনন্দেরই হোক না কেন, আপনার ছোট্ট বাচ্চাটা কিন্তু ঠিকই শিখে নিল যে মিথ্যা বলে কাজ ফাকি দিয়ে আনন্দ করা দোষের কিছু নয়।

তাই পরিবারের সবচেয়ে ছোট্ট সদস্যটির জন্য হলেও নিয়ম মেনে চলতে চেষ্টা করুন। এটা আপনারই দায়িত্ব ওকে শেখানো যে নিয়ম মেনে চললে জীবন থাকে গোছানো আর নিরাপদ।

কখনো কখনো নিয়মের ব্যাতিক্রম হতে পারে

মানুষের জন্য নিয়মকানুন, নিয়মকানুনের জন্য মানুষ নয়। এটাও কিন্তু আপনার শিশুকে শেখানো জরুরী। কখনো কখনো নিজের বা অন্যের জন্য নিয়মের ব্যাতিক্রম হতে পারে। কিন্তু এটা অবশ্যই আপনার শিশুকে বুঝিয়ে দিতে হবে।

ব্যাতিক্রম যে সব সময় চলতে পারবে না সেটাও ওকে পরিস্কার করে বলতে হবে। কারো চেষ্টাকে উৎসাহিত করতে এক-দুবার তার ভুলগুলো উপেক্ষা করা যায়। কিন্তু সেটা সবসময় নয়। এধরনের পরিস্থিতি শিশুকে খুব পরিস্কার করে বুঝিয়ে বলতে হবে।

যেমন ধরুন কেউ আপনার জন্য কিছু একটা রান্না করলো কিন্তু তা অতিশয় বিস্বাদ হওয়াতে আপনি তা খেলেন না। কিন্তু সে ব্যাক্তিকে আপনি বললেন খাবার খুব মজা হয়েছে। এই যে মিথ্যা আপনি বললেন সেটাও আপনার বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলাটা জরুরী। তাকে বলুন যে সবার সাথে সদয় আচরণ করাটাও গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন কিছু সেখাতে চাইলে শুধু বলে নয় সাথে দেখিয়ে দিন

নিজের কাপড় গুছিয়ে রাখা বা ঘুম থেকে উঠে বিছানা ঠিক করা, এসব কিছু আপনার শিশুকে শেখাতে চাইলে ওকে হাত ধরে দেখিয়ে দিন। দেখবেন বার বার মুখে বলার চেয়ে একবার দেখিয়ে দেয়া অনেক বেশি কাজে দিয়েছে।

শিশুকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য সঠিক নির্দেশনা দিতে চাইলে ওকে বলে নয় হাতে ধরে দেখিয়ে দিতে হবে। সামাজিক বা ব্যাক্তিগত যে কোন ধরনের বিকাশের জন্য এই জীবনমুখী শিক্ষা ওর জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts