ঘরের কাজে শিশুকে কেন অভ্যস্ত করবেন | কিভাবে করবেন

Spread the love

আপনি হয়ত ভাবছেন আপনার ছোট্ট শিশুটির এখনো ঘরের কাজ করার বয়স হয়নি, এই বয়সটা শুধুমাত্র খেলার বয়স! তবে আপনি কি জানেন, এই খেলার ছলেই ঘরের টুকিটাকি কাজ করার অভ্যাস তৈরি করতে পারলে শিশু অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে?

বড়দের করা কাজ আর শিশুদের করা কাজের মধ্যে পার্থক্য হলো একটি শিশু কখনই একদম পারফেক্ট ভাবে কোন কাজ করতে পারবে না। আর আপনার করনীয় হল, এক্ষেত্রে শিশুকে চাপ না দেয়া। শিশুকে কাজ করতে দেয়ার মানে কিন্তু এই নয় যে, আপনার ঘরের কাজে সাহায্য করা! এর মূল লক্ষ্য হলো তাকে আত্মবিশ্বাসী এবং স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা।

বিজ্ঞাপণ

ঘরের টুকিটাকি কাজ থেকে শিশু কি শিক্ষা পায়?

আজকের ছোট্ট শিশুটি কিন্তু সবসময় ছোট থাকবে না, সে প্রতিনিয়তই বড় হচ্ছে। আর এই বড় হওয়ার প্রতিটি ধাপে তাকে জীবনে চলার জন্য উপযোগী অনেক কিছুই শিখে নিতে হচ্ছে। আর সেই শেখার প্রথম ধাপটি হলো ঘরের সামান্য কিছু কাজ করা। কেননা এর মাধ্যমে নিজের কাজ নিজে করা থেকে শুরু করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, রান্না সহ অনেক কিছু সম্পর্কেই শিশু একটি প্রাথমিক ধারণা পেতে পারে। এই ধরণের টুকিটাকি কাজ শিশুর মধ্যে আরো অনেক গুণাবলীর প্রকাশ ঘটায়। যেমনঃ

দায়িত্বশীল ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলে

টুকটাকি কাজ করার মাধ্যমে শিশু দায়িত্বশীল এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে। ঘরের যে কাজগুলো তার নিজের বা যেকাজ গুলো সরাসরি তার সাথে জড়িত, যেমন- তার কাপড় ভাঁজ করে রাখা, তার খেলনা মেঝে থেকে তুলে রাখা, তার পড়ার টেবিল বা বইপত্র গুছিয়ে রাখা ইত্যাদি কাজ গুলো তাকে আত্মবিশ্বাসী এবং স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। নিজের কাজ নিজে করার মত সে বড় হয়ে উঠেছে তা ভেবেই সে গর্বিত বোধ করবে।

টিম ওয়ার্ক শেখায়

ঘরের কাজকর্ম শিশুদের ছোটবেলা থেকেই “টিম ওয়ার্ক” সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। তারা এসময় থেকেই বুঝতে শুরু করে তার কাজ কিভাবে অন্যদের প্রভাবিত করছে। যেমন- সে যদি তার খেলনা গুছিয়ে না রাখে তবে সে দেখবে বাবা কিংবা মাকেই তার কাজ করতে হচ্ছে। এসব চর্চা তাকে দলবদ্ধ হয়ে কিভাবে কাজ করতে হয় তা শেখায় যা পরবর্তীতে তার স্কুলে বা কর্মক্ষেত্রে তাকে বেশ সাহায্য করবে।

অন্যের কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে

আমরা যখন পড়ালেখার বা অন্য কোন কারণে বাবা মায়ের কাছ থেকে আলাদা থাকতে শুরু করি বা নিজেরাই যখন বাবা মা হয় তখনই আমরা বুঝতে পারি বাবা মা আমাদের জন্য কতটা কষ্ট করেছেন। যদি আমরা আমাদের শিশুদের এখন থেকেই ঘরের কাজে যুক্ত করি তবে তাদের এই বোধটুকু আরও আগেই আসবে, তারা ঘরের কাজের প্রতি এবং অন্যদের কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বেড়ে উঠবে।

কর্মপরিকল্পনা ও টাইম ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে ধারণা পায়

টুকিটাকি কাজ করতে করতেই শিশু কর্মপরিকল্পনা এবং ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে ধারণা পেতে থাকে। স্কুলে যাওয়া শিশুদের ঘরের কাজকর্মে সাহায্য করার অভ্যাস থাকলে তারা চেষ্টা করে তাদের কাজগুলো কিভাবে সময়মত গুছিয়ে নেয়া যায়। স্কুলের কাজ, বাসার কাজ, খেলাধুলা ইত্যাদির সময় কিভাবে সমন্বয় করতে হবে তা অল্পবয়সেই তারা শিখতে শুরু করে।

পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করে

অনেকেই অভিযোগ করেন বাসার কাজের জন্য বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানো সম্ভব হয়ে ওঠেনা। এমন অভিযোগ যাদের তাদের জন্য এটি হতে পারে খুবই সুন্দর একটা সুযোগ। এক সাথে বাসার কাজকর্ম করাটা ঘরের বড়দের এবং ছোটদের জন্য চমৎকার একটা সময় হতে পারে। এসময়গুলোতে ছোট বাচ্চারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে থাকে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বেঁড়ে যায় এবং যেসব বাচ্চা একটু চুপচাপ ধরণের বা মিশুক নয় তারাও দেখবেন সবার সাথে সহজ হতে শুরু করবে। এভাবে পরিবারের সবার মধ্যে একটি সুন্দর বন্ধন গড়ে ওঠে।

বাবা মায়েরা সাধারণত শিশুকে কাজ করতে দিতে চান না কেন?

প্রায়ই দেখা যায় যে বাবা-মায়েরা সন্তানকে কোন কাজ করতে দিতে চান না। এমনকি শিশু যদি নিজ থেকেও কোন কাজ করতে যায়, সেক্ষেত্রেও তারা সেই কাজ নিজেরাই করে দেন। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে।

অনেক বাবা মায়েরা বাচ্চা ঘরের কাজে সাহায্য করুক এটা চাইলেও বেশিরভাগই কিভাবে কাজটা “সঠিক ভাবে” করতে হবে তা বাচ্চাকে দেখিয়ে দিতে ক্লান্ত বোধ করেন বা ধৈর্য রাখতে পারেন না। আবার অনেকেই শিশুকে কাজ দেয়ার পর তার অনবরত আবদার বা প্রশ্ন শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে নিজেই কাজটা করে ফেলেন। আবার কিছু আছেন বাচ্চা ঘর নোংরা করবে বা মন মত হবেনা এই ভয়ে শিশুদের কাজ দিতে চান না।

এখনকার যুগে অনেক বাবা মাই দিনের অনেকটা সময় অফিসের কাজে ব্যয় করেন। তারা একটা অপরাধবোধে ভোগেন যে সন্তানকে এমনিতেই তারা সময় দিতে পারছেন না তাই যেটুকু সময় দিতে পারেন তা খুব মজার কিছু হতে হবে। গৃহস্থালির এসব কাজ স্বাভাবিকভাবেই আমাদের “মজার সময়ের” লিস্টে পরেনা। অনেকেই আবার স্কুলে যাওয়া বাচ্চার ব্যস্ত সময়সূচীতে “অপ্রয়োজনীয়” এসব কাজ যোগ করতে চান না।

এমন মনোভাব যাদের তাদের জন্যই আজকের এই আর্টিকেল, কারণ গবেষণা বলছে গৃহস্থালির এসব কাজ বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে নানাভাবে সন্তানের উপকার করে।

কীভাবে শিশুকে ঘরের কাজে অভ্যস্ত করবেন?

শিশুকে ঘরের কাজে অভ্যস্ত করে তুলতে তাকে মোটিভেট করতে হবে, কোন ভাবেই জোর করা যাবেনা বা ভয়ভীতি দেখানো যাবেনা। মোটিভেট করা বলতে আবার অনেকে মনে করেন কোন পুরষ্কারের লোভ দেখিয়ে কিছু করিয়ে নেয়া। এটা খুবই ভুল ধারণা। এভাবে শিশু কিছু পাওয়ার আশায় কাজ করতে পারে। কিন্তু যখনই সে পুরষ্কারটি দেয়া বন্ধ হয়ে যাবে তখনই সে সব উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে।

বিজ্ঞাপণ

এক্ষেত্রে সর্বচ্চো ফলাফল পেতে হলে শিশু যাতে ভেতর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিষয়টি যদিও কঠিন তবে নীচের কিছু টিপস এ বিষয়ে আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

শিশুকে যে কোন কাজ করতে দেয়ার আগে দেখুন যে কাজটি কি শিশুর বয়স অনুপাতে হচ্ছে কি না! এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কোন কাজ যখন সে সফলতার সাথে করতে পারবে তখনই সে সেটার প্রতি উৎসাহী হবে। তার বয়সের তুলনায় কঠিন কোন কাজ দেয়া হলে সেটা করতে না পারার ব্যর্থতায় সে উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারে।

খেয়াল রাখবেন যে, কাজটি শিশুর জন্য নিরাপদ কি না। এজন্য বেশ কিছুদিন কাজের সময় আপনাকে নজরদারি করতে হবে। সে কোথাও আটকে গেলে তাকে সাহায্য করুন, কিন্তু কোনভাবেই পুরো কাজটা নিজে করে দেবেন না। এটা নিশ্চিত করুন শিশু যাতে পুরো কাজটুকু শেষ করতে পারে। এতেই  তার উৎসাহ বাড়বে।

আপনার ছোট্ট শিশুটি যখন কোন কাজ করতে শুরু করবে তখন তাকে প্রশংসা করার চাইতে উৎসাহ বেশি দিন দিন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। তাকে বলুন যে, “ওয়াও! তুমি কত চমৎকার ভাবে কাজ করছ!”  বা “তোমার কাজের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। তুমি আমার অনেকটুকু কাজ এগিয়ে দিয়েছ। “

শিশু কাজ করতে গিয়ে ভুল করলে অথবা করতে না পারলে শিশুকে বকা দিবেন না বরং পুনরায় আবার চেষ্টা করার জন্য উৎসাহ দিন। কোন কাজে ছোট শিশুরা বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেনা। তাই কাজগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে দিন।

মনে রাখবেন ঘরের এসব কাজের সময় যে শুধু কাজই করতে হবে এমনটা না। কাজ করতে করতে দুজনে মিলে একসাথে গান করুন, কবিতা বলুন। ঘড়িতে টাইম সেট করে সে অনুযায়ী কাজ করে তাকে সময়ের ধারণা দিতে পারেন অথবা খেলনা তোলার সময় এক, দুই, তিন গুনে তাকে সংখ্যার সাথেও পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। মোট কোথা সময়টাকে শিশুর কাছে মজার করে তুলুন।

কখনো কখনো সে কাজ করতে না চাইলে জোর করবেন না। তাকে বুঝতে দিন মাঝে মাঝে সবারই কিছু করতে না চাওয়ার ইচ্ছে হয়। এটা স্বাভাবিক। তাকে বলুন অসুবিধা নেই, আপনি আছেন। তাকে বুঝতে দিন পরিবারের সবাই সবার ভালমন্দে এক সাথে কাজ করবে। তার মনে এমন ভাবনা যেন না আসে যে নিজের কাজ শুধুমাত্র নিজেকেই করতে হবে, কেউ সাহায্য করবেনা।

সবশেষে শিশুকে কোন কাজ করতে দেয়ার আগেই এটা মেনে নিন যে, সে কাজ করতে গিয়ে অনেক ধরণের ভুল করবে। আর এই ভুল করাটা খুবই স্বাভাবিক। শিশুর কাজ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখুন। কোন বয়সে বাচ্চার কাছ থেকে কতটুকু আশা করতে পারেন তা জানা থাকলে বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে যায়।

বেশিরভাগ মায়েরা ভাবেন, শিশুর সব কাজ করে দেওয়ার মাধ্যমেই শিশুকে সর্বোচ্চ ভালোবাসা দেয়া যায়। তবে এখন গবেষণা বলে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাহায্যই শিশু বিকাশে প্রকৃত বাধা। শিশুর যাবতীয় কাজ করে দেওয়া নয়, বরং তাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে সে নিজেই নিজেকে সাহায্য করতে পারে।

[ আরও পড়ুনঃ বয়স অনুযায়ী শিশুকে ঘরের যেসব কাজে অভ্যস্ত করতে পারেন ]

বিজ্ঞাপণ

সবার জন্য শুভকামনা।


Spread the love

Related posts

Leave a Comment