জন্মের পরপরই মায়ের ত্বকের সংস্পর্শে আসা (ক্যাঙ্গারু কেয়ার) নবজাতকের জন্য কতটা উপকারী?

Updated on

হাসপাতালে আগেই বলে রাখুন যাতে জন্মানোর পরপরই আপনার শিশুকে আপনার সংস্পর্শে এনে রাখা হয়। মাথায় ছোট একটা টুপি দিয়ে এবং শুধুমাত্র পিঠে গরম কম্বল দিয়ে ঠিক আপনার বুকে উপর শুইয়ে দিতে বলুন।

এই কাজটা শিশু জন্ম নেওয়ার সাথে সাথে যত তাড়াতারি করতে পারা যায়, তত ভালো। শিশুকে ধোয়া কিংবা ওজন মাপা, পরীক্ষা নিরীক্ষা করারও পূর্বে, এমনকি শিশুর নাভি কেটে ক্ল্যাম্প লাগানোরও আগে হালকা মুছেই শুইয়ে দিতে বলুন।

যদিও এই কাজটি করতে বেশ কয়েক মিনিট সময় লেগে যায়, তবুও এটা এখন পরীক্ষিতই যে, জন্মানোর সাথে সাথে মায়ের সংস্পর্শে আসাটা শিশুর পৃথিবীতে আগমনের প্রথম কিছু মুহুর্তকে অনেক স্নিগ্ধ, আরামদায়ক এবং সুরক্ষিত রাখে।

এই সংস্পর্শে রাখাটাকে অনেক সময় ‘ক্যাঙ্গারু কেয়ার’ (Kangaroo Care) ও ডাকা হয়ে থাকে কারণ মা ক্যাঙ্গারুও ঠিক একই ভাবে জন্মের পরপরই  শিশু ক্যাঙ্গারুকে পর্যাপ্ত উষ্ণতা, নিরাপত্তা ও খাওয়ানোর সুবিধার জন্যে নিজের পেটের সামনে ঝোলায় নিয়ে নেয়।

নবজাতকের জন্য মায়ের সংস্পর্শে আসার উপকারিতা কি?

মায়ের সংস্পর্শে আসাটা মা এবং নবজাতক উভয়ের জন্যেই বেশ কয়েকটি দিক দিয়েই উপকারী:

উষ্ণতা: জন্মের পর পর নবজাতক শিশুর নিজের শরীরের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা (যেমন শরীরে কাপুনি দিয়ে উষ্ণ রাখা) তেমন ভালো অবস্থায় থাকে না। এসময় মায়ের শরীরের উষ্ণতা শিশুকে শরীরের তাপমাত্রাকে স্বাভাবিক ও আরামদায়ক রাখতে সাহায্য করে।

স্বাচ্ছন্দ্য: গবেষকরা বলেন, যেসব বাচ্চারা জন্মের পর পর মায়ের সংস্পর্শে যত বেশী সময় কাটায়, তারা তুলনামূলক কম কান্না করে থাকে।

বুকের দুধ পান  করানোয় সুবিধা: জন্মের পরপরই যেসব শিশুদের মায়ের বুকের উপর শুইয়ে দেওয়া হয়, তারা প্রায়ই  মায়ের বুকে নড়াচড়া করে এবং দুধ পান করতে চেষ্টা করে।  বেশ কিছু গবেষণায় এটা বলা হয়েছে যে, যেসব বাচ্চারা মায়ের সংস্পর্শে বেশী সময় কাটায়, তারা সুবিধামত এবং দীর্ঘ সময় ধরে মায়ের দুধ পান করতে পারে।

স্থিতিশীল হৃদকম্পন এবং অন্যান্য: গবেষকরা গবেষনায় বের করেছেন যে, যেসব শিশুরা মায়ের সংস্পর্শে বেশী সময় ধরে থাকেন, তাদের হৃদকম্পন ও রক্তচাপ স্থিতিশীল থাকে এবং রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অন্যান্য শিশুদের তুলনায় পরিমিত থাকে।

ইনফেকশন থেকে সুরক্ষা: এটা প্রমাণিত যে, নবজাতককে ধুয়ে পরিষ্কার করার আগেই যদি তাকে মায়ের সংস্পর্শে নিয়ে আসা যায়, তাহলে শিশুর ইনকফেকশনের ঝুঁকি কমে যায় অনেকাংশে। কারণ স্বাভাবিক ডেলিভারিতে বাচ্চা জন্ম নেওয়ার সময় যেসব উপকারী ব্যাকটেরিয়া মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে প্রবাহিত হয় তা আরও বেশ কিছু সময় শিশুর শরীরে থাকতে পারে যার ফলে সে সুরক্ষিত থাকে।

প্রিম্যাচিওর শিশুর ক্ষেত্রে মায়ের সংস্পর্শ শিশুকে আরো কিছু বাড়তি সুবিধা দিয়ে থাকে, যেমন –

  • শিশুর স্নায়বিক উন্নতি ঘটে
  • শিশু দ্রুত এবং সুস্থভাবে বেড়ে উঠে
  • শিশুকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে কমসময় অবস্থান করতে হয়।

মা-শিশুর সংস্পর্শে শিশুর পাশাপাশি মা-ও অনেকভাবে উপকৃত হন, যেমন –

  • ডেলিভারির পরপরই মায়ের শরীরে শিশুর স্পর্শ, এ এক অসাধারণ অনুভূতি! এই সংস্পর্শে মা’র মস্তিষ্ক থেকে বেটা এনডোরফিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয় যা প্রসব ক্লান্তি অনেকটুকু হালকা করে, প্রশান্তি দেয়।
  • নিবিড় সংস্পর্শ মায়ের মস্তিষ্ক থেকে অক্সিটকিন নামক হরমোন নিঃসরণে সহায়তা করে যা মা ও শিশুর পারষ্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় করে এবং বুকের দুধ উৎপাদন সহজতর করে।

কি হবে যদি আমার শিশুকে জন্মের পরপরই আমার সংস্পর্শে এনে রাখা না যায়?

কখনো কখনো বিভিন্ন কারণে জন্মানোর সাথে সাথেই এই সংস্পর্শের ব্যাপারটা করা যায় না। যদি আপনার শিশু অসুস্থ থাকে, সংস্পর্শের চেয়ে তার শারীরিক অবস্থাটা নির্ণয় করা তখন বেশি জরুরী হয়ে পড়ে। যদি এমনটা ঘটে থাকে, চিন্তার কোন কারণ নেই। সংস্পর্শে আসার ব্যাপারটা কিছু সময় পরেও করা যায়।

আবার সিজারিয়ান ডেলিভারির ক্ষেত্রে অপারেশন টেবিলে আপনি যখন শুয়ে থাকবেন, তখনও আপনার বুকে এনে শিশুকে শুইয়ে দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠবে না। অবশ্য এখন অনেক হাসপাতালেই শিশু সিজারিয়ানের মাধ্যমে জন্ম নেওয়ার পরপরই তারা বিভিন্ন কৌশলে মায়ের সান্নিধ্যে রাখার ব্যবস্থা করে রাখেন।

কিন্তু আপনি যদি এই সংস্পর্শের জন্যে সুস্থ নাও থাকতে পারেন, সেক্ষেত্রেও দুশ্চিন্তার কারণ নেই। আপনি শিশুর বাবাকেও বলতে পারেন এই কাজটি করার জন্যে। মা-বাবা কিংবা যে কারোর সংস্পর্শই শিশুকে হৃদক্রিয়া এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।

সরাসরি ত্বকের এই স্পর্শ কতদিন ধরে রাখা উচিত?

এই সংস্পর্শ শুধু যে নবজাতকদের জন্যেই, তা কিন্তু নয়। প্রথম কয়েক মাসে আপনি যখনই সময় পাবেন, আপনার শিশুকে ত্বকের সাথে  জড়িয়ে রাখতে পারেন যা আপনার এবং শিশুর মধ্যকার বন্ধনকে তো সুদৃঢ় করবেই পাশাপাশি বুকের দুধ পান করানোও অনেক সহজ করবে।

আপনার শরীরের উষ্ণতা, আপনার হৃদস্পন্দন, আপনার গলার স্বর ও কম্পন – এর মাধ্যমেই আপনার শিশু আপনাকে চিনে নেবে। ভেবে নেবে সবচেয়ে আপন হিসেবে – মা হিসেবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts