বাচ্চার প্রথম সলিড খাবার কিভাবে এবং কি দিয়ে শুরু করবেন

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

আমরা জানি জন্মের পর থেকে প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত সময় একটি মানব শিশুকে তার খাদ্যের উৎস হিসেবে  শুধু মাত্র মায়ের বুকের দুধের উপর নির্ভরশীল রাখতে পরামর্শ দেয়া হয়। মায়ের অসুস্থতা, অনুপস্থিতি কিংবা বিশেষ কোনো কারনে শিশু মায়ের কাছ থেকে পর্যাপ্ত দুধ না পেলে, বিকল্প হিসেবে ফর্মুলা দুধ দেয়া যায়। ছয় মাস পুর্ণ হবার আগে সাধারণত আর কিছু খাওয়ানোর পরামর্শ খুব কম ক্ষেত্রেই দেয়া হয়।

প্রথমবার মা বাবা হলে অনেকেই প্রশ্ন করেন, ছয় মাসে পড়লে সলিড ফুড শুরু করবো? নাকি ৬ মাস শেষ হলে? এই ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার বলে রাখি, বাচ্চার ছয় মাস হওয়া অর্থ, বাচ্চা তার জন্মের পর  (৩০ X ৬ ) ১৮০ দিন বা ছয় মাস পার করে ফেলেছে। তাই ছয় মাসের শুরু নাকি শেষে – এই প্রশ্নটি খানিকটা বোকা-বোকা হয়ে যায়। ছয় মাস পূর্ণ করার আগে বাচ্চাকে পাঁচ মাসের বাচ্চা হিসেবে গন্য করা হয় ।

বিজ্ঞাপণ

এখন কথা হলো বাচ্চার ষষ্ঠ মাস যেদিন পুর্ণ হবে, সেদিন থেকেই কি তার weaning বা সলিড খাবার গ্রহন শুরু করবো? এটা শুনে আমাদের মতো পুরোনো হয়ে যাওয়া মা-বাবাদের একটু হাসি পেলেও , প্রথম মা-বাবার জন্য খুব চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে, যে ব্যাপারটি মনে রাখবেন, তা হলো ছয় মাস সময়টি একটি এভারেজ সময় যখন বাচ্চা দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার খাওয়ার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে থাকে। তাই হতে পারে সেটি ছয় মাস পুর্ণ হবার ২ থেকে ৪ সপ্তাহ আগে কিংবা পরে। শিশু Weaning এর জন্য প্রস্তুত কিনা, তার কিছু বেঞ্চমার্ক আছে, সেগুলো সম্পর্কে জেনে নিলে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ আপনাদের জন্য সহজ হবে।   

[ আরও পড়ুনঃ কিভাবে বুঝবেন আপনার বাচ্চা সলিড বা বাড়তি খাবার খাওয়ার জন্য প্রস্তুত? ]  

American Academy of Pediatrics এর মতে বুকের দুধের পাশাপাশি শিশুর প্রথম কমপ্লিমেন্টারী খাবার ৪ মাস থেকে ৬ মাসের মধ্যে শুরু করা যায়। আবার World Health Organization এর রেকমেন্ডেশান অনুযায়ীঃ “শিশুর সর্বোত্তম  বৃদ্ধি, বিকাশ এবং স্বাস্থ্য অর্জনের জন্য জীবনের প্রথম ছয় মাস  একচেটিয়াভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো উচিৎ” – যেহেতু সলিড খাবার শুরু করার সাইনগুলো বেশিরভাগ বাচ্চার মধ্যে পাঁচ মাস পুর্ণ হবার আগে দেখা যায় না, তাই WHO এর গাইডলাইন অনুযায়ী বেশিরভাগ জায়গায় Weaning শুরু করার নিরাপদ সময় হিসেবে ৬ মাস থেকে শুরু করার ব্যাপারেই জোর দেয়া হয়ে থাকে।

শিশুর জন্মের প্রথম বছর খুব দ্রুত শারিরিক বৃদ্ধি ও ব্রেইনের বিকাশ হতে থাকে। আবার,  শিশু যখন বসতে শেখে এবং হামাগুড়ি দিয়ে আগাতে শেখে, তখন দেখা যায় আশেপাশের নানা জিনিস থেকে জীবাণু সংক্রমনের ঝুঁকিও বাড়ে। দেখা যায় বাচ্চা এটা সেটা মুখে দেয়, কামড়াতে চায় যা তার স্বাভাবিক বিকাশেরই অংশ- তাই বাচ্চার প্রথম কমপ্লিমেন্টারী খাবার নির্বাচন করার ক্ষেত্রে মা বাবাকে অবশ্যই ভালো পুষ্টিমান সম্পন্ন খাবার নির্বাচন করা দরকার যা বাচ্চার বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়ানোয় সাহায্য করবে।

একটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে, নিজের দেশের প্রকৃতিতে উৎপাদিত প্রাকৃতিক খাবারকেই শিশুর প্রথম কমপ্লিমেন্টারি খাদ্য হিসেবে নির্বাচন করার ব্যাপারে সুপারিশ করেছেন পৃথিবীর বেশিরভাগ এক্সপার্টরা।     

WHO ও UNICEF এর গাইডলাইন অনুযায়ীঃ বুকের দুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি ছয় মাস বয়সী শিশুদের জন্য যে জাতীয় খাবারগুলি দেয়া শুরু করা উচিৎঃ

  1. শিশুর হজমের জন্য উপযোগী, নরম এবং পুষ্টিকর খাবার।
  2. সহজেই পাওয়া যায় এমনকিছু (অর্থাৎ নিজের কিংবা আশেপাশের এলাকায় উৎপাদিত খাদ্য এবং বাড়িতে বানানো খাবার) 
  3. খুব ব্যয়বহুল নয় এমন খাবার। সাধারণত এই খাবারগুলি শিশুর নিজের পরিবারের খাদ্যগুলো থেকে নেওয়া হয়। প্রসেসড বেবী ফুডের উপর করা বিশ্বের বিভিন্ন রিসার্চে দেখা গেছে প্রসেসড খাবার বা, স্টোরের ইন্সট্যান্ট ‘শিশুর খাবারগুলি’ প্রস্তুত করা সহজ হতে পারে তবে ঘরে তৈরি খাবারের তুলনায় এগুলো ব্যয়বহুল,  কম পুষ্টিকর এবং অনেক সময় বাচ্চার খাদ্যাভাস এবং ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। 

** তাই অনুরোধ, ভ্রমন বা বিশেষ কোনো ইমার্জেন্সী ছাড়া বাচ্চাদের ইনস্ট্যান্ট রেডি অথবা টিনজাত খাবারে অভ্যস্ত করাবেন না।  

এবার আসা যাক ঠিক কি কি ধরণের খাবার আমরা বাচ্চার প্রথম কমপ্লিমেন্টারি ফূড হিসেবে দিতে পারি। তার আগে কিছু কথা বলে নেয়া প্রয়োজন- তা হলো, বাচ্চাকে শুরুতে শুধুমাত্র একটি খাবার দিয়ে weaning time শুরু করতে হয়, প্রথম দুই-একদিন সেই খাবারের কি প্রতিক্রিয়া হলো সেটি দেখতে হয়। এসময় একাধিক খাবার একই দিনে দেয়া হলে, যদি বাচ্চার হজমে কোনো সমস্যা হয়, বা এলার্জিক রিএকশান হয়, তা কোন খাবারটি থেকে হয়েছে তা বোঝা যায় না । তাই ধীরে ধীরে একটি একটি খাবার শুরু করতে হয়।

আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত খিচুড়ি পুষ্টিকর হলেও কোনোভাবেই বাচ্চার প্রথম খাবার নয়। খিচুড়ি সাত বা আট মাস বয়স থেকে অফার করে দেখতে পারেন, যখন বাচ্চা অলরেডি কয়েকটি খাবারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।  বাচ্চার শুরুর খাবার কোনো এক ধরনের খাদ্যশস্য কিংবা সহজপাচ্য ফল বা সবজি দিয়ে করতে পারেন। ফল বা সবজি দিতে চাইলে, মিষ্টি জাতীয় ফল বা সবজি নির্বাচন করবেন।   

বাচ্চার প্রথম খাবার হিসেবে প্রথম মাসে কি কি ধরনের খাবার শুরু করা যায় (আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে)

খাদ্যশস্য (wholegrain)

যেহেতু আমাদের দেশের প্রধান খাবার শস্য চাল বা ভাত, তাই অবশ্যই এই শস্যটি হতে পারে আপনার বাচ্চার প্রথম মাসের খাবারের একটি। তবে নিশ্চিত করবেন যেন বাজারের প্রক্রিজাত-করা মিনিকেট চাল না হয়। ব্রাউন রাইস (লাল চাল) , ঢেঁকি ছাটা চাল – এগুলো নিরাপদ ও পুষ্টিকর। অন্যান্য খাদ্যশস্য যেমনঃ ছাতু বা বার্লী, গম, ভুট্টা এবং ওটস ইত্যাদী হতে পারে আপনার শিশুর জন্য প্রথম খাবার –এখানে আমরা আরেকটি ভুল করি , তা হলো কয়েকটি খাদ্যশস্য একসাথে মিশিয়ে খাবার রান্না করি, এটি বাচ্চার হজম এবং পুষ্টি দুইটির ক্ষেত্রেই বিরুপ প্রতক্রিয়া রাখে। তাই একবারে একটি একটি করে শুরু করুন।

[ আরও পড়ুনঃ ওটস্‌ (Oats) নিয়ে যত কথা ]

একটি খাবার বাচ্চা খেলে তাকে তাই দিন, নিত্যনতুন চমক দেয়ার এখনই প্রয়োজন নেই । এতে খাবারের প্রতি বাচ্চার অনীহা জন্মাতে পারে। তাই আপনি গ্রামে থাকুন বা শহরে, খাদ্যশস্যের পুষ্টির ব্যাপারে জানা থাকলে আপনার হাতের কাছের শস্যটি বাছাই করুন। আপনি যদি সিটি এরিয়াতে থাকেন আর ঢেঁকি ছাটা কিংবা হোল্গ্রেইন শস্য সহজলভ্য না হয়,  তাহলে কাছের কোনো স্টোর থেকে কিনে নিন Whole oats, rolled oats কিংবা Barley. শুধু চেষ্টা করবেন, গোটা শস্য বা সবচেয়ে কম প্রসেসড অপ্সশনটি বাছাই করতে যেটি ভালোভাবে রান্না করে খাওয়াতে হয়।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর প্রথম খাবার হিসেবে ওটস (Oats): কিছু রেসিপি ]

সবজি / রুট ভেজটেবল

বাচ্চার প্রথম সবজি হিসেবে কন্দমূল বা রুট ভেজিটেবল অনন্য। যেমন মিষ্টি আলু / লাল আলু, গাজর ইত্যাদি । আর অন্যান্য সব্জির মধ্যে আছে পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া, কাঁচা কলা- ইত্যাদি নরম সবজি। ভালোভাবে ভাপিয়ে নরম করে কিংবা অল্প সময় সেদ্ধ করে ম্যাশ (ভর্তা) করে দিতে পারেন। পরবর্তীতে ভাত বা পরিজের সাথে মিশিয়েও দিতে পারেন। একটি একটি করে শুরু করবেন প্রথম খাবার, একসাথে কয়েকটি সবজি মেশাবেন না শুরুতেই।

ফল

প্রথম খাবার হিসেবে আপনি অনায়াসেই কোনো পুষ্টিকর লোকাল এবং সিযনাল ফল বাছাই করতে পারেন। ফল কেনার সময় ক্যামিক্যাল বা প্রিযার্ভেটিভ বর্জিত ফল কেনার চেষ্টা করতে হবে। পাকা কলা হতে পারে খুব পুষ্টিকর একটি খাবার। এছাড়াও পাকা পেঁপে, ভিজিয়ে রাখা খেজুর, আপেল  ইত্যাদিও প্রথম ফল হিসেবে ভালো।

দুগ্ধজাত খাবার

এই বয়সে বাচ্চার দুধের বেশির ভাগ পুষ্টি মায়ের দুধ থেকে পেয়ে থাকে। মায়ের দুধ বা ফর্মুলার পাশাপাশি দুগ্ধজাত খাবার খুব বেশি একটা প্রয়োজন পড়ে না। তারপরও দিতে চাইলে, দই এবং কটেজ চিয খুব পুষ্টিকর। তবে বাজারের চিনি, লবন এবং প্রীযার্ভেটিভ যুক্ত প্যাকেটজাত দই বা চীজ অবশ্যই পরিহার করবেন। 

উল্লেখ্য, বাসায় বানানো দই গরুর দুধ দিয়েই প্রস্তুত করা হয়। ‘গরুর দুধ’ এই বয়সী শিশুর জন্য উপযুক্ত নয়, কিন্তু দই বসলে এই মধ্যকার ল্যাক্টোজগুলো ভেঙ্গে যায়, আর এটি অন্য এক ধরনের খাবারে পরিণত হয় যা ৬ মাস + বাচ্চারা খুব সহজেই হজম করতে পারে।   তাই গরুর দুধ দেয়া না গেলেও সেটি দিয়ে বসানো দই দেয়া যাবে।

ডিম , মাছ , মাংস

ডিম, মাছ, মাংস প্রোটিনের খুব ভালো সোর্স। শিশুর প্রথম খাবার হিসেবে শস্যজাত খাবার, সব্জি বা ফলই দেয়া উচিৎ। মাছ, মাংস ও ডিম এক দুই মাস পর থেকে আস্তে আস্তে যার যার সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী শুরু করতে পারেন। সাত মাস বয়স থেকে ভালো ভাবে রান্না করা মুরগীর নরম মাংস বা মাছ দিতে পারেন। ছোট মাছ দিলে ভালোভাবে ম্যাশ বা ব্লেন্ড করে দিবেন যেন গলায় না লাগে। ডিমের কুসুম দিতে পারেন আট মাস থেকে। সাদা অংশ একটু গুরুপাক তাই ১০ মাসের পর দেয়া উচিৎ।

বিজ্ঞাপণ

স্নেহ বা চর্বি জাতীয় খাবার

বাচ্চার খাবারে স্নেহ জাতীয় খাবার যুক্ত করা যাবে। প্রথম খাবারে না হলেও, প্রথম খাবার শুরু করার কিছুদিন পর থেকে পরিমান মতো এবং স্বাস্থ্যকর তেল (এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ এবং কোকোনাট অয়েল), বিশুদ্ধ ঘী বা বাটার যুক্ত করা যাবে।   তবে, ভাজা পোড়া ও ট্রান্সফ্যাট সবসময় পরিত্যাজ্য।

পানি ও জুস

ছয় মাসের আগে , বাচ্চাকে পানি দেয়া রেকমেন্ডেড নয়। ফর্মুলা খাওয়া বাচ্চার ক্ষেত্রে শুধু নির্দেশ অনুযায়ী পরিমান মতো পানি মেশাতে হয়, বেশী বা কম কোনোভাবেই না। এবং ডিহাইড্রেশানের সময় স্যালাইন খাওয়াতে হলেও ঠিক একইভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমান পানির সাথে স্যালাইন বিশেষ নিয়ম মেনে খাওয়াতে হয়। এছাড়া যেমন খুশি পানি খাওয়ালে ওয়াটার ইন্টক্সিক্যাশান হয়ে বাচ্চা অনেক মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। 

সলিড শুরু করার পর ৬ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত ২ থেকে ৪ আউন্সের বেশি পানি পানের প্রয়োজন পড়ে না বুকের দুধ বা ফর্মুলা পরিমানমতো খেলে। তবে, হ্যাঁ, পানি খাওয়ানোতে অভ্যস্ত করার জন্য আপনি ৫ মাস থেকে তার হাতে সীপ কাপ দিয়ে দিতে পারেন, খেলার ছলে দুই এক চুমুক নিলে এতে তেমন ক্ষতির আশংকা কম।

এবার আসি জুস বা ফলের রসের ব্যাপারে, অনেকেই বাচ্চার প্রথম খাবার হিসেবে জুস দেয়া যাবে কিনা জিজ্ঞেস করেন। এক্ষেত্রে , বলা যায়, জুস  বাচ্চার প্রথম খাবার হিসেবে একেবারেই প্রথম সারিতে পড়ে না।

প্রথমত জুসে ফলের পুষ্টিগুণ অনেক কম থাকে, এবং কোনো কোনো সময় এসিডিটির কারণ ঘটায়। তাই মিষ্টি জাতীয় নরম ফলের শাঁস চটকে বা ম্যাশ করে খাওয়ানোই সর্বোত্তম। ফলের শাঁস পানি ধারণ করে, এবং কোষ্ঠকাঠিন্যেরোধে ভুমিকা রাখে। আমেরিকান একাডেমী ও পেডিয়াট্রিক্সের এর মতে বাচ্চার বয়স ১২ মাস হওয়ার আগে কোন ধরণের জুস দেয়া উচিত নয় যদি না কোষ্ঠকাঠিন্য বা পানিশূন্যতার কারণে ডাক্তার তা সুপারিশ করেন।

প্রথম খাবার শুরু করার সময় ভীষণ গুরুত্বপুর্ন কিছু বিষয়

১। একসাথে কয়েকটি খাবার শুরু করবেন না। আস্তে আস্তে এবং প্রতিদিন অল্প অল্প করে শুরু করবেন। কোনো খাবারে বাচ্চার কোনো নেগেটিভ রিয়েকশান হচ্ছে বলে মনে হলে খাবারটি বন্ধ রাখুন।

২। কোনোভাবেই বাচ্চাকে ডিস্ট্র্যাক্ট করে অর্থাৎ বাচ্চার মন অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে খাওয়ানো প্র্যাকটিস করবেন না। বাইরে হেঁটে হেঁটে , কিংবা এদিক ওদিক তাকাতে বলে খাওয়াবেন না। এর মধ্যে যেটি সবচেয়ে ক্ষতিকর তা হলো টিভি বা অন্য ইলেক্ট্রোনিক ডিভাইসের সামনে বসিয়ে খাওয়ানো। বাচ্চা অল্প খেলেও যা খাচ্ছে সেটি তার নিজের হাতে ধরে খেতে উদ্বুদ্ধ করুন। আপনি আর আপনার বাচ্চার জন্য যেন উপভোগ্য একটি সময় হয় – সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। খায় না কেনো? বাটী খালি করে না কেনো? কিংবা জোর করে খাওয়ানো ইত্যাদি বিষয় পরিহার করুন। Baby led weaning বিষয়ে জেনে নিন।

৩। ৬ মাস বয়সে বাচ্চার মূল খাবার মায়ের দুধ। বাড়তি খাবার শুরু করতে বলা হয় এই মাসে। তাই বাড়তি খাবার শুরুতে  বাচ্চা এক দুই চামচ বা অল্প পরিনামে খেলেও অসুবিধা নেই। বয়সের সাথে সাথে আস্তে আস্তে খাবারের পরিমান বাড়ানো উচিৎ। তাই বাটি খালি না করলেও অস্থির হবেন না। বাটি সরিয়ে নিন।

৪। বাচ্চাকে বোতলে করে সেমি সলিড খাওয়াবেন না। যেমন সুজি বা সিরিয়াল দুধে মিশিয়ে বোতোলে করে দেবেন না। বাচ্চা সোজা ভাবে বসতে শিখলে, তাকে নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে  বাটি চামচ অথবা হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করে হাতে কচলে খাওয়াবেন।  শুইয়ে বা হেঁটে হেঁটে বাচ্চাকে খাবার খাওয়াবেন না। হাই চেয়ার খুবই উপকারী বাচ্চার ভালো খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার জন্য।

৫। বুকের দুধ বা ফর্মুলা মিষ্টি বা নোনতা  হয়না। এই দুধই বাচ্চা এতোদিন খেয়ে এসেছে। তাই বাচ্চার খাবারে আলাদা লবন বা চিনি যুক্ত করবেন না। এতে তাদের খেতে কোনো সমস্যা হয় না। বড়দের স্বাদ আর প্রথম খেতে শেখা বাচ্চার টেস্ট এক রকম হয় না। তাই খাবার বেশি সুস্বাদু করার জন্য লবন কিংবা চিনি যোগ করবেন না। এর পেছনে বিশেষ কারণ  রয়েছে। সেগুলো অবশ্যই জেনে নেবেন। ১১ মাসের পর থেকে হাল্কা একটু লবন অ্যাড শুরু করতে পারেন ।

৬। বাচ্চার খাবার পাত্র, বাচ্চার হাত, নিজের হাত ভালোভাবে ধুয়ে জীবানূ মুক্ত করবেন।

৭। পুষ্টিলাভের সাথে সাথে বাচ্চার খাদ্যাভাস, কখন খাবে, কি খাবে , কি খাবে না, কোথায় বসে খাবে, কোন খাবারের নাম কি, স্বাদ কেমন, পরিবারের সাথে বসে খাওয়ার গুরুত্ব, কালচার, খাবার বিষয়ক নৈতিকতা – এসব অনেক কিছুই শেখার সুত্রপাত হয় এই সময়। তাই বাবা মা কিংবা কেয়ার গিভার শুরু থেকেই খাবার বিষয়ক কিছু নিয়ম মেনে চলবেন। শুধু বাচ্চাকে খাইয়ে দিলেই হলো – এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। নিজের হাতে খাবার স্পর্শ করতে দিলে বাচ্চার সেন্সরী, আই হ্যান্ড কোওর্ডিন্যাশান, বুদ্ধিমত্ত্বা এগুলোর বিকাশে ভুমিকা রাখে। তাই খাওয়ার সময় তার শরীর কিংবা খাওয়ার জায়গাটা অপরিষ্কার করে ফেললেও বাচ্চাকে খাবার ধরতে দেয়ার সুযোগ দিন।  

৮। বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু বাচ্চার মুখে দিয়ে টেস্ট করাবেন না। এতে তাদের রুচি নষ্ট হয়। যেমন চিপ্স, কোলা , অতিরিক্ত চিনি বা নোনতা খাবার , জাঙ্ক ফুড, চকোলেট বা আইস  ক্রিম এগুলো অনেকে ফান করে বাচ্চার মুখে একটু দেন, বাচ্চার রিয়েশান দেখার জন্য। এটি পরবর্তীতে বাচ্চাকে এসব খাবারের প্রতি আকৃষ্ট করে এবং স্বাভাবিক খাবারের প্রতি অরুচি তৈরি করে। আপনি আইস্ক্রিম খাচ্ছেন, বাচ্চা খেতে চাইলে তাকে একটি কলা হাতে দিয়ে দিন। আপনার হাতের খাবারের স্বাদ তার জানা না থাকলে সে তার হাতের খাবারটি নিয়েই ব্যাস্ত থাকবে।

বিজ্ঞাপণ

[ আরও পড়ুনঃ শিশুকে খাওয়ানোর বিষয়ে যে ১১ টি ভুল বাবা মায়েরা করে থাকেন ]

৯। বাচ্চার খাবার কতোখানি উষ্ণতার  পরিক্ষা করে তারপর দেবেন। বেশি ঠান্ডা বা বেশি গরম যেন না হয়। শুরুর দিকে খাবার ম্যাশ করে দেবেন, যেন তার চিবুতে সমস্যা না হয়। টুকরো করে খাবার দেবেন আস্তে আস্তে বয়স বাড়ার সাথে সাথে যখন আপনি বুঝতে পারবেন তার মুখের পেশীগুলো টুকরো করে কাটা খাবার চিবুতে পারছে।  এটি একেক বাচ্চার একে রকম হতে পারে, তাই সময় নিন, আস্তে আস্তে খাবারের ঘনত্ব, পরিমান ও আকার পরিবর্তন করুন।  

১০। এ বয়সী বাচ্চাকে একা রেখে খাবার খেতে দেবেন না। নিজের হাতে খেতে উদ্বুদ্ধ করুন কিন্তু অবশ্যই সুপারভিশনে রেখে।  

১১। সবকিছুর পরও বাচ্চার বয়স ১০ মাস হয়ে গেলে সে যদি দুধ ছাড়া অন্য কিছু খেতে না চায় তবে অবশ্যই একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

১২। বাচ্চার খাবার দেয়ার ক্ষেত্রে রুটিন মেনে চলুন। বাচ্চা যদি খিদে লাগে তবে খাবার দিন, আবার খুব বেশি ক্ষুধার্ত হলে তাড়াহুড়া করে খেতে গিয়ে রিস্ক হয়ে যেতে পারে। তাই একটি মডারেট ইন্টারভাল (২-৩ ঘণ্টা পর পর) মেইন্টেইন করে খাবার অফার করুন।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment