চার ধরণের প্যারেন্টিং স্টাইল এবং শিশুর উপর এর প্রভাব

Spread the love

প্রত্যেকটি শিশু তাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব নিয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। তবে বাবা-মায়ের প্যারেন্টিং স্টাইল ঠিক করে দেয় শিশুটির সামাজিক দক্ষতা, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং তাদের আচার-আচরণ কেমন হবে।

শিশুরা জন্মের পর থেকে তাদের বাবা-মা কে অনুসরণ করে বড় হয়। বাবা-মায়ের ব্যক্তিত্ব বাচ্চাদের বিকাশে খুব গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। বাচ্চারা যত বড় হতে থাকে ততই তাদের বাবা-মায়ের ব্যক্তিত্বের প্রতিটি অংশ তাদের মনে গেঁথে যায়। এবং একটা সময় তারা সেই ব্যক্তিত্বকে নিজের মাঝে ধারণ করে নেয়। শিশুরা তাদের প্রতি মা-বাবার আচরণ থেকেও অনেক বেশি প্রভাবিত হয়।

বিজ্ঞাপণ

আমাদের দেশের বেশিরভাগ বাবা-মায়েরাই সন্তানের বিকাশের জন্য সঠিক প্যারেন্টিং স্টাইল সম্পর্কে সচেতন নয়। তবে বর্তমানে অনেকেই এর গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে। চলুন জেনে নেই বিভিন্ন ধরণের প্যারেন্টিং স্টাইল সম্পর্কিত খুঁটিনাটি।

প্যারেন্টিং স্টাইল বলতে মূলত কি বোঝায়?

সহজভাবে বলতে গেলে প্যারেন্টিং স্টাইল হচ্ছে শিশু লালন-পালন করার কলাকৌশল। অর্থাৎ আপনি আপনার শিশুটিকে কিভাবে বড় করে তুলছেন। আপনার শিশুর সাথে আপনি কেমন আচরণ করছেন, তার কিভাবে যত্ন নিচ্ছেন, তাকে কি ধরনের শিক্ষা দিয়ে বড় করছেন, এই সবকিছুই প্যারেন্টিং স্টাইলের অন্তর্ভুক্ত।

প্রত্যেকেই তাদের সন্তানদের নিজেদের ধ্যান ধারণা অনুসারে লালন পালন করে থাকেন।অনেক বাবা-মায়েরই ধারণা শিশুকে ভালো খাবার খাওয়াচ্ছি, দামি পোশাক পরাচ্ছি, সেরা স্কুলে ভর্তি করিয়েছি, ভালো টিচার রেখেছি এর চেয়ে বেশি কি দরকার। তবে আমরা ভুলে যাই আমাদের ছোট্ট একটি ভুল অভ্যাস আগামীতে শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে অনেক বেশি প্রভাব রাখতে পারে।

ডায়ানা বাউমরাইন্ডের  প্যারেন্টিং স্টাইল মতবাদ

ডায়ানা বাউমরাইন্ড  একজন সাইকোলজিস্ট যিনি বছরের পর বছর ধরে মা-বাবার সাথে শিশুর সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে আসছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের প্যারেন্টিং এবং শিশুদের সামাজিক দক্ষতা নিয়েও গবেষনা করছেন।

তাঁর গবেষণাটি অনেক বাবা-মায়ের উপর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় এবং তিনি এমন একটি বিশ্লেষণ প্রদান করেন যা এখন পর্যন্ত বর্তমান বাস্তবতার সাথে প্রাসঙ্গিকতা রাখে।

১৯৬০ সালে তিনি মা-বাবার আচরণ শিশুর মনস্তাত্ত্বিক দিককে কতোটা প্রভাবিত করে তা নিয়ে একটি মতবাদ প্রকাশ করেন। যেখানে তিনি তিন ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইলের কথা বিশ্লেষন করেছেন।

বাউমরাইন্ডের  মতবাদ হলো প্যারেন্টিং স্টাইল এবং শিশুদের আচরণের ধরণের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নানা ধরনের পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাতকার এবং বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বাউমরাইন্ড  প্রাথমিকভাবে তিন ধরণের প্যারেন্টিং স্টাইল শনাক্ত করেছিলেন:

  1. Authoritarian (স্বৈরাচারী)
  2. Authoritative (কর্তৃত্বসম্পন্ন/ কর্তৃত্বপূর্ন)
  3. Permissive ( সহনশীল)

পরবর্তীতে ম্যাকোবি এবং মার্টিন ১৯৮৩ সালে দুটো বিষয়ের উপর ভিত্তি করে এই মতবাদ আরেকটু বিস্তৃত করেন। এই দুটি বিষয় হলো-

Demandingness, যা দ্বারা বোঝায় বাবা মা তাদের সন্তানের আচরণ নিয়ন্ত্রণে কি পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

Responsiveness, দ্বারা বোঝায় বাবা মা তাদের সন্তানের মানসিক এবং বিকাশগত প্রয়োজনে কিভাবে সাড়া দেন।

বর্তমানে যে চার ধরণের প্যারেন্টিং স্টাইল নিয়ে আলোচনা করা হয় তা এই দুজনেরই তৈরি। তারা বাউমরাইন্ডের  পারমিসিভ প্যারেন্টিংকে দুভাগে ভাগ করেন-

১। Permissive Parenting বা Indulgent Parenting (প্রশ্রয় দেয়া)

২। Neglectful Parenting বা Uninvolved Parenting ( উপেক্ষা করা)

চার ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইল
চার ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইল

চার ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইল এবং শিশুদের উপর তার প্রভাব

Authoritarian Parenting (স্বৈরাচারী)

High Demandingness. Low Responsiveness

স্বৈরাচারী পিতামাতারা শিশুদের কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তারা তাদের সন্তানের কাছ থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করে। এই ধরনের বাবা-মায়েরা শিশুদের মতামত এবং পছন্দ অপছন্দকে কোন প্রকার গুরত্ব দেয় না। তারা একতরফা নিজেদের মতামত শিশুদের উপর চাপিয়ে দেওয়াকেই সঠিক মনে করে থাকেন। এই ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইলে শিশুদের আলাদা কোন ব্যক্তি স্বাধীনতা থাকে না।

এই ধরণের প্যারেন্টিং স্টাইলে বাবা মায়েরা সন্তানের অন্ধ আনুগত্য প্রত্যাশা করেন। তারা যেটা বলবেন সেটাই হতে হবে এই নীতিতে বিশ্বাসী থাকেন। এই ধরণের প্যারেন্টিং এ খুব প্রচলিত একটি বাক্য হচ্ছে – “কারণ আমি বলেছি তাই এটাই তোমাকে করতে হবে”। তাদের মতামতের বিরুদ্ধে যুক্তি দেখানো খুবই খারাপ আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই স্টাইলে শাস্তির পরিমাণ এবং ধরণও খুব কঠিন হয়। এসব বাবা মায়েরা সাধারণত তাদের এই আচরণকে সন্তানের প্রতি “কঠোর ভালোবাসা” (Tough love) হিসেবে আখ্যায়িত করে তা ন্যায়সঙ্গত করার চেষ্টা করেন।

স্বৈরাচারী পিতা-মাতার সন্তানেরা সাধারণত প্রচন্ড মানসিক চাপের মধ্যে বড় হয়। তারা হীনমন্যতা এবং প্রায় সময় অপরাধবোধে ভোগে। এছাড়াও তাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ এবং আত্মবিশ্বাসের প্রচুর ঘাটতি থাকে। ফলে সমাজে সবার সাথে খাপ খাইয়ে চলাটা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যাও বেশি দেখা যায় এবং পড়াশোনাতেও খুব একটা ভালো করতে পারেনা।

Authoritative Parenting (কর্তৃত্বসম্পন্ন)

High demandingness. High responsiveness.

এই ধরনের বাবা-মায়েরা শিশুদের উপর উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখলেও তাদের প্রতি নমনীয় হয়ে থাকেন। স্বৈরাচারী বাবা-মায়ের মতো তারা সন্তানদের উপর একতরফা নিজেদের মতামত চাপিয়ে দেন না। তারা শিশুদের কথা শুনেন এবং তাদের পছন্দ-অপছন্দকে মূল্যায়ন করেন।

এসব বাবা-মায়েরা শিশুদের মতামতকে যুক্তি সহকারে গ্রহন করেন এবং তাদেরকে প্রয়োজন অনুসারে ব্যক্তি স্বাধীনতা দিয়ে থাকেন। কর্তৃত্বসম্পন্ন বাবা-মায়ের সন্তানেরা সাধারণত বুদ্ধিমান এবং লেখাপড়ায় বিচক্ষণ হয়ে থাকে।

বাউমরাইন্ডের  মতবাদ অনুযায়ী এই ধরণের প্যারেন্টিং এ শিশুরা ভবিষ্যতে যথেষ্ট আত্মমর্যাদা সম্পন্ন, স্বাবলম্বী এবং সমাজে সকলের কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠে।

কর্তৃত্বসম্পন্ন বাবা-মায়েরা শিশুদের উপর বলপ্রয়োগ না করে তাদেরকে যেকোনো বিষয়ে যুক্তি সহকারে বুঝিয়ে থাকেন। তারা শিশুদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা এবং প্রয়োজনীয় স্বাধীনতার সমন্বয় করে আগামীর জন্য গড়ে তুলেন।

সেই সাথে নিজেদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের এবং আচরণের কারণ শিশুর কাছে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। এধরণের প্যারেন্টিং স্টাইলকে গণতান্ত্রিক প্যারেন্টিংও বলা হয়।

এধরনের প্যারেন্টিং স্টাইলে শিশুদের চিন্তা ধারা এবং দৃষ্টিভঙ্গি উন্মুক্ত থাকে। ভবিষ্যতে তারা বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়। এসব শিশুরা সুখী হয়, অনেক বেশি অ্যাক্টিভ থাকে, সামাজিক দক্ষতা ভালো থাকে এবং পড়ালেখাতেও ভালো করে। এদের পরবর্তীতে মানসিক জটিলতায় ভোগারও ঝুঁকিও কম থাকে।

বিজ্ঞাপণ

Permissive বা Indulgent Parenting (সহনশীল থাকা বা প্রশ্রয় দেয়া)

Low demandingness. High responsiveness

এ ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইলে বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিয়ম তৈরি করে দিলেও সেই ব্যাপারে তেমন একটা তদারকি করেন না। এককথায় তারা শিশুদের সীমাহীন ছাড় দিয়ে দেন এবং তাদের যেমন খুশি তেমন করে বড় হতে দেন।

স্বৈরাচারী অথবা কর্তৃত্বসম্পন্ন বাবা মায়ের মত শিশুদের প্রতি কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন না। ফলে শিশুরা বুঝতে পারেনা তাদের জন্য ভুল অথবা সঠিক কোনটি। পারমেসিভ বাবা মায়েরা তাদের সন্তানের আচরণগত কোন দিক সুগঠিত করতে গুরুত্বারোপ করেন না। তারা তাদের শিশুদের শাসনের ব্যাপারে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নমনীয় হয়ে থাকেন।

এধরনের অভিভাবকেরা বাসার কোন নিয়ম কানুন তৈরি করলেও তাতে ধারাবাহিক থাকতে পারেন না। শিশু একটু কান্নাকাটি করলেই তাকে ছাড় দেন। মূলত এধরণের প্যারেন্টিং স্টাইলে অভিভাবকেরা বাবা মায়ের চাইতে বন্ধুর ভূমিকায় বেশি থাকেন।

এই ধরনের প্যারেন্টিং এ শিশুরা লাগামহীনভাবে বেড়ে উঠে বিধায় তাদের ব্যক্তিত্ব তেমন একটা সুগঠিত হতে পারে না। বাউমরাইন্ডের  মতবাদ অনুযায়ী এই ধরনের প্যারেন্টিংয়ে শিশুদের মাঝে মূল্যবোধ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব থাকতে পারে।

এই ধরনের বাবা-মায়ের শিশুরা বিভিন্ন ধরেনর সম্পর্কে মানিয়ে চলতে পারেনা। এছাড়াও এসব শিশুদের ক্ষেত্রে ওবেসিটির ঝুঁকি বেশি থাকে কারণ বাবা মা জাঙ্ক ফুড গ্রহণে শিশুকে বাঁধা দেন না এবং তাদের স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস গঠনেও তেমন একটা মনযোগী হন না।

Neglectful বা Uninvolved Parenting( অবহেলা বা উপেক্ষা করা)

Low demandingness. Low responsiveness.

এই ধরনের প্যারেন্টিং এ বাবা মায়েরা শিশুদের চাহিদা এবং প্রয়োজনের দিকে উদাসীন থাকে। তারা শিশুদের প্রচন্ড অবহেলায় মানুষ করেন। এই ধরনের বাবা-মায়ের শিশুরা অতিরিক্ত স্বাধীনতা পেয়ে থাকে। এমনকি তারা শিশুদের মতামতের উপর তেমন একটা হস্তক্ষেপ করেন না।

এভাবে বেড়ে ওঠা শিশুদের জীবনে তেমন কোন শৃঙ্খলা থাকে না। এরা জীবনের বেশিরভাগ সময় অযত্নে বড় হয়ে থাকে। বাবা-মায়েরা শিশুদের প্রতি তেমন একটা আকাঙ্ক্ষা অথবা প্রত্যাশাও রাখেন না।

এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় সাধারণত বাবা-মায়েদের নিজেদের মানসিক কোন সমস্যা থাকে অথবা তাঁরাও শৈশবে অবহেলায় বেড়ে উঠে‌। ফলে তারাও তাদের সন্তানদের অযন্তে বড় করে যা শিশুর ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর।

এই প্যারেন্টিং স্টাইলের শিশুদের ভবিষ্যতে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এরা বেশিরভাগ সময় বাবা মায়ের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যস্ত থাকে। এছাড়াও এই ধরনের শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধের অভাব এবং আচরণগত সমস্যাও দেখা যায়।

কোন ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইল বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকরী?

মনোবিজ্ঞানীরা প্রায় কয়েক দশকের গবেষণার পর Authoritative অর্থাৎ কর্তৃত্বসম্পন্ন প্যারেন্টিং স্টাইলকেই শিশুদের জন্য আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। দেখা গিয়েছে কর্তৃত্বসম্পন্ন প্যারেন্টিং স্টাইলের অভ্যন্তরে যে শিশুরা বেড়ে ওঠে তাদের মানসিক বিকাশ সবচেয়ে বেশি সুগঠিত হয়।

এই শিশুরা সঠিক নিয়মানুবর্তিতায় চলে এবং তাদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি হয়। জীবনে যে কোন সিদ্ধান্ত তারা যুক্তি সহকারে গ্রহণ করতে পারে। কর্তৃত্বসম্পন্ন পিতা-মাতার সন্তানেরা মেধাবী এবং যেকোনো কাজে তুলনামূলক বেশি সফলতা অর্জন করে থাকে। তারা সামাজিক, শিক্ষাগত এবং আচরণগত দিক থেকে অন্যান্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকে।

কর্তৃত্বসম্পন্ন বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের থেকে যতোটা প্রত্যাশা করেন তার চাইতে অনেক বেশি তাদের প্রতি যত্নবান হয়ে থাকেন। তাই এই প্যারেন্টিং স্টাইলের শিশুদের মাঝে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে।

তবে যেহেতু সব বাচ্চাই এক নয় তাই কোন একটি নির্দিষ্ট প্যারেন্টিং স্টাইল যে সব শিশুর উপর একইভাবে কাজ করবে এমন নয়। আরও কিছু ফ্যাক্টর এর পেছনে কাজ করতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে এশিয়ান, আফ্রিকান এবং হিস্পানিকদের ভালো স্কুল পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে Authoritative বা কর্তৃত্বসম্পন্ন প্যারেন্টিং স্টাইল সব সময় ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনেনা। আবার স্পেনে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে Indulgent Parenting এবং Authoritative parenting স্টাইলে একই রকম ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপণ

আবার শিশুর মেজাজের উপর ভিত্তি করেও বাবা মায়ের প্যারেন্টিং স্টাইল পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। সন্তান যদি খুব খিটখিটে মেজাজের হয় তবে বেশিরভাগক্ষেত্রে বাবা মায়েরা Authoritarian বা স্বৈরাচারী প্যারেন্টিং এর দিকে ঝুঁকে পরেন। এমনকি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে শিশুর অসামাজিকতা এবং উগ্র আচরণের পেছনে প্যারেন্টিং স্টাইলের চাইতে তার মেজাজের প্রকৃতি বেশি ভূমিকা রাখে।  

আবার প্যারেন্টিং স্টাইল কতটা কার্যকরী হবে সেটা আপনার প্যারেন্টিং প্র্যাকটিস কেমন তার উপরও নির্ভর করবে। প্যারেন্টিং স্টাইল বলতে বোঝায় সন্তান প্রতিপালনে আপনার মানসিক সাপোর্ট এবং নিয়ন্ত্রণের ধরন । আর প্যারেন্টিং প্র্যাকটিস হলো আপনি তাকে কিভাবে শেখাচ্ছেন, কি কি পদ্ধতি অবলম্বন করছেন সেসব। যেমন সন্তানের লেখাপড়ার বিষয়ে আপনি তাকে মানসিক সাপোর্ট দিতে পারেন তার মতামতকে গুরুত্ব দিতে পারেন কিন্তু  তার জন্য উপযোগী করে তাকে যদি পড়া বোঝাতে না পারেন তবে তার স্কুল পারফরম্যান্স কখনোই ভালো হবেনা।

তবে এতসব তর্ক-বিতর্কের পরেও মনোবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা Authoritative Parenting কেই বেছে নিয়েছেন কারণ এর পক্ষে প্রচুর গবেষণা হয়েছে এবং বেশিরভাগ গবেষণাতেই এর উপকারিতার কথায় উঠে এসেছে। আরেকটি কারণ হলো কোন গবেষণাতে এখন পর্যন্ত এই প্যারেন্টিং স্টাইলের তেমন কোন ক্ষতিকর দিক পাওয়া যায়নি।  

প্রত্যেকটি বাবা মায়ের লক্ষ্য থাকে তাদের সন্তান যেন স্বাস্থ্যবান, সুখী, দয়ালু এবং দায়িত্ববান হয়ে বেড়ে ওঠে। বাকি তিন ধরণের প্যারেন্টিং স্টাইলে এসব লক্ষ্য পূরণ বেশ কঠিন।

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বাচ্চাদের জন্য প্যারেন্টিং স্টাইল কেমন হওয়া উচিত?

সাধারণত প্যারেন্টিং স্টাইলের বেশিরভাগ গবেষণাই করা হয়েছে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা শিশুদের উপর ভিত্তি করে। তবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের প্যারিন্টিং স্টাইল অবশ্যই বাকিদের থেকে কিছুটা আলাদা হবে। কারণ তাদের আচরণগত দিক এবং মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠা বাচ্চাদের থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে।

তাই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য পিতামাতাদের আরো বেশি যত্নবান এবং নমনীয় হতে হবে। তাদেরকে নিজেদের যুক্তি দিয়ে আবদ্ধ না করে তাদের পছন্দ অপছন্দকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এই শিশুদের প্রতি পিতা-মাতার প্রত্যাশা না রেখে তাদেরকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ গড়ে দিতে হবে।

যেমন অটিস্টিক শিশুরা আচরণগত দিক থেকে স্বাভাবিক শিশুদের চেয়ে আলাদা হয়ে থাকে। তারা যেকোন কাজ আর দশটা বাচ্চাদের মত করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে আমাদের এই শিশুদের প্রতি বাড়তি যত্নশীল হতে হবে যাতে তাদের বেড়ে ওঠা সহজ হয়।

পরিশেষঃ

শিশুদের বেড়ে ওঠা এবং ভবিষ্যত কাঠামোর সম্পূর্ণটাই নির্ভর করে বাবা মায়ের প্যারেন্টিং স্টাইলের উপর। আজকে আপনি আপনার শিশুকে যতটা যত্ন এবং উষ্ণতা দিয়ে বড় করবেন ভবিষ্যতে সে ততটাই বিচক্ষণ এবং সুন্দর ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবে।

মনে রাখবেন শিশুদের জন্য অতিরিক্ত কঠোরতা এবং অতিরিক্ত নমনীয়তা দুটোই ক্ষতিকর। তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এই দুটি জিনিসের ভারসাম্য ঠিক রাখাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের যথেষ্ট সময়, পরিমিত শাসন এবং পরিচর্যা দিয়ে গড়ে তুলুন। এতে তাদের মাঝে একটি সুন্দর ব্যক্তিত্ব তৈরি হবে এবং আগামীতে একজন সুনাগরিক হিসেবে সমাজে সমাদৃত হবে।

সবার জন্য শুভকামনা।


Spread the love

Related posts

Leave a Comment