প্যারেন্টিং এর সাধারণ কিছু ভুল | পর্ব-২

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

সবসময় প্রশংসা বা তিরস্কার করা

অনেক সময় বাচ্চার সাধারণ কিছুতেই বেশী বেশী প্রশংসা করতে বাবা মা খুব পছন্দ করে। এর ফলে বাচ্চা মনে করে, সে যা করছে তার চেয়ে বেশী কিছু করার প্রয়োজন নেই। এর ফলে তার সৃজনশীলতার পরিপূর্ণভাবে বিকাশ ঘটে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাবা মা সন্তানের ভুলের জন্য সবসময় তিরস্কার করতে থাকে। সন্তান এই কারনেও হীনমন্যতায় ভুগে।

কি করা উচিত

বিজ্ঞাপণ

সন্তানকে তার ভালো কাজের জন্য অবশ্যই প্রশংসা করতে হবে তবে যে কাজে তার আরও ভালো করার সুযোগ আছে তার জন্য তাকে আরও উৎসাহ দিতে হবে। আর বাচ্চাকে খারাপ কাজের জন্য বকা দিলেও সেটা সবসময় কখনোই করা যাবে না।

বিশেষ করে বাইরের কোন মানুষের সামনে কখনোই বকা ঝকা বা মারধোর করা যাবে না। বাচ্চাকে সময় নিয়ে তার ভুলগুলো ভালো মত বুঝাতে হবে। তাহলে সন্তান নিজের ভুল গুলো যেমন বুঝতে পারবে তেমনি সেই ভুল না করার বিষয়েও সচেতন হবে।

[আরও পড়ুনঃ  শিশুকে প্রশংসা করার সময় যে শব্দগুলোর ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে ]

সন্তানকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়াঃ

বাবা বা মা প্রায়ই বিভিন্ন সময়ে সন্তানের জন্য কিছু করার আশ্বাস দিয়ে থাকেন। সমস্যা হয় তখনই যখন সেই আশা বা প্রত্যাশার চাহিদা সন্তানের মধ্যে তৈরি হবার পর অনেক সময় বাবা মা সেই চাহিদা পূরণ করতে ভুলে যায় বা তা নিছকই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বলে থাকে।  এই ধরণের মিথ্যা আশ্বাসে সন্তান বাবা মার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

কি করা উচিত

সন্তানকে কোন আশ্বাস দিলে তা পূরণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। একান্তই তা সম্ভব না হলে সন্তানকে আদর দিয়ে তার কারণ ভালোভাবে বুঝাতে হবে। এতে সন্তানের প্রত্যাশা পূরণ না হলেও বাবা মা তার জন্য চেষ্টা করছে সেটা বুঝতে পারবে। একই সাথে, সন্তান অন্যায় কিছু আবদার করলে কখনোই শুধুমাত্র তাকে শান্ত করার উদ্দ্যেশ্যে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া যাবে না। তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বাচ্চার ভালো লাগে এমন কোন কাজ তাকে করতে দিতে হবে।

বাবা মা হিসেবে ভুল স্বীকার না করা

মাঝে মাঝে বাবা মা সন্তানের সাথে আচরণগত ভুল করে ফেলে এবং নিজেদের ভুল স্বীকার করতে চায় না। বাবা মা সন্তানদের কাছে নিজেদের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে এই ভুলটা করে। এর ফলে, বাবা মা যেহেতু ভুল হলেও স্বীকার করে না তখন সন্তানও নিজেদের ভুল স্বীকার করার প্রয়োজন মনে করে না। একই সাথে বাবা মাকে আদর্শ হিসেবে মেনে নিতে পারে না।

কি করা উচিত

বাবা মা হিসেবে কোন ভুল হলে এবং সন্তান তা বুঝতে পারলে তার জন্য অবশ্যই ভুল স্বীকার করতে হবে। কখনোই সন্তানের সামনে নিজেকে ভুলহীন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত না। বাবা মা আদর্শ বা ভালো কোন মডেল হতে পারে তবে “ভুলহীন” না। আর ভুল হলে তা স্বীকার করলে সন্তানের বাবা মার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আরো বেড়ে যায়।

[আরও পড়ুনঃ ভুল আচরণের জন্য শিশুর কাছে ক্ষমা চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কেন ]

স্বামী স্ত্রী হিসেবে নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক অবহেলা করা

বাবা মার আদর ও ভালোবাসার অনেকটুকু অংশ জুড়ে সন্তান অবস্থান করে। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই যখন সন্তানকে সময় দিতে গিয়ে স্বামী স্ত্রী নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্কে অবহেলা করে এবং সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে পরোক্ষ ভাবে সন্তানের উপর খারাপ প্রভাব।

আবার, অনেক সময় বিভিন্ন প্রয়োজনে বাবা মা আলাদা থাকে বা সন্তানকে অন্য কারো কাছে রেখে বড় করে। এর ফলেও সন্তান সুস্থ পারিবারিক সম্পর্কের মাঝে বড় হতে পারে না। ধীরে ধীরে সন্তান বাইরের জগতের দিকে বেশী ঝুঁকে যায় এবং পারিবারিক বন্ধনের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে।

কি করা উচিত

সন্তানকে সুস্থ পারিবারিক সম্পর্কের মাঝে বড় করার জন্য বাবা মার একসাথে থাকা এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের সামনে একে অপরের প্রতি ভালোবাসার ছোট ছোট বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হবে যাতে সন্তান বুঝতে পারে বাবা মা হিসেবে তারা একে অপরকে ভালবাসে ও শ্রদ্ধা করে। এর ফলে সন্তান পরিবার থেকেই সুন্দর সম্পর্ক গঠনের প্রতি আগ্রহী হবে।

সন্তানকে বাবা/মার ভয় দিয়ে প্রভাবিত করা

অনেক মা-বাবা এই ভুলটা করে থাকে। বিষয়টাই এমন যে, কোন জায়গা বা জিনিসের প্রতি বাবা মা-র ভয় কাজ করে আর অভিভাবক হিসেবে তাদের বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যায়, তাদের সন্তানের মধ্যেও সেই বিষয়ে ভয় কাজ করবে। বাবা মা অতিরিক্ত সচেতনতায় এই কাজগুলো করে থাকে। তবে এই কারণে সন্তানদের সেই ভয় দূর হবার বদলে তা আরও বদ্ধমূল হয়।

কি করা উচিত

বাবা-মা হিসেবে সন্তানকে খারাপ কিছুর জন্য অবশ্যই সতর্ক করতে হবে কিন্ত কোনভাবে তাদের মধ্যে নিজেদের ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে না। এমন হতেই পারে আপনি যা ভয় পান তা হয়তো আপনার সন্তানের কাছে ভয়ের নয়। আর তাই সন্তানকে এককভাবেও কিছু বিষয় জানতে ও বুঝতে দিন। এতে তার নিজে থেকে যাচাই করে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে।

সন্তানকে নতুন কিছু শিখতে সময় না দেওয়া

কিছু বাবা মা সন্তানকে নতুন কিছু শিখতে প্রায়ই সময় দিতে চায় না। তারা ভাবে সন্তানকে যেহেতু সকল সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে তাহলে কেন তারা সহজেই সবকিছু শিখবে না? কিন্তু বাস্তবতা হল, বুদ্ধিমান বাচ্চাদেরও অনেক সময় নতুন বিষয় শিখতে সময় লাগতে পারে। বাচ্চাদের যদি এই সময়টা না দেওয়া হয় তাহলে তারা নিজেদের প্রতি আস্থা ও নতুন কিছু শিখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

কি করা উচিত

বাচ্চাকে তার নিজের মতো করে শিখার সময় দিতে হবে। পড়াশোনা বা নতুন যেকোনো কিছু শিখতে হলে সেই বিষয়টা তার জন্য সহজ ও মজা করে তুলে ধরার চেষ্টা করতে হবে। বাচ্চা একটু সময় লাগলেও ভালমতো তা শিখবে ও নতুন কিছু শেখার জন্য আগ্রহ তৈরি হবে।

বিজ্ঞাপণ

প্যারেন্টিং এ অসামাঞ্জস্যতা

বাবা মা হিসেবে মাঝে মাঝে খুব কঠোর আচরণ আবার একই বিষয়ে কখনো শাসন না করাকেই প্যারেন্টিং এর অসামঞ্জস্যতা বলে। এই ক্ষেত্রে বাচ্চা দ্বিধায় পড়ে যায় আসলে তার জন্য কি করা ঠিক হবে।

কি করা উচিত

সন্তানকে বুঝতে দিতে হবে, বাবা মা হিসেবে যে বিষয়গুলোতে আপনি কঠোর তা সবসময়ের জন্যই সত্য। একই ঘটনার জন্য কখনো কোমল বা কখনো কঠোর এমন যেন না হয়।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর জন্যে নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠায় অটল ও ধারাবাহিক থাকবেন কিভাবে? ]

সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দায়িত্বশীল হিসেবে নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে গড়ে না তোলা

বাচ্চাকে ছোট থেকেই নির্দিষ্ট কোন রুটিনের ভিতরে বড় না করলে বড় হয়ে তারা অগোছালো হয় এবং কোন নিয়মের মাঝে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে না ও উশৃঙ্খল  জীবন যাপন করতে পছন্দ করে। আবার একই সাথে, সন্তানদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোর গুরুত্ব না বোঝালে তারা সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না ও কোন সম্পর্কের গুরুত্ব বুঝতে পারে না।

কি করা উচিত

ছোট থেকেই বাচ্চাকে নির্দিষ্ট একটি রুটিনের মধ্যে বড় করতে হবে। মাঝে মাঝে একটু এলোমেলো হলেও বাচ্চাকে বুঝতে দিতে হবে এটাও রুটিনেরই একটি অংশ। একই সাথে সন্তানদের কাছে আত্মীয়দের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। এর ফলে বাচ্চারা বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠে। এই বিষয় গুলো ছোট থেকে বিভিন্ন গল্পের ছলে শিখানো যেতে পারে।

একাধিক সন্তানদের মধ্যে গুনগত তুলনা করা  

এই ভুলটা প্রায়ই বাবা মা করে থাকে। কয়েকজন সন্তানের মধ্যে বাবা মা কাউকে বুদ্ধিমান , কাউকে লাজুক বা সুন্দর বাচ্চা হিসেবে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়। কিন্তু এই কারণে অবচেতন ভাবেই বাবা মা বাচ্চাদের মধ্যে তফাৎ তৈরি করেন এবং তাদের শুধু একটিমাত্র ভালো গুনের দিকেই গুরুত্ব দেন। বাচ্চারা এতে নিজেদের অন্যান্য গুন বা স্বকীয়তা জানার ও বোঝার চেষ্টা করে না বা নিজেদের দুর্বল ভাবে। অনেক ক্ষেত্রেই বাচ্চারা নিজেদের একমুখী করে ফেলে।

কি করা উচিত

বাচ্চাকে বুঝাতে হবে প্রত্যেকেই অনেকগুলো ভালো গুনের অধিকারী এবং সেই গুণগুলো নিজস্ব স্বকীয়তায় কম বা বেশী হয়ে তাদের আচরনের মাধ্যমে ফুটে উঠে। এর ফলে বাচ্চারা নিজেদের গুণাবলীর চর্চা করতে শিখবে ও নিজেদের সবসময় জানার চেষ্টা করবে।

[ আরও পড়ুনঃ সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রভাব | প্যারেন্টাল ফেভারিটিসম ]

বাবা মা হিসেবে নিজেদের সময় দিতে ভুলে যাওয়া

আপনাদের সমাজে “মি টাইম” কথাটার সেইভাবে কোন প্রচলন নেই। কিন্তু একজন মা বা বাবা হিসেবে প্রত্যেক বাবা মার নিজেকে দিনের কিছুটা সময় দেওয়া উচিত। এই সময়টাকেই বলে “মি টাইম”। কিন্তু বাবা মা হবার পর সন্তান, সংসার বা প্রাত্যাহিক জীবনে সবাই এতটাই ব্যস্ত হয়ে যায় যে নিজের জন্য যে আলাদা করে সময় দিতে হয় সেটাই ভুলেই যায়। আর এই কারণে ব্যাক্তিগত জীবনে অভিভাবকগন সবকিছু নিয়ে মানসিকভাবে অনেক চাপের মধ্যে থাকে এবং সরাসরি ভাবে এর প্রভাব সন্তানের উপর পড়ে। 

বিজ্ঞাপণ

কি করা উচিত

বাবা মা হিসেবে দিনের মধ্যে ১৫-৩০ মিনিট রাখতে হবে নিজেজের জন্য। এই সময়টাতে নিজেকে নিয়ে ভাবুন,নিজের যা করতে ইচ্ছে হয় সেটা লিখে রাখুন, নিজেকে কিভাবে গুছাতে চান সেই বিষয়গুলো একটু ছোট করে লিখে রাখুন।

“মি টাইম” নতুন উদ্যোমে কাজ করার উৎসাহ দেয় এবং অনেক গোছালো ভাবে সব কাজ করতে সাহায্য করে। একই সাথে  মানসিক চাপ দূর হবার কারণে সন্তানের উপর প্রত্যাশার চাপটাও কিছুটা কমে যায় এবং সন্তানের সাথে অহেতুক চিল্লা-চিল্লি করার প্রবণতাও অনেক কমে যায়।

সন্তানকে সবসময় সুখী রাখার চেষ্টা করা

ছেলে মেয়েরা কোথাও প্রত্যাখাত হলে, কোন জন্মদিনের উৎসবের নিমন্ত্রন না পেলে, কিংবা সে কিছু চেয়ে না পেয়ে কান্না করলে কিছু কিছু বাবা মা সাথে সাথে অস্থির হয়ে ওঠেন। আপনি যদি শিশুর প্রত্যেকটা মন খারাপের বিষয় নিয়েই হস্তক্ষেপ করে থাকেন, তাহলে আপনার শিশু হয়ত শিখছে যে মন খারাপ করা খুবই ভুল একটা কাজ।

কি করা উচিত

শিশুদের এটা জানা উচিত কিছু কিছু সময় অসুখী হওয়া বেঠিক নয়। এটা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি আপনি তার সব অসন্তোষ বা দুঃখ  দুর করার জন্য মরিয়া হয়ে যান তবে হয়তো আপনি তাকে এই বার্তা দিচ্ছেন যে মন খারাপ করা বা দুঃখি হওয়া উচিত নয়। আপনার শিশুকে দুঃখবোধসহ সকল ধরণের অনুভুতির অভিজ্ঞতার অর্জনের সুযোগ দিন।

বাবা-মা হওয়া জীবনের অনেক বড় একটি অধ্যায়। সন্তান জন্ম হওয়ার পর থেকে প্রতি ধাপে ধাপে এই অধ্যায়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়। আর তাই বাবা মা হিসেবে প্যারেন্টিং এর সাধারণ ভুলগুলো বুঝে সন্তানকে গুড প্যারেন্টিং এর মাধ্যমে বড় করতে পারলে নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে যোগ্য সন্তান হিসেবে গড়ে উঠবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

পর্ব-১


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Leave a Comment

Related posts