শিশুর জন্যে নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠায় অটল ও ধারাবাহিক থাকবেন কিভাবে?

Updated on

আপনি আপনার শিশুর আচার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে যে ধরণের নিয়মকানুনই প্রতিষ্ঠা করতে চান না কেন, আপনার নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠায় যদি অটল এবং ধারাবাহিক না থাকেন, কোন কিছুই কাজ করবে না। শিশুর আচার আচারণে প্রকৃত সমস্যাগুলো খুঁজে বের করতে ধারাবাহিকতার বিকল্প নেই।

নিয়মিতভাবে শিশুর আচরণের একটা মাত্রা নির্ধারণ করা, শিশুকে দিয়ে সেগুলো পালন করানো, প্রয়োজনে বয়স উপযোগী শাস্তি প্রদান এই কাজগুলো প্রতিদিন ঠিকঠাকভাবে করা আপনার জন্যে যত কঠিনই হোক না কেন, করা উচিত। এবং নিয়মকানুনে ধারাবাহিকতা রক্ষায় যে বিষয়গুলো বার বার বাধা হয়ে আসছে সেগুলো খুঁজে বের করে কিভাবে ধারাবাহিকতা আরো বৃদ্ধি করা যায়, সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

ঘরের নিজস্ব নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠা করুন

পছন্দ অনুযায়ী নিজস্ব কিছু নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠা করুন যাতে এই কানুনগুলো ভঙ্গ হলে নিয়মিত সেটার উপর কাজ করতে পারেন। একটা হোয়াইট বোর্ডে বা পৃষ্ঠায় নিয়মকানুন লিখে ঝুলিয়ে দিন। এতে করে আপনার শিশু বুঝতে শিখবে আপনি তার কাছে কি কি প্রত্যাশা করেন।

আর যখন এই নিয়মগুলোতে সাময়িক পরিবর্তন আনতে হবে, তখন আগে থেকেই আপনার শিশুকে ব্যপারগুলো বুঝিয়ে দিন। যেমন বলতে পারেন,”যদিও ৮ টা বাজে তোমার ঘুমিয়ে যাওয়ার সময়, কিন্তু যেহেতু গরমের ছুটি শুরু হচ্ছে আগামী সপ্তাহ থেকে, তুমি এক ঘন্টা বেশীক্ষণ জেগে থাকতে পারবে”। এতে করে আপনার শিশু বুঝতে শিখবে কোন কোন কারণে নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং সে এটাও বুঝতে পারবে যে নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষমতা শুধু আপনার হাতেই।

ডেইলি রুটিন বানিয়ে নিন

ডেইলি রুটিন অনুসরণ করা শিশুদের জন্যে অনেক সহজ এবং তারা এই কাজটা করতে বেশ পছন্দও করে। সময় অনুযায়ী কখন কি কাজ করতে হবে সেটা ভাগ করে দিলে একইসাথে নিয়মকানুনের ধারাবাহিকতাও রক্ষা করা হবে এবং আপনার শিশু বুঝবে আপনি তার কাছে কি চান।

য়সে একটু ছোট শিশুদের খাবার ও ঘুমানোর ঠিকঠাক সময়ে করার জন্যে রুটিন খুব উপকারি। এছাড়া বয়সে একটু বড় শিশুদের জন্যেও রুটিন উপকারী কারণ এর মাধ্যমে তারা সহজে দেখে নিতে পারবে কখন তাদের হোমওয়ার্ক করা উচিত, কখন খেলাধুলা করা উচিত ইত্যাদি। এর মাধ্যমে তারা তাদের দায়িত্বগুলো নিয়েও সচেতন হবে।

একটা পরিকল্পনা গঠন করুন

যখন আপনার কাছে সম্পূর্ণ একটা পরিকল্পনা থাকবে, তখন ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আপনার জন্যে সহজ হয়ে যাবে। কোন নিয়ম ভঙ্গ হলে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, কোন দুর্ব্যবহারগুলো হলে আপনি তাকে কেমন শাস্তি দেবেন সেটা নিজে ঠিক করে ফেলুন।

শিশুর নিয়মভঙ্গ বা খারাপ ব্যাবহারের কারণে কয়েক মিনিট চুপ করে বসিয়ে রাখা, পছন্দের খেলনাগুলো সরিয়ে রাখা প্রভৃতি শাস্তির পাশাপাশি ভালো ব্যাবহারে পুরষ্কৃত করার ব্যাপারটাও পরিকল্পনায় রাখতে ভুলে যাবেন না আবার!

অন্যান্য তত্ত্বাবধায়কদের সাথে একসাথে কাজ করুন

আপনি ছাড়াও প্রতিদিন আপনার শিশু ভিন্ন পরিবেশে আরো বেশ কিছু মানুষদের তত্ত্বাবধানে থাকে যেমন স্কুলের শিক্ষক, ডে-কেয়ারের পরিচারিকা কিংবা যৌথপরিবারের ক্ষেত্রে অন্য আত্মীয়-স্বজন প্রভৃতি। সবার সাথে মিলে, কথা বলে নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করুন। এর মাধ্যমে মূল সমস্যাগুলো কি কি তা সহজে বের করতে পারবেন। হয়তো এমন সব বিষয় বের হয়ে আসতে পারে যা আপনি হয়তো চিন্তাও করেননি।

এছাড়া একই ব্যাবহারের প্রতিক্রিয়া ঘরে আপনার কাছে একরকম আবার বাইরে আরেক রকম হলে সেটাও শিশুর উপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব শিশুর মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছে সেসব শিশুর ক্ষেত্রে এটা বেশীই জরুরী।

নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেস্ট করুন 

বাবা-মা’র মেজাজ এবং মুড শিশুর নিয়মানুবর্তিতায় বড় ভূমিকা পালন করে। আপনি যখন বেশ ক্লান্ত বা বিদ্ধস্ত অবস্থায়, আপনি হয়তো শিশুর নিয়মকানুন ঠিকঠাক রাখতে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে চাইতে পারেন।

অনেক মা-বাবা আছেন যাদের ধৈর্য্য কিছুটা কম, শিশুর একটু আকটু উল্টাপাল্টা ব্যবহারেই মেজাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন; আবার অনেকে আছেন শিশুর উপর এতটাই ক্লান্ত হয়ে যান যে কিছু সমস্যাকে সমস্যাই মনে করে না যার কোনোটাই ঠিক না। মুডের দিকে খেয়াল না করে প্রয়োজন হয় তো জোর করে হলেও শিশুর নিয়মানুবর্তিতায় যাতে কোন ব্যঘ্যাত না ঘটে সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখুন।

কেবল ছোটখাট হুমকি-ধামকিতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না

নিয়মকানুন ভঙ্গের কারণে আপনি যদি আপনার শিশুকে বার বার কেবল হালকা ধমক কিংবা হুমকিই দিয়ে যান, এটাও নিয়মকানুনের ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে দিতে পারে। আপনি যদি দেখেন যে এই জিনিসটা বারবার ঘটছে, বুঝতে হবে আপনাকে কিভাবে বাগে আনতে হয়, সেটা আপনার শিশু শিখে গিয়েছে।

কিন্তু আপনার শিশুকে এটা বিশ্বাস করাতে হবে যে, আপনি যেটা বলছেন, সেটা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। শুধু হুমকি ধামকিতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না। নিয়মকানুনের প্রক্রিয়া ঠিকঠাক অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, তা দেখভাল করুন এবং না হলে, পরিকল্লনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।

অপেক্ষাকৃত বেশী সমস্যাযুক্ত ব্যবহারগুলো নিয়ে আগে কাজ করুন

আপনার শিশুর সাথে প্রতিদিনকার সকল যুদ্ধ যদি আপনি একসাথে জিতে নিতে চান তাহলে কিন্তু কোনোটারই ঠিকঠাক সমাধান হবে না। নিয়মকানুনে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে অবশ্যই আপনাকে বেছে বেছে সমস্যা ধরে এগুতে হবে। যদি আপনার পরিকল্পনায় অনেক বেশী নিয়মকানুন ও তার উপযোগী শাস্তির ব্যাবস্থা রাখেন, তাহলে গন্ডগোল পাকিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

আপনার শিশুর আচার-আচরণে যদি অনেক বেশীই সমস্যা থাকে সেক্ষেত্রে বেছে বেছে অপেক্ষাকৃত বেশী সমস্যাযুক্ত আচরণ নিয়ে প্রথমে কাজ শুরু করুন। ছোট-বড় সব সমস্যা একসাথে ঠিক করতে চাইলে শিশুর পাশাপাশি একসময় আপনিও ক্লান্ত হয়ে পড়বেন এবং এক পর্যায়ে ধারাবাহিকতা ভেঙে যাবে।

নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখুন

শিশুর কান্নাকাটি কিংবা আবদারে ভুলে যাবেন না। মনে করুন আপনার শিশু অতিরিক্ত সময় ধরে বেশ কয়েকবার টিভিতে কার্টুন দেখায় আপনি আগামী ২৪ ঘন্টার জন্যে কার্টুন দেখায় নিষেধাজ্ঞা দিলেন। এখন আপনার শিশু হয়তো কান্নাকাটি করে কিংবা রাগ করে থাকতে পারে অথবা আপনাকে বলতে পারে যে সে আর এমনটি করবে না। নাহ, এতে আপনার ভুলে গেলে চলবে না। আপনি তাকে ২৪ ঘন্টার আগে টিভির রিমোট কিছুতেই দেবেন না।

এক্ষেত্রে কিছুটা কঠোর হতেই হবে। কারণ আপনি যদি তার কান্না শুনে বা রাগ দেখে কিংবা কথায় ভুলে তাকে সময়ের আগেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেন, তাহলে সে বুঝে যাবে এই জিনিসটা দিয়ে যে কোন শাস্তি কমিয়ে বা একেবারে মওকুফ করিয়ে ফেলা যাবে এবং এতে সে প্রশ্রয়ও পেয়ে যাবে।

পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হবে

আচার আচরণে কোন সমস্যা থাকলে সেটা কখনোই রাতারাতি পরিবর্তন হবে না। সুতরাং, আপনার কোন পদক্ষেপ যদি সাথে সাথেই কাজ না করে, তাহলে সেটাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেবেন না। শিশুকে প্রতিনিয়ত আচরণ ঠিক রাখার একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখতে হবে৷ তাকে ঠিকঠাক অনুসরণ করবেন। সে যতবার ভুল করবে, আপনি তাকে ততবারই মনে করিয়ে দেবেন, প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নেবেন। এক্ষেত্রে কোনভাবেই আপনার ভুলে যাওয়া কিংবা হাল ছেড়ে দেওয়া চলবে না। আপনি যদি প্রত্যেকবার ধারাবাহিক থাকতে পারেন, তবেই আপনার শিশু ধীরে ধীরে নিজের ব্যবহারে পরিবর্তন আনা শুরু করবে।

পরিকল্পনা অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদী করুন

অধিকাংশ মা-বাবা’ই যে ভুলটা করেন, তারা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা ভাবনা করেন না। হ্যা, শিশুর এখন যে বয়স, তার খারাপ আচরণগুলো নিয়ে খুব বেশী একটা না ঘাটালে বর্তমান সময়টা হয়তো কিছুটা হাসিখুশিতে কাটবে কিন্তু এই সময়েই যদি পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, ভবিষ্যতে হয়তোবা এটার জন্যে আফসোস করা লাগতে পারে।

আপনি যদি এখন শিশুর বাধনহারা জীবনকে একটু একটু করে শৃঙ্খলা ও নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে পারেন তাহলে তার মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা, সময়ানুবর্তিতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণসহ আরো অনেক গুণাবলি বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমেই আপনার শিশু সুস্বাস্থ্যবান ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ হিসেবে ভবিষ্যতে বেড়ে উঠবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts