নবজাতকের স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাসের ধরণ

Updated on

আপনার নবজাতক শিশু যখন একটু অসামাঞ্জস্যভাবে নিঃশ্বাস নেবে, সাথে সাথেই আপনার মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে আপনার শিশুর কোন সমস্যা হচ্ছে না তো! তবে তেমনটা নাও হতে পারে।

একেক শিশু একেক রকমভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারে। আপনি যেটা নিয়ে ভয় পাচ্ছেন, সেটা হয়তো আপনার শিশুর জন্যে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।

শব্দ করে নিঃশ্বাস নেওয়া (Noisy Breathing Pattern)

আপনার নবজাতক শিশু শব্দ করে নিঃশ্বাস নিলে সাথে সাথেই বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। জন্মের পর পর প্রথম কয়েক মাসে শিশু শুধু নাক দিয়েই নিঃশ্বাস নেয়, যার কারণে শিশু যখন নিঃশ্বাস গ্রহন করে কিংবা ছাড়ে, নাক ডাকা, গলার ঘরঘর শব্দ কিংবা শিস বাজার মতোসহ বিভিন্ন ধরণের শব্দ হতে পারে।

এটা নিয়ে খুব বেশী ঘাবড়ে যাবার প্রয়োজন নেই। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকুন, খেয়াল রাখুন – শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার অন্যান্য লক্ষণগুলোর দিকে খেয়াল রাখুন । নিম্নোক্ত ব্যাপারগুলো আপনার শিশুর সাথে ঘটে থাকলে, দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়াই শ্রেয়।

  • শরীরের যেসব অংশে বেশী রক্ত প্রবাহিত হয়, যেমন ঠোট, জিভ, যৌনাঙ্গ – এসব নীলচে ভাব আসা। (তবে শিশুর হাত-পা নীল হয়ে আসাটা অস্বাভাবিক কিছু না। নবজাতকের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া কিছুটা অপরিণত অবস্থায় থাকায় এটা হতে পারে। তাই শুধুমাত্র হাঁট বা পা নীল হয়ে গেলে সেটা তেমন একটা উদ্বেগের কারণ নাও হতে পারে।)
  • অস্বাভাবিক দ্রুত নিঃশ্বাস নিচ্ছে। (মিনিটে প্রায় ৬০ বারের বেশি)
  • শিশুর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া। নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় শিশুর নাক ক্রমাগত ফুলে ওঠা এবং বুক অস্বাভাবিকভাবে দেবে গেলে বুঝতে পারবেন যে শিশুর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
  • ঠিক মতো খাচ্ছে না।
  • শিশু তেমন একটা নড়াচড়া করছে না।

শিশু ঘনঘন হাঁচি দেওয়া (Sneezes Frequently)

আপনার নবজাতক শিশুকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে এসে দেখলেন, সে বারবারই হাঁচি দিচ্ছে। আপনি এই সিদ্ধান্তে পৌছে গেলেন যে, আপনার পোষা কুকুর, বিড়াল কিংবা পাখিটা থেকেই শিশুর এলার্জি হচ্ছে। আপনি আপনার পোষা প্রানীটিকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিলেন, কিন্তু তারপর দেখলেন, আপনার শিশুর অবস্থা অপরিবর্তিত, এর সাথে পোষা প্রানীটির কোন সম্পর্কই নেই।

শিশু শুধু নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নেয় – এর মানে হলো যত ধুলো ময়লা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে, সব নাকেই জমা হয়। শিশুর নাকের ছিদ্র অনেক ছোট হওয়াতে সে বার বার হাঁচি দিয়ে নাকে জমা হওয়া ময়লা পরিষ্কার করে। আর তাইতো, হাঁচি মানেই টেনশান, ব্যাপারটা এমন নয়। এটার মানে হলো আপনার শিশুর শ্বসনতন্ত্র ঠিকঠাকই কাজ করছে।

কিন্তু হাঁচির সাথে আরো অন্যান্য কিছু সমস্যা যেমন বমি, ডায়রিয়া, নিশ্বাসের সময় শোঁ শোঁ শব্দও করা, একটানা কান্না (কলিক) এসব লক্ষ্য করে থাকেন, সেক্ষেত্রে খুব সম্ভবত আপনি যে ফর্মুলা দুধটি খাওয়াচ্ছেন, সেটা থেকে শিশুর এলার্জির সমস্যা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ডাক্তার কিংবা পুষ্টিবিদের সাথে কথা বলুন, তিনি দুধটি পাল্টে এলার্জির সমস্যা হবে না, এমন দুধের পরামর্শ দিতে পারেন।

থেমে থেমে নিঃশ্বাস নেওয়া (Periodic Breathing)

আপনার শিশু যখন ঘুমিয়ে থাকবে, তখন আপনি এই পিরিয়ডিক ব্রিথিং বা থেমে থেমে নিঃশ্বাস নেওয়ার বিষয়টি খেয়াল করবেন। খেয়াল করলে দেখবেন, একসময়ে সে খুব দ্রুত নিঃশ্বাস নিচ্ছে, এরপর খুব গভীরভাবে নিশ্বাস নিচ্ছে। আবার কখনো মনে হবে সে যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্যে নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছে।

এটাতে চিন্তার কিছু নেই। এটা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশেরই অংশ। শিশুর বয়স বাড়তে থাকলে, এটা ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে চিন্তা করতেই হবে। নিচের ব্যাপারগুলো যদি আপনার শিশুর সাথে হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে এটা পিরিয়ডিক ব্রিথিং এর বাইরেও কিছু যা হয়তো আপনার শিশুর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

  • নিঃশ্বাস বন্ধের বিরতি ১০ সেকেন্ডের বেশী স্থায়ী হলে।
  • নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় ঘোৎ ঘোৎ আওয়াজ করা।
  • শিশুর একটানা কাশি অথবা নিশ্বাসের সময় শোঁ শোঁ শব্দ করা।
  • এত গভীর নিঃশ্বাস নেওয়া যে বুকের পাজরের হাড় উপরে নিচে উঠানামা করা।

এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

শিশুর ‘প্রথম সর্দি’ ও বন্ধ নাক (The False “First Cold” and Stuffy Noses)

শিশুর জন্মের প্রথম কয়েক মাসেই তাকে ‘প্রথম সর্দি’টা ধরে ফেলা অস্বাভাবিক কিছু না। এখানেও আপনার শিশুর নাকটা কত ছোট, এবং ধুলোবালি ময়লা ঢুকে নাক প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার যোগাড় হতে পারে সে কথা আসছে। তবে এক্ষেত্রে শিশুদের চেয়ে মায়েরাই বরং বেশী চিন্তিত থাকেন। এক্ষেত্রে আপনার শিশুকে আপনার সাহায্য করার তেমন প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো যা হচ্ছে, তা আপনা আপনিই বন্ধ করার সুযোগ দিতে হয়।

তবুও যদি আপনি আপনার শিশুকে কোনভাবে সাহায্য করতে চান, সেক্ষেত্রে আপনি আপনার শিশুর রুমকে ধুলোবালি এবং পোষা প্রানীর লোম থেকে মুক্ত রাখতে পারেন, স্যালাইন ড্রপ দিতে পারেন এবং যদি খুব বেশি প্রয়োজন হয় তবে নাসাল অ্যাসপিরেটর (Nasal Aspirator) ব্যাবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে কিন্তু অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই করতে হবে।

আপনার শিশুর যদি নাক বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো দেখা যায়, তাহলে আপনি ধরে নিতে পারেন যে আপনার শিশুর ‘প্রথম সর্দি’ চলছে। তখন অবশ্যই ডাক্তারের উপদেশ মেনে চলা উচিত।

  • জ্বর
  • কাশি
  • কম ঘুমানো
  • খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া
  • মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকা।

শিশুর হেচকি (Baby Hiccups)

হেঁচকি আপনার শিশুর পেছনে নাছোড়বান্দার মত লেগে থাকতেই পারে, এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। এমনকি গর্ভে থাকা অবস্থায়ও মা শিশুর হেচকি বুঝতে পারে। বুকের দুধ পান করার সময় বেশী বাতাস পেটে ঢুকে গেলে কিংবা পেটের তাপমাত্রায় হুট করে কোন পরিবর্তন আসলে হেচকি দেখা যেতে পারে। এটা সময়ে সময়ে আপনাআপনিই ঠিক হয়ে যায়।

গ্যাস্ট্রোইসোফ্যাগাল রিফ্লাক্স (GER)‘ নামক সমস্যার কারণেও হেঁচকি হতে আপরে। এই সমস্যা হলে বাচ্চার পাকস্থলী থেকে খাবার প্রায় সময় তার খাদ্যনালীতে উঠে আসে। প্রি-ম্যাচিওর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা বেশি দেখা যায়। তবে সময়ের সাথে সাথে যখন তার পাকস্থলী বড় হতে থাকে এবং তাতে আরও বেশি খাবার জমা হতে পারে তখন এ সমস্যা ঠিক হয়ে যায়।

যদি বাচ্চার মধ্যে অনবরত GER এর লক্ষণ দেখা যায়, যেমন- ওজন না বাড়া, খুব খিটখিটে মেজাজের হয়ে থাকা এবং একটানা কাশি থাকে তবে তা ডাক্তারকে জানানো উচিত।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts