নগর পুড়লে দেবালয় কি এড়ায়?

লিখেছেন- Sharmin Shamon

আজকে আমার মেয়ের দুপুরের খাবার ছিল পালং শাক আর ডাল। অন্য সময়ে হলে হয়তো এর সাথে মাছ বা চিকেন দিতাম। কিন্তু এই দুঃসময়ে ডালই আমার কাছে একটি ভালো প্রোটিন। সলিড শুরু করার পর থেকে সবসময়ই মেয়ের জন্য তিনবেলা আলাদা খাবার রান্না করে এসেছি যেহেতু বাচ্চার গ্রোয়িং এবং ডেভেলপমেন্ট ফেইজ। তার জন্য অনেক ব্যালেন্সড মিল দরকার যা আমাদের বড়দের প্রতিদিনের খাবারে সব সময় থাকেনা। আমাদের থেকে ওর ফুড হ্যাবিট আলাদা হওয়ার কারনেও এটা করতাম। কিন্তু এই প্যানডেমিক এ সেটা আর করছি না বলতে গেলে, করতে পারছিনাও না। একেতো বাজারে যাওয়ার সমস্যা দ্বিতীয়তঃ অপরাধবোধ। শুধু মনে হয় তবুও তো বাচ্চার মুখে খাবার তুলে দিতে পারছি কিন্তু কত শত মা আছেন যারা বাচ্চার মুখে খাবার তুলে দিতে পারছে না। বাচ্চার ক্ষুধার কান্নায় হয়তো রাগে, ক্ষোভে, হতাশায়, অসহায় হয়ে বাচ্চার গলা চেপে ধরতে ইচ্ছে করছে তাদের!! এটা তো অবাস্তব নয়, অনেক মা-ই অভাবে, ক্ষুধার তাড়নায় বাচ্চাদের নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন এমন খবর দেখেছি আগেও।

বিজ্ঞাপণ

এক ভয়ঙ্কর দুঃসময় চলছে পৃথিবীতে এবং সামনে আরো ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করে আছে পৃথিবীর জন্য, পৃথিবীর মানুষের জন্য। জানিনা মানুষ কিভাবে এগুলোর মুখোমুখি হবে, কিভাবে টিকে থাকবে।

যেহেতু আমেরিকাতে আছি তাই এখানকার পরিস্থিতি টুকটাক জানা হচ্ছে। এখানে আজকের দিন পর্যন্ত ২২ মিলিয়ন লোক চাকরি হারিয়ে সরকারী ভাতার জন্য আবেদন করেছেন। ১৯৩০ সালের পর পৃথিবীতে এমন দূর্ভিক্ষ আর আসেনি যা আসতে যাচ্ছে এই করোনা পরবর্তী সময়ে৷ আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের এই বছরের একাডেমিক রিসার্চের জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড পাবেনা!

আমার এক পরিচিত যে ৫ বছর ধরে কঠিন সংগ্রাম করে পিএইচডি শেষে কেবল মার্চের প্রথম সপ্তাহে একটা ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফ্যাকাল্টি পজিশনে অফার পেলো, যা কিনা স্বপ্নের মতো বিষয় এখানে পড়তে আসা বেশিরভাগ মানুষের কাছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ফান্ড ক্রাইসিসের কারনে উনার জবটা ফ্রিজ হয়ে গেলো।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের, অনেক ডিপার্টমেন্ট তাদের নতুন জব, নতুন ছাত্র এসব ফ্রিজ করে দিচ্ছে। কারন তাদের এবারে বাজেট সংকট হবে। আমি আর কতটুকু জানি, এগুলো তো কেবল দুই-একটা দিক। আরো এমন কত-শত দিক যে আছে যা হুমকির মুখে পড়বে!! ভাবুন তো বিশ্বের এক নম্বর দেশের যদি এই হয় তাহলে আমাদের দেশ কোথায় আছে, কি হবে আমাদের দেশের মানুষের সাথে!!!

প্রায় দিনই নিউজ চোখে পড়ে চাল চুরির, তেল চুরির। আসলে বাংলার খেটে খাওয়া মানুষেরা তো আজন্ম বঞ্চিত। এদের জীবনের কোন উন্নতি হয়না, হতে দেয়া হয়না!

বিজ্ঞাপণ

কিছু মানুষকে আবার দেখে মনে হয় এই লকডাউন টা তাদের জন্য একটা শ্রান্তিবিনোদনের ছুটি। এতোদিন কাজের চাপে তারা জীবন উপভোগ করতে পারতো না, রান্না করতে পারতো না, ছবি তুলতে পারতোনা, খেতে পারতো না, খাওয়াতে পারতোনা। এখন সুযোগ পেয়েছে তাই এতোদিনের না পারা কাজ করছে। মানুষ খাবেনা, সারাদিন মুখ ভারী করে বসে থাকবে, খালি হা-হুতাশ করবে তা কিন্তু নয়। বরং এখন মনকে শক্ত করে স্বাভাবিক থাকতে পারাই প্রথম প্রতিষেধক। কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই যে পুরো পৃথিবী কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমার পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে কিন্তু আমার বাড়িতে ধোয়া হলেও আসবে

ধরুন আমার অনেক ভালো জব আছে/ আমার হাসব্যান্ড অনেক ভালো জব করে, ব্যাংকে জমানো টাকা আছে– আমার অভাব হবে না, না খেয়ে থাকতে হবে না, সো নো টেনশন। নাহ, আমি তবুও নো-টেনশনে থাকতে পারবো না। কারন দেশে লকডাউনের কারনে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে, তাতে করে হয়তো আমার হাতে টাকা থাকলেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নাও থাকতে পারে! তখন এই টাকা দিয়ে আমি কী করবো? টাকা যেহেতু খাওয়া যায়না তাই নিশ্চয়ই ক্রয়ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমি অভাবে পড়বো, খাবারের অভাবে। এ তো গেলো খাবার।

এবার আসুন চিকিৎসার বিষয়ে৷ আমার লক্ষ টাকা থাকলেও আমি এখন করোনায় আক্রান্ত হলে ভালো ভেন্টিলেশন পাবোনা যেহেতু দেশে এসবের অভাব। আর অনেক ডাক্তারই হয়তো করোনা পরবর্তীতে চিকিৎসা নাও দিতে পারেন, মারা যেতে পারেন, বাজারে দরকারী ওষুধ নাও থাকতে পারে, তাহলে আমার এই টাকা দিয়ে আমার নিজের, সন্তানের অসুখে চিকিৎসা, ওষুধ কোথায় পাবো? এভাবেও আমি চিকিৎসার অভাবে পড়তে পারি। এমনও হতে পারে চিকিৎসাযোগ্য অসুখেও আমি বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে পারি।

এবার আসুন ভিন্ন প্রসঙ্গে। এই প্যান্ডেমিকের কারনে অনেক মানুষ কাজ হারাবে, ইতোমধ্যে অনেক প্রবাসী কাজ হারিয়ে দেশে এসে গেছে, আরো আসবে, অভাবে পড়বে, দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে। সেই মানুষের মধ্যে অনেকেই জীবন বাঁচাতে অপরাধপ্রবন হয়ে উঠতে পারে যা একদমই অস্বাভাবিক নয়। কারন ক্ষুধার তাড়না মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলে। ক্ষুধার চেয়ে বড় সত্য আর নেই! দেশে আমার আশেপাশে যখন এমন শত শত ভুখা-নাঙা মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়বে তখন সার্বিকভাবে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থতির অবনতি হবে৷ আর আমার ভালো চাকুরি বা টাকা থাকার কারনে অভাবের ছুরির নিচে না গেলেও এই হঠাৎ বেড়ে যাওয়া অপরাধের ছুরির নিচে যে যাবোনা তা কে বলতে পারে!!

বিজ্ঞাপণ

এই প্যান্ডেমিকে আপনি একা নন। এটা আমার, আপনার, আমাদের সবার জন্য দুঃসময়। আসুন আমরা সবাই সবার কথা মাথায় রেখে এই সময়টা একসাথে পেরিয়ে নতুন দিনের, নিরপদ দিনের আশায় বাঁচি। আমরা যেন আমাদের সন্তানদের করোনা, ক্ষুধা, ভয় আর অপরাধমুক্ত পৃথিবী উপহার দিতে পারি সেই লক্ষ্যে কাজ করি।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment