বাচ্চা কোন বয়স থেকে দাঁড়াতে শেখে?

Updated on

প্রথমবারের মত দাঁড়ানো এবং দাঁড়িয়ে থেকে নিচের দিকে তাকানো, এগুলো একটা ছোট্ট শিশুর জন্য খুবই রোমাঞ্চকর বিষয়। আপনার শিশু যখন দাঁড়াতে পারে তখন তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটা জগতের দরজা খুলে যায়। শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং আত্মবিশ্বাসের জন্য  হঠাৎ করেই নতুন এই দক্ষতাটি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুকে দাঁড়াতে এবং দাঁড়িয়ে তার নতুন জগতটাকে অন্যরকম করে দেখার জন্য উৎসাহ প্রদান, তাকে অনেক উৎসাহী এবং উদ্দীপিত করে তোলে। এসবকিছুই তার হাঁটতে শুরু করার প্রথম ধাপ।

আপনার শিশু কখন দাঁড়াতে পারবে?

দাঁড়াতে পারার জন্য প্রথমেই আপনার শিশুর প্রয়োজন পরে তার মাংসপেশির শক্তি এবং তাদের মধ্যে পরিপূর্ণ সমন্বয়।  এর মাধ্যমে শিশু আরো শিখতে পারে কীভাবে গড়িয়ে যেতে হয় এবং বসতে হয়। যদি আপনার শিশু এখনই উপুড় হতে না পারে, তবে এতে ভয়ের কিছু নেই, কেননা অনেক শিশুই গড়াতে শেখার আগেই তার অন্য মাইলস্টোনগুলো অতিক্রম করতে পারে।

চার থেকে সাত মাসের মধ্যবর্তী সময়গুলোতে আপনার শিশু তার হাতের উপর ভর দিয়ে বসতে শেখার জন্য চেষ্টা করতে থাকবে। তবে পাঁচ মাসের সময়ের দিকে শিশুর হাত ধরে আপনি তাকে দাঁড়া করাতে পারেন আর এভাবেই শিশুর স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়াতে শেখার সময়টাকে একটু তরান্বিত করতে পারেন আপনি।

আপনি একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন আপনার হাত ধরে দাঁড়ানোর পর শিশু আপনার দিকে তাকাচ্ছে, কারণ সে দেখে নিতে চাচ্ছে এভাবে দাঁড়ানোতে আপনার অনুমোদন আছে কি না। তবে আপনার শিশু কিন্তু ইতোমধ্যেই দাঁড়ানোর জন্য বেশ উৎসাহী হয়ে উঠবে।

ছয় মাস বসয়ের সময় আপনার শিশুর তার পায়ের উপর নিজের ভর নিতে পারবে এবং পায়ের উপর ভর দিয়ে শরীর উপর নিচ দোলাতে থাকবে। এই সময়ে আপনি তাকে সাপোর্ট দিয়ে মেঝের উপর দাঁড় করাতে পারেন।

ছয় থেকে নয় মাস বয়সের সময় শিশু নিজেকে টেনে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়ে যায়। এই সময়টাতে আপনার শিশু অল্প কিছু সময়ের জন্য নিজে নিজে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হয় এবং তার পরেই হয়তো সে পেছনের দিকে হেলে পড়তে পারে। এই বয়সের সময় শিশুর দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখুন। কেননা ফাঁকা যায়গায় শিশু যদি দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যায় তাহলে সে হয়ত ব্যথা পাবে না কিন্তু এতে সে ভয় পেতে পারে। সে যদি ভয় পেয়ে যায় তাহলে তাকে অনেক আদর দিয়ে এবং জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে হবে।

শিশুর প্রথম জন্মদিনের কাছাকাছি সময়ের দিকে আপনার শিশুর আত্মবিশ্বাস এবং ভারসাম্য দুটোই বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠবে এবং দেখবেন সে কারো সাহায্য ছাড়া এবং কোন কিছু না ধরে নিজে থেকেই দাঁড়াতে পারছে।

আপনার শিশু কীভাবে নিজে থেকে দাঁড়াতে শিখবে?

নবজাতক থেকে দুই মাস বয়স

শিশু জন্ম গ্রহণের পরপরই সে সহজাত ভাবেই তার পা দুটো ভাজ করে ধীরে ধীরে সামনের দিকে ছুঁড়ে দিতে থাকে এবং পায়ের নিচে কোন সাপোর্ট পেলে তাতে পা দিয়ে ধাক্কা দেয়। মাঝে মাঝে তার মাথায় ভালোভাবে সাপোর্ট দিয়ে তাকে আপনার কোলে সোজা করে ধরুন।

আপনি অনুভব করবেন শিশুটি আপনার কোলে থেকেও তার পা ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তবে সে কিন্তু হাঁটার চেষ্টা করছে না, সে শুধু তার দুই পা একসাথে করার চেষ্টা করছে। তার সেই ছোট ছোট পা দুটো তখনো এত শক্ত হয়ে উঠেনি যে সে দাঁড়াতে পারবে তবে এই ধরনের নড়াচড়ার জন্য তার পেশীগুলো শক্ত হতে থাকবে এবং ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানোর মত অবস্থায় যেতে প্রস্তুত হবে।

তিন মাস থেকে ছয় মাস

তিন মাস বয়সের সময় শিশুর সহজাত প্রবৃত্তি পরিবর্তিত হয় ভার বহন করার দিকে। সাধারণ ভাবেই এই বয়সে শিশুর পা এবং হাঁটুতে পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তি আসে না, সে যখন দাঁড়ানোর চেষ্টা করে তখন সেটাকে এলোমেলো ভাবে পা ফেলার মত দেখায়। তবে আর কয়েক মাসের মধ্যেই  শিশু নিজের কিছুটা ভার বহর করার মত সক্ষম হবে এবং পায়ের নিচে যদি শক্ত কিছু থাকে তাহলে সে সেটার উপর ভর দিয়ে নিজের শরীরকে উপরে নিচে ঝাঁকাতে থাকে।

পাঁচ মাস বয়সের সময় দেখবেন তাকে যখন আপনি ধরে দাঁড় করিয়ে দেবেন তখন সে কতটা উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠে। দেখবেন সে তখন আপনার দিকে তাকাচ্ছে, এই বিষয়ে আপনার অনুমতি আছে কি না সেটা বুঝার জন্য এবং শিশুর লক্ষ্য থাকে নিজের পায়ে ভর দিয়ে ঠিকমত উঠে দাঁড়ানো।  

আপনি আপনার কোলের উপর তাকে দাঁড় করিয়ে তার পায়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে দিতে পারেন। দেখবেন সে খুব আনন্দিত হয়ে ঝাঁকাচ্ছে। এবং দেখবেন যে এভাবে এই ঝাঁকানোটাই পরবর্তী কয়েক মাস তার প্রিয় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এভাবে বাউন্স করার জন্য কিছু বাউন্সার আছে যেগুলো অনেক শিশুই পছন্দ করে। তবে যাই হোক, খুব বেশি সময় সেখানে অতিবাহিত না করাই ভালো বরং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শিশুকে বেড়ে উঠতে দিন। তাই প্রতিদিন এই ধরনের বাউন্সারে পনেরো মিনিটের বেশি সময় ব্যয় করবেন না।

ছয় মাস থেকে দশ মাস

এই ছয় থেকে দশ মাস বয়সের সময় আপনার শিশুর হয়ত কোন কিছু ধরে নিজেকে দাঁড়া করানোর চেষ্টা করতে থাকবে। আপনি যদি এমন সময় তাকে কোন সোফার পাশে দাঁড় করিয়ে দেন, দেখবেন সে সোফা ধরে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখছে আর প্রাথমিক অবস্থায় এটা তার জন্য অনেক বড় একটা ব্যাপার।

যেহেতু তার দুই পা দুদিকে ছড়ানো থাকে এবং সে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে তাই মধ্যাকর্ষণের বিপরীতে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় । এই সময়ে সে যখন সোফা ছেড়ে দিবে তখন কিছুটা হেলেদুলে হাঁটতেও পারবে হয়ত। আর যখন সে এই ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকবে, তখন তাকে বাধা দিলে শিশু রেগেও উঠতে পারে, কেননা তখন তার একমাত্র লক্ষ্য থাকে দাঁড়ানো এবং হাঁটা।

শিশুর আশেপাশে জায়গা নিরাপদ রাখার জন্য আপনি কোন ধারালো বস্তু এবং ব্যথা পেতে পারে এমন কোন খেলনা সরিয়ে ফেলতে পারেন এবং তার আশেপাশে কিছু সোফার কুশন এনে রেখে দিতে পারেন। দাঁড়ানো এবং হাঁটার শেখার জন্য কিভাবে পড়লে কম ব্যাথা পাওয়া যাবে সেটা শেখাও গুরুত্বপূর্ণ ।

এই প্রক্রিয়াটি শিশুর ছয় মাস বয়স থেকেই শুরু হতে থাকবে। দেখবেন যখন আপনি তাকে ধরে দাঁড় করাবেন তখন শিশু তার ভারসাম্য রক্ষার জন্য দু হাত দু পাশে ছড়িয়ে দিবে। কিছুদিনের মধ্যেই সে শিখে যাবে কীভাবে হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে পরে যাওয়ার সময় নিজেকে রক্ষা করতে হয়।

নয় মাস বয়সের সময় শিশুর জন্য নিজেকে দাঁড় করানোটা অনেকটাই সহজ হয়ে আসবে। তবে শিশু তখনো হয়ত দাঁড়ানো অবস্থা থেকে নিজ থেকেই ধীরে ধীরে বসতে পারবে না বরং থপ করেই সে হয়ত বসে যাবে।

কোন কিছু না ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টাটাই শিশুর জন্য পরবর্তীতে প্রথম লক্ষ্য হয়ে যাবে কেননা সে ইতোমধ্যে খুব সহজেই কোন কিছু ধরে দাঁড়িয়ে যেতে পারবে।

দশ মাস থেকে এক বছর সময়

দশ মাস বয়সের সময় আপনার শিশুটি কীভাবে হাঁটু বাঁকা করতে তা শিখে যাবে এমনকি দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসতেও পারবে। তবে ব্যাপারটা আপনার কাছে অনেক সহজ মনে হলেও একটা শিশুর জন্য এটা মোটেও সহজ কিছু নয়। দশ মাস থেকে এক বছর সময়ের মধ্যে আপনার শিশু পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে দাঁড়াতে পারে আবার নিজে থেকে বসেও যেতে পারে। তার প্রথম জন্মদিন হতে হতে সে হয়তো কিছু সময় কোন কিছু না ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে।

শিশু দাঁড়ানো শিখে যাওয়ার পর কি করবে?

শিশু দাঁড়ানো শিখে যাওয়ার পর যতক্ষণ পারে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করতে থাকবে। নতুন এক জগত তখন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে আর এই জন্য সে খুবই উত্তেজিত থাকবে। তবে ভারসাম্য রক্ষার জন্য তখনও তার দুই হাতের প্রয়োজন পড়বে তাই সে যখনই কোন কিছু ধরতে যাবে তখন সে পরে যেতে পারে।

তবে যদি সে কার্পেট অথবা নরম মেঝের উপর পরে তাহলে সে তেমন একটা ব্যথা পাবে না। তবে এই সময়ে সে অনেক কান্না করতে পারে এবং রেগে যেতে পারে তবে সেটা ব্যথা থেকে নয় বরং দাঁড়িয়ে থাকতে না পারার হতাশা থেকে।

শিশু যখন ঠিকমত দাঁড়াতে পারবে তখন সে আশেপাশের অনেক আসবাবপত্র ধরে ধরে ঘুরে বেড়ানোর চেষ্টা করতে শুরু করবে। এভাবেই সে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে এবং এক সময় কোন কিছু সাহায্য ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকবে এবং এই সময়ে সে আপনার হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতেও চেষ্টা করবে। মেঝেতে পড়ে থাকা কোন খেলনা সে তখন ঝুঁকে তুলে নিতেও চাইতে পারে।

কীভাবে আপনার শিশুকে দাঁড়ানোর ব্যাপারে উৎসাহ দিবেন?

আপনার শিশু তখনই দাঁড়াবে যখন সে নিজেকে এর জন্য প্রস্তুত মনে করবে। তবে বেশ কিছু খেলা এবং কাজের মাধ্যমে আপনার শিশুর পেশীর শক্তিবৃদ্ধি এবং দাঁড়ানোর ব্যাপারে তাকে উৎসাহী করতে পারেন।

শিশুর সাথে চটপটে হনঃ  

আপনার শিশুকে গড়ানো, হামাগুড়ি দেয়া এবং বসে বসে সামনের দিকে আগানোর ব্যাপারে উৎসাহ দিন। শিশুর আশেপাশের জায়গা যখন সে পৌঁছাতে পারবে তখন এর সাথে সাথে তার স্বাভাবিক কৌতূহল বৃদ্ধি পাবে এবং সে কোন কিছু নাগালে নিয়ে ধরার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠবে।

শিশুর আশেপাশে তার নাগালের বাইরে রঙিন এবং সুন্দর কিছু খেলনা রেখে দিতে পারেন যাতে করে শিশু সেগুলোর কাছে পৌঁছে ধরার চেষ্টা করে। তবে খেয়াল রাখবেন, সেই খেলনাগুলোর যাতে কোন ধারালো কোনা না থাকে এবং সেগুলো শিশুর জন্য নিরাপদ হয়।

শিশুর সমবয়সীদের সাথে খেলার জন্য একটা নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করুন। সমবয়সীদের সাথে খেলতে গেলে শিশু বাকি সবাইকে অনুকরণ করতে চাইবে এবং এটা তার জন্য অনেক মজার একটা বিষয় হয়ে যায়।

আপনার শিশুকে সব কাজে উৎসাহ দিন এবং তার প্রশংসা করুন

অনেক উৎসাহ, হাততালি এবং শিশুর দিকে তাকিয়ে হাসি এই ধরনের কাজের মাধ্যমে শিশু নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসী হয় এবং প্রতিনিয়ত নতুন কিছু করার ব্যাপারে সচেষ্ট হয়। এভাবেই সে যখন দাঁড়াতে শিখবে তখন তার হয়ত কীভাবে বসতে হয় এটা জানার জন্য আপনার সাহায্য প্রয়োজন হবে।

সে যখন উঠে দাঁড়াতে না পারার জন্য অথবা বসতে না পারার জন্য কান্নাকাটি করবে তখন তাকে ধরে বসিয়ে দেয়া অথবা দাঁড় করিয়ে দেয়া থেকে বিরত থাকুন। বরং শিশুকে দেখিয়ে দিন কীভাবে হাঁটু বাঁকা করে নিচে বসতে হয় এবং শিশু যাতে এভাবে বসার জন্য চেষ্টা করে এই ব্যাপারে তাকে উৎসাহ দিন।

আপনার শিশুর প্রায় এক বছর হয়ে গেছে তবে সে এখনো দাঁড়াতেই পারছে নাআপনি এখন উদ্বিগ্ন হবেন কি?

আপনার শিশু যদি তার প্রথম বছর পার করার সময়েও কোন কিছু ধরে দাঁড়াতে না পারে তাহলে পরবর্তীতে ডাক্তার দেখানোর সময়ে ডাক্তারকে সেটা জানান। তবে একটা বিষয় মনে রাখবেন এই ধরনের মাইলস্টোনগুলো অতিক্রম করার ব্যাপারে কোন কোন শিশু খুব দ্রুত হয় আবার কারো জন্য আরেকটু দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন পরে।

এছাড়া আপনার শিশু যদি গর্ভ ধারণের ৩৭ সপ্তাহ পূরণের আগেই জন্ম নিয়ে থাকে অর্থাৎ প্রি-ম্যাচিওর হয় তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই অন্যান্য শিশুদের তুলনায় এই ধরনের মাইলস্টোনগুলো সে একটু দেরিতেই অতিক্রম করবে।

শিশুর অন্যান্য মাইলস্টোনগুলো সম্পর্কে পড়ুন-

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts