ডিসলেক্সিয়া (Dyslexia) কি ? কারণ, লক্ষণ ও করনীয়

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

যুক্তরাষ্ট্রে প্রাইমারী ক্লাসের এক শিক্ষার্থী, যার নাম ছিলো বেনি (Benny) ছোট্ট বেনির কিছুতেই স্কুলে যেতে ভালো লাগতো না, কারন সে ক্লাসের অন্য বাচ্চাদের সাথে পড়াশোনায় ঠিক তাল মেলাতে পারতো না। ক্লাস ফাইভে ওঠার পরও দেখা গেলো, পাঠ্যসূচির মূল দুটি বিষয়েই সে অনেক বেশি পিছিয়েঃ একটি হলো লেখা শেখা এবং অন্যটি রিডিং বা পঠন।

স্কুলের শিক্ষকরা অনেক চেষ্টার পরও তার তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেন না। ক্রমাগত তাকে নিয়ে শিক্ষকদের হতাশা এবং  সহপাঠীদের কৌতুকের তোড়ে বেচারা বেনি স্কুলের উপর দিন দিন আরো বেশী বিতৃষ্ণ হতে শুরু করে।

বিজ্ঞাপণ

জীবনের অন্যান্য বিষয়ে তার বুদ্ধিমত্তায় তেমন কোনো সমস্যা খুঁজে না পাওয়ায় তার বাবা ভাবতেন তার ছেলে নিশ্চয়ই আলসেমি করেই ঠিকমতো চর্চা করছে না। স্কুলে তার নাম ছিলো ‘হাঁদা বেনি’। কিন্তু বেনি হাল ছাড়ার পাত্র ছিলো না। শেষমেষ  এই অপমান থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে সে যোগ দিলো স্কুলের ফুটবল টিমে।

বেনি’র অসাধারন মানসিক শক্তি আর বুদ্ধিমত্তা প্রকাশ পায় যখন সে নিজেকে প্রমান করার জন্য এমন কিছু একটা বেছে নিলো যাতে সে নিজের দক্ষতা প্রমানের সুযোগ পায়। ফুটবলে তার সম্ভবনাময় পারফর্মেন্স তাকে কোচের সুনজরে এনে দেয়। সৌভাগ্যক্রমে টিমের কোচ ছিলেন একজন অসাধারন মানুষ এবং খুব ভালো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন শিক্ষক । বেনির ‘লিখতে’ ও ‘পড়তে’ পারার সমস্যাটিকে তিনিই সবার গোচরে আনেন এবং জানান, বেনী কোনোভাবেই বোকা কিংবা অলস নয়, বরং তার সমস্যাটি একটি বিশেষ রোগ যার নাম ‘ডিসলেক্সিয়া’।  

এই ঘটনা জানার পর বেনির পরিবার এবং স্কুলের টনক নড়ে এবং তারা এ সম্পর্কে নতুনভাবে জানতে শুরু করে। শুরু হয় বেনির জীবনের নতুন এক চ্যালেঞ্জ, যখন সে জানতে পারে, এটি এমন একটি সমস্যা যার কোনো সমাধান নেই, বরং একে জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েই, নতুন উপায়ে এগিয়ে যেতে হয়।  পরবর্তীতে একাগ্রতা এবং নতুন করে ফিরে পাওয়া আত্মবিশ্বাসের জোরে, বেনি একজন নামকরা ফুটবল-স্টার হয়ে ওঠে।“ 

 -উপরের ঘটনাটি হলো  ‘‘How Dyslexic Benny Became A Star: A story of hope for dyslexic children and their parents’ (1996) বইটির সারসংক্ষেপ। মার্কিনি লেখক জো গ্রিফিথ (Joe Griffith) তার নিজের জীবনকাহিনীকে কেন্দ্র করে একজন ডিসলেক্সিয়া-আক্রান্ত মানুষের অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে চেষ্টা করছিলেন একটি কাল্পনিক চরিত্র ‘বেনি’র মাধ্যমে।  

জো গ্রিফিথ’র জন্ম ও বেড়ে ওঠা টেক্সাসে। ডিসলেক্সিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি একাধারে একজন সফল রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, লেখক, কৌতুক অভিনেতা এবং দুর্দান্ত পাবলিক স্পিকার। তাঁর জীবন আমাদের সবার জন্য একটি অনুপ্রেরণামূলক বার্তা যা সাফল্য অর্জনে আমাদের অপারগতাকে পাশ কাটিয়ে আমাদের সুপ্ত সম্ভবনাগুলোর দিকে মনযোগী হতে উৎসাহ দেয়।

শৈশব থেকেই সামাজিক এবং শারিরিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কয়েকটি ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন অধ্যাবসায় এবং নিজের সুপ্তপ্রতিভা বিকাশের সম্ভবনাগুলো উন্মোচন করার মাধ্যমে।

ডিসলেক্সিয়া রোগটি নিয়ে এখন আমরা অনেকেই অল্প বিস্তর জানি, বিশেষ করে , ভারতের ‘তারে-যামিন পার’ নামক মুভিতে ঈশান চরিত্রটির মাধ্যমে আমরা অনেকেই এই বিশেষ সমস্যাটির কথা প্রথমবারের মতো জানতে শুরু করি।     

আসুন জেনে নেওয়া যাক ডিসলেক্সিয়া সম্পর্কে 

ডিসলেক্সিয়া (Dyslexia) কি?

“ডিসলেক্সিয়া” শব্দটি গ্রীক শব্দ থেকে এসেছে যার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় “শব্দ-সঙ্ক্রান্ত সমস্যা”। “ডিসলেক্সিয়া” মূলত একটি স্নায়বিক অসামঞ্জস্যতা, যার ফলে একজন মানুষের ভাষা শেখার এবং ব্যবহার করার যে মূল দক্ষতা তা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যাটি প্রকাশ পায় মূলত লেখা এবং লিখিত কোনো অংশের পাঠোদ্ধার করার সময় কারণ তার জন্য সঠিকভাবে ধ্বনি ও বর্নের সমন্বয় করা সম্ভব হয় না।  খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যাক্তির (dyslexic) লিখতে ও পড়তে বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তবে এটি শারীরিক অন্যান্য সমস্যা যেমন চোখ, কিংবা কান অথবা বুদ্ধিমত্বার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়।   

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত স্নায়বিক-অসামঞ্জস্য দ্বারা সৃষ্ট এই বিশেষ সমস্যাটির অনেকটাই মানুষের অজানা ছিলো। এমনকি আজ পর্যন্ত এই ব্যাধি সৃষ্টির কারন, নিরাময় কিংবা প্রতিরোধের উপায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিশ্চিতভাবে প্রমানিত হয়নি। তবে দ্রুত রোগটি সনাক্তকরন এবং এটি মেনে নিয়েই, বিকল্প কি কি উপায়ে পড়াশোনা করা যায় সে বিষয়ে অনেক পদ্ধতি সাফল্যের সাথে অনুসরণ করা হচ্ছে।  

এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, সব বাচ্চার শেখার ধরন এক হয় না আর সব বাচ্চার শেখা একই গতিতেও চলে না। শেখার পরিবেশ, আগ্রহ ও শিশুর বুদ্ধিমত্ত্বা এবং আরো কিছু বিষয় বাচ্চাদের পড়ালেখা শেখার গতিকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু আপনার শিশুটিকে যদি লক্ষণীয়ভাবে পড়া ও লেখা শেখার ক্ষেত্রে স্ট্রাগল করতে দেখেন এবং এগুলো শেখার ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি বিলম্ব দেখেন, তাহলে সেই শিশু ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত কিনা যাচাই করতে পারেন।

ডিসলেক্সিয়া সম্পর্কে জানার আগে একসময় এই ধরনের সমস্যা দেখা গেলে, সাধারণভাবে বুদ্ধিমত্ত্বাকে দায়ী করা হতো।  কিন্তু এখনকার গবেষণায় এটি প্রমানিত যে, ডিসলেক্সিয়া একধরনের লার্নিং ডিসাবিলিটি বা বিশেষ ‘কিছু বিষয়’ শেখার অক্ষমতা। এর সাথে কোনোভাবেই বুদ্ধিমত্ত্বা কম বা বেশি হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক নেই। পৃথিবীর অনেক সফল এবং বুদ্ধিমান ব্যাক্তি ডিসলেক্সিয়া-আক্রান্ত ছিলেন বলে ধারনা করা হয়।  এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলোঃ  লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, সেন্ট টেরেসা, নেপোলিয়ন, উইনস্টন চার্চিল, কার্ল জাং, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, টমাস এডিসন, স্টিভ জবস সহ বর্তমানকালের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ।

ডিসলেক্সিয়ার কারণ

আমরা জানি, আমাদের মস্তিস্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র শরিরের বেশ জটিল এবং নাজুক অংশ। এর একেকটি অংশ এক এক ধরনের কাজ করে এবং অংশগুলো একে অন্যের সাথে সাথে সমন্বয় করে চলতে থাকে।

মস্তিষ্কের যে অংশটি ভাষার প্রক্রিয়া সংক্রান্ত (ধ্বনি, বর্ন , সংখ্যা) কিংবা কোনো কিছুর অবস্থান মনে রাখা নিয়ে কাজ করে, সেই অংশটি কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা জন্মগতভাবে ব্রেনের বিশেষ কিছু স্থানে কোনো অসামঞ্জ্যস্যতা থাকলে, সেই ব্যাক্তির ডিস্লেক্সিয়া দেখা দিতে পারে।    

‘ডিস্লেক্সিয়া’ একটি শিশুর শব্দের ডিকোড করার (শব্দ শুনে বিশ্লেষণ করা) ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে – অর্থাৎ, ধ্বনি ও বর্নের সমন্বয় করতে সমস্যা হবার কারণে, বানান করতে, নতুন শব্দ শিখতে, শব্দ পড়তে ও লিখতে তাদের সমস্যা হয়।   

সম্প্রতিক গবেষণাগুলোয় জানা গেছে, ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত ব্যাক্তির মস্তিস্ক লিখিত শব্দগুলোকে আলাদাভাবে প্রসেস করে। ডিসলেক্সিক ব্যাক্তি মূলত ব্রেনের বাম পাশের (cerebrum: left hemisphere) সামনের অংশের উপর বেশি নির্ভর করে, সেখানে অন্যান্য সাধারণ পাঠকরা এর পিছনের অংশগুলোর উপরে নির্ভরশীল থাকে। ব্রেইনের কাজের এই পার্থক্যের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে বলে আধুনিক গবেষণাগুলোয় ধারনা করা হচ্ছেঃ

  • জেনেটিক বা বংশগত – যদি কারো এই সমস্যা থেকে থাকে তাহলে সন্তানের মধ্যে অনেকসময় একই সমস্যা দেখা যায়। এর সাথে চোখের , বুদ্ধির কিংবা কানে শোনার সমস্যার সম্পর্ক নেই।
  • ব্রেনের যে অংশটি ভাষার শেখার বিষয়টি নিয়ন্ত্রন করে (left hemisphere)  সেই অংশে কোনো কারনে আঘাত পেলে কিংবা ব্রেন ট্রমা থেকেও হতে পারে।
  • মাতৃগর্ভে থাকাকালীন ব্রেনের বিকাশে কোনো ত্রুটি হলে এটি হতে পারে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, অনেক সময়ই একটি শিশু ADHD এবং ডিসলেক্সিয়ায় একসাথে আক্রান্ত হয়, অর্থাৎ দুটি সমস্যার উপসর্গই বিদ্যমান থাকে।  যদিও দুইটি ভিন্ন সমস্যা এবং একে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত নয়, ADHD এবং ডিসলেক্সিয়া দুটি সমস্যাই ব্রেনের একই বা কাছাকাছি স্থানের কিছু একটি অসামঞ্জস্যতার কারণে সৃষ্ট।

অনেক গবেষকের মতে মাতৃগর্ভে ভ্রূণের ব্রেন ডেভেলপমেন্টের উপর মায়ের খাবার বা নিশ্বাসের সাথে শরিরে প্রবেশ করা হেভী মেটালগুলো কিছু ক্ষেত্রে  ব্রেনের গঠন সংক্রান্ত এধরনের সমস্যা সৃষ্টির জন্য দায়ী হতে পারে। এছাড়াও ড্রাগ, অ্যালকোহোল ইত্যাদি ভ্রূণের ব্রেনের গঠনের ত্রুটির জন্য ভুমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন। যদিও এগুলোর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রমান পাওয়া যায় নি।  

কিভাবে বুঝবেন আপনার সন্তান Dyslexic (ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত) কিনা 

ডিসলেক্সিয়া নির্ণয় করার জন্য কোনো এক ধরণের নির্দিষ্ট পরীক্ষা থাকে না। কারন ডিসলেক্সিয়ার বিভিন্ন মাত্রা থাকে এবং এর উপসর্গগুলো একেকজনের এক একেকভাবে প্রকাশ পায়। সব ডিসলেক্সিক মানুষের সমস্যার ধরণও সবসময় একই হয় না।  তাই Dyslexia নির্নয়ে বিস্তৃত এবং নানা স্তরের পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে।

 বয়সের উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ বিবেচনা করা হয়, যেমন –

থেকে বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে   

বিজ্ঞাপণ
  • বয়সোপযোগী সহজ ও সাধারণ ছড়াগুলো শিখতে সমস্যা হওয়া,  
  • Speech delay বা কথা বলা শিখতে অনেক দেরী হওয়া।
  • ছোটো এবং সহজ শব্দগুলোও শিখতে, উচ্চারণ করতে এবং মনে রাখতে সমস্যা হওয়া।
  • সহজ শব্দও উচ্চারণে সমস্যা হওয়া।
  • সহজ ইন্সট্রাকশান বুঝতে না পারা,
  • দিক নির্দেশনা না বোঝা, যেমন ডান ও বাম দিক আলাদা করতে সমস্যা হওয়া।

তবে ৪ বছরের আগে, কিংবা প্রাইমারি লেভেলে স্কুলে ভর্তি হবার আগে ডিসলেক্সিয়া ডায়াগনোয করা একটু মুশকিল, কারন ওই বয়সে বানান করে পড়া কিংবা ঠিকমতো পেন্সিল ধরার ব্যাপারটি সাধারণ সব বাচ্চার জন্যই কঠিন কিংবা সম্ভব না হতে পারে। তাই মূলত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর এই সমস্যাটি ডিসলেক্সিয়া কিনা তা নির্নয় করা সহজ হয়।   

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ( বছর + )

  • বয়স অনুযায়ী নতুন শব্দ শেখা, মনে রাখা, উচ্চারণ করতে না পারা এবং শব্দের গঠনের মূল ব্যাপারগুলো শিখতে ব্যর্থ হওয়া।
  • অক্ষর, শব্দ এবং সংখ্যার ক্রম অনুসরণ করতে না পারা, কিছু বর্ন উল্টো করে লেখা অথবা এক বর্ণের স্থলে অন্য বর্ন লেখা এবং সময়ের সাথে বিষয়গুলোর উন্নতি না হওয়া। যেমন কিছু উদাহারণ হতে পারেঃ   
  • উল্টো বর্ন বা অক্ষর – d এর স্থলে b লেখা যেমন dog এর স্থলে bog, অথবা m এর স্থলে w লেখা। কিংবা বাংলা ১ লিখতে গিয়ে ইংরেজি 6 এর মতো করে লেখা।   
  • শব্দ গঠনে ধ্বনির ক্রম  অনুসরণ করতে না পারা –যেমন tip লিখতে গিয়ে pit লেখা, left কে felt লেখা কিংবা বাংলায় গরম কে গমর লেখা ইত্যাদি।
  • বোর্ড থেকে দেখে কিছু লেখা বা কিংবা শ্রুতলিপি কিছুতেই ফলো করতে না পারা। এমনকি পরিচিত শব্দগুলিও সঠিকভাবে বানান করতে সমস্যা হওয়া।
  • হাতের লেখা খুব খারাপ এবং অপরিপক্ব হওয়া বয়স কিংবা একই ক্লাসের অন্য বাচ্চাদের তুলনায়। অনেক সময় পেন্সিল ধরতেও সমস্যা হতে পারে যেটি এই স্তরে সাধারণত ঘটে না।
  • রিডিং পড়া এবং লেখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে ধীরগতির হওয়া এবং এই কাজগুলোকে এড়িয়ে যাবার প্রবণতা ও তীব্র অনীহা প্রকাশ করা কিংবা এই কাজগুলো করার সময় খুব তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে পড়া।  
  • সাধারণ কোনো ঘটনা বা গল্প বলার সময় সামঞ্জস্যতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারা।   
  • যুক্তি ও বিচার বিশ্লেষণমূলক কিছু (বয়স অনুযায়ী/ উপযোগী) বুঝতে না পারা। ধাঁধা, কৌতুক কিংবা পাযল ইত্যাদি না বোঝা। কিংবা সহজ অংকেরও সমস্যা সমাধান করতে না পারা।   

** একটি কথা মনে রাখতে হবে, সব সিম্পটম কিন্তু সব ডিসলেক্সিকের একই রকমভাবে প্রকাশ পায় না। একেক জনের একেক রকম সমস্যা এবং সেই সমস্যার প্রকটতা একেক রকম হয়। 

টিনএইজ কিংবা প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে

  • প্রায়ই শব্দ উচ্চারণে ভুল করা, ঠিক জায়গায় ঠিক শব্দটি ব্যবহার করতে না পারা, বা প্রায়ই শব্দ ভুলে যাওয়া।
  • ঘটনা বা গল্প ধারাবাহিকভাবে বলতে না পারা, প্রায়শঃ কথার মাঝখানে খেই হারিয়ে ফেলা।   
  • ভেবে যুক্তি খাটিয়ে, বিশেষ কৌশলে কিংবা বিচার-বিশ্লেষণ করে সমাধান করতে হয় এমন কিছুতে দক্ষতা খুব কম থাকা, কিংবা একেবারেই না থাকা। যেমনঃ গানিতিক সমস্যা, পাযল,  ধাঁধাঁ ইত্যাদি সমাধান  করা, কোনো গল্পের বা কবিতার মর্মার্থ বা সার সংক্ষেপ করতে ব্যর্থতা ইত্যাদি।
  • খুব সহজে মনোযোগ হারিয়ে ফেলা এবং নিয়মানুবর্তী হতে ব্যর্থ হওয়া।
  • লক্ষণীয়ভাবে অসাবধানী, আনমনা এবং জনসমক্ষে নার্ভাস বোধ করা। 

বাবা মায়েদের প্রতি অনুরোধ

যেহেতু ডিসলেক্সিয়ার কোনো নিরাময় নেই, প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যেও দেখা যায়, তবে early intervention অর্থাৎ যত ছোটো বয়সে এই সমস্যা সনাক্ত করা যায়, এবং যত তাড়াতাড়ি প্রফেশ্যানালদের সাহায্য নিয়ে শিশুকে উৎসাহ প্রদান করে, তার অন্যান্য গুনাবলির বিকাশ ঘটিয়ে এবং ডিসলেক্সিয়া আক্রান্তদের জন্য সহায়ক বিশেষ উপায়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে তাকে নিরাময় অযোগ্য এই সমস্যাটির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে শেখানো শুরু করা যায়, ততই পরবর্তী জীবনে তার সাফল্যের সম্ভবনা বেড়ে যায়।

বাচ্চার শরিরিক এবং মানসিক বৃদ্ধির মাইলস্টোনগুলো নিয়ে জানুন, পড়ুন এবং প্রফ্যাশানালদের সাথে আলোচনা করুন। আমাদের দেশে বাচ্চার বিকাশ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে এখনো অনেকেই (এমনকি শিক্ষিত সমাজের বড়  একটি অংশও)  কুণ্ঠাবোধ করেন। অন্যরা কি ভাববে, আমার ছেলেকে অস্বাভাবিক বলবে, কিংবা আমার প্যারেন্টিং-এর দোষ ধরা হবে –এসব ভাবেন। কেউবা ভাবেন, ছেলে  আলসেমী করে বা ফাঁকিবাজি করে এমনটা করছে- ডিসিপ্লিন কড়াকড়ি করলেই কিংবা বয়স বাড়লে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।

এতে ফলাফল যা হয়- বাচ্চাটি বাসায় কিংবা স্কুলে, পড়ালেখায় এবং নিয়মশৃঙ্খলা পালনে পিছিয়ে থাকার জন্য হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। তার সমস্যাটি কোথায় সেটি ধরতে পারে না, বুঝিয়ে বলতেও পারে না এবং সর্বোপরি পরিবারে এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতা খুঁজে পায় না। ফলে দেখা যায়, তারা নিরাপত্ত্বাহীনতায়  ভুগতে থাকে যেহেতু সমাজিক গ্রহণযোগ্যতার সাথে নিরাপত্ত্বার ভীষণ গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলশ্রুতিতে, কেউ কেউ অবাধ্য বা উচ্ছৃঙ্খল হিসেবে পরিচিতি পায়, আবার কেউ কেউ হয়ে পড়ে ভিতু এবং অসামাজিক।

একটি শিশুর শৈশব-পরবর্তী জীবনের হতাশা এবং উদ্যমের অভাববোধের  একটি মূল কারন শৈশব জীবনে গেঁথে যাওয়া ‘হীনমন্যতাবোধ’। তাই ডিসলেক্সিয়ার সাথে খাপ খাইয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শুধুমাত্র বাবা মায়ের অনুপ্রেরণা সেই শিশুর জীবন গড়ার মূল ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।  

তাই, গতানুগতিক পদ্ধতিতে লেখাপড়ার জন্য শুরুতেই চাপ না দিয়ে বাচ্চাদের প্রাক প্রাথমিক বছরগুলোয় তাদের বিভিন্ন স্কিলগুলো লক্ষ্য করুন খেলা কিংবা অন্যান্য অ্যাকটিভিটিগুলোর মধ্য দিয়ে। ‘ডেভেলপমেন্ট মাইলস্টোন’ থেকে পিছিয়ে পড়া মানে সবসময় কোনো বিশেষ লার্নিং ডিসএবিলিটি হতে হবে এমনও নয়। তাই এ ধরণের কিছু লক্ষ্য করলে অবশ্যই লার্নিং ডিযঅ্যাবিলিটি কন্সালট্যান্ট বা চাইল্ড সাইকোলোজিস্টের পরামর্শ নিন।  

যদি ডিসলেক্সিয়া হয়েও থাকে, দমে যাবার কিংবা নিজেদের দোষী ভাবার কোনোই কারণ নেই। ডিসলেক্সিক বাচ্চাদের শ্রবণ, দৃষ্টি কিংবা বুদ্ধিমত্তায় ঘাটতি থাকে না। তাদের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হলো আপনার কাছ থেকে গ্রহনযোগ্যতা, স্নেহ এবং গাইডেন্স। 

তাই তার অন্য সব প্রতিভা এবং ভালো গুন গুলোর বিকাশে গুরুত্ব দিন এবং পড়াশোনা শেখানোর জন্য বিশেষ পদ্ধতিগুলো নিয়ে ভালোভাবে জেনে নিন। তাদের সাহায্য করুন এবং অনুপ্রেরণা দিন। সাফল্যের শুরুটা এখানেই।  

প্রাথমিক ও প্রি-স্কুলের শিক্ষকদের জন্য বিশেষ বার্তা

স্পেশ্যাল লার্নিং ডিস্যাবিলিটি (special learning disability)  নিয়ে সকল প্রাক –প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিশেষ জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এ বিষয়ে আজকাল আলোচনা হলেও, শিক্ষকদের যুগোপযোগী বিশেষ প্রশিক্ষণের সংখ্যা এখনো নিতান্ত নগণ্য। একটি শিশুর ডিসলেক্সিয়া  এবং অন্য কোনো লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি আছে কিনা তা নির্ণয়ে। অথচ প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক (primary and preschool) পর্যায়ের শিক্ষকদের ভুমিকা সবচেয়ে বেশী ।  

শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে যেসব বিষয়ে একজন ডিসলেক্সিক বাচ্চাকে সাহায্য করতে পারে পারে, তার মধ্যে কিছু সাধারণ পদ্ধতি হলোঃ

বিজ্ঞাপণ

ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির তাদের অসুবিধাগুলোর সাথে মানিয়ে নেয়ার  জন্য সবার আগে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো দরকার। তাই, তাদের ছোট কোনো সাফল্যেও প্রশংসা করে তাদের অনুপ্রেরণা দেয়া।

যেহেতু ডিসলেক্সিক আক্রান্তদের পড়তে সমস্যা হয়, তাদের উচ্চস্বরে কিংবা সবার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু পড়া বা আবৃত্তি করতে না বলাই ভালো, এটি তাদের বিব্রত করে। যদি পড়েও, তাদের ভুলগুলো ক্লাসের বাকি শিশুদের মতো করে একইভাবে বিচার বা মন্তব্য করা যাবে না। ক্লাসের বাকি শিশুদের তার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করুন, যেনো তাদের আচরণ দেখে বিশেষ শিশুটি নিজেকে তাদের চেয়ে আলাদা না ভাবে।

পড়া ভুলে যাওয়া, বাড়ীর কাজ আনতে ভুলে যাওয়া কিংবা নিয়মানুবর্তিতার সমস্যায় শাস্তি প্রদান করা যাবে না। বরং বার বার মনে করিয়ে দিয়ে, মনে রাখার বিভিন্ন উপায় শিখিয়ে দিয়ে ইতিবাচক উপায়ে তাদের কাজগুলো আদায় করতে হয়। স্পেশ্যাল লার্নিং বা শিখন-সমস্যাগ্রস্থ শিশু ক্লাসে থাকলে শিক্ষকদের তার প্রতি কিছুটা আলাদা মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজন হয়।

শিশুদের সহজ ও পরিষ্কারভাবে ধাপে ধাপে নির্দেশ প্রদান করতে হয়। অন্যথায় তাদের জন্য নির্দেশ মনে রাখা ও পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।  প্রয়োজনে নির্দেশ পুনরাবৃত্তি করুন। মনে রাখবেন, নির্দেশ পালনে গাফিলতি তাদের ইচ্ছাকৃত নয়।

ডিসলেক্সিক বাচ্চারা কোনো কিছু কপি করা, যেমন বোর্ড থেকে লেখা খাতায় তোলার ব্যাপারে অসুবিধার সম্মুখীন হলে তার জন্য বিকল্প উপায়ের ব্যবস্থা করা। কোনো প্রশ্নের উওর লিখে দিতে না পারলে, মৌখিকভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিন।

শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ আর মজার উপায়ের সাহায্য নিন। বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে হাতে কলমে কাজ করতে দিন।

ডিসলেক্সিক শিশুর শেখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অপারগতার কারণে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবেলায় এযুগে প্রযুক্তির সাহায্য নেয়া খুবই যুক্তিসঙ্গত এবং সুবিধাজনক।শিক্ষকদের নিয়মিত শিশুর অভিভাবকদের সাথে বিভিন্ন অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান শিশুর শেখার ক্ষেত্রে বিশেষ ভুমিকা রাখে।  

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts