গর্ভাবস্থায় কিভাবে শোওয়া বা ঘুমানো নিরাপদ ?

Spread the love

গর্ভবতী মহিলাদের একটি অন্যতম  বড় সমস্যা হল ঘুমাতে এসে বিছানায় আরাম না পাওয়া। এর কারণ হিসেবে মায়ের শারীরিক বিভিন্ন পরিবর্তন এবং মানসিকভাবে কিছুটা উত্তেজিত কিংবা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকা বিষয়গুলোকে দায়ী করা যায়।

এছাড়াও মায়ের ঘুমানোর ভঙ্গিরও এর উপর বেশ প্রভাব আছে। স্বাভাবিক অবস্থায় কিভাবে গর্ভধারণের আগে ঘুমাতেন তার উপর নির্ভর করে গর্ভাবস্থায় মায়ের শোওয়ার অবস্থান পরিবর্তন করতে হতে পারে।

বিজ্ঞাপণ

চলুন জেনে নেই গর্ভাবস্থায় কোন ভঙ্গিতে শোওয়া নিরাপদ এবং কোন ভঙ্গি ঝুঁকিপূর্ণ সে সম্পর্কে-

চিৎ হয়ে বা পিঠে ভর দিয়ে শোওয়া

গর্ভাবস্থার ১৫ থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যে মায়ের জরায়ুর বেশ অনেকটুকু বৃদ্ধি ঘটে। এসময় পিঠের উপর ভর দিয়ে চিৎ হয়ে শুলে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জরায়ুর চাপে ইনফেরিয়র ভেনা কাভা সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। এই শিরাটি শরীরের মধ্যভাগ ও নিম্নভাগ থেকে রক্ত হৃদপিণ্ডে প্রবাহিত করে। তাই মা যদি চিৎ হয়ে শোয় তবে তা রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে।

চিৎ হয়ে শোয়ার ফলে অ্যাওরটাতেও (Aorta) চাপ পড়তে পারে যার ফলে মায়ের শরীরে এবং প্লাসেন্টাতে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হতে পারে। এর কারণে মায়ের হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল কমে যেতে পারে, দম বন্ধ অনুভুতি হয়ে মায়ের ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে এবং হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যেতে পারে।

গর্ভাবস্থার ১৬ সপ্তাহ পার হয়ে যাবার পর অনেকক্ষণ চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে মায়ের জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হতে পারে, কারণ গর্ভস্থ শিশুটির সকল চাপ তখন রক্তনালীগুলোর ওপর পড়ে। এ সময় মায়ের নাসারন্ধ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে যার কারণে নাক ডাকার সমস্যা দেখা দেয়।

গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে রিলাক্সিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা বিভিন্ন হাড়ের সংযোগস্থলের টেনডনকে আলগা করে দেয়। ফলে এই সময় তাদের হাঁড় যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই গর্ভাবস্থার শেষের দিকে চিৎ হয়ে শুলে মেরুদণ্ডে ও কোমরে চাপ পড়তে পারে এবং ব্যাক পেইন দেখা দিতে পারে।

উপুড় হয়ে বা পেটের উপর ভর দিয়ে শোওয়া 

পেটের উপর ভর দিয়ে শোয়া গর্ভাবস্থার শুরুর  দিকে তেমন কোন সমস্যা না করলেও  ১৬-১৮ সপ্তাহের মধ্যে মায়ের পেটের আকার বেড়ে যাওয়ার কারণে এভাবে শোওয়াটা কঠিন এবং কষ্টকর হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অনেকের এর আগেও পেটের আকার বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করতে পারে। এ সময় থেকে এভাবে শোওয়াটা, চিৎ হয়ে শোওয়ার মতই ক্ষতির কারণ হতে পারে কারণ এর ফলে জরায়ুতে চাপ পড়ে এবং তা পেছনের দিকে অ্যাওরটা ও ভেনা কাভাতে চাপ সৃষ্টি করে।

উপুড় হয়ে যদি শুতেই হয় তবে ডোনাট আকৃতির বালিশ বানিয়ে নিতে পারেন যাতে মাঝামাঝি গোলাকৃতির গর্ত থাকবে। এই গর্তে পেট রেখে এমনভাবে শুতে পারেন যাতে পেটের উপর চাপ না পড়ে।

পাশ ফিরে শোওয়া

চিকিৎসকরা গর্ভাবস্থায় পাশ ফিরে শোওয়ার পরামর্শ দেন। একে বলে sleep on side বা সংক্ষেপে SOS।

গর্ভাবস্থায় পাশ ফিরে শোওয়া বিশেষ করে বাম পাশ ফিরে শোওয়াটা সবচাইতে নিরাপদ।বাম কাত হয়ে শোয়াটা আপনার বাচ্চার জন্যও ভালো কারণ এতে করে পুষ্টি ও রক্ত প্লাসেন্টা দিয়ে সহজেই বাচ্চার কাছে পৌঁছাতে পারে। মায়ের কিডনিও বর্জ্য ও অতিরিক্ত ফ্লুইড শরীর থেকে বের করে দেয়ার জন্য কাজ করতে পারে। এর ফলে মায়ের  হাত-পা-গোড়ালি ফুলে যাবার (oedema) সম্ভাবনাও কম থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে যেসব নারীরা গর্ভাবস্থায় বাম কাতে শোয়, তাদের মৃত সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা কম থাকে; অন্তত যারা অন্য পজিশনে শোয় তাদের চাইতে। তবে প্রকৃতপক্ষে মৃত সন্তান প্রসবের নির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো বিশেষজ্ঞরা বুঝে উঠতে পারেনি এবং এর সাথে অনেক বিষয় জড়িত।

বিজ্ঞাপণ

এই গবেষণায় কেবল ঘুম-সংক্রান্ত প্রভাবগুলো, যেমন নাক ডাকা, বার বার বাথরুমে যাওয়া, এবং ঘুমানোর পজিশন ইত্যাদি বিষয়ই দেখা হয়েছে। তবে স্লিপিং প্যাটার্নই দায়ী কি না সেটা বোঝার জন্যও আরো অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছে।

এভাবে শোওয়া যদি আপনার অভ্যাস না থাকে তবে এখনই ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত আপনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী শুতে পারেন। এতে বাচ্চার তেমন কোন সমস্যা হয়না।

গর্ভাবস্থার শেষের দিকে ডান পাশ ফিরে শুলে অনেক সময় ভেনা কাভাতে চাপ পড়তে পারে। তবে যারা বাম কাতে বেশিক্ষণ শুতে পারেন না তারা ডান পাশ ফিরে শুয়ে পেটের নিচ বালিশ দিতে পারেন যাতে জরায়ুর চাপ সরাসরি নিচের দিকে না পড়ে।

গর্ভাবস্থায় শোওয়া আরামদায়ক করার কিছু পরামর্শ

ঘুমানোর ক্ষেত্রে মায়ের আরাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন। তাই, আপনার যত খুশি বালিশ ব্যবহার করুন। পায়ের নিচে, পিঠে বালিশ আপনার গর্ভকালীন ব্যথা থেকে দিতে পারে কিছুটা স্বস্তি ও আরামের ঘুম। বালিশের অবস্থান এমনভাবে রাখতে হবে যেন তা শুধু মাথা নয়, মায়ের পেট ও পা কেও সমানভাবে আরাম দিতে পারে। এ সময়ের জন্য উপযুক্ত বালিশ কিনতে পাওয়া যায় বা বানিয়ে নেওয়া যায়। তা সম্ভব না হলে পর্যাপ্ত বালিশের সাপোর্ট থাকা জরুরী।

হাঁটু ভাজ করে বাম পাশ ফিরে শুয়ে পড়ুন এবং দুই হাঁটুর মাঝখানে নরম বালিশ রাখুন। এতে করে আপনার হিপ ও পেলভিস-এর পেশীর ওপর চাপ কম পড়বে।  পেটের নিচে লম্বা বালিশ দিতে পারলে পিঠের দিকে টান কমায়। রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে যদি খেয়াল করেন যে আপনি চিত হয়ে ঘুমাচ্ছেন, তাহলে সাথে সাথেই বাম দিকে ফিরে যেতে পারেন। পাশ ফিরে ঘুমানোর সময় পিছনের দিকে বালিশ বা কুশন রাখুন। এটি ঘুমের ঘোরে চিৎ হয়ে যাওয়া থেকে আপনাকে সুরক্ষা দিবে।

ঘুমানোর সময় পাশে আরেকটি বালিশ দিয়ে নিতে পারেন যার কারণে আপনি ঘুমের মধ্যে খুব বেশি নড়তে পারবেন না।যদি বাম কাতে লম্বা সময় শুয়ে থাকার কারণে আপনার হিপে চাপ পড়ে, তাহলে আপনার ম্যাট্রেসের ওপর দেয়ার জন্য একটা নরম ফোম কিনে নিতে পারেন। এতে আপনি আরাম পাবেন আর বাতাস সঞ্চালনও সহায়ক হবে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা অনলাইনেও আপনি মাপ মত ফোম ম্যাট্রেস পাবেন।

শ্বাসকষ্ট থেকে রেহাই পেতে আপনার বুকের পাশেও একটি বালিশ আলতো করে ধরে রাখতে পারেন।বই জাতীয় কিছু দিয়ে অথবা আপনার সুবিধামতো উপায়ে বিছানার মাথার দিকের অংশ কয়েক ইঞ্চি উঁচু করে দিন, এতে আপনার পাকস্থলী এসিডিটি থেকে মুক্ত থাকবে আর আপনার বুকে জ্বালাপোড়াও কম অনুভব হবে।

বিজ্ঞাপণ

ঘুমানোর জন্য কেবল বিছানাই  একমাত্র আশ্রয় এমন না,  আপনার যেখানে শুয়ে আরাম অনুভূত হয়, আপনি সেখানেই শোবেন। সোফায় আরাম পেলে সোফাতেই আবার যদি মেঝেতে বিছানা করে ঘুম ভালো হয় তবে তাই করুন।

গর্ভাবস্থার শেষ দিকে যদি বিছানায় শুয়ে আরাম না পান, তাহলে আরামদায়ক আর্মচেয়ারে কিংবা সোফায় একদিকে ফিরে  শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে পারেন। এটা যে সবসময় কার্যকরী সমাধান হয় তা নয়, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

পরিশিষ্ট

ঘুমের মধ্যে পাশ ফেরা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হবেন না। ঘুমন্ত অবস্থায় আপনার শরীর আপনাআপনিই  আরামদায়ক পজিশনে থাকবে নতুবা আপনাকে জাগিয়ে দেবে। ঘুম থেকে জেগে যদি দেখেন আপনি ঠিক ভাবে শুয়ে নেই তাতে ঘাবড়ে যাবেন না। এতে কোন ক্ষতি হয়ে যায়নি। চিৎ হয়ে শোওয়া, পেটের উপর ভর দিয়ে শোওয়া বা ডান পাশ ফিরে শোওয়া তখনই ক্ষতির কারণ হতে পারে যদি অনেক বেশি সময় ধরে গর্ভবতি মা এসব ভঙ্গিতে শুয়ে থাকেন।

সবশেষে বলতে চাই, আপনার সুবিধা অনুযায়ী সাইড পরিবর্তন করেও শুতে পারবেন। এসব নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করবেন না। মনে রাখতে হবে পর্যাপ্ত পরিমান ঘুমোনোটা  আপনার জন্য এখন সবচাইতে বেশি জরুরি।

সবার জন্য শুভকামনা।


Spread the love

Related posts

Leave a Comment