গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত পানি পান করছেন তো?

Updated on

গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত পানি পান করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল পানির উৎস নিরাপদ কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। কেননা পানির মধ্যে শুধু H20 থাকে ব্যাপারটা এমন না, আপনার পান করা পানির মধ্যে আরো অনেক কিছুই থাকতে পারে।

গর্ভকালীন সময়ে আপনার কি অনেক পানি পান করতে ইচ্ছে করে? হ্যাঁ! এমনটাই হওয়া উচিৎ। অচিরেই আপনি মা হতে যাচ্ছেন, আর এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত পানি পান করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

এই আর্টিকেলটি পড়লে আপনি গর্ভকালীন সময়ে পানি পান করার গুরুত্ব, উপকারিতা (অর্শরোগ সহ আরো অন্যান্য গর্ভকালীন জটিলতা থেকে কীভাবে নিরাপদ থাকবেন) এবং ঠিক কি পরিমাণ পানি আপনাকে পান করতে হবে (আগের চাইতে কতটুকু বেশি পানি পান করতে হবে) এ সম্পর্কে জানতে পারবেন। এছাড়া আপনি আরো জানতে পারবেন, যে পানি আপনি পান করছেন সেটা কিভাবে নিরাপদ রাখবেন।

পানি আপনার গর্ভের শিশুর কাছে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো পৌঁছে দেয়

কখনো কি আপনি ভেবেছেন যে গর্ভকালীন সময়ে আপনি যে ভিটামিন গ্রহণ করেন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খান সেগুলো আপনার গর্ভ পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছে? এই সবকিছুর প্রক্রিয়া শুরু হয় পানির মাধ্যমে। প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করে নিয়ে শরীরের কোষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পানিই আপনার শরীরকে সাহায্য করে।

এছাড়া ভিটামিন, মিনারেল সহ অন্যান্য হরমোন যাতে রক্ত কণিকায় পৌঁছে যায় সে ব্যাপারেও পানি আপনার শরীরকে সাহায্য করে। এবং এই পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ রক্ত কণিকা পরবর্তীতে প্লাসেন্টাতে পৌঁছে এবং সর্বোপরি আপনার গর্ভের শিশু পর্যন্ত পৌছায়। এটা জেনে রাখবেন যে এই ধরনের সকল প্রক্রিয়াই পানির সাহায্যে হয়ে থাকে।   

গর্ভকালীন সময়ে আপনার একটু বেশি পানি পান করা উচিৎ

গর্ভকালীন সময়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনার এবং গর্ভের শিশু উভয়ের জন্যই আপনার একটু বেশি পরিমাণে পানি পান করতে হবে। যদিও পানির পরিমাণটা একদমই নির্ভর করছে আপনার শারীরিক গঠন এবং আপনি কতটা কর্মঠ তার উপর।

সাধারণ হিসেব অনুযায়ী আপনাকে প্রতিদিন আট আউন্স পরিমাণ গ্লাসের ৮-১০ গ্লাস বা ২ থেকে ৩ লিটার পানি (সব ধরণের উৎস মিলিয়ে) পান করতে হবে। তবে সব চাইতে ভালো হয় যদি আপনার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করা এই বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া যায়।

একসাথে অনেক পানি পান না করে বরং সারাদিনে কিছুক্ষণ পর পর পানি পান করুন, কেননা একত্রে অনেক পানি পান করে ফেলাটা আপনাকে অনেক অস্বস্তির মধ্যে ফেলতে পারে।

সাধারণত আমরা অনেকেই পরিমিত পানি খাই না, তাই প্রতিদিন সকালে একটা অথবা দুইটা বোতলের মধ্যে পানি ঢেলে সেগুলো হাতের নাগালের মধ্যে রাখুন যাতে করে যে কোন সময়েই আপনি পানি পান করতে পারেন।

এছাড়া ব্যায়ামের শুরুতে, ব্যায়ামের মধ্যে এবং ব্যায়ামের শেষে নিয়মিত পানি পান করতে ভুলবেন না এবং আবহাওয়া যদি বেশ গরম হয়ে থাকে তাহলে তো পানি করাটা আপনার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। এছাড়া আরেকটি বিষয় জেনে রাখবেন, আপনার যদি তৃষ্ণা অনুভূত হয় তার মানে হল আপনার শরীর পানিশুন্যতায় ভুগছে এবং এই মুহূর্তে পানির প্রয়োজন।

কিন্তু একটা প্রশ্ন আসতেই পারে, সেটা হল কীভাবে বুঝবেন যে আপনি পরিমাণ মত পানি পান করছেন কি না? এর উত্তর হল আপনার যদি নিয়মিত প্রস্রাব হয় এবং তার রঙ ধুসর অথবা রঙ বিহীন হয় তাহলেই বুঝতে হবে আপনার পানি পান করার পরিমাণ ঠিক আছে।

পরিমিত পানি প্রস্রাবের রাস্তায় সংক্রমণ, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং অর্শরোগ প্রতিহত করে

আপনি এই মুহূর্তে গর্ভধারণ করেছেন আর তাই শুধুমাত্র দুইজনের জন্য খাবার এবং পানীয় পান করছেন না বরং আপনি দুইজনের পরিমাণে শরীর থেকে ত্যাগও করছেন। তারমানে হল আপনি শরীর থেকে এখন আগের তুলনায় অতিরিক্ত মলমুত্র ত্যাগ করবেন।

এই সময় পরিমিত পানি আপনার শরীরের বর্জ্য পদার্থ দ্রভিভুত করতে এবং কিডনি থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। এছাড়া পরিমিত পানি আপনার প্রস্রাবকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে এবং মূত্রনালিতে ইনফেকশন থেকে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। কেননা মুত্রথলিতে বেশি সময় ধরে প্রস্রাব রয়ে গেলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর তাই পরিমিত পানি পান করা কেবল আপনাকে মূত্রনালিতে ইনফেকশন থেকেই বাঁচিয়ে রাখবে না বরং মুত্রথলি এবং কিডনির ইনফেকশন থেকেও বাঁচিয়ে রাখবে।

এছাড়া মলত্যাগের ক্ষেত্রেও পানির ভূমিকা অপরিহার্য, কেননা খাবারকে ঠিকমত হজম করে বর্জ্য হিসেবে মলত্যাগ করতে পানি খুবই সাহায্যকারী ভূমিকা পালন করে। এছাড়া যেহেতু গর্ভকালীন সময়ে বেশীরভাগ নারীদের মধ্যেই কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা যায় আর অতিরিক্ত পরিমাণ কোষ্ঠকাঠিন্য এর কারণে অর্শরোগও হতে পারে। এই ধরনের যাবতীয় সমস্যা থেকে পরিমিত পানি পান আপনাকে অনেকটাই স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিতে পারে।

গর্ভকালীন সময়ে অবসাদ, মাথাব্যথা, শরীর ফুলে যাওয়া এবং শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া থেকে পানি আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে

বাইরে তাপমাত্রা কি আসলেই অনেক বেশি—নাকি আপনি গর্ভধারণ করেছেন? হ্যাঁ! এটা সত্য যে গর্ভকালীন সময়ে শরীরের তাপমাত্রা অনেক বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই সময়ে যদি আপনি নিয়মিত এবং পরিমিত পানি পান করেন তাহলে এটা আপনার শরীরকে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করবে। গর্ভাবস্থার বিভিন্ন কারণে যখন শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় তখন পানি ঘাম হয়ে বেড়িয়ে আপনার শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে।

এছাড়াও পানি পানের নিয়মিত ধারা গর্ভকালীন সময়ের অবসাদ থেকে দূরে থাকতে অনেক সাহায্য করে, কেননা পানিশূন্যতার একটা অন্যতম লক্ষণ হল অবসাদ এবং গর্ভকালীন সময়ে আপনার মাথাব্যথাকেও দূরে রাখে (উল্লেখ্য যে মাথাব্যথাও পানিশূন্যতার আরেকটি লক্ষণ)। এছাড়া আপনার শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের হয়ে যাওয়ার জন্য পানি আপনাকে সাহায্য করবে, যেটা আপনার ইডেমা বা শরীর ফুলে যাওয়া কমিয়ে আনবে।

আপনার পানি কি নিরাপদ কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিন

পানি কি পরিষ্কার এবং নিরাপদ কি না সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখা সবসময়েই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো এবং উপকারী একটা পদক্ষেপ এবং বিশেষ করে গর্ভকালীন সময়ে এটা খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়।

পানিতে লিড, মার্কারি এবং আর্সেনিকের মত অনেক ধরনের ক্যামিকেল দ্বারা সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে যেটা আপনার গর্ভের শিশুর জন্য বেশ ক্ষতিকর। এছাড়া আপনি যখন প্লাস্টিকের বোতলে করে পানি পান করতে যাবেন তখন লক্ষ্য রাখবেন BPA নামক এক ধরনের ক্যামিকেলও প্লাস্টিকের মধ্যে পাওয়া যায় যেটা আপনার ও গর্ভের শিশু উভয়ের জন্য বেশ ক্ষতিকর।

ঢাকায় প্রতিদিন যে পরিমাণ পানির চাহিদা থাকে, তার প্রায় পুরোটাই সরবরাহ করে থাকে ওয়াসা।ভূগর্ভস্থ পানি বা নদী থেকে যে পানি আহরণ করা হয় সেটা দুই দফায় পরিশোধনের মাধ্যমে পুরোপুরি দুষণমুক্ত করা হয় ঠিকই তারপরও ঢাকার বাড়িগুলোয় এই বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা যায় না।

তার কারণ যে পাইপ লাইনের মাধ্যমে এই পানি মানুষের বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হয় সেখানে লিকেজ বা পুরানো পাইপের কারণে পানি দুষিত হয়ে পড়ে।এছাড়া বাড়ির ট্যাংকগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করাও পানি দুষিত হয়ে পড়ার আরেকটি কারণ। (সূত্রঃ বিবিসি বাংলা)

পানি বিশুদ্ধ করবেন কিভাবে ? 

ফুটিয়ে:

পানি বিশুদ্ধ করার সবচেয়ে পুরানো ও কার্যকর পদ্ধতির একটি হল সেটা ফুটিয়ে নেয়া।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, পানি ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় ৫ থেকে ২৫ মিনিট ধরে ফোটানো হলে এরমধ্যে থাকা জীবাণু, লার্ভাসহ সবই ধ্বংস হয়ে যায়।

তারপর সেই পানি ঠাণ্ডা করে ছাকনি দিয়ে ছেকে পরিষ্কার পাত্রে ঢেকে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন ওয়াটার এইডের পলিসি ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান আবদুল্লাহ আল মুঈদ।পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পাত্রের পরিবর্তে কাচ অথবা স্টিলের পাত্র ব্যাবহার করার কথাও জানান তিনি।

সেইসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন সেইসব পাত্র বা যে গ্লাসে পানি খাওয়া হচ্ছে সেটি যথাযথভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে কিনা।মিস্টার মুইদ জানান সেদ্ধ করা পানি বেশিদিন রেখে দিলে তাতে আবারও জীবাণুর আক্রমণের আশঙ্কা থাকে।এ কারণে তিনি ফোটানো পানি দুইদিনের বেশি না খাওয়ার পরামর্শ দেন।

ফিল্টার:

পানি ফোটানোর মাধ্যমেই ক্ষতিকর জীবাণু দূর করা সম্ভব হলেও পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত থাকতে ফিল্টারের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করা যেতে পারে।তাছাড়া যাদের গ্যাসের সংকট রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ফিল্টারে পানি বিশুদ্ধ করাই সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি।

বাজারে বিভিন্ন ধরণের ফিল্টার পাওয়া যায়। যার মধ্যে অনেকগুলো জীবাণুর পাশাপাশি পানির দুর্গন্ধ পুরোপুরি দূর করতে সক্ষম।

বাজারে মূলত দুই ধরণের ফিল্টার পাওয়া যায়। যার একটি সিরামিক ফিল্টার এবং দ্বিতীয়টি সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত রিভার অসমোসিস ফিল্টার।বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ সিরামিক ফিল্টার ব্যবহার করে থাকে।

তবে আবদুল্লাহ আল মুঈদের মতে, এই ফিল্টার থেকে আপনি কতোটুকু বিশুদ্ধ পানি পাবেন সেটা নির্ভর করে ফিল্টারটি নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় কিনা, তার ওপরে।

পানিশুন্যতা থেকে দূরে থাকার একমাত্র উপায় কেবল পানিই নয়

পানি অবশ্যই সবচাইতে ভালো, তবে যখন আপনার পান করার মত পানি আশেপাশে থাকবে না তখন কি করতে পারেন? অন্যান্য আরো অনেক পানি জাতীয় দ্রব্য আছে যেটা পানি শুন্যতা থেকে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সেগুলো হলঃ দুধ (৮ আউন্স পরিমাণ দুধে ৭ আউন্স পরিমাণ পানি থাকে), জুস, ফলের রস (জুসের মধ্যে অতিরিক্ত চিনি মিশ্রিত থাকলে অথবা অন্যান্য পানীয়তে যদি সোডিয়াম মিশ্রিত থাকে তাহলে সেগুলো থেকে দূরে থাকবেন) এবং ক্যাফেইন মুক্ত চা পানির অন্যতম ভালো উৎস।

আপনি শুধু ক্যালোরি এবং পাস্তুরিত করা কি না এই সমস্ত তথ্য সম্পর্কে সচেতন থাকবেন।  তবে আপনি অতিরিক্ত সোডা পান করা থেকে দূরে থাকবেন, কেননা এর মধ্যে শুধুমাত্র ক্যালোরি ছাড়া আর কিছুই নেই। এছাড়া ক্যাফেইন সমৃদ্ধ অন্যান্য পানীয় থেকে দূরে থাকবেন, কেননা এগুলো খেলে আপনার অতিরিক্ত প্রস্রাব হতে পারে। এছাড়া গর্ভকালীন সময়ে ক্যাফেইনের অন্যান্য আরো বেশ কিছু ক্ষতিকারক প্রভাব রয়েছে।

মনে রাখবেন, আমাদের খাবার থেকেই শতকরা বিশ ভাগ পানীয় আমরা পেয়ে যাই। এরমধ্যে ফল ফলাদির মধ্যেই পানি বেশি থাকে। যেমন এক কাপ তরমুজের মধ্যে পাঁচ আউন্স পরিমাণ পানি থাকে। এছাড়া মাঝারী আকৃতির নাশপাতি এবং এক কাপ স্ট্রবেরির মধ্যে সাড়ে চার আউন্স পানি থাকে, মাঝারী আকৃতির কমলার মধ্যে চার আউন্স পানি থাকে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts