গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া | কারণ ও করনীয়

Updated on

গর্ভাবস্থায় অনেক মা ই কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। এটা স্বাভাবিক। তবে এর উল্টোটাও দেখা যায়। গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া হওয়া স্বাভাবিক। অনেক মায়েরাই গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে ডায়রিয়ার শিকার হন আবার অনেকে প্রসব যন্ত্রণার ঠিক আগে এতে আক্রান্ত হন। তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে তা প্রসব শুরুর লক্ষন হতে পারে।

২৪ ঘণ্টায় তিনবার বা এর বেশিবার পানিসহ পাতলা পায়খানা হওয়াকে ডায়রিয়া বলা হয়। ডায়রিয়া সাধারণত বেশীদিন স্থায়ী হয়না এবং কয়েকদিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। তবে এ ব্যাপারে সাবধান না হলে এবং প্রতিকার করা না হলে গর্ভাবস্থায় তা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া যদি কয়েকদিন স্থায়ী হয় তবে অবশ্যয় ডাক্তারকে জানাতে হবে। অনেক দিন ডায়রিয়া থাকলে শরীরে খনিজ পদার্থের বা ইলেকট্রোলাইটের অসমতা- অর্থাৎ দেহে সোডিয়াম-পটাশিয়ামের অসমতা এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়। ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানি ও লবণজাতীয় পদার্থ বেরিয়ে গিয়ে পানিস্বল্পতা দেখা দেয়। যা প্রি-ম্যাচিউর লেবারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া কেন হতে পারে?

গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া  হওয়া মানে এই নয় যে তা শুধুমাত্র গর্ভধারণের সাথেই সম্পর্কিত। অন্যান্য কারণেও গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া  হতে পারে, যেমন- পরজীবীর সংক্রমণ, রোগজীবাণু, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, খাবার ও পানির মাধ্যমে খাদ্যবিষ দেহে প্রবেশের কারণে (food poisoning) ডায়রিয়া হতে পারে।

গর্ভধারণ সম্পর্কিত যেসব কারনে ডায়রিয়া হতে পারে তা হোল-

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনঃ অনেকেই মা হতে যাচ্ছেন, এই সংবাদটি পাওয়ার সাথে সাথে খাদ্যাভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। হঠাৎ খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন পাকস্থলীকে আপসেট করতে পারে এবং ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে। মনে রাখা উচিত ডায়রিয়া সবসময় খাদ্যাভ্যাসে খারাপ পরিবর্তনের কারণে হয়না। ভালো পরিবর্তনের কারনেও হতে পারে। যেমন গর্ভধারণের পর অনেক মা ই সুষম খাবার খাওয়া শুরু করেন, পরিমিত পরিমানে পানি খান এবং অনেকেই খাবারের পর কিছুটা হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস ও করেন। এসব কিছুই পরিপাকতন্ত্রকে প্রভাবিত করে যার ফলে ডায়রিয়া হতে পারে।

খাদ্যে সংবেদনশীলতাঃ গর্ভাবস্থায় অনেকেই বিভিন্ন খাদ্যে সংবেদনশীল হয়ে ওঠেন। যেসব খাবার গর্ভধারণের আগে কোন সমস্যায় করতোনা গর্ভধারণের পর সেসব খাবারই অনেকের সমস্যা সৃষ্টি করে। খাদ্যে এ সংবেধনশীলতার কারণে অনেকের পেটে গ্যাস, পাকস্থলীতে সমস্যা এবং ডায়রিয়া হতে পারে।

প্রি-ন্যাটাল ভিটামিনঃ গর্ভাবস্থায় অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শে প্রি-ন্যাটাল ভিটামিন নিয়ে থাকেন যা মায়ের জন্য এবং গর্ভের শিশুর জন্য উপকারী। তবে এ সব ভিটামিনের প্রভাবে মায়ের পাকস্থলী আপসেট হতে পারে এবং ডায়রিয়া হতে পারে।

হরমোনের পরিবর্তনঃ গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে খাদ্য পরিপাক প্রক্রিয়া ধীরে হয়। যার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। তবে মাঝে মাঝে হরমোনের এ পরিবর্তনের কারণে ডায়রিয়াও হতে পারে।

তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে ডায়রিয়া

গর্ভাবস্থায় তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে ডায়রিয়া হওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। প্রসবের দিন এগিয়ে আসার সাথে সাথে ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। এটি প্রসব ঘনিয়ে আসার লক্ষন হতে পারে। ডায়রিয়া প্রসবের ঠিক আগে বা প্রসবের সপ্তাহ দুয়েক আগে দেখা দিতে পারে। যদি ডিউ ডেট এর সপ্তাহ দুয়েক আগে ডায়রিয়া হয় তবে এর মানে এই নয় যে তা প্রি-ম্যাচিউর বার্থ এর লক্ষন।

তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে ডায়রিয়া হওয়া মানে এই নয় যে খুব দ্রুত বাচ্চা প্রসব হবে। এটি বাচ্চা প্রসব করার জন্য মায়ের শরীরকে প্রস্তুত করার কারণেও হতে পারে। তাই এ সময় ঘাবড়ে না গিয়ে প্রসব শুরুর অন্যান্য লক্ষন গুলো দেখা যাচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?

গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া স্বাভাবিক হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যদি ডায়রিয়া একদিনের বেশী থাকে এবং এর সাথে আরও কিছু লক্ষন দেখা যায় যেমন- পেট ব্যাথা, জ্বর, অতিরিক্ত পাতলা পায়খানা, সাথে রক্ত বা মিউকাস যাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোড়া ইত্যাদি থাকে তবে দ্রুত ডাক্তারকে জানাতে হবে।

এছাড়াও যদি মনে হয় বাচ্চা কম নড়ছে বা স্বাভাবিকের চাইতে বেশী নড়াচড়া করছে বা প্রি-টার্ম লেবারের কোন লক্ষন থাকলে যেমন- নিয়মিত কন্ট্রাকশন, যোনিপথে অতিরিক্ত তরল নির্গত হওয়া, পানির মত, রক্ত বা মিউকাস মিশ্রিত তরল নির্গত হওয়া, খিঁচুনি হওয়া , তলপেটে বা পেলভিসে চাপ অনুভব করলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া হলে যা করতে হবে

ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়ার ফলে শরীর থেকে অনেক পানি বের হয়ে যায়। এ সময় পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন হয়ে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।  ডায়রিয়া যত দিন চলে, তত দিন রোগীকে স্যালাইন খাওয়াতে হবে। স্যালাইন শরীরে পানিশূন্যতা রোধ করে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে খাবার স্যালাইন, ভাতের মাড় বা অন্য কোনো বিশুদ্ধ পানীয় পান করালে শরীরে লবণ-পানির ঘাটতি কমবে। জানেন নিশ্চয়ই, এক লিটার পানির সঙ্গে এক মুঠো গুড় বা চিনি ও এক চিমটি লবণ মেশালেই তৈরি হয় খাওয়ার স্যালাইন। প্রাথমিক চিকিৎসায় এটা ডায়রিয়া রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে।

এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে যে প্যাকেট স্যালাইন পাওয়া যায়, সেটাতে থাকে সোডিয়াম ক্লোরাইড, গ্লুকোজ অথবা সুক্রোজ, সোডিয়াম বাই কার্বনেট এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইড। উভয় স্যালাইনই ২৪ ঘণ্টার বেশি রাখা যাবে না এবং চুলায় গরম করা যাবে না।

ডায়রিয়ায় কতগুলো খাবার বেশ উপকারী। যেমন- গাজরের রস, কলা, হলুদের গুঁড়া ও রসুন। গাজরে রয়েছে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, সালফার ও ম্যাগনেসিয়াম। এটা অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে ও বমি রোধ করে। পাকা কলায় আছে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পেকটিন। এটা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটায়। হলুদের গুঁড়াও অন্ত্রের জীবাণু ধ্বংস করে। রসুন ডায়রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে ও প্যারাসাইট ধ্বংস করে। এটা জীবাণুনাশক ও হজমকারক।

গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া হলে BRAT ডায়েট পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। BRAT  মানে হোল Banana Rice Apple Toast। চাল হতে হবে ব্রাউন রাইস আর টোস্ট হওয়া উচিত গমের তৈরি পাউরুটির। এসব খাবারে যে ফাইবার থাকে তা পানি শোষণ করে এবং পায়খানা শক্ত করে। আপেলে পেকটিন থাকে যা ডায়রিয়া উপশম করে।

ডায়রিয়ার সময় আঁশহীন সবজি, ফলের রস, পরিজ, সাগু, টোস্ট বিস্কুট, এরারুট বা বার্লি, পাউরুটি, জেলি, নরম ভাত- এ ধরনের সহজপাচ্য শর্করা দিতে হবে। চায়ের সঙ্গে মুড়ি-খই দেওয়া যায়। ফলের মধ্যে কলা, কমলা, পাকা পেঁপে, ডাব, আপেল ও ডালিম দেওয়া যাবে।

অধিক চর্বি বেশ গুরুপাক। তবে মাখন ও তেল সহজপাচ্য। ঘি, ডালডা, মাংসের চর্বি সহজে হজম হয় না বলে যত কম দেওয়া যায়, তত ভালো। ডুবোতেলে ভাজা খাবার, মসলা ও ঝালযুক্ত খাবার। মিষ্টি, চাটনি, আচার, কাঁচা সবজি, আঁশযুক্ত খাবার, দুধ ও দুধের তৈরি খাবার, ভুসিযুক্ত রুটি, শসা, মাংস ইত্যাদি বাদ দিতে হবে।

যদি কোন ওষুধের কারণে ডায়রিয়া হয় তবে তা হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই আপনার শরীর মানিয়ে নিবে। যদি তা ঠিক না হয় তবে ডাক্তারকে তা জানান। অনেক সময় ব্র্যান্ড পরিবর্তন করলে উপকার পাওয়া যায়।

সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts