গর্ভাবস্থায় এডিমা বা শরীরে পানি আসা বা শরীর ফুলে যাওয়া

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

শরীরের টিস্যুতে অতিরিক্ত তরল জমা  হওয়ার কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যাওয়াকে এডিমা বা শরীরে পানি আসা বলে। এডিমার কারণে শরীরের যেকোনো অংশ ফুলে যেতে পারে তবে হাত ও পায়ে এর প্রভাব বেশী দেখা যায়। গর্ভাবস্থায় এ ধরনের ফোলা খুবই স্বাভাবিক বিশেষ করে পায়ের গোড়ালি এবং পায়ের পাতায়,  কারণ এ সময় শরীরের টিস্যুগুলো অতিরিক্ত পানি ধরে রাখে।

গর্ভাবস্থায় এডিমা বা শরীরে পানি আসা বা শরীর ফুলে যাওয়া

শরীরে পানি কেন আসে বা শরীর ফুলে যায় কেন?

গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধির কারনে স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে গর্ভবতি অবস্থায় একজন মায়ের শরীরে প্রায় ৫০ ভাগ বেশী রক্ত ও তরল উৎপন্ন হয়। এই অতিরিক্ত রক্ত এবং তরলের কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যায়।

বিজ্ঞাপণ

গর্ভাবস্থায় জরায়ুর আকার বাড়ার সাথে সাথে মায়েদের পেলভিক শিরা এবং ভেনা কাভাতে ( শরীরের ডান পাশে থাকা বড় শিরা যা শরীরের নিম্ন অংশ থেকে হৃদপিণ্ডে রক্ত প্রবাহিত করে) চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে শরীরের নিম্নাংশ থেকে হৃদপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ কমে যায় এবং শিরা থেকে তরল বেরিয়ে তা শরীরের টিস্যুতে বিশেষ করে হাত, পা এবং পায়ের গোড়ালিতে জমা হতে থাকে।

শরীরে পানি আসা মায়েদের জন্য অস্বস্তির হলেও এর কিছু উপকারী দিক আছে। এই অতিরিক্ত তরল জমার ফলে মায়ের শরীর নমনীয় থাকে যাতে ভ্রূণ বেড়ে ওঠার সাথে সাথে মায়ের শরীরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়াও অতিরিক্ত তরল মায়ের পেলভিক জয়েন্ট এবং টিস্যুগুলোকে প্রসবের জন্য উপযোগী করে তোলে।

সাধারণত তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে শরীরে পানি আসা বা ফুলে যাওয়ার প্রবনতা দেখা দেয়। যাদের এমনিওটিক ফ্লুইড বেশী থাকে এবং গর্ভে যমজ সন্তান থাকে তাদের ক্ষেত্রে এর মাত্রা বেশী থাকতে পারে। সাধারণত দিনের শেষভাগে বা গ্রীষ্মকালে এটি বেশী হতে পারে।

সন্তান প্রসবের পর দ্রুত ফোলা কমে যায় কারণ এ সময় অতিরিক্ত তরল শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। প্রসবের পর কয়েক দিন এ কারণে অনেক ঘাম হয় এবং ঘন ঘন প্রস্রাব হয়।

কখন ভয়ের কারন হতে পারে

বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই গর্ভাবস্থায় শরীর ফুলে যাওয়া বা এডিমা খুবই স্বাভাবিক। এতে ভয়ের কোন কারণ নেই। বেশীর ভাগ মায়েরাই কম বেশী এ সমস্যায় ভোগেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এডিমা ভয়ের কারণ হতে পারে। যদি শরীর ফুলে যাওয়ার সাথে সাথে মাথা ব্যাথা থাকে এবং দৃষ্টি ঝাপসা মনে হয় তবে তা প্রি-এক্লাম্পশিয়ার লক্ষন হতে পারে।

প্রি-এক্লাম্পশিয়া হলে উচ্চ রক্তচাপও থাকবে। তবে  প্রি-এক্লাম্পশিয়ার লক্ষন  সাধারণত গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহের পরে দেখা দেয় এবং এটি অনেক বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

সাধারণত শরীর ফুলে যাওয়াতে কোন ভয়ের কারণ থাকেনা যদি না এর সাথে অন্যান্য লক্ষনও  দেখা দেয়, যেমন- দম বন্ধ অনুভুতি, মাথা ব্যাথা, ঝাপসা দৃষ্টি, ফোলা অংশে ব্যাথা, ফুলে যাওয়া রক্তনালী ইত্যাদি। এছাড়াও হঠাৎ করে শরীর ব শরীরের কোনো অংশ ফুলে যাওয়া বা অনেক বেশী ফুলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সাবধান থাকতে হবে।

আরেকটি ভয়ের কারণ হোনো  যদি শুধুমাত্র এক পা ফুলে যায় বা এক পা যদি অন্য পায়ের চাইতে বেশি ফুলে যায়। যদি এমন হয় এবং কাফ ও থাই-তে  ব্যাথা অনুভূত হয় তবে তা রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষন হতে পারে। একে ডীপ ভেইন থ্রমবোসিস (Deep vein thrombosis) বলেরক্ত জমাট বাঁধা বিপদজনক হতে পারে কারণ জমাট বাঁধা রক্তের কিছু অংশ ছিঁড়ে লাংসে চলে যেতে পারে ।

হরমোনের পরিবর্তনের কারণে গর্ভাবস্থায় রক্ত জমাট বাঁধতে পারে বিশেষ করে প্রথম ট্রাইমেস্টারে। তাই যখনি মনে হবে আপনার এক পা অন্য পায়ের চাইতে বেশী ফুলে আছে অতিসত্বর আপনার ডাক্তারকে জানান।

যদি ধূমপানের অভ্যাস থাকে, ওজন বেশী থাকে, বয়স ৩৫ বা তার বেশী হয় এবং এ সমস্যার পারিবারিক ইতিহাস থাকে তবে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেশী থাকে। তাই এ ধরনের কোন পারিবারিক ইতিহাস থাকলে তা অবশ্যই আপনার ডাক্তারকে জানিয়ে রাখুন।

এছাড়াও যদি মুখ ফুলে যায়, চোখের চারপাশে ফোলা থাকে, হাত বা পা অতিরিক্ত ফুলে যায় তবে এ বিষয়ে অবশ্যই ডাক্তারের  পরামর্শ নিতে হবে।

গর্ভাবস্থায় ফোলা কমাতে কি কি করা যেতে পারে?

পায়ের উপর ভর দিয়ে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে না থাকার চেষ্টা করুনঃ

বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বা পা নিচের দিকে মাটিতে রেখে বসে থাকলে শরীরের শিরার উপর চাপ পরে যার ফলে ফোলা আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে কিছুক্ষন পর পর কিছু সময় বসে থাকুন। বসার সময় পা কিছুর উপর তুলে রাখতে পারেন। আরামদায়ক জুতা ব্যাবহার করুন। টাইট জুতা বা লম্বা হীলের জুতার কারণে পা অনেক  বেশী ফুলে যেতে পারে।

বিশ্রাম নেয়ার সময় পা উপরের দিকে তুলে রাখুনঃ

যখন বিশ্রাম নেবেন বা শুয়ে থাকবেন তখন পায়ের নীচে বালিশ বা উঁচু কিছু রেখে পা উপরের দিকে তুলে রাখুন। এতে যেমন আপনার রিলাক্স হবে তেমনি এতে শরীরে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হবেনা। সবচাইতে ভালো হয় যদি শুয়ে থাকা অবস্থায় পা আপনার হার্টের অবস্থানের চাইতে উপরে রাখা যায়। তবে যে ভঙ্গিটি আপনার জন্য আরামদায়ক সেভাবেই থাকুন।

ঢোলা, আরামদায়ক এবং সুতির কাপর পরার চেষ্টা করুনঃ

গর্ভাবস্থায় ঢোলা এবং আরামদায়ক কাপড় পরার চেষ্টা করুন যাতে শরীর কোনো  চাপ না পড়ে। এছাড়াও সুতির কাপড় পরলে অতিরিক্ত গরম লাগার হাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন। গরমের কারণে এডিমা বাড়তে পারে।

বিজ্ঞাপণ

নিয়মিত হাঁটাচলা বা ব্যায়াম করার চেষ্টা করুনঃ

ব্যায়ামের ফলে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকে এবং অতিরিক্ত তরল দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। তবে কোন কোন ব্যায়াম গর্ভাবস্থায় আপনার জন্য উপযোগী সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করে নিন। নিয়মিত হাঁটাচলা করুন এবং মুভমেন্টে থাকার চেষ্টা করুন।

আরামদায়ক এবং ঠাণ্ডা পরিবেশে ঘুমানোর চেষ্টা করুনঃ

আপনার শোওয়ার ঘর যাতে ঠাণ্ডা, আরামদায়ক এবং বাতাস চলাচলের ব্যাবস্থা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। বাম পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। এতে শরীরের ডানপাশে থাকা শিরায় চাপ কম পরে যা শরীরের নিম্নাংশ থেকে হৃদপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ করে। বিছানার চাদর যাতে আরমদায়ক হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা উচিৎ।

খাবার লবনের পরিমান কম রাখুনঃ

অতিরিক্ত লবন শরীরে পানি ধরে রাখে। তাই খাবারে অতিরিক্ত লবন পরিহার করুন। সোডিয়াম সমৃদ্ধ খাবার ও প্যাকেটজাত খাবার না খাওয়ার চেষ্টা করুন। অতিরিক্ত সোডিয়াম কমানোর আরেকটি উপায় হলো  পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, যেমন- কলা, অ্যাপ্রিকট, কমলা, মিষ্টি আলু, বিট ইত্যাদি।

প্রচুর পরিমানে পানি খানঃ

শরীরের অতিরিক্ত পানি কমানোর জন্য ঘন ঘন পানি খাওয়া কিছুটা অদ্ভুত মনে হলেও গর্ভাবস্থায় এটি উপকারী। এতে আপনি যেমন হাইড্রেটেড থাকবেন তেমনি এর ফলে অতিরিক্ত তরল প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। তবে চিনি সমৃদ্ধ পানীয়, যেমন সোডা বা প্যাকেটজাত জুস না খাওয়াই ভালো।

অতিরিক্ত গরমে বাইরে না যাওয়ার চেষ্টা করুনঃ

অতিরিক্ত গরমে যেহেতু এডিমার সম্ভবনা বেশি থাকে, তাই গরমে বাইরে না যাওয়ার চেষ্টা করুন এবং যথসম্ভব ঠাণ্ডা এবং আরামদায়ক স্থানে থাকার চেষ্টা করুন।

সাঁতার কাটুন বা পুলে হাঁটার চেষ্টা করুনঃ

পানিতে নেমে সাঁতার কাটা এক্ষেত্রে বেশ উপকারী কারণ এতে শরীরে রক্ত এবং তরল প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে। যদি সাঁতার না জানা থাকে, তবে সুইমিং পুলে নেমে পানিতে হাঁটাহাঁটি করা যায়। এতেও উপকার পেতে পারেন।

খাবারের দিকে নজর দিনঃ

বিজ্ঞাপণ

গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্যকর এবং সুষম খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে শরীরে পানি আসার সমস্যা কমে যেতে পারে। ধুমপানের কারণে এ সমস্যা বাড়তে পারে তাই ধুমপানের অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করুন।

আক্রান্ত স্থানে মাসাজ করা যেতে পারেঃ

কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে মাসাজের ফলে শরীরে ফোলা কমতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে বেশী জোরে মাসাজ করা না হয় যাতে ব্যাথা লাগে। এমনভাবে মাসাজ করা উচিত যাতে মাসাজের স্ট্রোকগুলো হার্টের দিকে হয়।

এছাড়াও গর্ভাবস্থার উপযোগী কিছু কমপ্রেশন স্টকিংস, টাইটস এবং মোজা পাওয়া যায়। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে সেগুলো ব্যাবহার করতে পারেন।

সবশেষে মনে রাখতে হবে,  এডিমা বা শরীরে পানি আসা গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক যদি না এর সাথে ঝুকিপুর্ন লক্ষনগুলো দেখা দেয়। তাই সতর্কতা জরুরী। গর্ভাবস্থায় সতর্কতা সুস্থ গর্ভধারণ এবং সুস্থ স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment