গর্ভস্থ শিশুর গায়ের রং ফর্সা করা কি সম্ভব?

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

আমাদের এই উপমহাদেশে অনেকটা প্রকাশ্যেই মানুষ ত্বকের রং নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন। আমাদের কাছে আসা বিভিন্ন প্রশ্ন থেকে আমরা কিছুটা  অবাক হয়েই লক্ষ্য করেছি বেশিরভাগ হবু মা-বাবা চান তাদের  অনাগত সন্তানের গায়ের রঙ যেন উজ্জ্বল হয়। কেউ কেউ সরাসরি বলতে দ্বিধা করেন বলে নানা উপায়ে জানতে চান ঠিক কি করলে বা গর্ভাবস্থায় কি খেলে বাচ্চার গায়ের রং ফর্সা হবে? কিংবা অনেকেই নিজের নাম উহ্য রেখে পরিবারের কেউ জানতে চান বা পরিবার থেকে চাপ প্রয়োগের কথাও বলেন। রং ফর্সাকারী ক্রিমগুলোর চাহিদা শত সমালোচনা স্বত্বেও তুঙ্গে থাকে। আর ইউটিউবে গর্ভধারণ সম্পর্কিত সবচাইতে বেশি ভিউ পাওয়া ভিডিওগুলো হচ্ছে এই বিষয়টি নিয়ে।

গর্ভস্থ শিশুর গায়ের রং ফর্সা করা কি সম্ভব?

আজকের আলোচনায় আমরা কেন মানুষের এই ফর্সা ত্বকের জন্য এতো আগ্রহ -এই ধরণের আলোচনায় যাবো না, আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় মূলত গর্ভস্থ সন্তানের গায়ের রং কিভাবে নির্ধারিত হয়, এবং এই অনাগত শিশুর গায়ের রং ফর্সা কিংবা উজ্জ্বল করার পেছনে মায়ের কিছু করনীয় বা ভূমিকা আছে কিনা, এ ব্যাপারে প্রচলিত ধারণাগুলো কি এবং এসব ধারণার পেছনে আসলেই কোন বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি আছে কিনা।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

গর্ভের শিশুর গায়ের রং কিভাবে নির্ধারিত হয়

আমাদের ত্বকের তিনটি প্রধান স্তর আছে। এগুলো হলো- এপিডারমিস, ডারমিস ও হাইপোডারমিস। প্রত্যেকটি স্তরে ভিন্ন ভিন্ন ধরণের কোষ থাকে যাদের কাজও ভিন্ন ভিন্ন। আমাদের গায়ের রং কেমন হবে তা নির্ধারণ করে সবচাইতে বাইরের স্তর অর্থাৎ এপিডারমিস। আরও নির্দিষ্ট করে বললে এই স্তরের দুধরণের কোষঃ  ক্যারাটিনোসাইট এবং মেলানোসাইট এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ক্যারাটিনোসাইট কোষগুলো ত্বকের বাহ্যিক আবরণ তৈরি করে। মেলানোসাইট কোষগুলো থাকে এপিডারমিসের একেবারে নীচের দিকে। মেলানোসাইট কোষগুলোতেই আমাদের শরীরের পিগমেন্ট মেলানিন তৈরি হয়। প্রত্যেকটি মানুষের শরীরে মেলানিনের পরিমাণ ভিন্ন হয়। আর এই মেলানিনের পরিমাণের উপরই নির্ভর করে কার গায়ের রং কেমন হবে। মেলানিনের পরিমাণ বেশি হলে গায়ের রং গাঢ়  বর্ণের হবে,  আর কম হলে হালকা বর্ণের হবে।

আমাদের শারিরিক বৈশিষ্ট্য কেমন হবে তা নির্ধারিত হয় আমাদের জিনের ক্রোমসোমের মাধ্যমে, যাকে বংশগতির ধারক বলা হয়- এটি  প্রত্যেকটি মানব শিশু তাদের বাবা মায়ের কাছ থেকে পেয়ে থাকে এবং বাহ্যিক কিছু এই জীনগত বৈশিষ্টের পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। ডিম্বাণু যখন শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয় তখনি নির্ধারণ হয়ে যায় বাচ্চা তার বাবা মায়ের কোন জিনগুলো ধারণ করবে।

যে জীনগুলো মানুষের গায়ের বৈশিষ্ট্য ধারণ থাকে সেগুলো  মেলানোসাইট কোষগুলোকে নির্দেশ দেয় কতটুকু মেলানিন উৎপন্ন করবে এবং তা কি ধরণের হবে । আর এভাবেই নির্ধারিত হয় একটি মানুষের গায়ের রং কেমন হবে। তাই বলা যায় গর্ভধারন বা শিশুর কন্সেপশনের সময়ই তার গায়ের রং নির্ধারিত হয়ে যায়। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের খাওয়া কোন খাবার তা পরিবর্তন করতে পারেনা।

এমনকি শিশুর জন্মের পরও তার গায়ের রং পরিবর্তন করার কোন উপায় নেই। কখনো কখনো স্বাস্থ্যগত বা পরিবেশগত কোন কারণে শিশুর গায়ের রং পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু এটি ক্ষণস্থায়ী। যখনই এসব বিষয় ঠিক হয়ে যাবে তখন শিশুর ত্বক তার স্বাভাবিক রং ধারণ করবে।  এই রং কখনোই স্থায়ীভাবে পরিবর্তনযোগ্য নয়।

যেমন- কেউ যদি কড়া রোদে বেশিক্ষণ থাকে তবে তার শরীরে মেলানিন উৎপাদন বেড়ে যায় এবং গায়ের রং গাঢ় হয়ে যায় আবার টানা কয়েকদিন কড়া রোদ থেকে দূরে থাকলে মেলানিন উৎপাদন আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। একইভাবে কোন অসুস্থতার কারণে মানবদেহে মেলানিন উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং গায়ের রং কিছুটা ফ্যাকাসে হয়ে যেতে পারে। অসুস্থতা সেরে গেলে গায়ের রং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

এবার আসা যাক, রং ফর্সাকারী ক্রিম বা বিভিন্ন পণ্যের বিষয়ে।  কিছু রাসায়নিক পদার্থ বা ক্রিম বা অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করে অস্থায়ী ভাবে ফর্সা হওয়া সম্ভব, যা ত্বকের জন্য খুব ক্ষতিকর। এগুলো নানা ধরণের চর্মরোগ, এমনকি ত্বকের ক্যান্সারেরও এর ঝুঁকি বাড়ায়। মনে রাখতে হবে,  আমাদের ত্বকের কোষ খুব দ্রুত পরিবর্তনশীল । অর্থাৎ, আমাদের শরীর থেকে ক্রমাগত কিছু কোষ মরে যায় এবং সেগুলো ঝরে গিয়ে নতুন কোষ তার জায়গা নেয়। নতুন তৈরী হওয়া কোষ কিন্তু আপনার জিনগত বৈশিষ্ট্য  অনুযায়ী তৈরী হবে। তাই এসব পদ্ধতিতে যতই ফর্সা হোন না কেন আবার সেই জন্মগত যেই রং ছিল সেটিই ফিরে আসবে। তাই শুধু শুধু এইসব ক্ষতিকর পদ্ধতি ব্যবহার না করাই ভালো।

যেসব খাবার খেলে গর্ভের শিশু ফর্সা হবে বলে মনে করা হয়

জাফরান দুধ:

অনেক মহিলা গর্ভবতী অবস্থায় জাফরান দেয়া দুধ পান করে থাকেন। মনে করা হয় জাফরান গর্ভের শিশুর গায়ের রঙ ফর্সা করে। এটি ভুল ধারণা। গবেষণায় দেখা গেছে জাফরান গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ ও মুড সুইং নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে,  তবে অতিরিক্ত জাফরান খাওয়া এসময় ক্ষতিরও কারণ হতে পারে।  এর কারণে জরায়ুর সঙ্কোচন হতে পারে যার কারণে প্রি-টার্ম লেবার বা গর্ভপাতের মত ঘটনা ঘটতে পারে। এমনকি প্রথম ট্রাইমেস্টারে জাফরান না খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

নারকেল:

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী নারকেলের সাদা শাঁস গর্ভের শিশুর গায়ের রং ফর্সা করে। গবেষকদের মতে নারকেলে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে যা ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে এমনকি ভ্রূণের ত্বকের গঠনেও এর উপকারী ভূমিকা থাকতে পারে। তবে ত্বকের রং ফর্সা করার সাথে নারকেলের কোন সম্পর্ক নেই।

গর্ভাবস্থায় নারকেল খাওয়ায় কোন নিষেধ নেই,  তবে অতিরিক্ত খাওয়া মোটেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এই বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে।

দুধ:

দুধে থাকা পুষ্টি উপাদান ভ্রূণের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে হাঁড় ও দাঁতের গঠনে।কিন্তু দুধ খেলে তা মায়ের গায়ের রঙই   ফর্সা করেনা, গর্ভের ভ্রূণের ক্ষেত্রে সে প্রশ্নই আসেনা।

চেরি ও বেরি জাতীয় ফল:

চেরি ও বেরি জাতীয় ফলে উচ্চমাত্রার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে যা ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে এবং ত্বকের ক্ষতি রোধ করে। তাই স্ট্রবেরি, ব্ল্যাক বেরি, ব্লু বেরি ইত্যাদি ফল খাওয়া হয় সুন্দর ত্বকের জন্য। তবে সেগুলো পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, গর্ভের শিশুর ক্ষেত্রে নয়।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

আলমন্ড

আলমন্ডে থাকা পুষ্টি উপাদান ভ্রূণের বৃদ্ধিতে বেশ উপকারী। আলমন্ড গ্রহণে ত্বক সুন্দর হতে পারে, তবে ত্বক ফর্সা হয়না। সেক্ষেত্রেও, এটি মায়ের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। গর্ভের শিশুর জন্য নয়। 

এছাড়াও আরও বেশ কিছু খাবার যেমন, কমলা, টমেটো, ঘি, আনারস, মৌরি, ডিম ইত্যাদি খেলেও গর্ভস্থ শিশুর ত্বক ফর্সা হবে এমন ধারণা সমাজে বেশ প্রচলিত। এদের মধ্যে কিছু কিছু খাবার গর্ভাবস্থায় খাওয়া উপকারী আবার কিছু খাবার অতিরিক্ত খেলে গর্ভবতী মা ও সন্তানের ক্ষতিও হয়ে যেতে পারে। তাই কোন কিছু অন্ধভাবে মেনে চলার আগে সে সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন।  

এটা কিছুটা হতাশাজনক যখন আমাদের কাছে অসংখ্য প্রশ্ন আসে কি খেলে অনাগত শিশুটি  ফর্সা হবে বা ছেলে সন্তান পাওয়ার উপায় কি। অথচ এসময় হবু মা কিংবা বাবার প্রশ্ন হওয়া উচিত একটি সুস্থ পরিবেশে সুস্থ শিশু জন্ম দিতে কোন কোন বিষয় সম্পর্কে জানা দরকার। গর্ভকালীন সময়ে আমাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষিত বিষয় হওয়া উচিত যাতে শিশু এবং মা সুস্থ থাকে। যে রং নিয়েই সে জন্মাক, শিশুটি যেন একটি সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠে এবং সামনের পৃথিবীকে আরো সুন্দর করে তুলতে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment