গর্ভকালীন সময়ে বেডরেস্ট কি আসলেই অনেক উপকারী?

Updated on

বেডরেস্ট কি?

আমেরিকার শতকরা বিশ ভাগ নারীকে তাদের গর্ভকালীন সময়ের কোন না কোন সময়ে বেডরেস্ট অর্থাৎ পরিপূর্ণ বিশ্রাম দেয়া হয়ে থাকে। আদতে এর মানে হল, বেশিরভাগ সময়ে তাকে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। আর এই বেড রেস্টের সময়টা দুই একদিন থেকে দুই এক মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।

তবে ডাক্তাররা সাধারণত গর্ভধারণ করা নারীদের এখন খুব বেশি একটা বেডরেস্টে দিয়ে থাকেন না। কেননা, স্বাস্থ্যকর গর্ভকালীন অবস্থা এবং প্রসবের জন্য বেডরেস্ট কি আসলেই উপকারী কি না, এই ব্যাপারে তেমন একটা প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি।

বেডরেস্ট শব্দটা প্রাথমিক অবস্থায় শুনলে মনে হতে পারে গর্ভকালীন সময়ে কোন কাজ না করে শুয়ে থাকাটা হয়ত তেমন মন্দের কিছু না। তবে নারীরা গর্ভকালীন অবস্থায় একদম শুয়ে বিশ্রাম নিয়ে সময় কাটাতে তেমন একটা পছন্দ করেন না, এমনকি সেটা দুই একদিনের জন্য হোক না কেন।

বেডরেস্টের এই সময়টা তাদের জন্য অস্বস্তিকর, বিরক্তিকর এবং খুবই অপছন্দের। আর এই চুপচাপ শুয়ে বিরক্তিকর সময় পার করাটা যদি কয়েক দিন থেকে সপ্তাহ-খানেক সময়ে গিয়ে গড়ায় তাহলে এটা আরামদায়ক না হয়ে তাদের কাছে বরং অত্যাচারের মত মনে হতে পারে।

মাঝেমধ্যে ডাক্তাররা কেন বেডরেস্টে থাকতে বলেন?

সাধারণত, গর্ভকালীন সময়ে নানাবিধ সমস্যার কারণে ডাক্তাররা বেডরেস্ট দিয়ে থাকেন। উদাহরণ সরূপ বলা যেতে পারে, আপনি গর্ভে যদি যমজ সন্তান থাকে, আপনার জরায়ু যদি দুর্বল হয় অথবা নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই সন্তান জন্ম নেয়ার ঝুঁকিতে থাকেন তাহলে ডাক্তার আপনাকে বেডরেস্টে দিতে পারেন।

এছাড়া ডাক্তার যদি সন্দেহ করেন যে, আপনার গর্ভের সন্তানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হচ্ছে না (intrauterine growth restriction)  অথবা আপনার যদি প্লাসেন্টা প্রিভিয়া (placenta previa)  থাকে, সেক্ষেত্রেও ডাক্তার বেড রেস্টের পরামর্শ দিতে পারেন।

অবশেষে আপনি যদি খুব বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন অথবা আপনার যদি উচ্চ রক্তচাপ বা প্রি-এক্লাম্পশিয়া থাকে তাহলেও বেডরেস্টের কারণে আপনার রক্তচাপ একটু নিয়ন্ত্রণে থাকবে এই চিন্তা করে ডাক্তার আপনাকে বেডরেস্ট দিয়ে থাকতে পারেন।

কোন গবেষণাতে কি প্রমাণিত হয়েছে যে বেডরেস্ট আসলে উপকারী?

এই বিষয়ে অল্প কিছু গবেষণা হয়েছে তবে প্রি-টার্ম বার্থের ঝুঁকি কমাতে বেডরেস্ট অনেক উপকারী, এমন কোন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। American College of Obstetricians and Gynecologists এবং Society for Maternal-Fetal Medicine এর মতে নির্ধারিত সময়ের পূর্বে প্রসব হওয়ার ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে বেডরেস্ট তেমন কোন উপকারী ভূমিকা পালন করে না এবং নিয়মিত বেডরেস্টের পরামর্শ  না দেয়াটাই বরং ভালো।

এছাড়াও যমজ সন্তান, সার্ভিকাল ইনসাফিসিয়েন্সি, প্লাসেন্টা প্রিভিয়া বা ইন্ট্রাইউটেরিন গ্রোথ রেস্ট্রিকশনের মত জটিলতাতে ক্ষেত্রেও বেডরেস্টের সপক্ষে কোন যুক্তি প্রমাণিত হয়নি।

এমনকি বেশ কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে যে জোড়া সন্তান গর্ভধারণ করার পর কোন ধরনের জটিলতার ফলে যদি হাসপাতালে খুব বেশি সময় ধরে বেডরেস্টে থাকে তাহলে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই সন্তান প্রিম্যাচিউর অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করার ঝুঁকি থাকে।

বেডরেস্ট কি আদতেই দুশ্চিন্তা এবং উচ্চ-রক্তচাপ এর ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে কি না এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বেশ কিছু মতবিরোধ পরিলক্ষিত করা যায়। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে এটা দুশ্চিন্তা এবং উচ্চ-রক্তচাপে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, অপরদিকে বেশীরভাগ গবেষণায় দেখা গিয়েছে এটা তেমন একটা সহকারী ভূমিকা পালন করে না।

তবে কেউ কেউ বলেন কোন অপকারিতার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না পাওয়ার আগ পর্যন্ত বেডরেস্ট এর মাধ্যমে গর্ভকালীন জটিলতাগুলো কাটিয়ে তোলার চেষ্টা করা যেতে পারে।

অপরদিকে অনেকেই এই মতের বিরোধিতা করে বলেছেন, যেহেতু বেডরেস্টেরই অনেক ক্ষতিকারক দিক রয়েছে তাই গর্ভধারণ করা নারীদের দিয়ে বেডরেস্টের উপকারিতা আছে কি না সেটার পরীক্ষা করা কখনই উচিৎ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না জানা যাচ্ছে এর ক্ষতিকারক দিক থেকে উপকারী দিক অনেক বেশি।

কোন কোন ডাক্তারদের মতে পুরোপুরি বেডরেস্ট থেকে বিরত থাকাই ভালো। এক্ষেত্রে চাপ কমানোর জন্য কাজ কমিয়ে নিয়ে আসা, ভারী কিছু উঠানো থেকে বিরত থাকা, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে না থাকা এবং প্রতিদিন পরিমিত বিশ্রাম গ্রহণ করা বরং আরো অনেক বেশি উপকারী ভূমিকা পালন করে।

পরিশেষে, বেডরেস্ট নিয়ে আরো অনেক বেশি পরিমাণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। পরিপূর্ণ গবেষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত ডাক্তারদের মধ্যে বেডরেস্ট নিয়ে বিভিন্ন মতবিরোধ দেখা যেতেই পারে।

বেডরেস্ট অর্থাৎ সবসময় বিছানায় শুয়ে থাকা কেন ক্ষতিকর?

স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনকে বেডরেস্ট বেশ প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘ সময়ে শুয়ে থাকলে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে (বিশেষ ধরনের পরিস্থিতিতে ডাক্তাররা এই সময়ে রক্ত পাতলা ও গতিশীল রাখার জন্য এবং যাতে করে জমাট না বেঁধে যায় সেজন্য ওষুধ দিয়ে থাকেন)।  এছাড়া দীর্ঘ সময়ে শুয়ে থাকলে আপনি অনিদ্রা, পাকযন্ত্রে জটিলতা, হাড় ক্ষয় সহ বিভিন্ন ধরনের ব্যথায় ভুগতে পারেন।

এছাড়া আপনি যখন আপনার শরীরের পেশীগুলোকে, হৃদপিণ্ড এবং ফুসফুস এর পরিপূর্ণ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবেন তখন আপনার শরীরের এই অংশগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাবে এবং আপনি প্রচুর পরিমাণে দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়বেন।

এরপর আপনি যখন বেডরেস্ট থেকে স্বাভাবিক জীবন যাপনে দিরে যাবেন তখন আপনার শারীরিক শক্তি ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে এবং এক্ষেত্রে আপনার নবাগত সন্তানের পরিপূর্ণ যত্ন নেয়া আপনার জন্য বেশ কঠিন হয়ে উঠবে।

এরসাথে আপনি যদি বেডরেস্টে থাকেন তাহলে আপনার সংসার এবং পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থায় এটা বেশ বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আপনাকে হত আপনার নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ বন্ধ করে দিতে হবে এমনকি আপনার সন্তানকে যত্ন নেয়ার জন্যও আপনাকে অন্য কারো সাহায্য নিতে হতে পারে। আর আপনি সম্পূর্ণ বেডরেস্টে থাকলে আপনার প্রাত্যহিক সকল কাজের জন্য আপনাকে অন্যান্যদের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে হবে।

পরিশেষে এটা বলা যায়, সবসময় বিছানায় শুয়ে থাকলে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। বিরক্তিকর সময় এবং সবকিছু থেকে দূরে একা একা সময় পার করলে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটতে পারে।

ডাক্তার যখন আপনাকে বেডরেস্টে থাকতে বলবে, তখন আপনার কি করা উচিৎ?

ডাক্তারের সাথে বেডরেস্টের সুবিধা এবং অসুবিধাগুলো সম্পর্কে আলাপ করুন। দুইজনেই যদি এই মতে উপনীত হন যে সাময়িক বেডরেস্ট আপনার জন্য ভালো হবে তাহলে এই সময়ে কি কি কাজ করা যাবে সেটা নিয়ে ডাক্তারের সাথে আলাপ করে নিন। এছাড়া আপনাকে কি সবসময় বিছানায় শুয়ে কাটাতে হবে, নাকি দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় বিশ্রাম নিতে হবে এই সম্পর্কেও জেনে নিন।

এরপর আপনার বন্ধু-পরিবার-অফিসের বস সবার সাথেই একটা পরিকল্পনা করে নিন। কেননা, বেডরেস্টের সময়টা যাতে খুব স্বাভাবিক ভাবে কেটে যায় সেজন্য আপনার সবার সাহায্যের প্রয়োজন হবে। এছাড়া আপনি কিভাবে সবকিছু মানিয়ে নিয়ে পরিপূর্ণভাবে বেডরেস্ট করতে পারবেন সে জন্য বিশেষ ধরনের কোন প্রতিষ্ঠানের সাথেও যোগাযোগ করতে পারেন, যারা আপনাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে।

এই সময়ে আপনার মানসিক কাউন্সিলিং এর প্রয়োজন হতে পারে, কেননা আপনার অনাগত সন্তান সহ পারিবারিক অনেক দায়িত্ব থেকে নিজেকে আপনার বিচ্যুত মনে হতে পারে। বেডরেস্টের কারণে যদি আপনার সঙ্গীর সাথে আপনার সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তাহলে কাউন্সিলিং আপনার সঙ্গীর ক্ষেত্রেও উপকারী ভূমিকা পালন করবে।

বেডরেস্টে আপনাকে কি সবসময় বিছানায় শুয়ে কাটাতে হবে?

যদিও ঠিক কতটা সময় আপনাকে বিছানায় শুয়ে কাটাতে হবে, এ নিয়ে বেডরেস্টের কোন সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত নেই। তাই হয়ত আপনাকে পুরো সময়টা একেবারেই শুয়ে কাটাতে নাও হতে পারে। আপনার ডাক্তার আপনাকে বলে দিবে কি কি কাজ থেকে আপনাকে বিরত থাকতে হবে এবং কিভাবে ও কতটা সময় আপনাকে শুয়ে কাটাতে হবে।

ডাক্তার হয়ত আপনাকে এমন উপদেশ দিতে পারেন যে, আপনাকে সবসময় শুয়ে থাকতে হবে তবে আপনি খাবার তৈরি করার জন্য উঠতে পারবেন। এমনকি ডিনার টেবিলে পরিবারের সবার সাথে বসে খাবার ও খেতে পারবেন। এছাড়া প্রাত্যহিক কিছু কাজ, যেমন গোসল করা, দরজা খুলে দেয়া ইত্যাদি কিছু কাজ হয়ত আপনি করতে পারবেন।

অথবা ডাক্তার আপনাকে দৈনন্দিন সব কাজ থেকে একটু বিশ্রামে থাকতে বলবেন, তবে দিনের বেলায় দুই এক ঘণ্টা আপনাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হতে পারে। আপনার ডাক্তারই আপনাকে এসব নিয়ে পরিপূর্ণ উপদেশ দিয়ে দিবেন।

সাধারণত, বেডরেস্ট বলতে বেশীরভাগ সময় শুয়ে থাকাতে বুঝায় তবে এরমধ্যে ডাক্তার দেখানো, গোসল করা, খাওয়া ইত্যাদি কিছু কাজ স্বাভাবিক ভাবে চলতে থাকবে। এছাড়া আপনি যদি দীর্ঘ সময় চিত হয়ে শুয়ে থাকেন তাহলে আপনার জরায়ুতে চাপ লাগতে পারে। জরায়ুতে যাতে করে রক্ত প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে এজন্য আপনাকে একপাশে কাত হয়ে শুয়ে থাকতে হবে।    

সবার জন্য শুভকামনা। 

Related posts