প্রসবের সময় এপিডিউরাল পদ্ধতিতে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ বা ব্যথামুক্ত সন্তান প্রসব

Updated on

এই আর্টিকেলের বিষয়বস্তু-

  • এপিডিউরাল (Epidural) বা ব্যথামুক্ত সন্তান প্রসব পদ্ধতি কি?
  • এপিডিউরাল কিভাবে করা হয়
  • কখন এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করাটা সবচাইতে ভাল?
  • প্রসবের সময় এপিডিউরাল পদ্ধতিতে ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণের সুবিধাগুলো কি?
  • এপিডিউরাল পদ্ধতির অসুবিধাগুলো কি কি?
  • সিজারিয়ান অপারেশন বনাম ব্যথামুক্ত প্রসব
  • এপিডিউরাল পদ্ধতি কি আপনার নবজাতক শিশুর উপর কোন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?
  • যে কেউ কি এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহন করতে পারবেন?

এপিডিউরাল (Epidural) বা ব্যথামুক্ত সন্তান প্রসব পদ্ধতি কি?

এপিডিউরাল পদ্ধতিতে আপনাকে সম্পূর্ণ সচেতন রেখে প্রসবের সময় আপনার শরীরের নিচের দিকের অংশকে ব্যথামুক্ত করে ফেলা সম্ভব। যদিও এই পদ্ধতিতে ব্যথা মুক্ত রাখা সম্ভব তবে এর মাধ্যমে আপনাকে একেবারে অবশ করে ফেলা হবে না, বরং আপনি পুরোপুরি সজাগ থাকবেন।

আপনার পিঠের নিচের দিকে এপিডিউরাল অংশ যেখানে স্পাইনাল কর্ড এবং স্পাইনাল ফ্লুয়িড থাকে সেখানে খুব পাতলা এবং সরু একটি টিউব (catheter) এর মাধ্যমে ওষুধ দেয়া হয়। প্রসবের ব্যথা থেকে মুক্তির জন্য আমেরিকাতে এই এপিডিউরাল পদ্ধতিই সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত হয়।

এটা আমাদের দেশে সিজারিয়ান অপারেশনের সময় যে স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়, তার খুব কাছাকাছি, কিন্তু কিছু বিশেষ প্রশিক্ষণের দরকার হয়। যত ভালোভাবে এপিডিউরাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া যাবে, তত এর থেকে উদ্ভূত জটিলতা কম হবে। সত্যি কথা বলতে কি, যারা এপিডিউরাল অ্যানেসথেসিয়া দিতে অভিজ্ঞ, তাঁদের মাধ্যমে দেয়া হলে, লো-ব্যাক পেইন বা ছোটখাটো দু-একটি সমস্যা ছাড়া জটিল কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

এপিডিউরাল কিভাবে করা হয়

আপনাকে একপাশ কাত হয়ে কিছুটা হাটুমুড়ি দেয়ার মত হয়ে শুয়ে থাকতে হবে অথবা বিছানার এক পাশে বসতে হবে আর তখন একজন এনেসথেসিওলোজিস্ট (anesthesiologist) আপনার পিঠের নিচের দিকের যেই অংশে ইনজেকশন দেয়া হবে সেই অংশটা পরিষ্কার করবেন এবং অবশ করবেন।

এরপর ধীরে ধীরে আপনার পিঠের নিচের দিকের নির্ধারিত অংশ দিয়ে সাবধানে সুঁই ঢুকিয়ে দিবেন। বিষয়টা শুনে হয়ত আপনার মনে হতে পারে যে এই পদ্ধতিতে প্রচুর ব্যথা পাবেন, তবে বেশিরভাগ নারীরাই এই পদ্ধতি অনুসরণের সময় তেমন একটা ব্যথা পান না।

এনেসথেসিওলোজিস্ট তখন সুইয়ের মধ্যে দিয়ে ক্যাথিটারটি ভীতরে প্রবেশ করাবেন অতঃপর সুঁই সরিয়ে ফেলে ক্যাথেটারটি টেপ দিয়ে ভালো করে আটকে রাখবেন। এরপর এই অবস্থাতেই আপনি শুয়ে থাকতে পারবেন, এতে করে ক্যাথেটারের কোন প্রকার ক্ষতি হবে না। প্রয়োজন অনুসারে এই ক্যাথেটার দিয়ে ওষুধ সরবরাহ করা হবে।

তবে এই আনুষঙ্গিক কাজগুলো শেষ করার সাথে সাথেই আপনাকে পূর্ণ রূপে ওষুধ দেয়া শুরু করা হবে না। প্রাথমিক অবস্থায় পরীক্ষামূলক ভাবে অল্প কিছু পরিমাণে ওষুধ আপনাকে দেয়া হবে। এর মাধ্যমে দুটি ব্যাপার নিশ্চিত করা হবে। প্রথমটি হল, আপনার এপিডিউরাল ক্যাথেটারটি একদম সঠিক যায়গায় প্রবেশ করানো হয়েছে এবং দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি নিশ্চিত করা হয় যে পূর্ণ রূপে ওষুধ দেয়া শুরু করলে আপনার কোন প্রকার সমস্যা হবে না।

এই সময়ে আপনার শিশুর হৃদকম্পনের দিকে সবসময় লক্ষ্য রাখা হবে এবং এপিডিউরাল পদ্ধতি অনুসরণ করার কারণে আপনার শরীরে বড় ধরনের কোন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে কি না সেটা জানার জন্য প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর আপনার রক্ত চাপ পরীক্ষা করা হবে।

সাধারণত এই এপিডিউরাল পদ্ধতিতে লোকাল এন্সথেসিয়া অর্থাৎ অবশ করার ওষুধ এবং নারকোটিক অর্থাৎ অবচেতন করার ওষুধের একটা পরিমিত পরিমাণের মিশ্রণ আপনার শরীরে প্রবেশ করানো হবে। লোকাল এন্সথেসিয়ার মাধ্যমে আপনার শরীরের ব্যথা, স্পর্শ, উচ্চতাপমাত্রা ইত্যাদির অনুভূতিগুলোকে বাধা প্রদান করা হয় এবং নারকোটিকের মাধ্যমে আপনার ব্যাথার অনুভূতিকে ভোঁতা করে দেয়া হয়। এইসময় আপনার পা নাড়াতে কোন অসুবিধা হবেনা। এই দুটো উপাদানের কোন একটি ব্যাবহারের চাইতে এদের মিশ্রণের অল্প ডোজই ভালো ব্যাথানাশক হিসেবে কাজ করে।

ওষুধের প্রথম ডোজ দেয়ার ১০ থেকে ২০ মিনিট পর থেকেই আপনি অবশ অনুভূতিটা খেয়াল করতে থাকবেন  যদিও ওষুধ প্রয়োগের কয়েক মিনিটের মধ্যেই আপনার জরায়ুর নার্ভাস সিস্টেম অবশ হতে শুরু করবে। আপনার প্রসব শেষ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ডাক্তাররা আপনাকে নিয়মিত ক্যাথেটারের মাধ্যমে ওষুধ গ্রহণ দিতে থাকবেন।

আবার আপনি চাইলে আপনার সহ্য শক্তির উপর ভিত্তি করেও ওষুধ নিতে পারেন অর্থাৎ ওষুধ গ্রহণের মাত্রাটা নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে দিতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী মাত্রায় ওষুধ ক্যাথেটারের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারবেন। তবে যেহেতু মাত্রার পরিমাণটা আপনার হাতে থাকবে, তাই যাতে করে ওষুধ খুব বেশি মাত্রায় চলে না যায় এইজন্য আপনি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মত ওষুধ নিজ থেকে নিতে পারবেন।

আপনার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আপনার পিঠের নিম্নাংশ থেকে ক্যাথেতারটি সরিয়ে ফেলা হবে। (তবে আপনার শিশু যদি সিজারের মাধ্যমে হয় তাহলে মাঝেমধ্যে ডাক্তাররা সিজার পরবর্তী ব্যথানাশক ওষুধ দেয়ার জন্য এটা রেখে দিতে পারেন) এছাড়া ক্যাথেতারটি সরানোর সময় আপনি সামান্য পরিমাণ ব্যথা আপনি অনুভব করবেন। আর সেটা এতটাই কম যে শরীর থেকে টেপ খোলার সময় থেকেও কম ব্যথা আপনি অনুভব করবেন।

কখন এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করাটা সবচাইতে ভাল?

অতীতে প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার আগে এপিডিউরাল দেয়া হতনা কেননা তখন ধারনা করা হত এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করলে সেই নারীর নিম্নাঙ্গ প্রায় অবশ থাকে এবং যার ফলে প্রসবের সংকোচনে দেরিও হতে পারে। তবে এখনকার সময়ে আপনি যখনই চাইবেন ডাক্তাররা সাথে সাথেই এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করতে দেন।

প্রসবের সময়ের আগেই যদি এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় তাহলে সেটা স্বাভাবিক প্রসবকে প্রলম্বিত করবে এবং সিজারের দিকে নিয়ে যাবে,  এমন কিছু গবেষণায় প্রমাণিত হয়নি । সে যাই হোক, এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করলে ভ্যাকুয়াম এস্কট্রাশন অথবা বাচ্চাকে টেনে বের করে আনার মত অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আপনি যদি প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার পূর্বেই হাসপাতালে পৌঁছে যান এবং আপনি এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হন তাহলে প্রসব শুরু হওয়ার আগে ক্যাথেটারটি শরীরে প্রবেশ করিয়ে রাখুন। প্রসব বেদনা উঠা অর্থাৎ স্বাভাবিক ভাবে প্রসব শুরু হওয়ার পর আপনি ক্যাথেটারের মাধ্যমে ওষুধ গ্রহন শুরু করতে পারবেন।

তবে ওষুধ শুরু করার আগে আপনি অপেক্ষা করে দেখতে পারেন আপনি কেমন বোধ করছেন বা আপনার এপিডিউরাল প্রয়োজন আছে কিনা। বাচ্চার মাথার সম্মুখভাগ দেখা যাওয়ার আগ পর্যন্ত যেকোন সময় ওষুধ নেয়া যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে একটা ঝুঁকি থেকে যায় যে আগে বলে না রাখলে আপনার এপিডিউরাল স্পেশালিষ্ট হয়ত অন্য রোগীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারেন এবং আপনি ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ডাক্তার আসতে হয়ত দেরিও হয়ে যেতে পারে।

প্রসবের সময় এপিডিউরাল পদ্ধতিতে ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণের সুবিধাগুলো কি?

আপনার পুরো প্রসবের সময়টাতে কোন প্রকার ব্যথা অনুভব করা ছাড়াই আপনি প্রসব করতে পারবেন।

আপনার এনেস্থেসিওলোজিস্ট যে কোন সময়ে ওষুধের মাত্রা এবং ওষুধ পরিবর্তন করতে পারবেন। এই নিয়ন্ত্রণটা হাতে থাকা জরুরী, কেননা আপনার প্রসব যখন শুরু হবে এবং শিশু জন্ম নালীতে এসে পৌঁছে যাবে, তখন আগের পরিমাণে ওষুধ হয়ত কাজ নাও করতে পারে, এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আপনি ব্যথা অনুভব করা শুরু করতে পারেন।তখন খুব সহজেই ওষুধের পরিমাণ বাড়িয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

এই এইডিউরিয়াল পদ্ধতি শুধুমাত্র শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশে কাজ করে, তাই প্রসবের পুরো সময়টা আপনি সচেতন থাকতে পারবেন। আর যেহেতু আপনি সম্পূর্ণ ব্যথা মুক্ত থাকবেন তাই আপনি কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে প্রসবের পরবর্তী অংশের জন্য শক্তি অর্জন করে নিতে পারবেন।   

এই পদ্ধতি অন্যান্য অবচেতন কারি ওষুধের মত নয়, কেননা আপনার শিশুর শরীরে এই পদ্ধতির মাধ্যমে কোন প্রকার ওষুধ প্রবেশ করে না বললেই চলে। যে পরিমাণে করে সেটা একদমই ক্ষুদ্র এবং নগণ্য।

এপিডিউরাল পদ্ধতির ক্যাথেটারটি শরীরে লাগানো থাকলে যদি কোন কারণে সিজার করার প্রয়োজন হয় বা প্রসবের পর কোন জটিলতা দেখা দিলে, এর মাধ্যমে এনেস্থেশিয়া প্রয়োগ করা যায়।

এপিডিউরাল পদ্ধতির অসুবিধাগুলো কি কি?

আপনাকে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট নড়াচড়া না করেই এক-জায়গায় স্থির হয়ে বসে অথবা শুয়ে থাকতে হতে পারে যখন এপিডিউরালটি শরীরে প্রবেশ করানো হবে। এছাড়া ওষুধ পুরোপুরি কাজ করা শুরু করতেও প্রায় ২০ মিনিটের মত লেগে যেতে পারে।

আপনার পায়ের অনুভূতি নাও থাকতে পারে এবং তাৎক্ষনিক অবস্থায় আপনি উঠে দাঁড়াতে নাও পারতে পারেন। কখনো আরলি লেবারের ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ করার ওষুধ খুবই কম পরিমাণে দেয়া হয় যাতে করে আপনি পায়ে স্বাভাবিক শক্তি অনুভব করেন এবং কোন প্রকার বাঁধা অনুভব করা ছাড়াই পা নাড়াতে পারেন। বেশীরভাগ সময়েই এই রকম পদ্ধতির ক্ষেত্রে নারকোটিক ওষুধের মাত্রা তুলনামূলক ভাবে একটু বেশি থাকে । তবে আপনি আপনার শরীরে একবার এপিডিউরাল পদ্ধতির জন্য ক্যাথেটার লাগিয়ে নেয়ার পর বেশীরভাগ ডাক্তাররাই আপনার উঠে হাঁটাচলা না করার পরামর্শ দিবেন।

আপনার শিরায় ক্যানোলা লাগাতে হতে পারে, ঘন ঘন রক্তচাপ মাপা হবে এবং গর্ভের বাচ্চার উপর নজর রাখা হবে।

কখনো এপিডিউরাল পদ্ধতি অবলম্বন করলে প্রসবের পরবর্তী ধাপগুলোতে একটু বেশি সময় লাগতে পারে। কেননা, ওষুধের প্রভাবে শরীরের নিম্নাঙ্গে অবশীভাব এর জন্য নিচের দিকে পেশিগুলোতে তেমন একটা শক্তি পাওয়া যায় না এবং শিশুকে বের করার জন্য যে পরিমাণ ধাক্কার প্রয়োজন পরে, ওষুধের প্রভাবের কারণে মায়েরা সেই পরিমাণ শক্তি পান না। (সমসাময়িক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, প্রসবের মধ্যে পুশ করার যে অংশ থাকে সেটা প্রায় ১৩ মিনিট বেশি দীর্ঘায়ত হতে পারে)

আপনি যখন পুশ অর্থাৎ শিশুকে ধাক্কা দেয়ার পর্যায়ে যাবেন তখন নিচের দিকের অংশের পেশিগুলোর শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য ওষুধের মাত্রা কিছুটা কমিয়ে নিয়ে আসতে হতে পারে। এমন সময় ওষুধের প্রভাবও কমে যেতে পারে আর যার ফলে আপনি পূর্ণরূপে ব্যথা অনুভব করা শুরু করতে পারেন। তবে ওষুধের মাত্রা কমিয়ে আনার মাধ্যমে প্রসবের সময়টা ত্বরান্বিত করা যায়, এই সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি।

এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করার মানে হল, আপনাকে হয়ত ভ্যাকুয়াম এক্সট্রাকশন বা ফোরসেপের মাধ্যমে প্রসব করতে হতে পারে। যার কারণে আপনার যৌনাঙ্গ কেটে যেতে পারে অথবা ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পরে যায়। এসব পদ্ধতিতে আপনার শিশুর শরীরের ক্ষত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। (তবে আপনার শিশুর বড় কোন ক্ষতি হতে পারে এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ)

কোন কোন ক্ষেত্রে এপিডিউরাল পদ্ধতির মাধ্যমে শুধুমাত্র কিছু অংশের ব্যথা কমতে পারে। এমনটা হওয়ার কারণ হল, ক্যাথটার এর মাধ্যমে স্পাইনাল নার্ভের সবগুলো অংশে হয়ত ওষুধ পৌঁছাতে পারেনি, কেননা অনেকের শরীরের গঠন ভিন্ন রকমের হতে পারে।

ক্যাথেটারও তার নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সরে যেতে পারে, যার ফলে শুরুতে একদম সবকিছু ঠিক থাকলেও পরবর্তীতে ব্যথানাশক ওষুধ ঠিকমত কাজ নাও করতে পারে। (আপনি যদি শরীরের নিমাংশের কোন যায়গায় ব্যথা অনুভব করেন তাহলে আপনার ডাক্তারকে বলুন যাতে করে ক্যাথেটারটা ভালোভাবে পুনরায় বসিয়ে দেয়া হয়)

এই ধরনের ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে আপনার শরীরের রক্তচাপ কমে আসতে পারে যার ফলে গর্ভের শিশুর কাছে পর্যাপ্ত রক্ত নাও পৌঁছাতে পারে। এই কারণে আপনার শিশুর শরীরের হৃদ কম্পনও কমে আসতে পারে। (তবে এটা ফ্লুয়িড এবং অন্যান্য ওষুধের মাধ্যমে ঠিক করে ফেলা সম্ভব)

এপিডিউরিয়ালের মাধ্যমে যখন নারকোটিক ওষুধ দেয়া শুরু হবে তখন শরীরের কোন কোন অংশ চুলকানো শুরু হতে পারে, বিশেষ করে মুখমণ্ডলে চুলকানির প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া এপিডিউরাল পদ্ধতিতে ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে বমি বমি ভাব চলে আসতে পারে। তবে প্রসবের সময় ব্যথানাশক ওষুধ ছাড়াও অনেক সময় নারীদের বমি করতে দেখা যায়।

এপিডিউরাল পদ্ধতিতে এনেসথেশিয়া ওষুধ গ্রহণের পর, আপনার যদি প্রস্রাবের বেগও আসে তবে সেটা আপনি নাও বুঝতে পারেন। আর তাই আপনার মুত্রথলিতেও আরেকটা ক্যাথেটার লাগিয়ে নিতে হবে যাতে করে মুত্রথলি খালি থাকে।

এপিডিউরাল পদ্ধতি অনুসরণ করলে প্রসবের সময় শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তবে এর কারণ এখন পর্যন্ত সঠিক ভাবে জানা যায় নি, যদিও কেউ কেউ মনে করেন যেহেতু ব্যথা থাকে না এবং ঘাম কম হয় তাই প্রসবের সময়ে তৈরি হওয়া উত্তাপ বের করতে না পারার কারণেও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

তবে এটি আপনার এবং আপনার শিশুর শরীরে ইনফেকশন হওয়ার আশংকা বৃদ্ধি করে না। যেহেতু বোঝা যায় না যে আসলে জ্বর কি শরীরের ইনফেকশনের কারণে নাকি এপিডিউরাল পদ্ধতি অনুসরণের কারনে হয়েছে, তাই অযথা হয়ত আপনাকে বা আপানর শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করতে হতে পারে।

এপিডিউরাল ব্যাবহার করা মায়েদের ক্ষেত্রে বাচ্চার পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকার হার বেশি। যাদের বাচ্চা পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকে তাদের প্রসবের সময় দীর্ঘ হয়, Pitocin এর প্রয়োজন বেশি পরতে পারে এবং সিজার করার হারও বেশি। তবে এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই, আদতে কি এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণের কারণেই (যেহেতু পেলভিক এর অংশ বেশ শিথিল অবস্থায় থাকে) এমনটা হয়, নাকি শিশুরএই অবস্থানের জন্য শরীরে যে অতিরিক্ত ব্যথা হয় তার কারণেই নারীরা বেশি এপিডিউরাল পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন।

শতকরা এক শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে প্রসবের পর তাদের স্পাইনাল জনিত মাথা ব্যথা করতে পারে। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, যেহেতু স্পাইনাল কর্ডের চারপাশের ফ্লুয়িডে সুঁই এর মাধ্যমে ক্যাথেটার প্রবেশ করানো হয়, তাই এই ফ্লুয়িড সেখান দিয়ে কিছুটা বের হয়েও আসতে পারে। আর তাই যদি সোজা হয়ে দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় আপনার মাথা ব্যথা করে, এটা আবার শোয়ার সাথে সাথে চলে যায় তাহলে আপনার ডাক্তারকে অবহিত করুন।

এই ধরনের সমস্যাও এপিডিউরাল পদ্ধতিতে ঠিক করা হয়। আপনার হাত থেকে রক্ত নিয়ে সেটা এপিডিউরিয়ালের মাধ্যমে সেই অংশে প্রবেশ করানো হয় এবং সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে সেই অংশটি সিল অর্থাৎ ফুটোটি বন্ধ হয়ে যায়। আপনি যখন হাসপাতালে থাকেন, তখনই এই পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করা ভালো। তবে বাসা থেকেও আবার হাসপাতালে এসে আপনি এই চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন।

সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ না করা হলে এই ব্যথা একদিন থেকে সপ্তাহ খানেক পর্যন্ত হতে পারে এবং ব্যথার ধরনও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এমনকি কোন কোন নারীরা চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করার পরেও মাথা ব্যথায় ভুগেছেন অলে জানা গিয়েছে।

যদি সম্ভাবনা খুবই কম, তবুও এপিডিউরিয়ালের কারণে আপনার শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যাও দেখা যেতে পারে।

যদিও এমনটাও খুবই খুবই কম এবং নেহায়েত দেখা যায় না বললেই চলে, তবুও এপিডিউরাল পদ্ধতির কারণে নার্ভ ইনফেকশন এবং নার্ভে ক্ষত হতে পারে।

সিজারিয়ান অপারেশন বনাম ব্যথামুক্ত প্রসব

  • সিজারিয়ান অপারেশন একটি অস্ত্রোপচার, তাই অস্ত্রোপচারকালীন অথবা এর পরে অনেক জটিলতা ঘটতে পারে। স্বাভাবিক বা ব্যথামুক্ত প্রসবে এটা হয় না।
  • সিজারিয়ান অপারেশনে একজন মায়ের দুই বা তিনের বেশি গর্ভধারণ করা সম্ভব নয়। স্বাভাবিক বা ব্যথামুক্ত প্রসবে এটা সম্ভব।
  • সিজারিয়ান অপারেশনে ইন্সিসনাল হার্নিয়া বা তলপেটের ব্যথা বা অন্যান্য জটিলতা হতে পারে। স্বাভাবিক বা ব্যথামুক্ত প্রসবে এটা হয় না।
  • সিজারিয়ান অপারেশনে কাটা জায়গা বা ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্বাভাবিক বা ব্যথামুক্ত প্রসবে এটা হয় না।
  • একবার সিজারিয়ান অপারেশন হলে পরবর্তী স্বাভাবিক প্রসবেও এই দিকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কাজেই প্রথম থেকে আমাদের উচিত অহেতুক সিজারিয়ান অপারেশনে না যাওয়া।
  • সিজারিয়ান সেকশনে অস্ত্রোপচার–পরবর্তী হাসপাতালে কয়েক দিন থাকতে হয়। কিন্তু ব্যথামুক্ত প্রসবে সন্তান হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন মা বাসায় চলে যেতে পারেন।

এপিডিউরাল পদ্ধতি কি আপনার নবজাতক শিশুর উপর কোন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?

সমসাময়িক বেশ কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে এপিডিউরাল পদ্ধতি অবলম্বনের কারণে নবজাতক শিশুর উপর কোন ধরনের ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তার লাভ করে না। জন্মের পরপরই শিশুর উপরে করা অ্যাপগার স্কোর তেমনটাই বলছে। কোন কোন গবেষণায় এমনটাও দেখা গেছে যে যে সকল নারীরা এপিডিউরাল পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তাদের শিশুদের অ্যাপগার স্কোর অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই থাকে।

তবে শিশু কি জন্মের পরপরই বুকের দুধ খেতে পারে, নাকি তার বুকের দুধ খাওয়ার ক্ষমতার উপর এপিডিউরাল পদ্ধতির কোন ধরনের প্রভাব রয়েছে এই নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক দেখা গেছে। কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে যে সকল মায়েরা এপিডিউরাল পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তাদের শিশুরা বুক থেকে দুধ চুষে বের করতে কিছুটা সমস্যা হয়। তবে অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতে এমনটা আদতেই হয় কি না এ নিয়ে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোন গবেষণার ফলাফল পাওয়া যায় নি।

তবে আমরা জানি যে, সাধারণ নারকোটিক নবজাতক শিশুর উপর যে প্রভাব বিস্তার করে সে তুলনায় এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করলে তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

যে কেউ কি এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহন করতে পারবেন?

না, সব নারীরাই এই ধরনের ব্যথামুক্ত প্রসব পদ্ধতি বা এপিডিউরাল গ্রহণ করতে পারেন না। আপনার মধ্য যদি নিম্ন বর্ণীত সমস্যাগুলো দেখা যায়, তাহলে আপনি এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারবেন নাঃ

  • আপনার যদি অস্বাভাবিক নিম্ন রক্তচাপ থেকে থাকে।
  • আপনার রক্ত যদি স্বাভাবিক ভাবে জমাট না বেঁধে থাকে।
  • আপনার রক্তে যদি কোন ধরনের ইনফেকশন থাকে।
  • আপনার পিঠের যে অংশ দিয়ে সুঁই প্রবেশ করানো হবে যদি সেখানের ত্বকে কোন ধরনে ইনফেকশন থাকে।
  • লোকাল এনেসথেসিয়ার উপর যদি আপনার পূর্ব থেকেই এলার্জি থাকে।

আপনি যদি রক্ত পাতলা (ব্লাড থিনিং) করার জন্য কোন ধরনের ওষুধ গ্রহণ করে থাকেন এবং এপিডিউরাল পদ্ধতি গ্রহণ করার ব্যাপারে ইচ্ছুক হন তাহলে একটু সতর্ক থাকবেন এবং আপনার ডাক্তারকে সেটা জানিয়ে নিন। এপিডিউরাল পদ্ধতি কি আপনার জন্য নিরাপদ হবে কি না সেটা গর্ভকালীন সময়েই আপনার ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে জেনে নিন। আর জেনে রাখবেন বেশীরভাগ হাসপাতালেই এনেসথেসিওলোজিস্টের সাথে আলাপ করার যথেষ্ট পরিমাণে সুযোগ রয়েছে।  

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts