৬-৯ মাস বয়সী শিশুর বিকাশে যেভাবে সাহায্য করবেন

৬-৯ মাসে পরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য

খুব শীঘ্রই সে তার প্রথম পা ফেলবে। আপনার কাজ হবে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে তাকে একটা সঠিক পথ বেছে নিতে উৎসাহিত করা। আপনি এখন আরও ভাল করে বুঝতে পারবেন সে কিভাবে স্বাচ্ছন্দ্য পেতে পছন্দ করে- তাকে খাওয়ানো , তাকে জড়িয়ে ধরে রাখা বা দোল খাওয়ানো, আপনার কোলে দাঁড়ানো অবস্থায় সাহায্য পেতে নাকি স্ট্রলারে করে চুপচাপ বেড়াতে যেতে। আপনারা দুজনে কোন শব্দ উচ্চারণ না করে ও নিজেদের মধ্যে কথা বার্তা  বলতে শিখবেন। মনোযোগ সহকারে তার কথা শুনবেন। আপনি ও আপনার শিশু যত এক অপরকে চিনতে থাকবেন, আপনি ততই নিশ্চিত হতে পারবেন যে আপনি খুব ভাল কাজ করে  যাচ্ছেন।

৬-৯ মাস বয়সী বাচ্চার যা যা দরকার 

বাচ্চার ক্রিব বা খেলার জায়গার বাইরে বাচ্চাকে একা ফেলে যাবেন না কারণ সে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেতে পারে। সে ঝুমঝুমি, টীদিং রিং, নরম খেলনা-পশুপাখি নিয়ে খেলতে ভালবাসবে। ওসব না পেলে থালাবাটি, ঢাকনা ও চামচ এসব হলেও চলবে। খেলার মাঝ দিয়ে সে শিক্ষালাভ করে। কখনো কখনো মানসিক চাপ লাঘব করার জন্য সে কান্না করে। গোলমেলে এ পৃথিবীতে বড় হয়ে ওঠা অনেক কঠিন। তাই আপনাকে তার প্রয়োজন। সে নানা ধরনের শব্দ নকল করে। শিশু ভোলানো গান ও ছড়া সে পছন্দ করে। বেসুরো হলে তার সাথে গান করতে লজ্জা পাবেন না। আপনার গলার স্বরই তার সবচাইতে পছন্দের।

এই বয়সের বাচ্চারা কোন কিছু ঝাঁকিয়ে দেখতে, নেড়েচেড়ে দেখতে পছন্দ করবে, রঙিন জিনিসের প্রতি আকর্ষিত হবে এবং এটা ওটা ছুঁড়ে দিয়ে মধ্যাকর্ষন ও সংঘর্ষের ফলে উৎপন্ন শব্দের উৎস নিয়ে তার নিজস্ব গবেষণা চালাতে থাকবে। এসময় আপনার সাধের কোন ভঙ্গুর জিনিস এই বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর হাতের কাছে না রাখাই শ্রেয়। তাকে শব্দযুক্ত খেলনা দিন, কোনকিছু ছুঁড়ে ফেললে সে আশা করবে আপনি তা কুড়িয়ে এনে দেবেন। সুতরাং আগামী কিছুদিনের জন্য আপনাকে তার ছুঁড়ে ফেলা বস্তু কুড়িয়ে বেড়াতে হবে- বাচ্চার মানসিক বিকাশের জন্য বাচ্চার সাথে খেলায় এই ইনভল্ভমেন্টগুলো খুব প্রয়োজনীয়। তাকে রঙিন বই পরে শোনান, বিশেষ করে বড় বড় ছবি-ওয়ালা বই। তবে তার হাতে দিলে সে ছিঁড়ে ফেলতে পারে, কিংবা বইয়ের পাতা মুখে দিতে পারে, তাই খেয়াল রাখতে হবে। বয়সপযোগী বোর্ড বই পাওয়া যাচ্ছে এখন, এগুলো ছেঁড়া খুব সহজ হয় না।

আপনার শিশুর উন্নতিলাভে সাহায্য করুন

নিরাপত্তা

  • শিশুর গোসলের পানি কুসুম কুসুম গরম কিনা তা কনুই ডুবিয়ে পরীক্ষা করে নিন।
  • আপনার শিশুর খেলা এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য নিরাপদ একটা জায়গা ঠিক করুন। সব প্লাগ পয়েন্ট ঢেকে দিন এবং সিঁড়ির পথ আটকে দিন।
  • তাকে খেলনা বা এমন ধরনের জিনিস দিন যেগুলি সে মুখে দিলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই এবং সেগুলি নিয়ে তার সাথে কথা বলুন। খেলার জন্য প্রচুর খেলনা কেনার দরকার নেই- আপনার বাচ্চা বাড়ির নানা নিরাপদ, সহজ জিনিসপত্র নিয়েই খেলতে পারে।

নিশ্চয়তা

  • আপনার শিশুর কাছ থেকে দুরে যাওয়ার সময় কিংবা অন্য মানুষ দেখে ভয় পেয়ে সে যদি কেঁদে ওঠে, আপনি শান্ত থাকুন।
  • আপনার শিশুর নিজস্ব ব্যাক্তিত্তের প্রতি সম্মান দেখাবেন। আমরা প্রত্যেকে আমাদের চারিদিকের মানুষজন ও জিনিশপত্রের ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সাড়া দিয়ে থাকি।
  • একজন মা কিংবা বাবা হিসেবে আপনিই হলেন আপনার বাচ্চার সবচেয়ে ভালো খেলার সাথী। তাই তার সঙ্গে খেলা করার জন্য প্রতিদিনই সময় দেয়ার চেষ্টা করুন।
  • আপনার কণ্ঠস্বরই বাচ্চার কাছে তার প্রিয় সঙ্গীত। সুতরাং তাকে গান গেয়ে শোনান, এমনকি যদিও আপনার মনে হয় যে আপনার গলা ভালো শোনাচ্ছে না। আপনার বাচ্চা আপনার সমালোচনা করবেনা। টিভি বা রেডিও চালানো থাকলে সেটা বন্ধ করে দিন যাতে আপনার বাচ্চা আপনার কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।

স্বাস্থ্য

  • আপনার ঘর ও গাড়ি ধোঁয়া মুক্ত রাখুন। ছোট ও বড় শিশুরা যদি সিগারেটের ধোঁয়ার শিকার হয় তাকে তাদের কান-ব্যাথা, হাঁপানি বা অন্যান্য রোগ হতে পারে।
  • বেবী টুথব্রাশ বা নরম কাপড় ও পানি দিয়ে প্রত্যেকবার খাবার পড় শিশুর নতুন ওঠা দাঁত পরিষ্কার করে দেবেন।
  • আপনার শিশুকে বিছানায় শোয়ানোর সময় হাতে বোতল দেবেন না। আপনার শিশুকে ঘুম পাড়ানোর সময় যদি মুখে বোতল দিতে চান, তাতে শুধু পানি বা দুধ দেবেন। ফলের রসে বা দুধে যে চিনি থাকে তা তার মাড়ি বা নতুন দাঁত- ওঠাতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
  • আপনার শিশুর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আপনার যদি কোন উদ্বেগ থাকে তাহলে আপনার ডাক্তারের সাথে অথবা স্থানীয় হাসপাতালের ইনফরমেশন লাইনে যোগাযোগ করুন। নিশ্চিত করবেন যেন চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে যে-সকল প্রতিষেধক টিকা নেয়ার প্রয়োজন সেগুলো সময়মতো তাকে দেয়া হয়।

জ্ঞান অর্জন

  • আপনার শিশুকে আয়নার সামনে ধরুন। আপনার নাক, মুখ ও শরীরের অন্যান্য অংশগুলো তাকে দেখান।
  • শিশু ভোলানো ছড়া এবং সহজ ছবির বই পড়ুন আপনার শিশুর সাথে।
  • একটা নিরিবিলি জায়গা বেছে নিন। টিভি বা রেডিও চালু থাকলে বন্ধ করে দিন যাতে কোনরকম ব্যাঘাত না ঘটে।
  • গল্প পড়া ছাড়াও, ছবিগুলো নিয়ে কথা বলুন। যদি একটি কুকুরের ছবি থাকে তবে আপানর চেনা কোন কুকুর সম্পর্কে কথা বলুন।
  • খুব বেশি সময় ধরে পড়বেন না। ছোট শিশুরা সহজেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সুতরাং অল্প সময়ের জন্য আর ঘন ঘন পড়াই সবচেয়ে ভালো। পরিবারের অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্কদেরও বই পড়াই অংশ নিতে দিন।
  • মনে রাখবেন আপনি কিন্তু আপনার বাচ্চাকে পড়াতে শেখাচ্ছেন না। পড়তে শেখার অনেক আগেই বাচ্চারা কথা বলতে শেখে, এবং বইপত্র একসাথে পড়া ভাষার উপর আপনার বাচ্চার দখল বাড়ানোর একটা চমৎকার উপায়।

সমন্বয় সাধন

  • দিনের মধ্যে খাওয়ানো, খেলা করা ও ঘুমানোর জন্য একটা সময় তালিকা প্রস্তুত করুন, তবে আপনার প্রয়োজন অনুসারে সেটি পরিবর্তনযোগ্য রাখবেন।
  • আপনার বাচ্চা যখন ক্লান্ত ও বিচলিত বোধ করবে তখন তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তার কোন প্রিয় গান ধীরে ধীরে ও নিচু গলায় তাকে শোনান। সে যদি আপনার সঙ্গে যোগ দেয় তাকে প্রচুর উৎসাহ দয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে তার চেষ্টা আপনি লক্ষ করছেন।
  • যদি প্রয়োজন মনে করেন আপনার শিশুকে “না” বলবেন। এরপর অন্য কাজ কিংবা খেলায় তার দৃষ্টি বা মনোযোগ ফেরাবেন।

আপনি কি আশা করতে পারেন

মনে রাখবেন প্রত্যেক শিশু আপন গতিতে বিকাশ লাভ করে। এগুলো শুধু নীতিসম্পর্কিত নির্দেশাবলী। আপনার শিশুর বিকাশলাভ সম্পর্কে যদি কোন উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপানর ডাক্তার অথবা অন্য কোন বিশ্বাস ভাজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করুন।

  • শিশু ঠেস দিয়ে বসবে, আপনার সাহায্যে আপনার কোলের উপর দাঁড়াবে, তার দুহাত ও হাঁটুর উপর ভর দিয়ে সে দুলতে থাকবে।
  • সে হয়তো হামাগুড়ি দেবে এবং চেয়ার বা সোফা ধরে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে। তাকে উতসাহ দেবেন কিন্তু তাড়াতাড়ি করে কিছু করতে বলবেন না। কোনো কোনো শিশু হামাগুড়ি না দিয়েই সরাসরি হাঁটতে শুরু করে।
  • সে ভাল করে জিনিসপত্র ধরে রাখতে পারবে ও একহাত থেকে অন্যহাতে জিনিস হাতবদল করতে পারবে। সে দড়াম করে শব্দ করতে পারবে, পানি ছিটাতে পারবে বা খেলনাপাতি জোরে আঁকড়ে ধরতে পারবে।
  • যখন আপনি তাকে অন্যদের সাথে রেখে চলে যেতে চান তখন হয়তো সে আপনাকে চেপে ধরে কান্না করতে পারে। অন্য লোকদের সাথে মিশতে অনিচ্ছা প্রকাশ করা অস্বাভাবিক নয় তবে কয়েক মাস্যার মধ্যে এটি ঠিক হয়ে যাবে।
  • দাঁতের মাড়ি লাল হওয়া, মুখ থেকে লালা ঝরা, জিনিসপত্রে কামড় বসানো, কান্না করা ও নিজের মুখ বা কান ঘষা থেকে বুঝতে হবে যে শিশুর প্রথম দাঁত ওঠার সময় হয়েছে। তাকে কিছু চিবুতে দিন ( যেমন ঠাণ্ডা টীদিং রিং), সেই সাথে বেশি করে আদর ও মনোযোগ দেবেন।

এই বয়েসে বাচ্চাদের খুব কৌতূহল বাড়ে। সে হয়তো খেলনা ছুঁড়ে ফেলে বা তার বোনের চুল ধরে টান দেয়! আপনার বাচ্চা দুষ্টুমি করছে না, শুধু পরীক্ষা করে দেখছে সবকিছু। তার কিছুই খুব বেশিক্ষণ মনে থাকবে না, তাই এখন তার কাছে শাসনের বিশেষ মানে নেই। তবে বাচ্চাকে সহজেই ভোলানো যায়। তাই আপনি পছন্দ করেন না এমন কোনো কাজ করা থামাতে হলে তাকে একটা খেলনা দেখাণ কিংবা একটা গান গেয়ে শোনান।

মাস অনুযায়ী শিশুর বেড়ে ওঠা সম্পর্কে জানতে পড়ুন-

 

আপনার নিজের যত্ন দেবেন

নতুন বাবা মায়ের কাছে শিশুর কান্না সামলানো বেশ কষ্টকর। কোন কোন বাচ্চা খুব বেশি কাঁদে। অনেক সময় তার কান্নার কারণ বোঝা খুবি মুশকিল হয়ে ওঠে। আপনি তাকে খাইয়েছেন, তার কাপড় বদলিয়ে দিয়েছেন, হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন, তবু সে কান্না কিছুতেই থামাবেনা। শিশুর এ ধরনের কান্না আপনার দোষ নয়।  সে আপনার ওপর রাগ করেনি কিংবা আপনাকে উত্ত্যক্ত করার জন্য কাদেনা। আপনারা দুজনই দুজনের জীবনে বড় একটা সমন্বয় সাধন করার চেষ্টা করছেন। আপনার শিশু এবং আপনার প্রতি ধৈর্য রাখুন। বেশি পরিমাণে বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করুন। মাঝে মাঝে সংসারের কাজের কথা ভুলে জান এবং শিশু যখন ঘুমিয়ে থাকে, আপনি একটু ঘুমিয়ে নিন।

শিশুর কান্না যদি আপনার সংযমের বাঁধ ভাঙ্গার মত হয় তবে শিশুকে একটি নিরাপদ স্থানে রাখুন (যেমন তার ক্রিব বা খেলার জায়গা) ও কয়েক মিনিটের জন্য ঘরের অন্য দিকে যান। কিংবা আপনার সঙ্গী, কোনো আত্মীয় বা বন্ধুকে অনুরোধ করুন অল্প সময় বাচ্চাকে দেখাশোনা করতে।

কখনোয় শিশুকে ধরে ঝাঁকুনি দেবেন না বা গায়ে হাত তুলবেন না। এর দরুন শিশুর মাথায় জখম, অন্ধত্ব বা মৃত্যুও   হতে পারে। আপনার কোন আচরণে শিশুর কোন ক্ষতি হতে পারে যদি মনে করেন তবে আপানর কাছের মানুষ বা ডাক্তারকে জানান।

সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

Leave a Comment