শিশুর রিফ্লাক্স (Reflux) ও গ্যাস্ট্রোএসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ GERD

এসিড Riflux বা গ্যাস্ট্রিকের কারনে বুক জালা পোড়া করাটা শুধু বড়দের ক্ষেত্রেই হয়না, বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে। অনেকেই জীবনধারায় পরিবর্তন করে অথবা ওষুধের সাহায্যে এই সমস্যাটা কে নিয়ন্ত্রনে রাখে। এই আর্টিকেলে আজকে আমরা বাচ্চার রিফ্লাক্স (Riflux) এবং গ্যাস্ট্রোএসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ নিয়ে আলচনা করবো।

 

 বাচ্চা ঘন ঘন দুধ উগলে দেয়া কি স্বাভাবিক?

এটা আসলে নির্ভর করে। বাচ্চাকে খাওয়ানোর পর উগলে দেয়া (তুলে দেয়া) অথবা কোন কারণ বা অসুস্থতা ছাড়া মাঝে মাঝে বমি করাটা স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আসলে কোন কোন বাচ্চা কোন রকম অসুখ ছাড়াই ঘন ঘন উগলে দেয় । একে বলা হয় রিফ্লাক্স (Reflux)। বেশিরভাগ বাচ্চারই ১ বছর বয়স হতে হতে তা ঠিক হয়ে যায়।

কিন্তু বাচ্চা যখন স্বাভাবিকের চাইতে বেশি উগলাতে থাকে এবং সেটা বাচ্চার শারীরিক বৃদ্ধির উপর প্রভাব ফেলে এমন কি গলা ব্যাথা ও শ্বাস কষ্টের মত সমস্যার সৃষ্টি করে তখন সেটাকে গ্যাস্ট্রোএসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) বলে। এছাড়াও অন্যান্য লক্ষন গুলোর মধ্যে আরো কিছু থাকতে পারে যেমন- কাশি, দুধ খাওয়ার সময় শ্বাস কষ্ট হওয়ার মত এক ধরনের শব্দ, তল পেটে ব্যাথা, পিঠ ধনুকের মত বাঁকানো, হাত পা ছড়ানো ও হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে চিৎকার করা ইত্যাদি।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর বমি । কখন স্বাভাবিক কখন নয় ]

রিফ্লাক্সের  জন্য কি ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত?

আপনার বাচ্চার উগলে দেয়া যদি বেশি হয় এবং তা আপনার কাছে স্বাভাবিক মনে না হলেও বয়সের সাথে যদি তার ওজন বাড়ে এবং তার যদি কোনো অস্বস্তির লক্ষণ না থাকে   সেক্ষেত্রে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। পরবর্তীতে ডাক্তারকে দেখানোর সময় ডাক্তারকে এই সমস্যার কথা বললেই হবে।

অন্যদিকে, আপনি যদি খেয়াল  করেন যে এই সমস্যাটা বাচ্চার জন্য খারাপের দিকে যাচ্ছে এমন কি তা বাচ্চার ওজন বাড়ার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে সেক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব অ্যাপয়েনমেন্ট বুক করে বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। ডাক্তারই আপনাকে বলে দিবেন যে আপনার বাচ্চা গ্যাস্ট্রোএসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজে (GERD) এ আক্রান্ত কি না। যদি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে তিনি বাচ্চার ভোগান্তি কমানোর জন্য আপনাকে যথাযতথ সাহায্য করবেন।

বাচ্চাকে খাওয়ানোর পর যদি ছিটকে বেড়িয়ে আসার মত করে বমি করে তবে সেটাও ডাক্তারকে বলুন। এটাকে প্রজেক্টাইল ভমিটিং (Projectile vomiting) বলে যা  Pyloric stenosis এর একটা লক্ষণ। Pyloric stenosis বা জোরে বমি করা এমন একটা অবস্থা যা বাচ্চাকে অপুষ্টি ও পানিশুন্যতার মত মারাত্মক সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

 

রিফ্লাক্স (Reflux) কেন হয়?

বাচ্চা যখন দুধ খায় তখন তা গলা থকে অন্ননালীর মাধ্যমে তার পাকস্থলীতে পৌছায়। পেশিযুক্ত একটি রিং দিয়ে অন্ননালী এবং পাকস্থলী যুক্ত থাকে। দুধ খাওয়ার পর এ রিংটি খুলে যায় ফলে দুধ পাকস্থলীতে ঢুকতে পারে। এরপর রিংটি আবার বন্ধ হয় যায়।এই রিং বা ভালভটিকে  এসোফেজিয়াল স্ফিঙ্কটার বলে। বাচ্চার এসোফেজিয়াল স্ফিঙ্কটার (Esophageal Sphincter)  দুর্বল হলে অথবা সঠিক ভাবে কাজ না করলে বাচ্চার রিফ্লাক্স (Reflux) হতে পারে। এক্ষেত্রে পেটের ভেতরে থাকা খাবার ও গ্যাস্ট্রিক এর তরল উপরের দিকে উঠে আসে। বড়দের ক্ষেত্রে বুক জালাপোড়া করার অন্যতম প্রধান কারণ।

 

কিভাবে গ্যাস্ট্রোএসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) সনাক্ত করা ও চিকিৎসা দেওয়া হয়?

ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর ডাক্তার আপনার বাচ্চাকে পরিক্ষা করে দেখবেন এমন কি বাচ্চার লক্ষন গুলো সম্পর্কে আপনার কাছে বিস্তারিত জানতে চাইবেন। বিস্তারিত শুনার পর বাচ্চার রিফ্লাক্স (Reflux) কমানোর জন্য ডাক্তার আপনাকে কিছু পরামর্শ দিবেন যা আপনি বাড়িতেই করতে পারেন। যেমন- খাওয়ানোর পর বাচ্চাকে সোজা করে রাখা (বসতে শিখলে বসিয়ে রাখা), একবারে বেশী না খাইয়ে অল্প করে ঘন ঘন খাওয়ানো, বেশি বেশি ঢেঁকুর তুলা, দুধ বা তরল জাতিয় খাবার কিছুটা ঘন করে খাওয়ানো ইত্যাদি।

বাচ্চা যদি বুকের দুধ খায় সেক্ষেত্রে ডাক্তার আপনার খাবার তালিকা থেকে গরুর দুধ অথবা অ্যালার্জিক কোন কিছু থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিবেন। কেননা নির্দিষ্ট কিছু দুগ্ধজাত খাবারও রিফ্লাক্সের কারন হতে পারে।

এসব কিছুতেও কাজ না হলে ডাক্তার আপনাকে কিছু ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করবেন। কোন কোন বাচ্চার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র অ্যানটাসিডেই ভাল কাজ হয় (ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া বাচ্চাকে কখনোই নিজে থেকে কোন ওষুধ খাওয়ানো যাবেনা)। ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী বাচ্চার মাস খানেক নিয়মিত ওষুধ চালিয়ে যেতে হতে পারে।

ওষুধেও কাজ না হলে সমস্যাটা আসলেই গ্যাস্ট্রোএসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তার আরও কিছু পরিক্ষা করার জন্য বলতে পারেন। অথবা প্রয়োজনে কোন গ্যাস্ট্রোএন্টেরলজিস্ট (Gastroenterologist) এর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিবেন।

আপনার শিশুর আপার গ্যাস্ট্রোএন্টেস্টাইনাল ট্র্যাক্ট (Upper Gastrointestinal Tract) এর এক্সরে করা হতে পারে। এটাকে আপার GI সিরিজও বলা হয়। এই পরীক্ষায় বাচ্চাকে ব্যারিয়াম বিফরহ্যান্ড (Barium Beforehand) নামে সাদা এক ধরনের তরল পদার্থ পান করানো হয়। এই পরীক্ষায় বাচ্চার কোন শারীরিক  সমস্যা আছে কি না তা এক্স-রে তে দেখা যাবে।

এছাড়াও বাচ্চার হজম প্রক্রিয়া ঠিক আছে কিনা তা পরিক্ষা করার জন্য বাচ্চাকে অচেতন অবস্থায় ক্ষুদ্র এক ধরনের ক্যামেরা খাদ্যনালি, পাকস্থলী  এবং কখনো ক্ষুদ্রান্তের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করানো হয় কোন ধরনের প্রদাহ বা ক্ষত আছে কিনা দেখার জন্য।

আরেকটি পরিক্ষা করা হতে পারে যেটা হল ২৪ ঘণ্টা pH পর্যবেক্ষণ (24-hour pH probe study)। এই প্রক্রিয়ায় বাচ্চাকে হসপিটালে ভর্তি করানোর পর তার নাক দিয়ে খুব পাতলা নালী খাদ্যনালীর তলদেশ পর্যন্ত ঢুকিয়ে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হয়।এই পরীক্ষায় বাচ্চার রিফ্লাক্সের পুনরাবৃত্তি ও তীব্রতার সাথে বাচ্চার শ্বাসক্রিয়া ও হৃদস্পন্দন পরিমাপ করা হয়।

এইসবের পরেও যদি বাচ্চার উগলানো বাড়তেই থাকে সেক্ষেত্রে ডাক্তার বাচ্চার ওজন বৃদ্ধির দিকে নজর রাখতে বলবেন। অনেক বাচ্চাই যাদের গ্যাস্ট্রোএসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) আছে পর্যাপ্ত খাবার পেটে না রাখতে পারার কারনে তাদের ওজন বাড়েনা। এছাড়াও অনেক্ষেত্রেই পাকস্থলীতে থাকা এসিড খাদ্যনালির দিকে উঠে আসার প্রবনতায় বাচ্চার গলায় ব্যাথাসহ নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে। যার ফলে যেকোনো ধরনের খাবার খাওয়ার প্রতি অরুচি এসে পড়ে।

আবার কোন কারনে পাকস্থলীর  কোন কিছু যদি নাক ও শ্বাসযন্ত্রে চলে আসে তাহলে তা GERD আক্রান্ত বাচ্চার ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। যেমন- নিউমনিয়া, রাত্রিকালীন কফ,সাইনাস বা কানের ইনফেকশন। এর কারণে বাচ্চার দাঁতের এনামেলেরও ক্ষতি হতে পারে।

 

বাচ্চার রিফ্লাক্সের সমস্যা কমানোর জন্য আমি কি করতে পারি?

বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় কিছুটা সোজা করে খাওয়াতে হবে এবং দুধ খাওয়ানো শেষে কিছুক্ষণের জন্য সোজা করে বসিয়ে রাখতে হবে (বসতে না পারলে ধরে রাখতে হবে)। খাওয়ানোর পর পরই বাচ্চাকে কোন ভাবে উপুড় করে রাখা যাবেনা, এমন কি ডায়পার চেঞ্জ করার ক্ষেত্রেও না।

বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় প্রতিবার অল্প পরিমানে কিন্তু ঘন ঘন বুকের দুধ অথবা ফর্মুলা দেওয়াটা বেশ উপকারি। প্রতিবার খাওয়ানো শেষে অবশ্যই বাচ্চার ঢেঁকুর তুলতে হবে।

বুকের দুধ অথবা ফর্মুলা কিছুটা ঘন করার জন্য সাথে ভাতের মাড় দিয়ে তৈরি এমন কোন শিশু খাদ্য মিক্স করা যাবে কিনা তা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন। এক্ষেত্রে ডাক্তার আপনাকে ভালভাবে বুঝিয়ে বলবেন যে কিভাবে বুকের দুধ অথবা কৃত্রিম খাদ্যের সাথে অন্য কোন শিশু খাদ্য মিক্স করতে হয়।

বাচ্চাকে সবসময় সিগারেটের ধোয়া থেকে দূরে রাখলে তাগ্যাস্ট্রোএসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজের (GERD) এর লক্ষণ গুলো কমাতে পারে এবং এটা সব বাচ্চার ক্ষেত্রেই করা উচিত।

অনেক বাবা-মা-ই বাচ্চাকে গাড়ির সিটে ঘুম পাড়ানোর জন্য বলতে পারেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এর বিপক্ষে । কারন বাচ্চাকে যখন গাড়ির সিটে শুয়ে রাখা হয় তখন তার পেটে প্রচুর চাপ পড়ে। যা বাচ্চার রিফ্লাক্সের উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে।

সত্যি কথা বলতে বিশেষজ্ঞরারা কখনোই বাচ্চাকে গাড়ির সিট, বাউন্সি সিট এমন কি দোদুল্যমান কোন জায়গায় ঘুমাতে দেওয়ার জন্য বলেন না, কেননা এই সমস্ত প্রোডাক্ট এইসব উদ্দেশ্যে পরিক্ষিত না। এসবে বাচ্চা ঘুমানোর সময় মাথা বেশী সামনের দিকে হেলে গেলে বাচ্চার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এসবে বাচ্চাকে বসালে খেয়াল রাখতে হবে যাতে বাচ্চার মাথা সোজা থাকে এবং নাকে মুখে কিছু না লাগে।

আরেকটা কথা, বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর ক্ষেত্রে কখনো বালিশ বা স্লিপ পজিশনার ব্যাবহার করবেননা। কারণ এইসব জিনিস ব্যাবহারে বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।সর্বোপরি বাচ্চাকে উপুড় করে ঘুম পারালে রিফ্লাক্সের সমস্যা কমতে পারে কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এর পক্ষে নয় কারণ এতে বাচ্চার SIDS এর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

[ আরও পড়ুনঃ ঘুমানোর সময় শিশুকে কিভাবে শোয়ানো নিরাপদ ]

 

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment