শিশুর ফ্লু । সাধারন সর্দি কাশি ভেবে ভুল করছেন না তো?

ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা কি?

ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা এক ধরনের ভাইরাসজনিত ইনফেকশন। এই ইনফেকশন এর মাধ্যমে আমাদের শ্বাসযন্ত্র (নাক, গলা ও ফুসফুস) সংক্রমিত হয়ে থাকে। আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে বিভিন্ন স্থানে ভাইরাল ফিবার বা ভাইরাসজনিত জ্বর হচ্ছে। অনেকে আবার আক্রান্ত হচ্ছে ফ্লুতে। ফ্লু সাধারণত: বেশি হয় শিশুদের। আর শিশুদের ফ্লু থেকে নিউমোনিয়া বা শ্বাস যন্ত্রের সংক্রমণ হতে পারে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের অনেক ধরন আছে। এক এক বছর এক এক ধরনের ভাইরাসের প্রকোপ দেখা যায়। ৫ বছরের নিচের বাচ্চাদের বিশেষ করে যাদের বয়স ২ বছরের কম তারা ফ্লুতে আক্রান্ত হলে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রতি বছর ৫ বছরের কম বয়সী অনেক বাচ্চা ফ্লু সংক্রান্ত জটিলতায় (যেমন- নিউমোনিয়া) আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।

বাচ্চার সাধারণ ফ্লু এর লক্ষন

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সাধারণ ফ্লু এর কিছু লক্ষন বোঝাটা কষ্টকর যেমন- মাথা ব্যাথা ও পেশীতে ব্যাথা। এগুলো ছারাও আরও কিছু লক্ষন থাকতে পারে। এসব লক্ষন দেখা গেলেই বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে যাতে তিনি ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। বাচ্চার এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রয়োজন পরতে পারে। এগুলো ২ সপ্তাহ বয়সের বাচ্চাদের জন্য ও নিরাপদ এবং এগুলো ভালো কাজ করে যদি অসুস্থ হওয়ার প্রথম দুই দিনের মধ্যে দেয়া হয়।

ফ্লু হলে বাচ্চার নিচের লক্ষনগুলোর মধ্যে কিছু কিছু বা সবগুলো দেখা দিতে পারে-

  • বাচ্চার জ্বর আসতে পারে।
  • শরীরে কাঁপুনি হতে পারে।
  • শুকনো কাশি থাকতে পারে।
  • গলা ব্যাথা হতে পারে।
  • নাক থেকে পানি ঝরতে পারে এবং নাক বন্ধ থাকতে পারে।
  • পেশীতে বা শরীরে ব্যাথা অনুভুত হবে।
  • মাথা ব্যাথা হতে পারে।
  • বাচ্চাকে ক্লান্ত লাগতে পারে।
  • বমি বা ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে।

সাধারণ ঠান্ডার ক্ষেত্রে গলা বসে যায়, নাক বন্ধ হয়ে যায় ও কাশি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে  জ্বর হয়ে থাকে। ফ্লুয়ের ক্ষেত্রে গলা বসে যায় এবং জ্বর হয়, একই সাথে মাথাব্যাথা, পেশীতে ব্যাথা, কাশি, নাক ও গলায় আবদ্ধতা থাকতে পারে। তবে এই দুটি সমস্যাই ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে এবং সাধারণত তিন থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। ফ্লু এর ক্ষেত্রে বাচ্চাদের অনেক বেশী অসুস্থ, ব্যাথাযুক্ত এবং বেশী শরীর খারাপ মনে হয়।

যেসব বাচ্চা বয়স ১২ মাসের নিচে তাদের ক্ষেত্রে জ্বর এবং কাশির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। নিচের লক্ষন গুলো দেখা গেলেই বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে-

  • যদি বাচ্চা ৩ মাসের কম বয়সী হয় এবং জরন ১০০.৪ ডিগ্রীর বা তার বেশী হয়।
  • যদি জ্বর বার বার ১০৪ ডিগ্রীর উপরে উঠে যায়।
  • ২৪ ঘণ্টার বেশী জ্বর থাকলে।
  • কাশি থাকলে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেও না কমলে।

বাচ্চার মারাত্মক ফ্লু এর লক্ষন

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (CDC) এর মতে শারীরিকভাবে তুলনামূলকভাবে বেশী সুস্থসবল শিশুরাও মারাত্মকভাবে ফ্লু তে আক্রান্ত হতে পারে। যদি বাচ্চার মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায় তবে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিতে হবে

  • ঘন ঘন শ্বাস নিলে এবং শ্বাসকষ্ট হলে।
  • চামড়া নীলচে বা ধুসর হয়ে গেলে।
  • বাচ্চার স্বাভাবিক পরিমাণে প্রস্রাব না হলে বা পানিশূন্যতার অন্য কোন লক্ষন দেখা দিলে।
  • অতিরিক্ত ও একটানা বমি করতে থাকলে।
  • বাচ্চা ঘুম থেকে উঠতে না চাইলে বা কোন কিছুতে সাড়া না দিলে।
  • যদি বাচ্চা এতটাই বিরক্ত থাকে যে কাউকে ধরতে না দিলে।
  • শুরতে ফ্লু এর মত লক্ষন দেখা দেয়ার পর ভালো হয়ে আবার জ্বর এবং কাশি হলে।

বাচ্চার যদি অন্য কোন কন্ডিশন থাকে যেমন- হার্ট বা লাংসের সমস্যা বা অ্যাজমা এবং এর সাথে ফ্লু এর লক্ষন দেখা দিলে যার সাথে জ্বর ও কাশি থাকে।

বাচ্চার ফ্লু কিভাবে হতে পারে

ফ্লু আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি কথা বলার সময় বা হাঁচি ও কাশি দেওয়ার সময় এই ফ্লু ভাইরাস বাতাসে ক্ষুদ্রাকারে ভেসে বাড়াতে থাকে। এই ভাইরাস সরাসরি অন্য কোনো ব্যাক্তির শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অথবা এই ভাইরাস যদি কোনো বস্তুর উপর থাকে তবে ঐ বস্তু স্পর্শ করার মাধ্যমে তা নাকে, চোখে বা মুখে পৌঁছাতে পারে।

এটি খুবই ছোঁয়াচে এবং এর উপসর্গ দেখা দেওয়ার দিন থেকে শুরু করে পাঁচ থেকে দশ দিন পর্যন্ত এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের মধ্যে এই ভাইরাস আরও দ্রুত ছড়ায়।

ফ্লু এর লক্ষন একেকজনের একেকরকম হতে পারে। যদি এর লক্ষন মৃদু হয় তাহলে হয়ত বোঝাও যাবেনা যে আপনি ফ্লুতে আক্রান্ত বা তাকে সাধারণ সর্দি কাশি ভেবে ভুলে করতে পারেন। এতে সহজেই অন্যদের মাঝেও ভাইরাস ছড়িয়ে পরতে পারে।

ফ্লু এর চিকিৎসা

বাচ্চার ফ্লু দেখা দিলে ডাক্তার অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দিতে পারেন। অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ভাইরাস জনিত ইনফেকশনের প্রতিকার করে। এটি বাচ্চার ফ্লু কমাতে এবং তাকে সুস্থবোধ করতে সাহায্য করে। এটি নিউমোনিয়ার মত মারাত্মক জটিলতা প্রতিরোধেও সাহায্য করে। অ্যান্টিভাইরাল সাধারনত ফ্লু এর লক্ষন দেখা দেয়ার দু দিনের মধ্যে প্রয়োগ করলে সবচাইতে ভালো কাজ করে।

একটা কথা মনে রাখতে হবে ফ্লু এর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কোন কাজ করেনা। কারণ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধ করে, ভাইরাস নয়। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন পরতে পারে যদি ফ্লু এর কারণে বাচ্চার নিউমোনিয়া, কানের ইনফেকশন বা ব্রংকাইটিসের মত ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন দেখা দেয়।

যদি বাচ্চার ফ্লু এর ঝুঁকি থাকে তবে ডাক্তার এর লক্ষন দেখা দেয়ার সাথে সাথে  অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ শুরু করতে পারেন। ৫ বছরের নিচে সব বাচ্চাই ফ্লু এর ঝুঁকিতে থাকে বিশেষ করে যাদের বয়স ২ বছরের কম তারা। প্রি-ম্যাচিউর শিশু বা যাদের অ্যাজমা ও সিকেল সেল ডিজিজের মত কন্ডিশন আছে তারাও ফ্লু এর ঝুঁকিতে থাকে।

বাচ্চার যদি ফ্লু হয় তবে ডাক্তার ওষুধ দিক আর না দিক তাকে অনেক বেশী বিশ্রামে রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত তরল পান করাতে হবে। সে হয়ত বেশী খেতে চাইবেনা তাই তাকে অল্প অল্প খাবার দিন। বাচ্চা যদি সলিড খাওয়া শুরু করে তবে তাকে স্যুপ দিতে পারেন।

বাচ্চাকে যদি বেশী অসুস্থ মনে হয় তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তাকে acetaminophen বা ibuprofen দেয়া যেতে পারে। কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনভাবেই অ্যাস্পিরিন দেয়া উচিত নয়। এর কারণে Reye syndrome এর মত মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। বাচ্চার সর্দি বা কাশির জন্য সর্দির ওষুধ দেবেন না। এতে সর্দি বা কাশির কোন উপকার হয়না বরং আরও ক্ষতি হতে পারে।

বাচ্চা ৩-৫ দিনের ভেতর সুস্থ বোধ করতে পারে তবে সব বাচ্চার ক্ষেত্রে একই হবে তা নয়। কারও কারও কাশি দুই সপ্তাহ বা তার বেশীও থাকতে পারে।

ফ্লু প্রতিরোধে কি করা যায়?

ফ্লু ভ্যাকসিন

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এর মতে প্রতিটি সুস্থ বাচ্চার ৬ মাস বয়স হওয়ার পর থেকে বছরে একবার ফ্লু ভ্যাকসিন নেয়া উচিত। বাচ্চা যদি ছোট হয় তবে তার আশেপাশের মানুষ যারা তার কাছে থাকেন তাদের ভ্যাকসিন নেয়া উচিত যাতে শিশুর মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণের আশংকা কমানো যায়।

বাচ্চা যদি ঝুঁকির মধ্যে থাকে তবে তার জন্য ভ্যাকসিন নেয়াটা আরও বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যদি বাচ্চার ডায়াবেটিস থাকে, ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়, এনেমিয়া থাকে বা হার্ট, লাংস বা কিডনির কোন সমস্যা থাকলে বাচ্চার ফ্লু ভ্যাকসিন নেয়াটা জরুরী।

তবে ফ্লু ভ্যাকসিন যে ১০০ ভাগ ক্ষেত্রে ফ্লু প্রতিরোধ করতে পারবে তা নয়। এটা বাচ্চার সার্বিক সাস্থ্যের উপর নির্ভর করে (সুস্থ সবল বাচ্চার ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন অধিক কার্যকর)। এছাড়াও যে বছর ভ্যাকসিন নেয়া হয় সে বছর কোন ধরনের ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে সেটার উপর ও এর কার্যকারিতা নির্ভর করে।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা

বাসার সবার পরিষ্কার পরিচ্ছনতা নিশ্চিত করুন। বাচ্চার হাত সাবান এবং গরম পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে এবং পরিবারের সবার নিয়মিত হাত ধুতে হবে। পানি না থাকলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যাবহার করতে পারেন।

হাঁচি বা কাশির সময় টিস্যু ব্যাবহার করতে হবে এবং ব্যাবহারের পর পরই ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে। নিজের চোখ, মুখ ও নাকে বার বার হাত না দেয়ার চেষ্টা করুন। বাচ্চার খেলনা জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দুই থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই যে সব জিনিষ সব সময় হাত দিয়ে ধরা হয় তা কিছুক্ষন পর পর মোছার চেষ্টা করুন।

রোগজীবাণু সাধারণত একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে যায়। আপনার শিশু যদি অন্য অসুস্থ শিশু কিংবা বড়দের কাছে যাতায়াত করে তাহলে তারও অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ সমস্যা মোকাবেলায় অসুস্থদের থেকে শিশুকে সাময়ীকভাবে দূরে রাখুন।

বহু মানুষই পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তাকে অনুধাবন করতে পারে না। কিন্তু পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলে তা আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

বাচ্চার যদি একবার ফ্লু হয় তবে সে বছর তার আবার ফ্লু হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ওই ফ্লু ভাইরাসের বিরুদ্ধে তার শরীরের প্রতিরোধ ব্যাবস্থা তৈরি হয়ে যাবে। পরের বছর যখন আবার ভিন্ন ধরনের ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিবে তখন আগের বারের ভ্যাকসিন কাজ নাও করতে পারে। এ কারণে প্রতি বছর ফ্লু ভ্যাকসিন দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

সবার জন্য শুভকামনা

Related posts

Leave a Comment