শিশুর থ্যালাসেমিয়া । লক্ষন, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) একটি বংশগত রক্তের রোগ। হিমোগ্লোবিন রক্তের খুবই গুরত্বপূর্ণ উপাদান। আমরা নিশ্বাসের সঙ্গে যে অক্সিজেন বহন করি, হিমোগ্লোবিনের কাজ হলো তা শরীরের সমস্ত অংশে বহন করে নিয়ে যাওয়া। এ রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী এই হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। হিমোগ্লোবিন তৈরী হয় দুটি আলফা প্রোটিন ও দুটি বিটা প্রোটিন দিয়ে। যদি এই প্রোটিন গুলোর উৎপাদন শরীরে কমে যায়, তবে শরীরের হিমোগ্লোবিনের উৎপাদনও কমে যায় এবং থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়। আলফা ও বিটা প্রোটিন তৈরী হয় জীন হতে। দুই গ্রুপের হিমোগ্লোবিন চেইনের সংশ্লেষণ মূলত জেনেটিক্যালি নিয়ন্ত্রিত হয়। কেউ যখন কোন ত্রুটিপূর্ণ জীন তার বাবা-মায়ের কাছ হতে বংশানুক্রমে পায়, তখনই মূলত থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়।

থ্যালাসেমিয়ার প্রকারভেদ

থ্যালসেমিয়া প্রধানত দুই ধরণের হয়। যেমন :

আলফা থ্যালাসেমিয়া (Alpha-thalassemia) 

চারটি জিন দিয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়া ধারা (Chain) গঠিত হয়। আমরা বাবা-মা প্রত্যেকের কাছ থেকে দুটি করে এই জিন পাই। এই জিনগুলোর মধ্যে এক বা তার অধিক ত্রুটিপূর্ণ হলে আলফা থ্যালাসেমিয়া হয়। যত বেশি জিন ত্রুটিপূর্ণ হবে তত বেশি মারাত্মক সমস্যা দেখা দিবে।

আলফা থ্যালাসেমিয়া চার ধরনের হয়, যেমন :

ক্যারিয়ার বা বাহকঃ একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে থ্যালাসেমিয়ার কোন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যাবে না। তবে আক্রান্ত ব্যাক্তি বাহক হিসেবে কাজ করবেন এবং আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তার সন্তানের মধ্যে এই রোগ ছড়াতে পারে।

আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনরঃ দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হালকা উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থাকে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনর (Alpha-thalassemia minor) অথবা আলফা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট ( Alpha-thalassemia trait). এটি হলেও তেমন কোন লক্ষন দেখা না দিতে পারে। তবে আক্রান্ত ব্যাক্তির হালকা এনেমিয়া হতে পারে যার ফলে তার সহজে দুর্বল লাগতে পারে।

হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজঃ তিনটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে এর উপসর্গগুলো মাঝারি থেকে মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই অবস্থাকে বলে হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ। এর ফলে এনেমিয়া দেখা দেয় এবং আরও জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।

আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজরঃ চারটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে একে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর (Alpha thalassemia major) অথবা হাইড্রপস ফিটেইলস (Hydrops fetalis)। এর ফলে প্রসবের (delivery) পূর্বে বাচ্চা মারাত্মক এনেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে অথবা জন্মের পর পরই বাচ্চার মৃত্যু ঘটতে পারে বা বাচ্চার সারাজীবন ব্লাড ট্রান্সফিউশনের চিকিৎসা নিতে হতে পারে।

বিটা থ্যালাসেমিয়া (Beta-thalassemia)

বিটা থ্যালাসেমিয়া ধারা গঠিত (Chain) হয় দুইটি জিন দিয়ে। বাবা-মা প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে মোট দুইটি জিন আমরা পেয়ে থাকি। একটি অথবা উভয় জিনই ত্রুটিপূর্ণ হলে Beta-thalassemia দেখা দেয়।

বিটা থ্যালাসেমিয়া তিন ধরনের হতে পারে-

বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনরঃ একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হালকা উপসর্গ দেখা যায়। এই অবস্থাকে বলে বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর (Beta-thalassemia major) অথবা বিটা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট (Beta-thalassemia trait). এর ফলে হালকা এনেমিয়া হতে পারে এবং এর বাহক তার সন্তানের মধ্যে এ রোগ ছড়াতে পারে।

বিটা থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়াঃ দুটি  জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে অনেক সময় মাঝারি ধরনের এনেমিয়ার লক্ষন দেখা দিতে পারে। একে বিটা থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া বলে।

বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজরঃ দুইটি জিনই ত্রুটিপূর্ণ হলে  মারাত্মক উপসর্গ দেখা যায়। এ অবস্থাকে বলে বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর ( Beta-thalassemia major) অথবা কুলিস এ্যানিমিয়া (Cooley’s anemia)। নবজাতক যেসব শিশুর এই সমস্যা থাকে তারা জন্মের সময় বেশ স্বাস্থ্যবান থাকে। তবে জন্মের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই এর উপসর্গ দেখা যায়। এর চিকিৎসা করা না হলে তাদের যকৃত, হাড় ও হৃদপিণ্ডের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ

থ্যালাসেমিয়া মাইনরে সামান্য অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা ছাড়া সাধারণত বড় কোনো উপসর্গ থাকে না। থ্যালাসেমিয়া মেজরে সাধারণত শিশুর জন্মের দুই বছরের মধ্যে উপসর্গসহ স্পষ্ট হয়। উপসর্গের মধ্যে আছে-

  • অতিরিক্ত কান্নাকাটি করা
  •  অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া
  • সংক্রামক রোগে বেশি আক্রান্ত হওয়া
  • ক্ষুধামান্দ্য বা খেতে অনীহা
  • প্লীহাস্ফীতি বড় হয়ে যাওয়া
  • মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া,
  • ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া (জন্ডিস),
  • মুখের হাড়ের বিকৃতি,
  • ধীরগতিতে শারীরিক বৃদ্ধি,
  • পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হওয়া বা বৃদ্ধি পাওয়া,
  • গাঢ় রঙের প্রস্রাব।

কিভাবে থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করা হয়?

ডাক্তাররা রোগের ইতিহাস, লক্ষণ, সাধারণ শারীরিক পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া সন্দেহ হলে কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট পরীক্ষা করে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ দেখে থাকেন। প্রয়োজন মনে করলে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষাও করা হয়।

এক্স-রে করে দেখা হয় হাড় কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণত মাথা ও মুখমণ্ডলের এক্স-রে করা হয়। বুকের এক্স-রে পরীক্ষায় অনেক সময় দেখা যায় পাঁজরের হাড় বিকৃতি ঘটেছে। অনেকের হার্টও আকারে বড় হয়ে যায়।

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে লোহিত রক্তকণিকার মাত্রা, লোহিত রক্ত কণিকার আকারের পরিবর্তন, বিবর্ণ লোহিত রক্ত কণিকা, লোহিত রক্ত কণিকায় হিমোগ্লোবিনের অসম থাকা, শিশুর রক্তে আয়রণ ও লৌহের পরিমাণ, হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ইত্যাদি জানা যায়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা অথবা রোগী ত্রটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জিন বহন করছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। কিছু লক্ষণ ও রক্তের কয়েকটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে থ্যালাসেমিয়া রোগ সন্দেহ ও পরবর্তীতে পর্যবেক্ষন করা হয়। যেমন- রক্তের কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট(CBC), ব্লাড ফ্লিম(PBF) ইত্যাদি ।

থ্যালাসেমিয়ার ঝুঁকি কাদের বেশী থাকে?

পরিবারে থ্যালাসেমিয়া থাকা: আপনার বংশ/পরিবারে কেউ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হলে আপনার এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

নির্দিষ্ট জাতির অন্তর্ভুক্ত হওয়া: কিছু কিছু জাতির মধ্যে যেমন-দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, ইটালী, গ্রীক, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগটি বেশী দেখা যায়।

যদি বাবা এবং মা দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক না হন তাহলে সন্তান থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নেয়া সম্ভব নয়।  যদি বাবা অথবা মা থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয়ে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে ৫০ ভাগ সম্ভাবনা থাকে বাচ্চাও মা বা বাবার মত থ্যালাসেমিয়ার বাহক হবে। কিন্তু এ রোগে আক্রান্ত হবেনা।

যদি বাবা এবং মা দু জনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন তবে-

  • শতকরা ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগ নিয়ে জন্মাতে পারে
  • শতকরা ৫০ ভাগ বাহক হিসেবে জন্ম নিতে পারে যাদের কোন লক্ষন প্রকাশ পাবেনা।
  • শতকরা  ২৫ ভাগ সুস্থ শিশু হিসেবে জন্ম নিতে পারে।

থ্যালাসেমিয়ার কারণে কি কি জটিলতা দেখা দিতে পারে?

আয়রনের আধিক্যঃ রক্ত পরিবর্তন অথবা রোগের কারণে রক্তে আয়রণের পরিমাণ বেড়ে যায়। রক্তে আয়রনের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা হৃৎপিন্ড, যকৃত এবং এন্ডোক্রাইন ব্যবস্থা কে (Endocrine system) ক্ষতিগ্রস্থ  করে।

ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াঃ থ্যালাসেমিয়ার রোগীদের ইনফেকশন ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে যাদের স্প্লিন শরীর থেকে কেটে ফেলতে হয়েছে তাদের মধ্যে এই ঝুকি অনেক বেশি। কারণ ইনফেকশনের সাথে যুদ্ধরত অঙ্গটি আর শরীরে অবস্থান করছে না। রক্ত পরিবর্তনের কারণে রক্ত বাহিত বিভিন্ন রোগ যেমন-হেপাটাইটিসের সংক্রমণ হয়।

হাড়ের সমস্যাঃ অস্থিমজ্জা প্রসারিত হয়ে যায় এবং এর ফলে হাড় প্রসারিত হয়ে পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। এতে  হাড় ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

হৃদপিণ্ডের সমস্যাঃ মারাত্মক আকারের থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে হার্ট ফেইলিউরও হতে পারে।

স্প্লীন বা প্লীহা বড় হয়ে যাওয়াঃ প্লীহা আমাদের শরীরকে ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা করে এবং পুরনো ও খতিগ্রস্থ রক্ত কনিকা ফিল্টার করে। থ্যালাসেমিয়াতে যেহেতু মানুষের শরীরে অনেক বেশী ক্ষতিগ্রস্ত লোহিত রক্ত কনিকা থাকে তাই প্লীহা কে অনেক বেশী কাজ করতে হয়। এর ফলে প্লীহা বড় হয়ে যায় (Spleen Enlargement)।

শিশুর বৃদ্ধি কম হওয়াঃ একজন সুস্থ-স্বাভাবিক শিশুর ক্ষেত্রে যেখানে রক্তে ফিটাল হিমোগ্লবিনের পরিমাণ শতকরা ৭০-৮০ ভাগ থাকে, সেখানে আক্রান্ত শিশুর জন্মানোর ছয়মাস পর থেকেই রক্তে হিমোগ্লবিনের পরিমাণ কমতে কমতে শতকরা ২-৩ ভাগে এসে পৌঁছায়। তাই শিশু রক্তশূন্য হয়ে পড়ে। এছাড়া যে বয়সে শিশুর দাঁড়ানোর কথা, বসতে শেখার কথা, কথা বলতে পারার কথা- শিশুর এইসব স্বাভাবিক বিকাশ নিয়ম অনুযায়ী হয় না।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা

রক্তপরিসঞ্চালন

থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি পূরনের জন্য ‍নিয়মিত রক্ত প্রদান করতে হবে যাতে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ৯ গ্রাম/ডিসিলিটারের(শতকরা ৫৬/ ৫৬%) উপরে থাকে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্তের উপাদান পৃথক করে শুধুমাত্র লৌহিত কণিকা বা রেড সেল দিতে হবে। থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়ার ক্ষেত্রে বেশীর ভাগ রোগীরই নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয় না । অনেক রোগীদের কখনই রক্ত দিতে হয় না্। রক্ত পরিসঞ্চালন শুরু করার আগেই থ্যালাসেমিয়ার ধরন নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারনত ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর পর রক্ত দিতে হয়।  থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া এবং ই বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে যদি থ্যালাসেমিয়া মেজরের মতো মারাত্মক রক্তশূন্যতা হয় হবে ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর পর, অন্যথায় আরো বেশী ব্যবধানে রক্ত দিতে হবে।

লৌহ নিষ্কাশন

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের দেহে নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালনের ফলে জমা হওয়া অতিরিক্ত আয়রন বের করার জন্য ‍নিয়মিত লৌহ নিষ্কাশক ( Iron Chelator) ওষুধ যেমন- ডেসফেরল, কেলফার গ্রহন করতে হয়। এছাড়া ডেসিরক্স (Deferasirox) নামে নতুন একটি মুখে খাওয়ার ওষুধ এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। যে কোন ওষুধই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে হবে।

আয়রন জনিত হৃদরোগ থ্যালাসেমিয়া রোগে মৃত্যুর প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক গবেষনাপত্রে দেখা গেছে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসায় কেলফার, ডেসফেরলের চেয়ে বেশী হৃদরোগ সুরক্ষা দেয়। এজন্য ডেসফেরল ও কেলফারের যৌথ চিকিৎসা সুপারিশ করা হয় । গবেষনায় দেখা গেছে যৌথ চিকিৎসায় প্রতিটি ঔষধের কার্যকারিতা একক চিকিৎসা অপেক্ষা বৃদ্ধি পায় এবং কার্যকরভাবে দ্রুত লৌহ নিষ্কাশন করা সম্ভব হয় ।

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগ নিরাময় সম্ভব । যেহেতু এটি একটি জন্মগত সমস্যা, যদি তার জিনগত সমস্যাকে পরিবর্তন করা হয়, অর্থাৎ যে অঙ্গ দিয়ে সমস্যাযুক্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি হচ্ছে, সে অঙ্গ মানে বোনম্যারো (অস্থিমজ্জা), এটাকে যদি অস্থিমজ্জা সংযোজনের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়, তাহলে একে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।এই প্রক্রিয়ার জন্য একজন অনুরুপ (Match) অস্থিমজ্জাদাতা প্রয়োজন যা দুষ্প্রাপ্য । এছাড়া প্রক্রিয়াটি ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং শতভাগ সফল নয় ।

আর একটি প্রক্রিয়া হলো কর্ড ব্লাড ট্রান্সপ্লান্টেশন (নবজাতকের প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল ও আম্বিলিকাল কর্ড থেকে স্টেমসেল সংগ্রহ করে তা প্রতিস্থাপন করা) । অতি সম্প্রতি এই প্রক্রিয়াটি বিশ্বের কয়েকটি দেশে সফলভাবে থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা বা প্রতিকার এর ব্যবহৃত হয়েছে । এছাড়াও জিন থেরাপি সম্পর্কে গবেষণা চলছে এবং আশা করা হচ্ছে ভবিষ্যতে থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা বা প্রতিকার করার ক্ষেত্রে এটি যুগান্তকারী অবদান রাখবে ।

ফলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট

থ্যালাসেমিয়া থেকে সৃষ্ট এনেমিয়া প্রতিরোধের জন্য বাচ্চাকে ফলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট দেয়ার প্রয়োজন পরতে পারে। ফলিক এসিড হোল ভিটামিন বি যা প্রতিটি রক্ত কোষের স্বাভাবিক ও সুস্থ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয়।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে করনীয়

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা খুবই সম্ভব। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। যদি স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়া বাহক বা একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক এবং একজন হিমোগ্লোবিন ই এর বাহক হয় তবে বাচ্চা থ্যালাসেমিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্বামী স্ত্রী দুজনের যেকোন একজন যদি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকেন, তাহলে নবজাতকের থ্যালাসেমিক হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না। তবে নবজাতক থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে যা কোন রোগ নয়। তাই এ রোগের বাহকদের মধ্যে বিয়ে নিরুৎসাহিত এবং প্রতিহত করার মাধ্যমে সমাজে নতুন থ্যালাসেমিক শিশুর জন্ম হ্রাস করা যায়।

থ্যালাসেমিয়া ও গর্ভধারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের লেখাটি পড়ুন। 

জেনেটিক রোগ সম্পর্কে সচেতন না থাকা ও আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের কারণে বাংলাদেশ, পাকিস্তানএইসব দেশগুলোতে থ্যালাসেমিয়ার দ্রুত বিস্তার ঘটছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় আট থেকে দশ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে । ইতঃমধ্যে সারাদেশে আক্রান্তর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখেরও বেশি শিশু। দেশে এ রোগের বাহক প্রায় দেড় কোটি মানুষ। তাইদ্রুত এই রোগ প্রতিরোধে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। আমরা চাইলে আমাদের সমাজ হতে এই রোগ সম্পূর্ নির্মূল করতে পারি।

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের জীবন যাপন কেমন হওয়া উচিত?

থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করার পর রোগীদের নিয়মিত যেসব বিষয় খেয়াল রাখা উচিত

  • নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো।
  • রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ১০ গ্রাম বা ডেসিলিটার রাখার চেষ্টা করতে হবে।
  • মেনিনজাইটিস ও হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা নেওয়া।
  • শিশুরোগীর ক্ষেত্রে প্রতি তিন মাস অন্তর উচ্চতা, ওজন, লিভার ফাংশন পরীক্ষা করা।
  • আট থেকে ১০ ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পর রক্তে লৌহের পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে।
  • শিশুর প্রতিবছর বুদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা।
  • রক্তে লৌহের মাত্রা এক হাজার ন্যানো গ্রাম বা মিলি লিটারের ওপরে হলে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া।
  • বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন নিশ্চিত করা।
  • শিশুদের যাতে ইনফেকশন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নিয়মিত হাত ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার রাখতে হবে।
  • দেহের হাড়ের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি আর ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে।যতদিন না ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া আয়রন সমৃদ্ধ ভিটামিন দেবেন না।

সবার জন্য শুভকামনা

Related posts

Leave a Comment