প্রসব পরবর্তী সহবাস । যে বিষয়গুলো জেনে রাখা উচিত

সন্তান জন্মদানের পর অনেক মা’ই শারীরিক এবং মানসিক ভাবে ক্লান্ত বোধ করেন, অনেকের ক্ষেত্রে যৌন সম্পর্কের তেমন সুযোগও ঘটে না। হয়তো আপনি এবং আপনার সঙ্গী এই পরিস্থিতিতেও খুশি থাকতে পারেন, কিন্তু আপনার প্রসব পরবর্তী সহবাস যদি একটি সমস্যায় পরিণত হয়, তাহলে কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসা জরুরী। যৌনমিলনের অভাব কিংবা আনন্দহীন সহবাস অনেক হতাশা ও দুশ্চিন্তার জন্ম দেয় এবং একটি সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

প্রসব পরবর্তী সহবাস কখন নিরাপদ? 

প্রসবের পর রক্তপাত বন্ধ হওয়া পর্যন্ত সহবাস করা উচিৎ নয়। এই রক্তপাত সাধারণত প্রসবের পর ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। এ সময় প্রসবের ফলে জরায়ুতে প্লাসেন্টার কারণে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয় তা শুকাতে থাকে। এই ক্ষত পুরোপুরি শুকানোর আগে সহবাস করা হলে ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকে।

প্রসবের পরে স্ফীতিপ্রাপ্ত জরায়ুর গুটিয়ে ক্রমশ ছোট হয়ে আসতে কিছু সময় লেগে যায়। প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলটি যখন তার ভিতরকার গা থেকে ছিরে আসে তখন সেখানে একটি ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ঐ ক্ষত থেকে প্রথম দুই একদিন পর্যন্ত কেবল অমিশ্র রক্তপাতই হতে থাকে। ক্রমে জরায়ু সংকুচিত হতে থাকে এবং ঐ ক্ষতটি আরোগ্য হয়ে সেখানে নতুন ঝিল্লীর আবরণ পড়তে থাকে। এক সপ্তাহ থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রক্ত থেকে গিয়ে তার বদলে পুঁজের মতো পদার্থ নির্গত হতে দেখা যায়। এটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

প্রায় তিন সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্ত থেমে গিয়ে যোনিস্থানও অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হয়, আর ওরই সঙ্গে ভিতরকার জরায়ুটিও ক্রমশ ছোট হয়ে আসতে থাকে। দুই সপ্তাহ পরে জরায়ু অনেকটা ছোট হয়ে গেলেও তখনও তার আকার গর্ভসঞ্চার হবার আগেকার আকারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বড় থাকে। চার সপ্তাহের আগে প্রসবের জরায়ু স্বাভাবিক অবস্থায় এসেছে বলা যেতে পারেনা। কিন্তু তার পরেও সেটি গর্ভাধানের আগেকার আকারের চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বড় থাকে। প্রসবের পরে বিশ্রাম নেবার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে এই সকল কথাই বিবেচনা করতে হবে। তাই প্রসবের পরে কিছুকাল পর্যন্ত সকল দিক দিয়ে যতই বিশ্রাম নেওয়া যায় ততই ভালো।

বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ প্রসবের পর অন্তত ৪ সপ্তাহ অপেক্ষা করার কথা বলবেন। আর যদি আপনার কোন কাটাছেরা থাকে – সেটা সিজারিয়ানের কারণে বা স্বাভাবিক প্রসবে যোনি ছিরে যাওয়া বা এপিসিওটমির কারণে হতে পারে, তবে আপনার ডাক্তার অন্তত ৬ সপ্তাহ পর তার সাথে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত সহবাস না করার পরামর্শ দেবেন।

সিজারিয়ানে যেহেতু জরায়ু মুখ দিতে বাচ্চা প্রসব হয়না তাই এসব ক্ষেত্রে সহবাসের সময় নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। বেশিরভাগ সময়ই সিজারিয়ানের ক্ষেত্রেও মায়ের যোনিমুখ খুলে যেতে পারে। আর যদি প্রসবের অল্প সময় পরই সহবাস করা হয় সেক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া যোনি হতে জরায়ুতে প্রবেশ করে ইনফেকশনের সৃষ্টি করতে পারে।

প্রসবের পড় যৌন ইচ্ছা জাগতে কতদিন সময় লাগতে পারে?

বাচ্চা প্রসবের পরপরই অনেক নারী ক্লান্ত ও বিষাদগ্রস্থ থাকেন। শারীরিক অবস্থা ও আবার গর্ভবতী হয়ে পড়া নিয়ে এক ধরনের চিন্তা কাজ করে। পুরুষদের ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। একজন বাবার যৌন অনুভূতি সন্তান জন্মের আগে পরে প্রায় একই রকম থাকে। কিন্তু অনেক পুরুষ তার স্ত্রীর জন্য কোনটা ঠিক তা নিয়েই চিন্তায় পড়ে যান। তারা কী করবেন তা নিয়ে অনিশ্চিয়তায় ভুগে চিন্তিত ও হতাশ হয়ে পড়েন।

সন্তান জন্মদানের পরপরই অনেক মা ক্লান্তি ও একধরণের ব্যথা অনুভব করেন। এই সময় যৌনমিলনের জন্য তাড়াহুড়ো না করাই ভাল। যৌনমিলনের সময় যদি আপনি ব্যথা পান, তাহলে অবশ্যই তা উপভোগ্য কিছু হবে না।যৌনমিলনের ইচ্ছা তৈরি হতে আপনার কিছুটা সময় লাগতে পারে। ততক্ষণ পর্যন্ত, একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্য বাড়িয়ে, দূরত্ব কমিয়ে পরস্পরকে খুশি রাখতে পারেন।

যেসব কারণে এ সময়ে আপনার যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যায়:

  • প্রসবজনিত কাটাছেড়া, ক্ষত এগুলি থেকে সেরে ওঠা (নরমাল ডেলিভারিতে যৌনাঙ্গের মুখে কাটাছেঁড়া)।
  • সিজারিয়ান প্রসব হলে তলপেটের কাটাছেঁড়া থেকে সেরে ওঠা।
  • প্রসব পরবর্তী রক্তপাত প্রসবের পরে চার থকে ছয় সপ্তাহ স্বাভাবিক ঘটনা।
  • গর্ভধারণ এবং প্রসব পরবর্তী অবসাদ।
  • এ সময়ে নবজাতক বাচ্চার আপনাকে দরকার হয়।
  • হরমোন লেভেলের পরিবর্তন।
  • নবজাতককে স্তন পান করানোর কারণে স্তনে কালশিটে দাগ পড়া।
  • আবেগ সংক্রান্ত ব্যাপার, যেমন প্রসব পরবর্তী বেদনা, মাতৃত্বের কারণে তৈরি হওয়া উদ্বেগ অথবা পারিবারিক ঝামেলা ইত্যাদি।

আপনি পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই আপনার সঙ্গী মিলিত হতে চাইলে কি হবে?

প্রসবের পর থেকে সাধারণত এক মাসের মধ্যে কোনো সঙ্গম প্রচেষ্টা করা নিরাপদ নয়। তবে স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে তিন চার সপ্তাহের মধ্যে যৌন স্থান গুলি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠে, একথা পূর্বেই বলা হয়েছে। সঙ্গমের খুবই প্রয়োজন বোধ করলে প্রসবের ৪০ দিন পর থেকে সেটা শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু সেই বাসনা দুই পক্ষ থেকেই হওয়া চাই, মাত্র এক পক্ষের নয়।

সাধারণতঃ মেয়েদের যৌন ইচ্ছা এ সময়টাতে একেবারেই চলে যায়। তারা সবে নতুন জননী হয়েছে আর বাৎসল্যের মনোভাবই তখন তাদের মধ্যে প্রধান্য লাভ করেছে। এই সময়টিতে যদি জোর করে বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে সহবাস করা হয় তাহলে স্ত্রীর মন স্বামীর প্রতি অকস্মাৎ বিরূপ হয়ে উঠতে পারে। স্বামী স্ত্রীতে মনোমালিন্য ঘটবার এই একটি বিশেষ কারণ। সুতরাং এই সমটিতে দুই দিক থেকেই বিশেষ বিবেচনা পূর্বক আচরণ করতে হবে।

পুরুষেরও মনে রাখা চাই অপর পক্ষের উপস্থিত অবস্থাটির কথা। আর নারীরও একথা বোঝা চাই যে তার পূর্বস্নেহ এবং যৌন সম্পর্কে আগ্রহের অভাবে স্বামী মনে মনে কষ্ট পাচ্ছে। দুজনকেই দেখাতে হবে পরস্পরের প্রতি বিবেচনা ও সহানুভুতি, দুজনকেই চাইতে হবে আগেকার সেই ভালোবাসার খানিকটা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বোঝাবুঝি ভাবটি আবার এসে পড়লে তখন আর সহবাসে কোনো বিঘ্ন থাকবে না।

মনে রাখবেন সহবাস না করেও একে অন্যকে সুখী রাখতে পারেন। এ সময় মিলিত হতে না পারলেও মুহূর্তগুলো সুন্দর করে তোলা যায়। স্বামী-স্ত্রীর মনের কথা একে অন্যজনের সাথে শেয়ার করুন। হাতে হাত রেখে বসে থাকুন। চুম্বন  করে একে অপরের শরীরের স্পর্শ নিন। পরস্পরকে মাসাজ করে দিন। এসব কিছুই দুজনকেই তৃপ্ত রাখতে সাহায্য করবে।

আপনার এবং আপনার স্বামী উভয়ের জন্যই এ সময়ে ধৈর্য্য ধরা উচিৎ। দেখা যায় প্রথম সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে আগের মত সম্পূর্ণ আনন্দময় যৌন মিলনের মত অবস্থায় ফিরে আসতে একটু বেশি সময় দরকার হয়। এই সময়কাল গর্ভকালীন অবস্থা ও প্রসব পরবর্তী সময় সব মিলিয়ে এক বছরের মত হতে পারে।

প্রসবের পর যৌন মিলন একটু আলাদা এবং অভ্যস্ত হতে সময় লাগে। নীচের পয়েন্টগুলো মিলনকে আরেকটু সহজ করতে পারবে-

সেলাই

যদি আপনার সেলাই থাকে, তবে যৌনসঙ্গম আরামদায়ক হতে ৬-৮ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। যদি তিন মাস পরও সঙ্গম ব্যাথাদায়ক হয়, তবে আপনার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

অল্প পিচ্ছিলতা

হরমোন পরিবর্তনের মানে হলো আপনার মাসিকের রাস্তা স্বাভাবিকের থেকে কম পিচ্ছিল হবে। এটা ১০ সপ্তাহ পরে ঠিক হয়ে যাবে। সেই পর্যন্ত, পিচ্ছিলকারক ব্যবহার করুন অথবা সঙ্গমের পূর্বে একটু বেশি সময় মেলামেশা করুন। প্রসবের পর যোনির শুস্কতা এবং বেদনা খুব স্বাভাবিক। নিজের থেকে তৈলাক্ত না হলে তৈলাক্তকরণের জেল পাওয়া যায়। কিন্তু ভালো হবে যদি শরীরের ইঙ্গিতের অপেক্ষা করেন যে সে প্রস্তুত।

ব্যথা করলে থেমে যাবেন

প্রসবের পর যৌন মিলন কষ্টকর হতে পারে। কষ্ট হলেই স্বামীকে বলবেন। সেই অবস্থান ঠিক করবেন যাতে আপনি আরাম পান। কেগেল ব্যায়াম করলে আপনার শ্রোণী তল শক্ত হবে ও অর্গাজম তীব্র হয়ে উঠবে।

আপনার অনুভূতি

কিছু মহিলা এই সময়ে তার শারিরীক পরিবর্তন মেনে নেন- কিন্তু অনেকেই তা মানতে পারেন না। আপনি নিজেকে আকৃতিহীন মনে করতে পারেন। আপনি মনে করতে পারেন এই শরীর আপনার না। এটা আপনার গর্ভাবস্থার শরীরের মতো নয়- কিন্তু আবার আপনার পূর্বের শরীরের মতোও নয়।

নিজের মত সময় নেবেন

হরমোনের গোলমালের কারণে মিলনের ইচ্ছা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তখনই রাজি হবেন যখন আপনি মানসিক ও শারীরিক ভাবে প্রস্তুত। স্বামীকে নিয়ে মন খারাপ করবেন না; আপনি একা নন। কিছু মায়েদের এক বছরের ওপরে সময় লাগে। যাই করবেন আগে ডাক্তারের সাথে কথা বলে নেবেন।

বুকের দুধ

কিছু মহিলার যৌনসঙ্গমের সময় বুকের দুধ চুয়ে চুয়ে পড়তে পারে। যদি আপনি বা আপনার সঙ্গী এর সাথে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করেন তবে বাচ্চাকে আগে দুধ পান করান বা দুধের পরিমান কমানোর জন্য দুধ বের করে নিন বা প্যাডযুক্ত ব্রা পরিধান করুন। ভালো খবর এই যে, কয়েক মাসের মধ্যেই আপনার শরীরের আকৃতি এবং যৌন জীবনের উন্নতি হবে। এই সময়ে:

  • আপনার অনুভূতি সম্পর্কে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলুন
  • কিছু ‘ব্যক্তিগত মুহুর্ত’ একসাথে কাটান
  • প্রথম যৌনসঙ্গমের সময় বেশি কিছু আশা করবেন না
  • যদি অস্বস্তিকর মনে হয়, তবে আরও কিছু সপ্তাহ অপেক্ষা করুন

মনে রাখবেন একজন আরেকজনের কাছাকাছি আসার এবং আনন্দ করার আরও অনেক পদ্ধতি আছে ।

জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ

গর্ভধারণ ও ডেলিভারির ফলে মায়ের শরীরে রক্তের যে ঘাটতি হয় তা পূরণ হতে ২ বছর সময় লাগে। সেজন্য পরবর্তী গর্ভধারণ কমপক্ষে ২ বছরের আগে নেয়া উচিত নয়। কিন্তু ভুল ধারণা, অজ্ঞতা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না নেবার কারণে অনেক মায়েরা না চাওয়া সত্ত্বেও স্বল্প সময়ের মধ্যে পুনরায় গর্ভবতী হয়ে পড়েন। এমনকি কেউ কেউ পরবর্তী মাসিক হওয়ার আগেই গর্ভবতী হয়ে পড়েন। এর জন্য প্রয়োজন, চিকিত্সকের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং তা শুরু করতে হবে ডেলিভারির ৪০ দিন পর থেকেই। প্রসব পরবর্তী  প্রথম ২-৩ সপ্তাহ যখন রক্তস্রাব থাকে এবং সেলাই থাকলে সেলাই এর ব্যথা ও ক্ষত যতদিন ভালো না হয়, ততদিন সহবাস থেকে বিরত থাকতে হয়। তবে আমাদের দেশের মায়েরা সাধারণত: ডেলিভারির পর ৪০ দিন পর্যন্ত সহবাস করা থেকে বিরত থাকেন। তাই ডেলিভারির ৪০ দিন পর থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ব্যবহার করা শুরু করতে হয়।

আরও পড়ুন- প্রসব পরবর্তী জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সমূহ

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment