প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ এবং গর্ভাবস্থার সপ্তাহ বা মাস কিভাবে হিসাব করবেন ?

প্রসবের দিন (Due Date) কিভাবে হিসাব করা হয়? 

গর্ভধারণের সময় গণনা সাধারণত শুরু হয় মাসিক এর প্রথম দিন হতেই। এই সময়ের সপ্তাহ দুই এক এর মধ্যেই সাধারণত গর্ভসঞ্চার হয়ে থাকে। যেহেতু গর্ভসঞ্চার এর নির্দিষ্ট সময় নির্ণয় করা অসম্ভব তাই বিশেষজ্ঞরা শেষ মাসিক এর প্রথম দিন হতে পরবর্তী ৪০ সপ্তাহকে গর্ভধারণ এর সময় হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। এই হিসেবেই প্রসবের দিন (Due Date) গণনা করা হয়।

যদি আপনার নিয়মিত মাসিক হয়, অর্থাৎ ২৮ দিন পর পর মাসিক হয় তবে আপনি নিম্নলিখিত উপায়ে আপনার প্রসবের দিন গণনা করতে পারেন –

প্রথমে আপনার শেষ মাসিকের প্রথম দিন এর সাথে সাত দিন যোগ করুন। এবং এর পর তা থেকে ৩ মাস বিয়োগ করুন।

উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার শেষ মাসিকের প্রথম দিন হয় নভেম্বর ১, ২০১৭-

  • ৭ দিন যোগ করুন ( নভেম্বর ৮, ২০১৭)
  • তিন মাস বিয়োগ করুন ( অগাস্ট ৮, ২০১৭)
  • এবার এক বছর যোগ করুন ( এক্ষেত্রে ২০১৮)

অর্থাৎ আপনার প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ অগাস্ট ৮, ২০১৮।

এছাড়া আপনার মাসিকচক্র যদি আরও লম্বা হয় সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু হিসাব করতে হবে। এক্ষেত্রে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে ওভুলেশনের ঠিক ১৪ দিন পর পরবর্তী মাসিক হয়। তার মানে যদি আপনার মাসিকচক্র ৩৫ দিন হয় তবে আপনার ওভুলেশন হবে ২১ তম দিনে। এক্ষেত্রে আপনার মাসিক চক্র যদি ৩৫ দিনের হয় এবং আপনার শেষ মাসিকের প্রথম দিন যদি হয় নভেম্বর ১, তবে-

  • এর সাথে ২১ দিন যোগ করুন (নভেম্বর ২২)
  • এর থেকে ১৪ দিন বিয়োগ করে আনুমানিক lmp বা মাসিকের প্রথম দিন হিসাব করুন (নভেম্বর 8)

এবার আগের পদ্ধতিতে প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ হিসাব করুন।

ওভুলেশন সম্পর্কে বিস্তারিত যানতে পড়ুন।

কিভাবে আমি বুঝবো আমি কয় সপ্তাহের গর্ভবতী?

সঠিক ভাবে কয় সপ্তাহের গর্ভবতী বা ডিম্বানু এবং শুক্রানু কখন মিলিত হয়েছে জানার কোন উপায় নেই। তাই ডাক্তার সহ সবাই হিসাব করে শেষ মাসিক চক্রের দিন বা এল এম পি। এভাবে হিসাব করতে হলে মনে রাখতে হবে শেষ মাসিক চক্র কখন শুরু হয়েছিল। মাসিক চক্রের প্রথম দিনকে গর্ভাবস্থার প্রথম দিন ধরা হয়।

প্রথম সপ্তাহের এ সময়টিতে আপনি ঠিক গর্ভবতী নন, কারন গর্ভসঞ্চারের ব্যাপারটি আপনার মাসিক শেষের দুই সপ্তাহ পর ঘটে থাকে। প্রতিবার মাসিক এর পরেই আপনার শরীর অনেক জটিল হরমনাল পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। এটা হয় শরীরকে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত করতে। তাই মাসিক এর প্রথম দিনকেই গর্ভধারণের প্রথম দিন হিসেবে ধরা হয়।বেশীরভাগ মায়েদের ক্ষেত্রেই মাসিক শুরুর ১২-১৪ দিনের মধ্যেই ডিম্বাণু উৎপন্ন হয়।

অনেক মহিলা ডিম্বানু তৈরীর দিন থেকে হিসাব করতে পছন্দ করে। এটা গর্ভধারনের প্রথমিক হিসাব করতে সাহায্য করে। এটা সাধারনতঃ মাসিক চক্রের প্রথম দিন থেকে দুই সপ্তাহ পরে হয়ে থাকে।তাই  মাসিক চক্রের হিসাবে সময় হিসাব করলে আপনি দুই সপ্তাহ এগিয়ে থাকবেন। তাই ডাক্তার সহ সবাই আসল গর্ভধারনের সময়ের সাথে দুই সপ্তাহ যোগ করে বলে থাকে এবং আমাদের ওয়েব সাইটেও এই পদ্ধতিতেই হিসেব করা হয়।

যদি আমি শেষ মাসিক চক্রের তারিখ না জানি বা আমার মাসিক চক্র যদি অনিয়মিত হয় তবে কিভাবে হিসাব করব?

প্রসবের দিন হিসেব করার ক্যালকুলেটর সঠিকভাবে কাজ করে যদি আপনার মাসিক চক্র নিয়মিত হয় এবং প্রতি ২৮ দিন পরপর হয়। যদি অনিয়মিত মাসিক চক্র হয় তবে মাসিক চক্রের দিন মনে নাও থাকতে পারে। আবার যদি মাসিক চক্র দীর্ঘ হয় বা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় তবে সন্তান প্রসবের সঠিক তারিখ নাও পাওয়া যেতে পারে।

এক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় আপনার প্রথম আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান আপনাকে অনেকটা সঠিক তারিখ দিতে পারে। যিনি আলট্রাসাউন্ড করে থাকেন (সনোগ্রাফার), তিনি শিশুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরিমাপ করেণ। এটাকে ক্রাউন রাম্ফ লেন্থ বলে। এটা অনেকটা আসল তারিখ বলতে সক্ষম যে আপনি কবে গর্ভধারন করেছেন। সাধারণত গর্ভাবস্থার ১১ থেকে ১৩ সপ্তাহ ৬ দিনের ভেতর আলট্রাসাউন্ড  টেস্ট করার পরামর্শ দেয়া হয়।

গর্ভাবস্থার শুরু দিকে করা আল্ট্রাসাউন্ডের  ফলাফল সাধারণত মোটামুটি সঠিক হয় কারণ এ সময়টাতে গর্ভের ভ্রূণ সবার ক্ষেত্রে একই হারে বারে। সময় বাড়ার সাথে সাথে এই বৃদ্ধির হার একেকজনের ক্ষেত্রে একেকধরনের হয়। এই কারণে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে করা আলত্রাসাউন্ডে সঠিক ডিউ ডেট পাওয়া যায়না এবং তা প্রথম আলত্রাসাউন্ড থেকে ভিন্ন হয়।

আরও পড়ুনঃ আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট এবং মাসিকের ভিত্তিতে (LMP) নির্ণয় করা গর্ভের শিশুর বয়স এবং ডিউ ডেটের মধ্যে পার্থক্য হয় কেন?

আমার গর্ভাবস্থা কেন ৪ সপ্তাহ বলা হয় যেখানে এটা আসলে ৫ সপ্তাহ

এটা বোঝার জন্য বয়সের চিন্তা করুন। যখন একটা বাচ্চাকে এক বছরের বলা হয় তার মানে সে ১২ মাস বা এক বছর অতিক্রম করেছে। তার মানে সে দুই বছরে পা দেয়ার পর তাকে ১ বছরের বলা হয়। একই ভাবে যখন আপনার গর্ভাবস্থার ২য় সপ্তাহ তখন আপনি ১ম সপ্তাহ অতিক্রম করেছেন। তার মানে ২য় সপ্তাহে বলা হচ্ছে আপনি এক সপ্তাহের গর্ভবতী। এটা আসলে গননা করা হয় প্রতি সপ্তাহের শেষে।

যেমন ১ম সপ্তাহে শূন্য সপ্তাহের গর্ভবতী।

২য় সপ্তাহে ১ সপ্তাহের গর্ভবতী

৩য় সপ্তাহে দুই সপ্তাহের গর্ভবতী

তিনমাস কাল বা ট্রাইমেস্টার কি?

তিন মাস কাল মানে তিন মাস। বেশীরভাগ গর্ভাবস্থা নয় মাস কাল দীর্ঘস্থায়ী হয়। এবং এই নয় মাসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ভাগকে বলা হয় ট্রাইমেস্টার বা তিনমাস কাল।

প্রথম ট্রাইমেস্টার বা তিনমাস কাল ধরা হয় প্রথম ১৩ সপ্তাহ এবং ৬ দিন পর্যন্ত। আনন্দের সাথে সাথে এ সময় নিজেকে বিধ্বস্ত লাগে।

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার হয় ১৪ সপ্তাহ থেকে ২৭ সপ্তাহ ৬ দিন পর্যন্ত। এসময় নিজেকে প্রথম ট্রাইমেস্টার থেকে ভালো মনে হয়। এসময় পেট কিছুটা উঁচু হতে পারে এবং গর্ভাবস্থার অন্যান্য লক্ষন গুলো দেখো দিতে শুরু করে।

তৃতীয় ট্রাইমেস্টার শুরু হয় ২৮ সপ্তাহ থেকে সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত। এসময় শিশুর বৃদ্ধির জন্য বেশী মাত্রায় শক্তির প্রয়োজন হয়। এসময় প্রথম ট্রাইমেস্টারের মতো নিজেকে বিদ্ধস্ত লাগা ফিরে আসে।

অনেকে চতুর্থ ট্রাইমেস্টার বলে থাকে। সাধারনত বাচ্চার জন্মের পর প্রথম তিন মাসকে চতুর্থ ট্রাইমেস্টার বলে। এসময় শিশুর সাথে পরিবারের সম্পর্ক তৈরী হয়।

গর্ভাবস্থা কতদিন দীর্ঘস্থায়ী হয়?

এটা নির্ভর করে আপনি কিভাবে হিসাব করছেন। বেশীর ভাগ মানুষ হিসাব করে মাসিক চক্রের প্রথম দিন থেকে ৪০ সপ্তাহ।

৪০ সপ্তাহ মানে-

  • নয় মাস (প্রতি মাস ৩০ বা ৩১ দিন হিসাব করে)
  • ১০ মাস (চন্দ্র মাসের হিসেবে প্রতি মাস ২৮ দিন হিসাব করে)

আমার প্রসব তারিখ কতটা সঠিক?

প্রসব তারিখ যেটা দেয়া হয় সেটা একটা সম্ভব্য তারিখ। শতকরা পাঁচ ভাগ শিশু ওই দিনে জন্ম গ্রহন করে। তারিখ যেটাই হোক না কেন বেশীরভাগ শিশু ৩৭ সপ্তাহ থেকে ৪২ সপ্তাহের মাঝে জন্ম গ্রহন করে।

 

সবার জন্য শুভকামনা।

 

 

Related posts

Leave a Comment