প্রসবজনিত ফিস্টুলা। লুকোনো নয়, নির্মূল করা জরুরী

একজন নারী পূর্ণতা লাভ করেন মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর জন্মদান পর্যন্ত একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তা ঐ নারীর জীবনে হয়ে উঠতে পারে, অভিশাপ স্বরূপ। তেমনি একটি অভিশাপের নাম ফিস্টুলা বা প্রসবজনিত (অবস্টেট্রিক) ফিস্টুলা। বাংলাদেশে আনুমানিক ৭২ হাজার নারী প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন।

 

প্রসবজনিত (অবস্টেট্রিক) ফিস্টুলা কি?

যোনিপথ, মূত্রাশয় ও মলদ্বারের মাঝখানে কোনো অস্বাভাবিক পথ তৈরি হলে একে প্রসবজনিত ফিস্টুলা বলে। এর ফলে কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই প্রস্রাব-পায়খানা বের হয়ে যায়। প্রসবের সময় যদি বাচ্চার মাথা যোনিপথের মুখে আটকে যায় এবং তা দীর্ঘসময় আটকে থাকে তবে বাচ্চার মাথার সামনের অংশ দ্বারা মূত্রথলী এবং পিছনের অংশ দ্বারা পায়ুপথ চাপের মুখে থাকে। দীর্ঘসময় চাপে থাকার ফলে এই সমস্ত অঙ্গসমূহে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং তাতে পচন ধরে। পচনযুক্ত টিস্যু খসে কয়েকদিনের মধ্যে সেখানে ছিদ্র সৃষ্টি হয়। মূত্রথলী ও যোনিপথের বা পায়ুপথ ও যোনিপথের মধ্যে সৃষ্ট এই ছিদ্রের মাধ্যমে অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়। ছিদ্র পথে এসব নারীদের অনবরত প্রস্রাব বা পায়খানার রস ঝরতে থাকে। একেই প্রসবজনিত ফিস্টুলা বলা হয়ে থাকে। এমন অবস্থায় অধিকাংশ নারী মৃত সন্তান প্রসব করেন।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা কয়েক ধরণের হয়ে থাকে। যেমন:

  • ভেসিকো -ভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা (Vesico-Vaginal fistula)-এটি মূত্রাশয় এবং যোনিপথের মধ্যে সংঘটিত হয়
  • ইউরেথ্রো-ভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা (Urethro-Vaginal fistula)-মূত্রনালী এবং যোনিপথের মধ্যে হয়ে থাকে
  • রেক্টো-ভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা (Vaginal fistula) মলদ্বার এবং যোনিপথের মধ্যে হয়ে থাকে

প্রসব জনিত ফিস্টুলা কেন হয়

যদি মায়ের পেলভিসের হাড় ও বাচ্চার মাথার মাঝে সমতা না থাকে, অর্থাৎ মায়ের পেলভিসের তুলনায় বাচ্চার মাথা যদি বড় থাকে অথবা পেলভিস প্রয়োজনের তুলনায় ছোট থাকে, তাহলে প্রসব বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বাচ্চা দীর্ঘক্ষণ (১-৩) দিন প্রসবের রাস্তায় আটকে থাকলে ও যদি বাচ্চা যথা সময়ে বের না হয় তাহলে মায়ের পেলভিসের (শ্রোনীচক্রের) হাড় ও বাচ্চার মাথার মাঝে মুত্রথলি দীর্ঘক্ষণ চাপের ফলে প্রসব জনিত ফিস্টুলা হয় এবং সাধারণত ডেলিভারির সাত/আট দিন পর থেকেই প্রস্রাব ঝরা শুরু হয়।

অল্প বয়সে বিয়ে, বিয়ের পর পরেই গর্ভধারণ, নিয়মিত  চেকআপে না থাকা, বিলম্বিত প্রসব হয়ে বাচ্চার মাথা অনেকক্ষণ আটকে থাকা, অদক্ষ ধাত্রী দিয়ে ডেলিভারি করানো, সময়মত হাসপাতালে উপযুক্ত চিকিত্সা না নেয়া ইত্যাদি প্রসবজনিত ফিস্টুলার অন্যতম কারণ।

প্রসবজনিত ফিস্টুলার লক্ষণ ও উপসর্গ 

ফিস্টুলার আকার এবং এটি হওয়ার স্থানের উপর নির্ভর করে এর লক্ষণ ও উপসর্গ গুলো সাধারণত: ভিন্ন হয়। যেমন:

  • প্রস্রাব, পায়খানা ও পুঁজ যোনিপথ দিয়ে বের হয়ে যাওয়া
  • দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব হওয়া
  • যোনিপথের এবং প্রস্রাবের রাস্তায় (Urinary tract)-এ বার বার সংক্রমণ হওয়া
  • শারিরীক সম্পর্ক স্থাপনের সময় ব্যথা অনুভব করা
  • ঘন ঘন পায়খানা হওয়া এবং পায়খানা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া
  • পায়ুপথের ভেতরের গ্রন্থিতে সংক্রমণের কারণে মলদ্বারের পাশে ফুলে ওঠে ও ব্যথা হয়।
  • সংক্রমণ যদি মলদ্বারের গভীরে প্রবেশ করে তখন ফোলা থাকে না। কিন্তু প্রচণ্ড ব্যথা ও জ্বর হতে পারে। এভাবে বারে বারে চলতে থাকে।
  • এক্ষেত্রে মলদ্বারের দূরে (আধা ইঞ্চি থেকে চার ইঞ্চি) একটি ছোট মুখ থাকে যা দিয়ে পুঁজ ও রক্ত বের হয়। কারও কারও এ মুখটি এতো ছোট যে দেখা যায় না। তারা বলেন যে, মলদ্বারে একটু ভেজা ভেজা লাগে বা আঠালো পদার্থ বের হয়।

উপরোক্ত লক্ষণ ও উপসর্গ গুলো দেখা দেয়ার সাথে সাথে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

 

কি ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে 

  • গর্ভধারণের অথবা সন্তান জন্মদানের ইতিহাস জানা
  • শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা
  • যোনিপথ, মলদ্বার ও পায়ুপথ পরীক্ষা
  • মলদ্বার এবং পায়ুপথের এনোরেক্টাল আল্ট্রাসাউন্ড ( Anorectal UltraSound)
  • কনট্রাস্ট টেস্ট (Contrast Test) যেমন: ভ্যাজাইনোগ্রাম (Vaginogram), বারিয়াম (Barium) পরীক্ষা
  • পেটের এবং শ্রেণীর (Pelvis) কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফী (Computerized Tomography)
  • শরীরের নরম কোষের ম্যাগনেটিক রিজোন্যান্স ইমেজিং (Magnetic Resonance Imaging)

কি ধরণের চিকিৎসা আছে 

  • সার্জারি বা অপারেশন
  • অপারেশনের আগে কোন সংক্রমণ হলে এ্যান্টিবায়োটিক সেবন
  • ডাক্তারের পরামর্শ ও নির্দেশনানুযায়ী ঔষধ সেবন ও বিধি-নিষেধ মেনে চলা

অবস্টেট্রিক ফিস্টুলার চিকিৎসা সম্ভব। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার করে ফিস্টুলা সম্পূর্ণরূপে নিরাময় করা সম্ভব। বাংলাদেশে এ জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জাতীয় ফিস্টুলা কেন্দ্রকে সেন্টার অব এক্সিলেন্স হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। ইউএনএফপিএর সহায়তায় বর্তমানে ১০টি মেডিকেল কলেজে ফিস্টুলা রোগীদের সেবা দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও সাতটি বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান ফিস্টুলা নিরাময়ে বিশেষ সেবা দিয়ে থাকে।
ফিস্টুলা সারাতে অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় রোগীদের পরামর্শ ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়া হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে জীবিকা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন। এতে ওই নারীরা সমাজের সঙ্গে আবার নিজেদের যুক্ত করে, নতুন করে জীবন শুরু করার মর্যাদা ও আশা ফিরে পান।

জীবন যাপন পদ্ধতি

  • প্রস্রাব-পায়খানার পর ভালোমত গরম পানি সাবান দিয়ে পায়ুপথ পরিষ্কার করা। ধোয়ার পর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছতে হবে।
  • জ্বালাপোড়া হতে পারে এমন প্রসাধন/সাবান ব্যবহার না করা
  • ঢিলেঢালা পোশাক এবং সুতির অর্ন্তবাস পরা।

কিভাবে প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধ করা যায়

ফিস্টুলা দূর করতে প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । প্রসবকালে সব নারীর পাশে দক্ষ সেবাদানকারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং প্রসবজনিত জটিলতায় জরুরি সেবা দেওয়ার মাধ্যমে ফিস্টুলাকে প্রায় নির্মূল করা যেতে পারে।

বাল্যবিয়েকে নারীজনিত ফিস্টুলার অন্যতম কারণ বলা হয়। বাল্যবিয়ে বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কম বয়সে গর্ভধারণ করলে ফিস্টুলা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। মেয়েদের ১৮ বছরের আগে বিয়ে না দেয়া, বিয়ের পর পরেই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করা এবং কমপক্ষে ৩ বছর গর্ভধারণ থেকে বিরত থাকা, ২১ বছরের আগে সন্তান ধারন না করা, গর্ভধারণের পর নিয়মিত চেকআপে থাকা এবং হাসপাতালে প্রস্রব করানো যাতে প্রসব বিলম্বিত না হয়। হাসপাতালে প্রসব করানো সম্ভব না হলে দক্ষ ধাত্রী দিয়ে ডেলিভারি করানো উচিত যাতে সময়মত পদক্ষেপ নেয়া যায়। এছাড়াও প্রসব বিলম্বিত হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে প্রসূতিকে উন্নত হাসপাতালে যেখানে সিজারিয়ান অপারেশনের সুব্যবস্থা আছে সেকানে পাঠিয়ে দেয়া ইত্যাদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে ফিস্টুলা প্রতিরোধ হতে পারে।

 

পরিশিষ্টঃ

অবস্টেট্রিক ফিস্টুলার চিকিৎসা না নিলে তা থেকে নানা ধরনের শারীরিক অসুস্থতা হতে পারে। যেমন: বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ, কিডনির সমস্যা, যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত, শারীরিক মিলন ও সন্তান ধারণে অক্ষমতা। সেই সঙ্গে সামাজিক লজ্জা প্রায় সময়ই নারীদের বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়। ফলে তাঁরা পরিত্যক্ত হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে এ সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের তালাক দিয়ে দেন তাঁদের স্বামীরা। পরিবার ও সমাজও তাঁদের আলাদা করে দেয়। এতে ওই নারীরা আরও বেশি করে দারিদ্র্যের কবলে পড়েন।

অবস্টেট্রিক ফিস্টুলাকে তাই প্রায়ই একটি লুকোনো যন্ত্রণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা নারী ও তাঁদের পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলে। ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীরা এ সমস্যাটি নিয়ে লজ্জিত থাকেন এবং এ নিয়ে খুব একটা কথা বলেন না। তাঁদের ভোগান্তিটা আড়ালেই রয়ে যায়। পরিণামে বিষণ্নতা, সামাজিক  বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য প্রভৃতি সমস্যায় নারীরা পড়েন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অবস্টেট্রিক ফিস্টুলা প্রতিরোধযোগ্য।শিল্পোন্নত দেশগুলোতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার ফলে অবস্টেট্রিক ফিস্টুলা প্রায় নির্মূল হয়েছে। কিন্তু এখনো যেসব নারী এ জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁরা সাধারণত দরিদ্র এবং চিকিৎসাসেবার আওতার অনেক বাইরে রয়েছেন। আমাদের সকলের মনে রাখতে হবে একজন ফিস্টুলা রোগী শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিকভাবেও অনেক বিপর্যস্ত থাকেন। অনেকসময় তারা জীবিত থেকেও মৃত। তাই তার প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়া প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।

সবার জন্য শুভকামনা

 

Related posts

Leave a Comment