পোস্টেরিয়র পজিশন । গর্ভে বাচ্চার অবস্থান

পোস্টেরিয়র পজিশন বলতে কি বোঝায়?

যখন গর্ভে শিশুর মাথা নীচের দিকে থাকে কিন্ত মুখ মায়ের পেটের দিকে ঘোরানো থাকে তখন বাচ্চার এই পজিশনকে বলা হয় occiput posterior (OP) position বা সংক্ষেপে পোস্টেরিয়র পজিশন। এ ধরনের নামকরণের কারণ হোল এ পজিশনে বাচ্চার মাথার খুলির পেছনের অংশ (the occipital bone) পেলভিসের পেছনের দিকে থাকে। এ ধরনের পজিশনকে অনেক সময় “ফেস আপ” বা “সানি সাইড আপ’ বলা হয়।

বাচ্চা যখন গর্ভাবস্থার শেষের দিকে নীচের দিকে নামতে থাকে তখন মায়ের পেলভিসে অবস্থানের সবচাইতে ভালো পজিশন হোল বাচ্চার পিঠ মায়ের পেটের দিকে থাকা। বাচ্চা যখন এ পজিশনে থাকে তখন প্রসবের সময় তার থুতনি নীচের দিকে নামান থাকে এবং তার মাথার সবচাইতে ছোট অংশ (মাথার উপরের ভাগ) আগে বেড়িয়ে আসে।

পোস্টেরিয়র পজিশনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো হয়। এ পজিশনে থাকলে বাচ্চার মাথা সামান্য পেছনের দিকে ঝোঁকান থাকে। ফলে বাচ্চার কপালের অংশ সবার আগে বেড়িয়ে আসে।

বাচ্চার পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকা কতটা স্বাভাবিক?

বাচ্চার পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকা কতটা স্বাভাবিক তা নির্ভর করে আপনি প্রসবের কোন পর্যায়ে আছেন তার উপর।  অনেক বাচ্চায় প্রসবের শুরুতে পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকে। কিন্তু ঠিক জন্মানোর আগ মুহূর্তে তার অবস্থান পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। জন্মানোর কিছুক্ষন আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বাচ্চা একের অধিকবার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।

সাধারণত ৫-১২ ভাগ শিশু জন্মের সময় পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকে। প্রথম বার মা হতে যাওয়া মহিলাদের মধ্যে এর হার বেশী দেখা যায়।

২০০৫ সালে এক গবেষণায় ১৫০০ এর অধিক মায়ের প্রসবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আলট্রাসাউন্ড করে প্রসবের কিছুক্ষন আগ পর্যন্ত বাচ্চার অবস্থান পরিবর্তনের প্রমান পাওয়া গেছে।

এ গবেষণায় প্রথমবার আল্ট্রাসাউন্ড করা হয় মায়ের প্রসব শুরু হওয়া মাত্র বা কৃত্রিম ভাব প্রসব শুরুর আগ মুহূর্তে। এতে দেখা যায় ৪ ভাগের ১ ভাগ শিশু ছিল পোস্টেরিয়র পজিশনে, প্রায় অর্ধেক ছিল পাশ ফেরানো এবং বাকিদের মুখ ছিল পেছন ফেরানো। এরপর আরও কিছু সময় পর পর একবার বা দু বার আলট্রাসাউন্ড করা হয় এবং শেষবার করা হয় জন্মানোর সময়।

এতে দেখা যায় বেশীরভাগ শিশুই প্রসবের সময় অবস্থান পরিবর্তন করে অ্যান্টেরিয়র পজিশনে চলে এসেছে। যেসব বাচ্চা প্রসবের আগ পর্যন্ত পোস্টেরিয়র পজিশনে ছিলে তাদের মধ্যে প্রতি ৫  জনের ১ জনে প্রসবের সময়ও একই পজিশনে ছিল। আর যেসব শিশু প্রসবের আগে অ্যান্টেরিয়র পজিশনে ছিল তাদের প্রতি ২০ জনের ১ জনের জন্ম হয় পোস্টেরিয়র পজিশনে।

এর পরে সব গবেশনাতেই দেখা গেছে প্রসবের আগে বাচ্চার অবস্থান এবং প্রসবকালীন বাচ্চার অবস্থান সবসময় এক থাকেনা। অনেক বাচ্চাই যারা প্রসবের আগে পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকে তারা প্রসবের সময় অ্যান্টেরিয়র পজিশনে চলে আসতে পারে।

জন্মের সময় বাচ্চা পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকলে তা কি প্রভাব ফেলতে পারে?

যদি বাচ্চা শেষ পর্যন্ত পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকে তবে কিছু কিছু সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। যেমন কন্ট্রাকশন বাড়ানোর জন্য Pitocin দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে, প্রসবে অনেক বেশী সময় লাগতে পারে। এছাড়াও এক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে assisted vaginal delivery  বা  c-section করার ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। এ সব মায়েদের প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকে।

পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকা বাচ্চার ভ্যাজিনাল ডেলিভারি হলে episiotomy (যোনি এবং মলদ্বারের মধ্যবর্তী স্থানে কাটা)  করার প্রয়োজন হতে পারে  এছাড়াও perineal tears ( যোনি এবং মলদ্বারের মধ্যবর্তী স্থানে ছিরে যাওয়া) এর সম্ভাবনা ও থাকে।

এ ছাড়াও পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকা বাচ্চার জন্মের পর কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে যার ফলে জন্মের পর শিশুকে neonatal intensive care unit এ রাখার প্রয়োজন হতে পারে।

বাচ্চা পোস্টেরিয়র পজিশনে কেন থাকে?

বাচ্চা পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকার অনেক কারণ থাকতে পারে। মায়ের পেলভিস যদি ওভাল বা হার্ট আকৃতির হয় তবে বাচ্চার পজিশন ঠিক না ও থাকতে পারে। পেলভিস সরু বা মোটা হলে এমন হতে পারে। লাইফ স্টাইলের কারনেও বাচ্চা পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকতে পারে, যেমন- মা যদি বেশী সময় বসে থাকেন তবে এর সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে অনুন্নত দেশে বাচ্চা পোস্টেরিয়র পজিশনে থাকার হার কম কারণ এসব দেশে মায়েরা বেশীর ভাগ সময় মুভমেন্টে থাকে।

বাচ্চার অবস্থান ঠিক রাখার জন্য কি করা যেতে পারে?

আমরা সবাই জানি সারাক্ষন শুয়ে বসে থাকা স্বাস্থ্যকর গর্ভধারণের জন্য ক্ষতিকর। তাই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে গর্ভকালীন সময়ে হালকা ব্যায়াম করুন বা গৃহস্থালির হাল্কা কাজকর্ম করুন। তাছাড়াও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে-

যখন বসবেন পেলভিস সামনের দিকে রাখার চেষ্টা করবেন। ঝুঁকে বসবেন না যাতে পেলভিস পেছনের দিকে থাকে। সব সময় মনে রাখবেন বসার সময় যাতে হিপ আপনার হাঁটুর উপরে থাকে।

মাঝে মাঝে হাত এবং হাঁটুর উপর ভর দিয়ে উপুড় হয়ে থাকুন( ঘর মোছার ভঙ্গিতে) । এর ফলে বাচ্চার মাথার পেছনের অংশ আপনার পেটের দিকে ঘুরে যেতে পারে।

যদি আপনি কর্মজীবী মহিলা হন এবং অনেক বেশী সময় ধরে বসে থাকতে হয় তবে কিছুক্ষন পর পর হাঁটার অভ্যাস করুন।

গাড়িতে বসার সময় সীটে একটি কুশন দিয়ে রাখতে পারেন যাতে আপনার হিপ উপরের দিকে থাকে।

আপনি যখন শুয়ে থাকবেন তখন বাচ্চার অবস্থান নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ এ সময় পেলভিসে বাচ্চার উপর কোন চাপ পড়েনা। তবে চিত হয়ে শোওয়ার চাইতে পাশ ফিরে শোওয়া গর্ভাবস্থার শেষের দিকে উপকারী।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment