ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা প্রতিরোধে করণীয়

বাংলাদেশ ম্যাটার্নাল মর্টালিটি সার্ভে ২০১০ অনুযায়ী, মাতৃত্বজনিত কারণে মৃত্যুর মধ্যে ৭ শতাংশ মারা যায় দীর্ঘ প্রসব জটিলতায়, ২০ শতাংশ মারা যায় একলাম্পশিয়ায়, রক্তক্ষরণে মারা যায় ৩১ শতাংশ, গর্ভপাতে মারা যায় ১ শতাংশ। অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু হয় গর্ভজনিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানান জটিল কারণে। এক শতাংশ মৃত্যু কেন হয় তা নির্ণয় করা যায়নি।

ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা আগে থেকে নির্ণয় করা সম্ভব হলে মাতৃমৃত্যূ রোধ করা সম্ভব। সে জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চেকআপ বা ডাক্তারি পরীক্ষা করা। বেশির ভাগ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা চেকআপের মাধ্যমে শনাক্ত করা গেলে সময় মত ব্যবস্থা নেয়া যায়। তাই গর্ভাবস্থায় কমপক্ষে চার বার চেকআপ করা, প্রসব পরবর্তী সময়েও চার বার চেকআপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা সম্পর্কে জানতে আমাদের আর্টিকেলটি পড়ুন।

ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভ নির্ণয়ের জন্য আগের গর্ভের এবং আগের প্রসবের ইতিহাস জানা জরুরী। বিশেষ করে প্রথম গর্ভবতী মা সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ বলে নিয়মিত চেকআপের প্রয়োজন হয়। এ জন্য যেকোনো রকমের অস্বাভাবিকতা থাকলে তা নির্ণয় করে সময়মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া যাবে। সময়ের আগে পানি ভাঙা অবস্থাটি জরুরি বিধায় অতি সত্বর হাসপাতালে প্রেরণ করতে হবে। সন্তানের অস্বাভাবিক অবস্থান, যমজ সন্তান, প্রি-একলাম্পশিয়ার লক্ষণ ইত্যাদির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চেকআপ। কারণ, বেশির ভাগ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা চেকআপের মাধ্যমে শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় প্রসব এবং চিকিৎসা হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে করানো উচিত। এ ব্যাপারে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক তথা দেশের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভের জটিলতা সম্পর্কে ধারণা এবং এ ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ মায়েদের অকালমৃত্যু, অনাগত শিশুটির করুণ অবস্থা থেকে রক্ষা করতে পারে।

গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্যের যত্ন

পরিকল্পনা

স্বামী এবং স্ত্রীর আলোচনা করার দরকার হতে পারে যে তারা কয়টি সন্তান চায়। অনুন্নত দেশগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় যে, একজন মহিলা ছোট শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছে এবং একই সময় সে আবারও সন্তানসম্ভবা। সযত্ন পরিকল্পনা এবং সবদিক বিবেচনা করা হয়তো দুটো সন্তানের জন্মের মাঝখানে কিছু সময় ব্যবধান থাকার সুযোগ দেবে আর তা মাকে কিছুটা স্বস্তি এনে দেবে, যিনি প্রসবের পর আবার সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য কিছু সময় পাবেন।

গর্ভধারণের প্রস্তুতি সম্পর্কে আমাদের আর্টিকেলগুলো পড়ুন।

পুষ্টি

কোয়ালিশন ফর পজিটিভ আউটকামস্‌ ইন প্রেগন্যান্সি অনুসারে, গর্ভবতী হওয়ার আগে একজন মহিলার ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে আরোগ্য হতে এবং বেড়ে ওঠা শিশুর জন্য এক উত্তম পুষ্টির সরবরাহ গঠন করতে অন্তত চার মাস সময় লাগে। উদাহরণস্বরূপ, সন্তানসম্ভবা মায়ের শরীরে যখন প্রচুর পরিমাণে ফলিক এসিডের সরবরাহ থাকে, তখন নিউরাল টিউবের ত্রুটির কারণে ঘটা মেরুদণ্ডের অস্বাভাবিকতার (স্পাইনা বিফিডা) ঝুঁকি প্রচুর পরিমাণে হ্রাস পায়। ভ্রূণের নিউরাল টিউব যেহেতু গর্ভধারণের ২৪ থেকে ২৮ দিন পরই বন্ধ হয়ে যায়—অনেক মহিলা বোঝার অনেক আগেই যে তারা গর্ভবর্তী—তাই যারা বাচ্চা নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের গর্ভধারণের আগে থেকেই ফলিক এসিড গ্রহণ করা শুরু করতে হবে

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর উপাদান হল আয়রন। বস্তুতপক্ষে, গর্ভধারণের সময় একজন মহিলার শরীরে আয়রনের চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। তার যদি ঘাটতি থাকে—যা অনুন্নত দেশগুলোর বেশির ভাগ মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই ঘটে থাকে—তা হলে, তিনি হয়তো আয়রনের অভাবে রক্তশূন্যতায় ভুগতে পারেন। বার বার গর্ভবতী হলে এই অবস্থা আরও গুরুতর হতে পারে, কারণ তিনি হয়তো তার আয়রনের ঘাটতিকে পূরণ করার মতো যথেষ্ট সময় পান না।

বয়স

১৬ বছরের নিচে গর্ভবতী মেয়েদের মৃত্যুর ঝুঁকি, ২০-র কোঠার গর্ভবতী মেয়েদের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি থাকে। অন্যদিকে, ৩৫ বছরের ওপরে বয়সী মহিলাদের জন্মগত ত্রুটিযুক্ত সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা থাকে, যেমন ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু। যে-মায়েরা একেবারে অল্পবয়সী বা যাদের সন্তানধারণের বয়স পেরিয়ে গেছে, তাদের প্রি-একল্যাম্পসিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এই রোগ যেটির উপসর্গ হল, গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহ পর উচ্চ রক্তচাপ ও সেইসঙ্গে ইডিমার (শরীরে বিষাক্ত পদার্থ জমা হওয়ার কারণে পা ফুলে যাওয়া) উপস্থিতি এবং ইউরিনে (মূত্রে) প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, মা ও শিশু উভয়ের মৃত্যুর হারকে বৃদ্ধি করে।

ইনফেকশন

ইউরিনারি, সারভিকোভ্যাজাইনাল এবং গ্যাসট্রোইনটেসটিনাল ইনফেকশনগুলো গর্ভাবস্থায় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে এবং এর ফলে অপরিণত (প্রিম্যাচিয়ুর) প্রসব ও প্রি-একল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। গর্ভধারণের আগেই যেকোনো ইনফেকশনের চিকিৎসা করা সর্বাধিক মঙ্গলজনক।

গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্যের যত্ন

প্রসব পূর্ববর্তী যত্ন

গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যাওয়া, মায়ের মৃত্যুর হারকে কমাতে পারে। এমনকি যে-দেশগুলোতে নিয়মিত ক্লিনিকে যাওয়ার সুযোগ নেই এবং হাসপাতালের সংখ্যা সীমিত, সেখানে সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত ধাত্রীদের পাওয়া যেতে পারে।

প্রসব পূর্ববর্তী সময়ে যত্ন প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের সেই পরিস্থিতিগুলো সম্বন্ধে সতর্ক করতে পারে, যেখানে হয়তো বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে একটার বেশি বাচ্চা ধারণ, হাইপারটেনশন, হার্ট ও কিডনির সমস্যা এবং ডায়াবিটিস। কিছু দেশে, একজন গর্ভবতী মহিলা নবজাতকের টিটেনাস হওয়া প্রতিরোধ করার জন্য টিটেনাস টোক্সোইড ভ্যাকসিন নিতে পারেন। এ ছাড়া, গর্ভধারণের ২৬ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে তার গ্রুপ বি স্ট্রেপটোককাস পরীক্ষা করা হতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া, যদি অন্ত্রের নিচের দিকে (লোয়ার ইনটেসটিনাল ট্র্যাক্টে) উপস্থিত থাকে, তা হলে প্রসবের সময় তা শিশুকেও সংক্রামিত করতে পারে।

ভাবী মায়ের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে তার শরীর সম্বন্ধে পুরো তথ্য জানানোর জন্য তৈরি থাকা উচিত, এর মধ্যে তার চিকিৎসাগত ইতিহাসও জড়িত। এ ছাড়া, তার নির্দ্বিধায় প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা উচিত। যোনিপথে রক্তক্ষরণ হলে, মুখমণ্ডলে আকস্মিক প্রদাহ, প্রচণ্ড ও ক্রমাগত মাথাব্যথা বা আঙুলে ব্যথা, হঠাৎ করে দুর্বল বা ঝাপসা দৃষ্টিশক্তি, পেটে প্রচণ্ড ব্যথা, ক্রমাগত বমি, সর্দি বা জ্বর, শিশুর ঘন ঘন নড়াচড়া ও স্থান পরিবর্তন, যোনিপথে তরল পদার্থের ক্ষরণ, প্রস্রাব করার সময় ব্যথা বা প্রস্রাব একেবারে কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসা করানো উচিত।

মদ ও মাদকদ্রব্য

মা যদি মদ বা মাদকদ্রব্য (এর অন্তর্ভুক্ত তামাক) সেবন করে, তা হলে তার সন্তানের মানসিক প্রতিবন্ধী, শারীরিক ত্রুটি আর এমনকি স্বভাবেও অস্বাভাবিকতা থাকার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। মাদকাসক্ত মায়েদের শিশুরা সেই লক্ষণগুলো প্রকাশ করেছে বলে জানা যায়, যা কোনো আসক্তির অভ্যাস ত্যাগ করার ফলে একজন ব্যক্তি দেখিয়ে থাকে। যদিও কিছু লোক মনে করে যে, মাঝেমধ্যে একটু মদ খাওয়া ততটা ক্ষতিকর নয় কিন্তু বিশেষজ্ঞরা গর্ভাবস্থায় মদ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে পরামর্শ দেয়। এ ছাড়া, সন্তানসম্ভবা মায়েদের তাদের আশেপাশে অন্য ব্যক্তির ধূমপানের ব্যাপারেও সাবধান থাকা উচিত।

ওষুধপত্র

গর্ভাবস্থা সম্বন্ধে অবগত আছেন এবং এর ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেছেন এমন একজন ডাক্তারের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া কোনো ওষুধই গ্রহণ করা উচিত নয়। কিছু কিছু ভিটামিনও ক্ষতিকর হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অতিরিক্ত ভিটামিন এ গ্রহণ ভ্রূণের বিকলাঙ্গতা ঘটাতে পারে।

ওজন বৃদ্ধি

একজন গর্ভবতী মহিলাকে ওজনের ক্ষেত্রে চরম অবস্থা এড়িয়ে চলতে হবে। ক্রাউসিস ফুড, নিউট্রিশন আ্যন্ড ডায়েট থেরাপি অনুসারে, কম ওজনের শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি, স্বাভাবিক ওজনের নবজাতকের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি। অন্যদিকে, দুজনের জন্য খাওয়া শুধুমাত্র ওজনই বাড়ায়। সঠিক ওজন বৃদ্ধি—দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার (গর্ভধারণের চার মাস) থেকে বেশি স্পষ্ট হয়—যা ইঙ্গিত করে যে, সন্তানসম্ভবা মা তার বৃদ্ধিরত চাহিদা অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে খাবার খাচ্ছেন।

স্বাস্থ্যবিধি এবং অন্যান্য বিবেচ্য বিষয়।

গোসল স্বাভাবিকভাবে করা যেতে পারে কিন্তু ভ্যাজাইনাল ডুশ ব্যবহার করা উচিত নয়। একজন গর্ভবতী মহিলার সংক্রামিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সান্নিধ্য এড়িয়ে চলা উচিত, যেমন রুবেলা যেটাকে জার্মান মিসেলস্‌ও (জার্মানি হাম) বলা হয়। এ ছাড়া, টোক্সোপ্লাজমাসিস জীবাণু প্রতিরোধ করার জন্য ভাল করে রান্না না করা মাংস এবং বিড়ালের মল অবশ্যই সতর্কভাবে এড়িয়ে চলা উচিত। মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি অপরিহার্য, যেমন হাত ধোয়া এবং রান্না করা হয়নি এমন খাবার। গর্ভাবস্থার শেষ কয়েক সপ্তাহ ছাড়া বা রক্তক্ষরণ, মাংসপেশির সংকোচন বা আগে গর্ভপাত হয়ে না থাকলে যৌনমিলনে সাধারণত কোনো ঝুঁকি থাকে না

যে-মহিলা গর্ভাবস্থায় নিজের শরীরের যত্ন নেন, তিনি প্রসবের সময় কম জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। সাধারণত, তিনি পরিকল্পনা করে থাকবেন যে, কোথায় প্রসব করতে চান, ঘরে অথবা হাসপাতালে। এ ছাড়া, তাকে ভালভাবে জানতে হবে যে, একজন দক্ষ ধাত্রী বা ডাক্তারের কাছ থেকে তার কী কী আশা করা উচিত এবং তিনি তাদের কীভাবে সহযোগিতা করতে পারেন। অন্যদিকে এই ব্যক্তি জানবেন যে, এইধরনের বিষয়গুলোতে মহিলা কী চান—যেগুলো বেছে নেওয়া সম্ভব—যেমন প্রসবের অবস্থান, ইপিজিওটমি, এবং ফরসেপ্‌স, ব্যথা নাশক এবং ইলেকট্রনিক ফেটাল মনিটরিং এর ব্যবহার। এ ছাড়া, আরও অন্যান্য বিষয়েও মতের মিল থাকা উচিত: বাড়িতে প্রসব যদি জটিল হয়ে পড়ে, তা হলে তারা কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাবে? অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে ঠিক কী করতে হবে? যেহেতু রক্তক্ষরণ অনেক মায়েদের মৃত্যুর কারণ হয়, তাই যারা রক্তগ্রহণ করে না, সেই রোগীদের জন্য রক্তের বিকল্প বিষয়গুলোর সরবরাহ রাখতে হবে। এ ছাড়া, যদি সিজারিয়ান সেকশন করার দরকার পড়ে, তা হলে কী করতে হবে সেই সম্বন্ধে আগে থেকে চিন্তা করা দরকার।

একটা কথা এখানে প্রযোজ্য যে, যেকোনো জটিলতা এড়াতে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার বিকল্প নেই। যেকোনো কিছুই হোক না কেন, তা চেক আপে ধরা পড়বেই। আর তাহলে চিকিৎসাও সম্ভব। আর আপনার মনকেও অনেকখানি প্রশান্তি দেওয়া সম্ভব হয়।

সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

Leave a Comment