গর্ভাবস্থায় জিকা ভাইরাস । সচেতনতা ও প্রতিকার

জিকা ভাইরাস কি?

জিকা ভাইরাস একটি মশা বাহিত ভাইরাস। সাধারণত এডিস মশার মাদ্ধমে এ রোগ ছড়ায় যা ডেঙ্গুর জন্য ও দায়ী। গবেষকেরা এই ভাইরাস শনাক্ত করেন ১৯৪৭ সালে। আফ্রিকার দেশ উগাণ্ডার একটি বনের নাম জিকা। সে বনের বানর থেকে এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয় বলে গবেষকেরা নাম দিয়েছেন জিকা ভাইরাস।

 

গর্ভাবস্থায় জিকা ভাইরাস কি প্রভাব ফেলতে পারে?

এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ভয়াবহ কোনো সমস্যা হয় না। ৫-৭ দিনের মধ্যে এমনিতেই রোগ সেরে যায়। কিন্তু গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এ রোগের প্রভাব মারাত্মক হতে পারে, যেমন- গর্ভ নষ্ট হয়ে যাওয়া, বাচ্চা অস্বাভাবিক ছোট মাথা বা ব্রেইন নিয়ে জন্মানো যা মাইক্রোসেফালি নামে পরিচিত।

মাইক্রোসেফালি একটি মারাত্মক জন্মগত ত্রুটি যার ফলে বাচ্চার ব্রেইন ঠিকমত গঠিত হয়না। এর ভয়াবহতার উপর ভিত্তি করে এটি বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করতে পারে, যেমন- খিঁচুনি এবং বাচ্চার ধীরগতির বিকাশ।

সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে যেসব নবজাতক গর্ভে থাকাকালীন জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তারা গ্লাউকমাতে আক্রান্ত হতে পারে যাতে তার শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি ক্ষতি গ্রস্থ হয় এবং তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়।

কিছুদিন আগ পর্যন্তও জিকা ভাইরাস কে গর্ভের ভ্রুনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হতো। জিকা ভাইরাসের কারনেই এমনটা হয় সেটা নিশ্চিত ছিলনা। কিন্তু সম্প্রতি গবেষকরা জিকা এবং মাইক্রোসেফালির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন।  এখনো অনেক বিষয় অজানা রয়ে গেছে, যেমন- গর্ভবতী মহিলা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ভ্রুনের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত সব শিশুই মাইক্রোসেফালি নিয়ে জন্মায় কিনা বা এত গর্ভ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু ইত্যাদি।

জিকা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে সপ্তাহ খানেক অবস্থান করে। CDC এর মতে গর্ভাবস্থায় একবার আক্রান্ত হলে পরবর্তী গর্ভধারণে এর প্রভাব পরতে পারে এমন কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। জিকা ভাইরাস রক্ত থেকে দূর হওয়ার পর গর্ভধারণ করলে এর কোন প্রভাব গর্ভস্থ শিশুর উপর পড়েনা।

জিকা ভাইরাস কিভাবে ছড়ায়?

এডিস মশার মাধ্যমে দ্রুত এ ভাইরাসটি ছড়ায়। ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটেছে এমন কোনো রোগীকে এডিস মশা কামড়ানোর মধ্য দিয়ে এর স্থানান্তর হয়। পরে ওই মশাটি অন্য ব্যক্তিদের কামড় দিলে তা ছড়াতে থাকে। এরপর ওই ব্যক্তিদের মাধ্যমেই ভাইরাসটির বিস্তার ঘটতে থাকে।

জিকা ভাইরাস যৌন মিলনের ফলেও ছড়াতে পারে। গর্ভাবস্থায় মা জিকা ভাইরাস এ আক্রান্ত হলে তা শিশুর শরীরে ছড়াতে পারে কিন্তু এ বিষয়টি এখন প্রমানিত নয়। তবে বুকের দুধের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ায় না।  এছাড়াও কিছু কিছু ক্ষেত্রে রক্তের মাধ্যমে জিকা ভাইরাস একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে।

জিকা ভাইরাসের লক্ষন

জিকা ভাইরাসে সংক্রামিত ব্যক্তিদের শরীরে ভাইরাসটির খুব সামান্য উপসর্গ দেখা যায়। যেমন- জ্বর, মাথাব্যথা, কাশি ও চোখ গোলাপি রঙ ধারণ করা ইত্যাদি। শতকরা ৮০ শতাংশ সংক্রামিত ব্যক্তিই বুঝতেই পারেন না যে তাদের শরীরে ভাইরাসটি রয়েছে। এসব কারণে ভাইরাসটি নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি ৫ জন জিকা ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের মাঝে ১ জনের রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।

সাধারণভাবে জ্বর, চামড়ার র‌্যাশ, শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যাথা, চোখের পর্দার প্রদাহ (Conjunctivitis) ইত্যাদি হয়ে থাকে। এছাড়াও মাথা ব্যাথা এবং মাংসপেশীর ব্যাথা থাকতে পারে। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

লক্ষণগুলো সাধারণত মারাত্মক আকার ধারণ করে না এবং এক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। জিকায় আক্রান্ত হলে সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না এবং মৃত্যুর সম্ভাবনাও অত্যান্ত ক্ষীণ।

 

জিকা ভাইরাসের চিকিৎসা

জিকা ভাইরাস দমনের জন্য এখনো কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট ওষুধ উদ্ভাবিত হয়নি। আপনার যদি জিকা ভাইরাসের লক্ষন দেখা দেয় তবে আপনার চিকিৎসক হয়তো কিছু আল্ট্রাসাউন্ড করতে বলবেন যাতে গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

আক্রান্ত রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। প্রচুর পানীয় খাবার খাওয়া উচিত। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। জ্বর এবং ব্যাথার জন্য শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। একটি বা দুটি ট্যাবলেট তিন বেলা অথবা সাপোজিটরি ব্যবহার করা যায়। পানি দিয়ে শরীর স্পঞ্জ করা এবং গোসল করাও এক্ষেত্রে কার্যকর। তবে গর্ভাবস্থায় ibuprofen বা  aspirin জাতীয় ওষুধ গ্রহন করা নিরাপদ নয়।

 

জিকা ভাইরাস প্রতিরোধের উপায় কি?

জিকা ভাইরাসের কোন প্রতিষেধক, ভ্যাকসিন বা টিকা এখনও আবিষ্কার হয়নি। এই রোগ থেকে পরিত্রাণের জন্য একটাই উপায় মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধ করার জন্য মশার আবাসস্থল এবং আশপাশের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা। অর্থাৎ ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং মশা প্রতিরোধটাই জরুরী।

এডিস মশা মূলত দিনের বেলা কামড়ায়, তবে রাতে বেশি আলো থাকলেও কামড়াতে পারে। মশার কামড় থেকে বাঁচার উপায় হলো শরীরের বেশিরভাগ অংশ ঢেকে রাখা, যেমন ফুলহাতা শার্ট এবং ফুলপ্যান্ট পরা, দিনে ঘুমালে মশারি ব্যবহার করা, স্প্রে, লোশন, ক্রিম, রিপেল্যান্ট ব্যবহার করা এবং দরজা-জানালায় নেট লাগানো ইত্যাদি। যে সকল মশা বিতারনকারী ক্রিমে ডিইইট(DEET) রয়েছে সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো গর্ভাবস্থায় ব্যাবহার করা নিরাপদ। তারপর ও ব্যাবহারের আগে লেবেল দেখে নিন।

যে কোন পাত্র, ফুলের টব, বাথরুম, ফ্রিজ বা এসির নিচে, বারান্দায় বা ছাদে জমে থাকা পানি ৩ থেকে ৫ দিন পরপর পরিষ্কার করলে এডিস মশার লার্ভা মারা যায়। পাত্রের গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম অপসারণে পাত্রটি ঘষে পরিষ্কার করলে ভাল। অব্যবহৃত পাত্র উল্টে রাখা উচিত, যাতে পানি জমতে না পারে।

যদি আপনার বা আপনার সঙ্গীর জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষন দেখা দেয় তবে কিছু সময়ের জন্য গর্ভধারণ করা থেকে বিরত থাকুন। যৌন মিলনের সময় কনডম ব্যাবহার করুন। CDC এর মতে যদি আপনার জিকার লক্ষন দেখা দেয় তবে অন্তত গর্ভধারণের জন্য ৮ সপ্তাহ অপেক্ষা করা উচিৎ। আর আপনার স্বামী বা সঙ্গীর যদি এর লক্ষন দেখা দেয় তবে ৬ মাস গর্ভধারণ থেকে বিরত থাকে উচিৎ।

জিকা কি বার বার হওয়ার সম্ভাবনা আছে?

জিকা একবার হলে তা পরবর্তীতে আবার হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা। এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য উপাত্ত পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে এ রোগে একবার আক্রান্ত হলে শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হয় যা শরীরকে এ রোগ প্রতিরোধী করে তোলে। তবে এ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কতদিন স্থায়ী হবে সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু জানা যায়নি।

বাংলাদেশে প্রায়শই কোনো রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য না দিয়ে ভয় জাগিয়ে দেওয়া হয়। অযথা ভীতি নিয়ে না থেকে সঠিকভাবে জানুন। নিজে সচেতন হয়ে অন্যকে জানান। সে অনুযায়ী সতর্কতা অবলম্বন করুন। মানব সভ্যতায় রোগ নতুন কিছু নয়। রোগ লড়াইয়ে প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান ও সাবধানতা। বাংলাদেশ হোক জিকা ভাইরাস মুক্ত-এই কামনা।

 

Related posts

Leave a Comment