গর্ভাবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ানো কি নিরাপদ?

অনেক মায়েদের মনেই, যারা এক শিশুর জন্মের অল্প সময়ের মদ্ধেই আবার গর্ভধারণ করেন, বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন আসে, যেমন- গর্ভাবস্থায় ব্রেস্টফীডিং কি নিরাপদ? ব্রেস্টফীডিং এর কারণে গর্ভস্থ ভ্রুনের উপর কি প্রভাব পড়বে? এর ফলে বুকের দুধ খাওয়ানো বাচ্চার উপর কি প্রভাব পড়তে পারে? দুটো বাচ্চাকে একসাথে বুকের দুধ কিভাবে খাওয়াবেন? ইত্যাদি। গর্ভাবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ানোর বিভিন্ন বিষয় নিয়েই আজকের আলোচনা।

গর্ভাবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ানো কি নিরাপদ? 

অবশ্যয়! গর্ভাবস্থায় বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখার কোন কারন নেয়। অনেক মাই গর্ভাবস্থায় বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান। শুধু তাই নয়, তারা সন্তান জন্মের পর দুটো বাচ্চাকেই একসাথে দুধ পান করাতে পারেন।

অনেকেই ভয় পান যে গর্ভাবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ালে গর্ভের বাচ্চার জন্য সঠিক পরিমাণে পুষ্টি সরবরাহ খতিগ্রস্থ হবে বা মায়ের পক্ষে বুকের দুধ উৎপাদনের জন্য এবং গর্ভের বাচ্চার জন্য একইসাথে পুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব হবেনা। এটা আসলে তেমন চিন্তার বিষয় নয় কারণ আমাদের শরীর আসলেই খুবই আশ্চর্যজনক এবং সে বোঝে ঠিক কোন মুহূর্তে কি করতে হবে। এ সময় মায়ের সুষম খাবার খাওয়া, খিদে পেলে খাওয়া এবং তৃষ্ণা পেলেই পান করা, এটুকুই যথেষ্ট।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে মায়েদের উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। গর্ভাবস্থায় মায়দের স্তনে এবং নিপলে ব্যাথা থাকতে পারে যাতে বুকের দুধ খাওয়ানোটা মায়েদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও গর্ভাবস্থায় বুকের দুধের পরিমাণও কিছুটা কমে যেতে পারে।

গর্ভাবস্থার শেষদিকে বাচ্চারা মায়ের দুধ খেতে না চাইতে পারে। কথা বলতে পারা বাচ্চারা হয়ত এটাও বলতে পারে যে তার মজা লাগছেনা। এর কারণ হলো গর্ভাবস্থার শেষ দিকে মায়ের বুকের দুধ কোলোস্ট্রাল ধরনের দুধে পরিণত হয়। (কোলোস্ট্রাম হচ্ছে একধরণের ঘন এবং হলুদ বর্ণের দুধ গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এবং প্রসবের পর কয়েকদিন পর্যন্ত উৎপন্ন হয়)।

অনেক মা আবার ভয়ে থাকেন কারণ বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় নিপলে যে স্টিমুলেশন হয় এবং তাতে হালকা যে কন্ট্রাকশন বোধ হয় তাতে প্রি-টার্ম লেবার বা বাচ্চার কোন ক্ষতি হবে কিনা তা ভেবে। নিপলে যে স্টিমুলেশন হয় তাতে মায়ের দেহে অক্সিটসিন হরমোন নিঃসরণ হয় যা বুকের দুধ উৎপাদনে এবং প্রসবের সময় যে কন্ট্রাকশন হয় তার জন্য দায়ী। তবে, বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় যে পরিমান অক্সিটসিন নিঃসরণ হয় তা স্বাভাবিক অবস্থায় প্রসব বেদনা তোলার মত নয়। এ সময় আপনি হালকা কন্ট্রাকশন বোধ করতে পারেন যাতে ভয়ের কোন কারণ নেই। এ ধরনের কন্ট্রাকশনের কারণে ভ্রুনের কোন ক্ষতি হয়না এবং তাতে গর্ভপাতের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললে চলে। এসব গর্ভকালীন হরমোন বুকের দুধের মাধ্যমে বাচ্চার শরীরে সামান্য পরিমাণে যেতে পারে, তবে তা কোন ঝুঁকি কারণ নয়।

গর্ভাবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ানোর কারণে অক্সিটসিন নিঃসরণ তখনই শুধুমাত্র বিপদের কারণ যখন মায়ের স্বাভাবিক সময়ের আগে প্রসব হওয়ার কোন ঝুঁকি থাকে। গর্ভাবস্থায় শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো নিরাপদ তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়, যদি-

যদি এসব লক্ষন থাকে তাহলে বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করতে হবে আপনার, আপনার নবজাতকের এবং গর্ভের সন্তানের জন্য কোনটা সবচাইতে ভালো।

যদি বাচ্চাকে গর্ভাবস্থায় পরিপূর্ণভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো না যায়

যদি বাচ্চা সলিড খাওয়ার উপযোগী হয়ে যায় তবে বুকের দুধ পরিপূর্ণভাবে খাওয়াতে না পারলে অন্যান্য খাবারের মাধ্যমে তার পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারেন। বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না বলে অপরাধবোধে ভোগার কিছু নেই। যতদিন শিশু বুকের দুধ খেয়েছে তাতেই সে বুকের দুধের সব উপকারিতা পেয়েছে।

এমনিতেই গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময় মায়ের বুকে দুধ কমে যায় এবং তা শিশুর কাছে বিস্বাদ লাগতে পারে। এর ফলে বাচ্চা নিজে নিজেই স্বাভাবিক সময়ের আগেই অন্য খাবার খাওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারে। যদি বাচ্চা সলিড খাওয়ার জন্য প্রস্তুত না থাকে তাহলে বুকের দুধের পাশাপাশি ফর্মুলা খাওয়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে একবার বিসেশজ্ঞের সাথে আলাপ করে জেনে নিন কোন ব্র্যান্ডের ফর্মুলা বাচ্চার জন্য ভালো হবে।

দুটি ক্ষেত্রেই বাচ্চার বেড়ে ওঠা এবং সাস্থ্যের দিকে নজর রাখতে হবে। বাচ্চার পরিপূর্ণ পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য পরিপূরক খাবার বা তার জন্য বাচ্চা প্রস্তুত না থাকলে বাচ্চাকে ফর্মুলা খাওয়াতে হবে।

গর্ভাবস্থায় বুকের দুধ খাওয়াতে যেসব অসুবিধা হতে পারে এবং তা সমাধানে কিছু টিপস

গর্ভাবস্থায় মর্নিং সিকনেস বা বমি বমি ভাব হওয়ার কারনে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াতে পারে। মর্নিং সিকনেসের কারণে মায়ের ক্লান্ত লাগতে পারে। তার সাথে যুক্ত হয় বুকের দুধ উৎপাদনে মায়ের শরীর যে আলাদা শক্তির প্রয়োজন হয় তা। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারেন। হালকা কিছু খাবার সাথে রাখতে পারেন যাতে বমি বমি ভাব কম হয়। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর আগে হালকা লবনাক্ত কোন স্ন্যাক্স খেয়ে নিতে পারেন। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর কারণে আলাদা করে কোন ক্লান্তি বোধ হয়না। তাই আরামদায়ক স্থানে শুয়ে বা বসে দুধ খাওয়াতে পারেন।

তবে মর্নিং সিকনেস যদি মারাত্মক আকার ধারন করে এবং মায়ের ওজন কমতে থাকে, সেক্ষেত্রে বেশীরভাগ  ডাক্তার বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখার পরামর্শ দিতে পারেন।

এ সময় আরকটি উপসর্গ হোল নিপলে ব্যাথা। যদি বেশী ব্যাথা লাগে তবে বাচ্চাকে বেশী সময় ধরে না খাইয়ে অল্প অল্প করে বেশ কয়েকবার খাওয়াতে পারেন। এ সময় অন্যদিকে মনোনিবেশ করে থেকেও কিছুটা সস্তি পাওয়া যেতে পারে। বাচ্চার মুখ ভালোভাবে হা করে নিপলসহ চার পাশের কালো অংশ (এরিওলা) বাচ্চা মুখে দিন। বাচ্চা এরিওলাই চুষবে। তাহলে ঠিকমতো দুধ পাবে। কিন্তু যদি শুধু নিপল চুষে, তাহলে নিপল ছিঁড়ে যেতে পারে, মা ব্যথা পাবে, বাচ্চাও দুধ কম পাবে। তাই স্তনের বেশি অংশ বাচ্চার মুখে দিন এতে ব্যাথা কম লাগতে পারে।

গর্ভাবস্থায় মায়ের পেট বড় হওয়ার সাথে সাথে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়ানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে পাশ ফিরে শুয়ে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো যেতে পারে। তবে বাচ্চা বড় হলে সে বসে বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও বুকের দুধ খেতে পারে।

যখন নতুন বাচ্চা আসবে তার শাল দুধ প্রয়োজন হবে। তাই বাচ্চা হওয়ার পরের কয়েকদিন বড় বাচ্চার দুধ খাওয়ানো কমিয়ে নতুন বাচ্চাকেই বেশী খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। নতুন বাচ্চা আসার পর হঠাৎ করে বড় বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে আপনার বিরক্ত লাগতে পারে। এমন হলে অবাক হওয়ার বা ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। সময়ের সাথে সাথে এটা ঠিক হয়ে যায়। যদি মনে হয় একসাথে দুজনকে বুকের দুধ খাওয়ানো আপনার পক্ষে সম্ভব নয় তবে বড় বাচ্চাকে সলিড খাওয়ানো গর্ভাবস্থাতেই শুরু করুন। নতুন বাচ্চা আসার পর হঠাৎ তার দুধ বন্ধ করে দিলে তার উপর মানসিক চাপ পরতে পারে।

এসময় মায়ের খাবার

গর্ভাবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ালে তিন জনের সুসাস্থ্যের কথা মাথাই রেখে মাকে সুসম খাবার গ্রহন করতে হবে। এক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে যে অতিরিক্ত ৩৫০ ক্যালোরি এবং তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে যে অতিরিক্ত ৪৫০ ক্যালরির প্রয়োজন পরে, তার চাইতে ৫০০-৬৫০ ক্যালোরি বেশী খাবার গ্রহন করা উচিত। প্রথম ট্রাইমেস্টারে মর্নিং সিকনেসের কারণে বেশী খেতে না পারলে ভয়ের কিছু নেই।  গর্ভাবস্থায় প্রথম ট্রাইমেস্টারে অতিরিক্ত ক্যালোরির প্রয়োজন হয়না।

গর্ভকালীন সময়ে মায়ের খাবার ও পুষ্টি সম্পর্কে জেনে নিন। 

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment