গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন । কেন জরুরী?

গর্ভকালীন সময়ে নারীদের দাঁতের যত্ন বিষয়টি মা ও অনাগত শিশুর সুস্থতার জন্য জরুরি৷ এই সময়টাতে নারীরা দাঁত ও মাড়ি নিয়ে অনেক ভোগেন৷ এ নিয়ে আছে অনেক ভুল ধারণাও৷ গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি নিতে হবে। কারণ গর্ভাবস্থার দুই মাস পর থেকে মুখ এবং দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। গর্ভাবস্থায় মায়ের দাঁতের সমস্যা সরাসরি গর্ভের শিশুর কোন ক্ষতি করেনা। কিন্তু দাঁতে সমস্যা থাকলে তার ফলে মায়ের সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো থাকেনা যেটা গর্ভের শিশুর উপর প্রভাব ফেলে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা গর্ভকালীন সময়ে মা ও গর্ভের শিশু – দুজনেরই সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় মুখে কি কি উপসর্গ দেখা দিতে পারে

প্রেগন্যান্সি জিনজিভাইটিসঃ

গর্ভাবস্থায় নারীর দেহে হরমোনজনিত কিছু পরিবর্তনের কারণে দাঁত ও মাড়িতে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এ প্রতিক্রিয়ার ফলে প্রায় ৫০-৭০% গর্ভবতী মাড়ির প্রদাহে আক্রান্ত হন। মাড়ির এ প্রদাহকে চিকিত্সাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রেগন্যান্সি জিনজিভাইটিস বলা হয়। এ সময় দাঁত ও মাড়িতে জমে থাকা খাদ্যকণা, যা হরমোনের প্রভাবে খুব সহজেই ডেন্টাল প্ল্যাকে রূপান্তরিত হয়।আর এসব সমস্যার ফলে গর্ভের বাচ্চার স্বাভাবিক বৃদ্ধিতেও ব্যাঘাত ঘটে।

প্রেগন্যান্সি জিনজিভাইটিসের লক্ষণগুলো হলো মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, মাড়ির রং গাঢ় লাল হয়ে যাওয়া, দুদাঁতের মাঝের অংশের মাড়ি ফুলে যাওয়া। গর্ভাবস্থার প্রথম ২ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত মাড়ির এ প্রদাহ বেশি লক্ষণীয়। এটি মোকাবিলা করার জন্য সর্বাগ্রে করণীয় হচ্ছে গর্ভাবস্থার শুরু থেকে নিয়মিত দাঁতব্রাশ এবং ফ্লসিং করা, যাতে ডেন্টাল প্ল্যাক সৃষ্টি হতে না পারে। গর্ভাবস্থার আগে একজন দন্ত চিকিত্সকের কাছে দাঁত ও মাড়ি পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত । এতে দাঁতে কোনও সমস্যা থাকলে তা তখনই নির্ণয় করে চিকিত্সা করা উচিত।

মুখ ও দাঁত নিয়মিত পরিস্কার রাখার মাধ্যমে জিনজিভাইটিস বা মাড়ির প্রদাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই মুখ ও দাঁতে কোন পরিবর্তন দৃষ্টি গোচর হলে ডেন্টিস্টের শরণাপন্ন হোন। অন্যথায়, মাড়ির এ প্রদাহ আরো প্রকট আকার ধারণ করবে।

পায়োজেনিক গ্রানুলোমা

গর্ভাবস্থায় অনেক সময় মাড়িতে এক ধরনের টিউমার দেখা যায় যা পায়োজেনিক গ্রানুলোমা নামে পরিচিতি। তবে অনেকে এ টিউমারকে প্রেগন্যান্সি ইপুলিস বলে থাকেন। গর্ভাবস্থা শেষ হলে এ টিউমার আপনা আপনিই ভাল হয়ে যায়। তবে কোন জটিলতা দেখা দিলে বা কোন সমস্যা অনুভব করলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সাথে সাথে চিকিত্সা নেয়া উচিত। তবে ওই জায়গাটায় একটুতেই রক্তপাত হয়। তাই সাবধানে ব্রাশ করতে হবে। ডেন্টাল সার্জন ম্যানুয়ালি এটা একটু ঠিক করে দিতে পারেন। এতে দেখা যায় টিউমারের বৃদ্ধিটা একটু কমে আসে। ওই সময় মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন এবং নিরাপদ অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যেতে পারে। এখন অনেক নিরাপদ অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায় গর্ভাবস্থায় খাওয়ার জন্য। তবে তা খেতে হবে অবশ্যয় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী।

দাঁত ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি

গর্ভাবস্থায় মায়েদের ক্যাভিটির ঝুঁকি বেশ কিছু কারনে বেড়ে যায়। যেহেতু এ সময় মায়েরা কারবহাইড্রেট বেশী গ্রহন করেন তাই তাতে দাঁত ক্ষয় হতে পারে। এছারাও গর্ভাবস্থায় মর্নিং সিকনেসের কারনে বমি বমি ভাব হলে বা বমি উঠে আসলে মায়েদের দাঁত এসিডের সংস্পর্শে আসে বেশী। এর ফলে দাঁতের এনামেল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

এর থেকে রক্ষা পেতে নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার করতে হবে। গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন ঠিকভাবে না নিলে তা আর বড় জটিলতার কারন হয়ে দাঁড়াতে পারে, যেমন- প্রি-ম্যাচিউর বার্থ, বাচ্চার ওজন কম হওয়া, ডায়াবেটিস, প্রি-এক্লাম্পশিয়া ইত্যাদি।

গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন

এখনকার আধুনিক যুগে সবকিছুই পরিকল্পিত হয়। যাঁরা আগে থেকেই মনে করেন বাচ্চা নেবেন তাদের আগে থেকেই গর্ভধারণের আগে চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাৎ করা উচিত। যে সমস্যাগুলো আছে তাৎক্ষণিক যদি চিকিৎসা করা যায় সেটা ঠিক করা যেতে পারে। সেটা দাঁত ক্ষয় হতে পারে, মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া ইত্যাদি অসুখ হতে পারে।

প্রতিদিন দুইবেলা অন্তত ২ মিমিট করে দাঁত মাজতে হবে। দাঁতের ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন, কি নিয়মে ব্রাশ করলে দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা ময়লা পরিস্কার হয়ে যাবে। টুথব্রাশের যে মাথায় ব্রাশ থাকে তা যেন ছোট হয় এবং ব্রাশের শলাগুলো বা ব্রিসল যেন নরম হয়। টুথব্রাশের হাতলটি যেন ধরতে সহজ হয়।

গর্ভাবস্থায় মর্নিং সিকনেসে আক্রান্ত মায়েরা অনেক দাঁত ব্রাশ করতে চান না কারন পেস্টের গন্ধে অনেকেরই এ সময় বমির উদ্রেক হয়। এক্ষেত্রে যেকোনো মাউথওয়াশ দুই ফোঁটা ব্রাশে নিয়ে সেটা দিয়ে ব্রাশ করবেন। এটা পেস্ট, মাউথওয়াশ এবং অ্যান্টিসেপটিকের কাজ করবে। কারণ পেস্ট ব্যবহারের কারণে যে বমি হওয়ার আশঙ্কা থাকে সেটা থাকবে না। যদি তাতেও সমস্যা হয় সেক্ষেত্রে ব্রাশ শুধুমাত্র পানিতে ভিজিয়ে দাঁত পরিষ্কার করে নিন।

অনেকেই গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাসে সকাল বেলায় অসুস্থবোধ করেন এবং বমি হয়। আপনার যদি এমনটা হয়ে থাকে তবে বমির পর পরিস্কার পানি দিয়ে কুলি করে ফেলুন। বমির সাথে পাকস্থলী থেকে এসিড বের হয়ে আসে, এই এসিড দাঁতে লেগে থাকলে দাতের ক্ষয় হয়। বমির পর কুলি করে ফেললে এসিড ধুয়ে চলে যায়। বমির পর পরই দাঁত ব্রাশ করবেন না। কারন বমির এসিডের কারনে এই সময় দাঁত কিছুটা নরম থাকে, ফলে ব্রাশের সময় ক্ষয় হতে পারে। বমি হলে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা পর দাঁত ব্রাশ করুন।

গর্ভকালীন সময়ে মিষ্টি, চকলেট বা আইসক্রিম-জাতীয় খাবারের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যেতে পারে৷ কিন্তু মূল আহারের মধ্যবর্তী সময়গুলোতে খুব মিষ্টি বা শর্করাজাতীয় খাদ্য গ্রহণ বন্ধ রাখা প্রয়োজন৷ এতে যেমন দেহের বাড়তি ওজন কমানো সম্ভব তেমনি দাঁতের ক্ষয়রোগ রোধ করা সহজ। তবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহণ একান্ত পয়োজন।  তা ছাড়া, মিষ্টি বা চকলেটজাতীয় দ্রব্য খেয়ে দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস দরকার৷

গর্ভাবস্থায় যেমন নিয়মিত একজন স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন তেমনি একজন দন্ত চিকিত্সকের কাছ থেকেও দাঁত ও মুখ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় দাঁতের চিকিৎসা করা যাবেনা এমনটা ভেবে ডাক্তারের কাছে যাওয়া বন্ধ রাখবেন না। দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় আপনার প্রেগন্যান্সির মেডিকেল ফাইলগুলো নিয়ে যান যাতে সেসব দেখে ডাক্তার আপনার দাঁতের চিকিৎসার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

অনেকের ধারণা, গর্ভকালীন ও স্তন্যপান করানোর সময় দেহ থেকে ক্যালসিয়াম ক্ষয় হয় এবং এর প্রভাব দাঁতেও পড়ে৷ কিন্তু আসলে ব্যাপারটা তা নয়৷ গর্ভবতী মায়ের দাঁতের ক্যালসিয়াম কখনোই গর্ভস্থ শিশুর দাঁতে চলে যায় না৷ কিন্তু গর্ভস্থ শিশুর সুস্থ ও শক্ত দাঁত গড়ে তোলার জন্য মাকে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করতে হবে৷ তাই এই সময়ে গর্ভবতী মায়ের প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসব্জি (সালাদ বানিয়ে) ও ফলমূল খাওয়া প্রয়োজন, যেমন- লাল শাক, পালং শাক, পুই শাক, গাজর, টমেটো, ঝিঙ্গা, পটল, আলু, লেটুস পাতা, কপি, সীম, বরবটি, লেবু শশা, আপেল, কমলা, জাম্মুরা, কলা পেয়ারা, আমলকি ইত্যাদি।

গর্ভাবস্থায় দাঁতের চিকিৎসা কি নিরাপদ?

গর্ভাবস্থায় সাধারনত দাঁতের চিকিৎসা নিরাপদ বলেই প্রমানিত।তবে নিতান্ত প্রয়োজন না হলে দাঁতের অন্যান্য চিকিৎসা করার জন্য সন্তান প্রসবের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। গর্ভাবস্থায় দাঁতের চিকিৎসার জন্য সবচাইতে উপযুক্ত সময় হলো দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার। প্রথম ট্রাইমেস্টারে গর্ভের ভ্রুন অনেক সংবেদনশীল থাকে এবং এসময় ভ্রুনের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়। তাই এ সময় দাঁতের চিকিৎসা করা বা কোন ওষুধ খাওার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। আর তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে মায়ের পক্ষে দীর্ঘক্ষণ চিত হয়ে শুয়ে থাকা কষ্টকর এবং তা উচিত ও নয়। তবে ইমারজেন্সি হলে যে কোন সময় দাঁতের চিকিৎসা করিয়ে নিতে হবে। কারন দাঁতের সমস্যার কারনে মায়ের সমস্যা হলে তা গর্ভস্থ সন্তানের উপরও প্রভাব ফেলে।

ডেন্টাল ইমার্জেন্সি বা কোন দাঁতের সমস্যা নির্ণয় করতে মাঝে মধ্যে ডেন্টাল এক্সরের প্রয়োজন হতে পারে। রেডিয়েশন বা বিকিরণ এড়াতে তলপেটে লেডেড এপ্রণ এবং থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের চার ধারে লেডেড থাইরয়েড কলার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। American Congress of Obstetricians and Gynecologists এবং American Dental Association এর বক্তব্য অনুযায়ী যথোপোযুক্ত শিল্ড বা আবরক সহ ডেন্টাল এক্সরের ব্যবহার গর্ভবতী মায়ের জন্য নিরাপদ।  যদিও মুখের এক্সরের কারণে গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা কম, তারপরও সাবধানতার জন্য খুব বেশী জরুরী না হলে এই সময় এক্সরে না করানোর চেষ্টা করা হয়।

ব্যথানাশক ওষুধ খেলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয়। অনেক ব্যথানাশক ওষুধ রয়েছে বাচ্চার বৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলে। কিছু ব্যথানাশক ওষুধের কারণে গর্ভপাত হয়ে যায়। কিংবা অন্য আরো সমস্যা হতে পারে। গর্ভাবস্থায় যেকোনো ওষুধই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া ঠিক নয়। দাঁতের ডাক্তারকে আপনার গায়নী ডাক্তারের দেয়া সব ওষুধ সম্পর্কে অবশ্যয় জানাতে হবে। প্রয়োজনে দাঁতের ডাক্তার আপনার গায়নী ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে আপনাকে ওষুধ দেবেন।

গর্ভাবস্থা মানেই হলো নতুন প্রাণের সৃষ্টি, নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি, নতুন শতাব্দীর সৃষ্টি। সে ক্ষেত্রে গর্ভধারণকারী মায়ের সুস্থতা সবার আগে। কারণ, একজন সুস্থ মা জন্ম দিতে পারেন একটি সুস্থ স্বাভাবিক শিশু। তাই মায়ের শারীরিক অন্যান্য সমস্যার পাশাপাশি মুখ ও গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব।

সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.