শিশুর ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা (জন্ম থেকে ১২ মাস) : লক্ষণ, করণীয় ও প্রতিকার

শিশুর ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা কি?

ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা মানে শরীর ঠিকঠাক কাজ করতে যতটুকু পানির প্রয়োজন, তার থেকে কমে যাওয়া। বয়ষ্ক মানুষের তুলনায় শিশুদের পানিশূন্যতার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। বমি, ডায়রিয়া, জ্বর, অতিরিক্ত ঘাম প্রভৃতির কারণে যখন দ্রুত শরীরের পানি কমে যায়, বেশি বেশি পানি খেয়ে সেটা পূরণ করে দিতে হয়। কিন্তু যদি তা না করা যায়, তখনই ডিহাইড্রেশন হতে পারে।

ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা কখনো কখনো খুব কম ঝুঁকিপূর্ণ হয়, যা সহজে পানি খেয়েই ঠিক করে ফেলা যায়। তবে এটা আবার নীরবে এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে যে কখনো কখনো জীবনের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রচন্ড গরমের সময়ে শিশুর প্রতি একটু বাড়তি খেয়াল রাখতেই হবে যে তার শরীর প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছে কিনা।

কিভাবে বুঝবেন শিশুর পানিশূন্যতা হচ্ছে কিনা?

পানিশুন্যতা হচ্ছে কিনা তা বোঝা খুব কঠিন কিছু না। নিম্নোক্ত ব্যাপারগুলো আপনার শিশুর সাথে ঘটে থাকলে বুঝবেন আপনি শিশুর ডিহাইড্রেশন হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে

  • ভেজা ডায়াপার ছাড়াই ছয় ঘন্টার বেশী সময় কাটিয়ে ফেলছে,
  • প্রস্রাবের রঙ ঘন এবং তীব্র গন্ধযুক্ত,
  • নিস্তেজ হয়ে থাকা,
  • মুখ এবং ঠোঁট শুকিয়ে আসবে,
  • কান্না করলেও চোখ থেকে পানি পড়বে না।

উপরের লক্ষণগুলো ছাড়াও আরো কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো শিশুর সাথে হতে দেখলে বুঝতে হবে শিশু অতিরিক্ত মাত্রার পানিশূন্যতায় ভুগছে:

  • চোখ দেবে যাওয়া,
  • হাত ও পায়ে ছোপ ছোপ দাগের মত দেখা যাবে, ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে আসবে,
  • যখন ঘুমুবে, একটানা ঘুমুবে, আবার যখন উঠে যাবে একটানা কান্নাকাটি করবে,
  • মাথার নরম অংশ(fontanels)  দেবে যাওয়া।

শিশুর পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা গেলে কি করবো?

শিশুর মধ্যে পানিশূন্যতা দেখা দিলে সেটা অনুধাবন করার জন্যে শিশু কিন্তু আপনাকে খুব বেশী একটা সময় দেবে না। শিশুর অবস্থা হঠাৎ করেই খুব খারাপ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রার পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সাথে সাথে তাকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে প্রয়োজনে স্যালাইনের মতো শিরার মাধ্যমে তার শরীরে তরল পদার্থের যোগান দিতে হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত তার শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

এছাড়া অবস্থা যদি খুব বেশী একটা খারাপ না হয়ে যায় এবং আপনি যদি উপরে উল্লেখিত লক্ষণগুলোর কিছু লক্ষণ শিশুর মধ্যে খেয়াল করে থাকেন, সেক্ষেত্রে প্রথমে আগে শিশুর ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। শিশুকে নিয়ে তার সাথে দেখা করে আসুন যে সে ঠিকঠাক আছে কিনা। ডাক্তার যদি কিছুটা পানিশূন্যতার আভাস পান, তিনি শিশুকে বেশী করে

তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শই দেবেন। আর যদি শিশুর বয়স তিন মাসের কম হয়, সেক্ষেত্রে বুকের দুধ বা ফর্মুলাই খাওয়াতে বলবেন, তবে একটু ঘন ঘন যাতে খাওয়ানো হয়, সে ব্যাপারেই নির্দেশনা দেবেন।

আপনার শিশু যদি তিন মাস কিংবা এর চেয়ে বেশি বয়সের হয় এবং তার মধ্যে মোটামোটি পানিশূন্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেক্ষেত্রে বুকের দুধ কিংবা ফর্মুলা দুধের পাশাপাশি ডাক্তার ইলেক্ট্রোলাইট জাতীয় পানীয় খাওয়ানোর পরামর্শ দিতে পারেন। পানিশূন্যতায় শরীর থেকে যে লবণ ও পানি বের হয়ে যায়, তা পুনরুদ্ধারে দ্রুত কাজ করে এ পানীয়।

বাজার পিডিয়ালাইট, ইনফালাইট, রিভাইটালসহ বিভিন্ন ব্র‍্যান্ডের এই ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় পাওয়া যায়। তবে আপনার শিশুকে কোনটা খাওয়াবেন সেটা আপনার ডাক্তারই বলে দেবেন।

শিশুর বয়স ও ওজন বুঝে তাকে কি পরিমাণ ইলেক্ট্রোলাইট তরল খাওয়াতে হবে, সে ব্যাপারে ডাক্তারই পরামর্শ দেবেন৷ তবে সাধারণ নিয়মে শিশুর ওজন যত পাউন্ড, পাউন্ডপ্রতি ৫ চা’চামচ করে এই পানীয় পান করানো যায়। সুতরাং আপনার শিশুর ওজন যদি হয় ১৫ পাউন্ড, সেক্ষেত্রে তাকে ৭৫ চা’চামচ বা ৩৭৫ মিলিলিটার (দেড় কাপ) ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় পান করানো যাবে। মনে রাখবেন, এই পানীয় খাওয়ার পুরো কোর্স ৩/৪ ঘন্টার, সুতরাং পুরো পানীয়টা এই সময়ের ভেতরেই শিশুকে খাওয়াতে হবে।

ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা প্রতিরোধের উপায় কি?

পানিস্বল্পতার প্রতিরোধ তরল দিয়েই করতে হবে। দিনের আবহাওয়াটা যখন খুবই গরম কিংবা শিশু যদি অসুস্থ থাকে, এমন সময়ে শিশুর দিকে একটু খেয়াল রাখতে হবে যে তাকে প্রচুর পরিমাণে তরল  খাওয়ানো হচ্ছে কিনা। তাকে নিয়মিত বুকের দুধ বা ফর্মুলা খাওয়াতে হবে।

শিশুর বয়স ছয় মাস হয়ে গেলে তারপর থেকে তাকে বুকের দুধ কিংবা ফর্মুলা দুধের পাশাপাশি একটু একটু করে পানি পান করাতে পারেন। পরিমাণে খুব বেশী নয়, মোটামুটি শক্ত খাবার খাওয়ানোর আগ পর্যন্ত প্রতিদিন ৪ আউন্সের মতো পানি পান করানো যায়।

শক্ত খাবার শুরু করে দিলে পানির পরিমাণটাও সাথে সাথে বাড়বে৷ তবে আপনার শিশুর বয়স যদি ছয় মাসের কম হয়, এবং আপনি ডিহাইড্রেশন নিয়ে চিন্তিত থাকেন, সেক্ষেত্রে শিশুকে পানি পান করানোর ক্ষেত্রে ডাক্তারের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েই করা উচিত।

শিশু একটু বড় হয়ে গেলেও পানি এবং পানীয় খাওয়ানোর ব্যাপারে মা-বাবাকে খুবই সচেতন থাকতে হবে। শিশুর দাঁত এবং স্বাস্থ্যের জন্যে খুবই ক্ষতিকর কার্বোনেটেড সোডা তো দূরে থাক, শিশুর ১২ মাস বয়স হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে কোন প্রকার জুসও খেতে দেওয়া উচিত না।

নিম্নোক্ত পরিস্থিতিগুলোতে শিশুর মধ্যে পানিশূন্যতার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে বাড়তি দৃষ্টি দিতে হবে:

জ্বর আসলে : শিশুর জ্বর উঠলে তাকে প্রচুর পরিমানে তরল খাবার খাওয়ান। শিশুর যদি তরল খাবারও গিলতে কষ্ট হয়, তার ডাক্তারের সাথে কথা বলে ব্যাথানাশক ঔষধ যেমন শিশুদের এইসটেমিনোফেন কিংবা (ছয় মাসের বেশী বয়স হলে) ইবোপ্রোফেন জাতীয় ঔষুধ খাওয়ানো যায়। এতে করে শিশু অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে৷ তবে শিশুকে কোনভাবেই এসপিরিন খাওয়ানো উচিত নয়, এটা শিশুকে প্রাণঘাতী ‘রে’স সিনড্রোম’এর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

অতিরিক্ত উষ্ণ আবহাওয়ায়: দিনের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শিশুকে সাধারণ দিনের তুলনায় বেশী পরিমাণে তরল খাওয়াতে হবে। গরমের দিনে শিশু একটু আকটু নড়াচড়াতেই প্রচুর ঘেমে উঠে এবং তার শরীর থেকে লবণ ও পানি বেরিয়ে যায় যা বাড়তি পানি খাওয়ানোর মাধ্যমে পূরণ করে দিতে হয়।

ডায়রিয়া হলে: পাকস্থলীতে কোন সমস্যাজনিত কারণে (যেমন গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস) শিশুর ডায়রিয়া কিংবা বমি হতে পারে, যার মাধ্যমে শিশুর শরীর থেকে দ্রুত প্রচুর পরিমাণ পানি বের হয়ে যায়। এই সময়ে অনেকে শিশুকে ফলের জুস খাওয়াতে চান যা উল্টো বিপদের কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। এমনকি ডাক্তার না বললে শিশুকে ডায়রিয়ার জন্যে কোন ঔষুধও খাওয়ানো ঠিক হবে না।

আপনার শিশুর বয়স যদি তিন মাস হয়ে থাকে এবং আপনার মনে হয় যে সে হয়তো পানিশূন্যতায় ভুগছে, আপনি চাইলে তাকে ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় পান করাতে পারেন(অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে)। শিশুর বয়স ছয় মাস কিংবা এর বেশী হলে, তাকে তূলনামূলক একটু বেশী বুকের দুধ অথবা ফর্মূলা দুধের পাশাপাশি পানিমিশ্রিত তরল খাবার খাওয়ানো যায়।

মনে রাখবেন, যদি ডায়রিয়ার কারণে শিশুর পানিশূন্যতা হয় তবে তার পায়খানা পাতলা হবে আর যদি বমি বা অন্য কোন কারণে তার পানিশূন্যতা দেখা দেয় তবে তবে সে অল্প পরিমাণে এবং অল্প বার পায়খানা করবে।

বমি করলে: ভাইরাস বা বিভিন্ন প্রকার ইনফেকশনের কারণে বমি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে বমির ফলে যদি আপনার শিশুর শরীর থেকে অনেক বেশী পানি বের হয়ে যায়, তবে তার খুব দ্রুতই ডিহাইড্রেশনে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

ছয় মাস বা তার চেয়ে বেশী বয়সী শিশুরা বমি করলে বুকের দুধ এবং ফর্মুলা দুধের পাশাপাশি অল্প অল্প করে পানি খাওয়ানো যায়। আর শিশুর বয়স যদি তিন মাস বা এর চেয়ে বেশী হয়, সেক্ষেত্রে বুকের দুধ বা ফর্মুলা দুধের পাশাপাশি ইলেক্ট্রোলাইট পানীয়টাও বমির ক্ষেত্রে বেশ ভালো কাজ করে।

তবে শিশুকে একেবারে বেশী করে না খাইয়ে অল্প অল্প করে বার বার খাওয়াবেন। পেট শান্ত না হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশুকে প্রতি দশ মিনিট পর পর এক চা’চামচ করে কয়েক ঘন্টা ধরে খাওয়াবেন। পেটের অবস্থা যদি কিছুটা ঠিকঠাক হয়, তাহলে ধীরে ধীরে খাওয়ানোর পরিমানটা বাড়ানো যায়। যেমন প্রতি ৫ মিনিট পর পর ২ চা’চামচ করে খাওয়ানো।

শিশু যখন খেতে চায় না: গলা ব্যাথা ছাড়াও বিবিধ কারনে, যেমন শিশুর হাত,পা ও মুখের রোগে (hand,foot and mouth disease) তার ব্যাথা থাকতে পারে। ব্যাথার যন্ত্রণা বেশী হয়ে গেলে শিশু খাওয়া কমিয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে খুব বেশী দেরি না করে শিশুর ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডাক্তার শিশুকে ইবোপ্রোফেন কিংবা এইসটামিনোফেন জাতীয় ব্যাথানাশক ঔষুধ দিতে পারে (যদি তার বয়স ৬ মাস বা তার বেশী হয়)। ব্যাথা কিছুটা কমে এলে শিশু খাওয়া শুরু করার পর তাকে অল্প অল্প করে নিয়মিত বুকের দুধ বা ফর্মুলা দুধ কিংবা বিশুদ্ধ পানি খাওয়াতে হবে।

সবার জন্য শুভকামনা। 

Related posts