শিশুদের দাঁতে দাঁত ঘষার প্রবণতা বা ব্রকসিজম

Updated on

আপনার ছোট্ট বাবুটা যখন ঘুমাচ্ছে তখন আপনি শুনতে চান ওর নিশ্চিন্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ, অথবা সুন্দর কোন স্বপ্ন দেখে বলে ওঠা আধো বুলি। আপনি কখনই শুনতে চাইবেন না ওর দাঁতে দাঁত ঘষার কর্কশ শব্দ। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে অনেক মা-বাবাকেই এই কষ্টকর শব্দটা রাতভর শুনতে হয়।

শিশুর দাঁতে দাঁত ঘষার এই প্রবণতার নাম “ব্রকসিজম”। দুনিয়াজুড়ে শিশুদের মধ্যে এটা খুবই সাধারন একটা সমস্যা।

দাঁতে দাঁত ঘষা বা “ব্রকসিজম ” কি ?

এক পাটি দাতের সাথে অন্য পাটির ঘর্ষণে অথবা চোয়াল শক্ত করে চেপে থাকলে মুখে যে কর্কশ শব্দ হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাকেই বলে “ব্রকসিজম”। প্রতি ১০-জন শিশুর মধ্যে ২ থেকে ৩ জনই এই সমস্যায়ে ভোগে। সাধারণত গভীর ঘুমের মধ্যে অথবা বাচ্চারা যখন কোন মানসিক চাপে থাকে তখন এর পরিমান বেড়ে যায়।

ব্রকসিজমকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়।

জাগ্রত ব্রকসিজম: এটি মূলত দিনের বেলায় সংঘটিত হয়। মূলত দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ থেকেই এই ব্রকসিজমের উৎপত্তি। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর বিশ শতাংশ এবং শিশুদের আঠারো শতাংশ এ রোগে আক্রান্ত।

ঘুমন্ত ব্রকসিজম: এটি রাতের বেলায় সংঘটিত হয়। ব্রকসিজমের মধ্যে স্লিপ ব্রকসিজমেরই প্রাধান্য বেশি (প্রায় ৮০ শতাংশ ব্রকসিজমই স্লিপ ব্রকসিজম) এবং শিশুদের মধ্যে অধিক দেখা যায়। এটি অনৈচ্ছিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত অর্থাৎ এর ওপর রোগীর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে বললেই চলে।

ব্রকসিজম কেন হয় ?

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মাঝে এখন যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু সাধারণত মনে করা হয় যেসব বাচ্চাদের দাতের দুইপাটির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকেনা তারাই এটা বেশি করে। আবার অনেকে ব্যাথা (কান বা নতুন দাত ওঠার ব্যাথা) কমানোর জন্য এটা করে থাকে।

“রাগে দাত কিড়মিড়” কথাটা কিন্তু এমনি এমনি আসেনি। যে কোন মানসিক চাপে পরলে আমরা সবাই কমবেশি এটা করে থাকি। শিশুরা করে একটু বেশি।

নতুন স্কুল, শিক্ষক, বা পরীক্ষা এসব কিছু নিয়ে যদি আপনার বাচ্চাটা একটু হলেও টেনশনে থাকে তাহলে কিন্তু ও দাঁতে দাঁত ঘসে শব্দ করবে। কখনো কখনো ওর নতুন ভাইবোন হলে ও একটু টেনশনে পরে যায় আর তখন এটা করে থাকে। আর কারো সাথে রাগ হলে যে এটা করবে সেটা তো জানা কথাই !

আপনার বাচ্চাটা যদি খুবই চঞ্চল হয় তাহলে ওর জন্য এই দাত কিড়মিড় খুবই সাধারন বিষয় । কিন্তু কখনো কখনো এই অভ্যাস মস্তিস্কের কোন জটিলতা (cerebral palsy)  বা বিশেষ কোন ঔষধ সেবন থেকেও হতে পারে।

বাচ্চারা ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষলে অনেক সময় বলা হয় কৃমির জন্য এ রকম হচ্ছে। কিন্তু এর কারণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা এখনো একমত হতে পারেননি।

ব্রকসিজম এর প্রভাব

এমনিতে ব্রকসিজম-এর কোন ক্ষতিকর প্রভাবের কথা শোনা যায়না। কিন্তু ক্রমাগত দাঁতে দাঁত ঘষার কারনে মাথা ও কানে ব্যাথা হতে পারে। আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর হচ্ছে শব্দটা। আশেপাশের মানুষের বিরক্তি উদ্রেকের জন্য এই শব্দটাই যথেষ্ট।

ব্রকসিজম রাতভর অথবা দীর্ঘসময় চলতে থাকলে দাতের ক্ষয়, দাত ভেঙ্গে যাওয়া, দাত অতিরক্ত সংবেদনশীল হয়ে যাওয়া সহ মারাত্মক ব্যাথা হতে পারে। এমনকি চোয়ালের বড় ধরনের সমস্যা বা “টেমপোড়োম্যানডিবুলার জয়েন্ট ডিজিজ” (temporomandibular joint disease (TMJ) হতে পারে।

ব্রকসিজম বুঝবেন কি করে ?

বাচ্চারা অনেক সময় বোঝেই না যে ওরা দাঁতে দাঁত ঘষছে। যতক্ষণ ওদেরকে বলা না হচ্ছে ততক্ষণ দেখবেন ওরা বুঝতেই পারছেনা যে ওরা এমন কিছু আদৌ করছে।

এক্ষেত্রে খেয়াল রাখুন

  • আপনার শিশুটি ঘুমের মাঝে কিড়মিড় শব্দ করছে কিনা
  • দাত বা মুখ ব্যাথা নিয়ে অভিযোগ করছে কিনা
  • ওর কোন কিছু চিবোতে সমস্যা হচ্ছে কিনা

এর কোনটা যদি আপনি দেখতে পান তাহলে দ্রুত ওকে ডেনটিস্টের কাছে নিয়ে যান। ডেনটিস্ট ওর দাতের কোন ধরনের ক্ষয়, ভাঙ্গা এসব পরীক্ষা করবেন। ঠাণ্ডা বাতাস আর পানি দিয়ে ওর দাঁতের সংবেদনশীলতাও পরীক্ষা করবেন।

ডেনটিস্ট এসময় ওকে জিজ্ঞেস করতে পারেন

  • ঘুমুতে জাবার আগে ওর কেমন লাগে?
  • ওকি স্কুল বা বাড়িতে কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত কিনা?
  • ওকি কারো ওপর রাগ করে আছে কিনা?
  • ঘুমুতে যাবার আগে ও কি কি করে?

এইসব প্রশ্নের উত্তর থেকে ডেনটিস্ট বুঝতে পারবেন ওর সমস্যাটা কি শারীরিক না মানসিক।

দাঁতে দাঁত ঘষা বা ব্রকসিজমের চিকিৎসা

ঘুমের মধ্যে শিশু দাঁতে দাঁত ঘষলে  ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবহার করতে পারেন ব্রুক্সিং গার্ড। এটা এক ধরনের প্লাস্টিকের তৈরি অ্যাপল্যায়েন্স। এর সমাধান করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডাক্তারা দাঁতের জন্য পাতলা পাত দিয়ে চিকিৎসা করেন।

এটি দুই মিলিমিটার পুরু হয় এবং দাঁতের মাপ অনুযায়ী বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। এই পাত দাঁতের মাঝখানে থাকলে আর দাঁতে ঘষা লেগে দাঁতের ক্ষয় হতে পারে না।

যদি আপনার সন্তান দাঁতে ব্যথার কথা বলে তাহলে তাকে ডেন্টিস্টের কাছে নিয়ে যান। এছাড়াও-

  • শিশুর স্ট্রেস কমানোর চেষ্টা করুন। বিশেষ করে ঘুমাতে যাওয়ার আগে।
  • পেশীকে শিথিল করার জন্য ম্যাসাজ ও স্ট্রেচিং করান।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করান। ডিহাইড্রেশনের কারণেও দাঁতে দাঁত ঘষার প্রবণতা হতে পারে।

ব্রকসিজমের সমস্যায় ভুগছে এমন শিশুকে কি করে সাহায্য করবেন?

শারীরিক বা মানসিক, যে কারনেই আপনার শিশুর ব্রকসিজম হোক না কেন, আপনি চাইলেই সেটা সমাধান করতে পারেন। ঘুমুতে যাবার আগে কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল, বা ওর সাথে বসে মন ভাল করা গান শোনা এসব ওর টেনশন অনেকটাই কমিয়ে দেবে।

ওর সাথে কথা বলুন। যেকোনো মানসিক সমস্যা সমস্যা সমাধানে খোলাখুলি কথা বলার কোন বিকল্প নেই। ওর মনটা যদি স্কুলের কিছু নিয়ে চিন্তিত থাকে তাহলে ওকে বোঝান যে আমাদের সবাইকেই বাড়ির বাইরে অনেক চাপ সামলাতে হয়। এসব খুবই সাধারন ব্যাপার। ওকে কিছু টিপসও দিন। দেখবেন ও নিজেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে আর ওর টেনশনও কমে যাবে।

কিন্তু ব্যাপারটা যদি আরও বড় কিছু হয় যেমন নতুন বাড়িতে অথবা শহরে যাওয়া তাহলে ওকে আরও সময় দিতে হবে।প্রয়োজনে বাড়ি বা শহরটা ঘুরিয়ে দেখান যে সেখানে আগের চেয়ে ভাল আরও কত কি আছে। এতেও কাজ না হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন।

ব্রকসিজম কতদিন স্থায়ী হয়

সাধারণত ব্রকসিজম বেশি দিন স্থায়ী হয় না। শিশুদের প্রথম দাত বা আমরা যাকে “দুধ দাত” বলি, সেটা পরে গেলে দাত কিড়মিড় করার এই প্রবনতাও চলে যায়। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে এটা বড় বয়স পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। আর ব্যাপারটা যদি হয় মানসিক কারনে তাহলে ওই মানসিক সমস্যার কারন সমাধান না হয়া পর্যন্ত ব্রকসিজম স্থায়ী হতে পারে।

ব্রকসিজম প্রতিরোধ করবেন কি করে ?

যেহেতু এটা শিশুদের খুব সাধারন প্রবণতা, সেহেতু এটাকে প্রতিরোধ করার কিছু নেই। কিন্তু এটা যদি মানসিক কারণে হয় আপনার শিশুটিকে মানসিক চাপমুক্ত রাখতে পারলে এই প্রবণতা ওর মাঝে নাও দেখা দিতে পারে।

তাই আপনার শিশুর সঠিক মানসিক বিকাশই পারে ব্রকসিজম প্রতিরোধ করতে।ওকে সময় দিন, ওর কথা শুনুন, ওর সাথে কথা বলুন।

ওর সুন্দর দাত গুলো হাসিতে ভরে উঠুক, অস্বস্তিকর কোন শব্দে নয়।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts