নবজাতক শিশুর ফর্মুলা দুধ সম্পর্কে যে পাঁচটি তথ্য হয়তো আপনার অজানা

Updated on

নবজাতক শিশুর জন্য যখন আপনি ‘ফর্মুলা দুধ’ কিনতে যান, তখন নিশ্চয়ই আপনার প্রিয় কোম্পানির পণ্যটিই আপনি বেছে নেন। কিন্তু এই ‘ফর্মুলা দুধ’ সম্পর্কে আরো অনেক তথ্য আপনার জেনে রাখা উচিৎ, যেমন- ফর্মুলা খাওয়ানো বাচ্চাদের মলের ধরণ কেমন হতে পারে বা তাকে কি পরিমাণ খাওয়াতে হবে ইত্যাদি।

আমরা এ সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরব, যে তথ্যগুলো আপনাদের একটু অবাক করবে বৈকি!     

ফর্মুলা দুধ পান করা শিশুদের মলের ধরণ ভিন্ন হয়

আপনার শিশুকে আপনি ঠিক কি খাওয়াচ্ছেন এবং শিশুটি কি ধরনের মলত্যাগ করছে এর মধ্যে অবশ্যই একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ফর্মুলা খাওয়ানো বাচ্চাদের মলের ধরণ শুধু ভিন্ন তা নয় এটা বাবা মায়ের জন্য কিছুটা আশ্চর্যজনক ও বটে, বিশেষ করে যারা বুকের দুধ থেকে ফর্মুলাতে সুইচ করেছেন তাদের জন্য।

“আমার বাচ্চা পঞ্চম সপ্তাহ থেকে ফর্মুলা দুধ খেতে শুরু করে এবং তখনই তার মলত্যাগের মধ্যে আমি বেশ ভিন্নতা দেখতে পাই” একজন মা ফর্মুলাদুধ সম্পর্কে বলেন। তিনিও আরো বলেন,“গন্ধ, রঙ, পরিমাণ, ঘনত্ব ও ঠিক কত সময় পরপর মলত্যাগ করছে সবকিছুই তাৎক্ষনিকভাবে পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল”। 

এই পার্থক্য ঠিক কেন হয়? এ নিয়ে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ‘মার্গারেট মরিস’বলেন, “আমরা যে খাদ্যটি গ্রহণ করছি , শরীর ঠিক সেটাই মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক” ফর্মুলা দুধ ও মলত্যাগের ভিন্নতা সম্পর্কে তিনি বলেন, “পরিপাকতন্ত্রের এই পরিবর্তন নির্ভর করছে ঠিক কি ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে তার উপর এবং এই ‘ফর্মুলা দুধ’অবশ্যই ‘মাতৃদুগ্ধ’ থেকে একদমই আলাদা”   

ফর্মুলা দুধ খাওয়ানোর পর শিশুটি যে ধরনের মলত্যাগ করে, সেটার গন্ধ বুকের দুধ খাওয়ানো বাচ্চাদের মলের চাইতে অনেক তীব্র হয় এবং একই সাথে এটা অনেক গাড় ও এর ঘনত্বের পরিমাণ সাধারণ মলের থেকে একটু বেশিই হয়ে থাকে।    

মায়ের দুধের মত ফর্মুলা দুধ দ্রুত হজম হয়না

শিশুরা সাধারণত ফর্মুলা দুধ পান করলে বেশিক্ষণ সময় ধরে না খেয়ে থাকতে পারে। এর কারণ হলো – ফর্মুলা দুধ তারা খুব সহজেই হজম করে ফেলতে পারেনা।

মাতৃদুগ্ধ এবং ফর্মুলা দুধে থাকে “whey” ও “casein” নামক প্রোটিন। মায়ের দুধে এই ‘whey’ এর পরিমাণ থাকে একটু বেশি যা হজম করতে সহজ এবং এর ফলে মায়ের দুধ খুব দ্রুতই হজম হয়ে যায়। ঠিক একই রকমভাবে ফর্মুলা দুধে ‘casein’ এর পরিমাণ বেশি থাকে এবং তা অতটা দ্রুত হজম হয় না। 

যেহেতু ফর্মুলা দুধ খেয়ে আপনার শিশু বেশিক্ষণ থাকতে পারে, তাই আপনি রাতের বেলায় একটা দীর্ঘ ঘুমের প্রত্যাশা করতেই পারেন। তবে এটা আপনাকে মনে রাখতে হবে, প্রত্যেকটা শিশুই একদম আলাদা।

জর্জিয়া হেলথ সায়েন্স ইউনিভার্সিটির নিওনেটোলজি  বিভাগের প্রধান যতীন্দ্র ভাটিয়া এ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে বলেন, “প্রত্যেকটা শিশুরই তার ক্যালোরি গ্রহণের চাহিদা,বৈশিষ্ট্য এবং কতক্ষণ ধরে সে ঘুমাবে, তার নিজস্ব কিছু স্বকীয়তা আছে”। ঠিক একারণেই কিছু ‘ফর্মুলা দুধ’ পান করা শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করা শিশুর মতই ঘন ঘন খাওয়ার জন্য জেগে উঠতে পারে।

বেবি সেন্টারের একজন মা বলেন, “আমার বড় ছেলেটি ফর্মুলা দুধ খেয়ে বড় হয়েছে এবং ছোট ছেলেটি বুকের দুধ পান করে বড় হয়েছে। তবে তাদের ঘুমানো এবং জেগে ওঠার ধরন একদম একই রকম ছিল”

সে যাই হোক,নিঃসন্দেহে এটা মেনে নেয়া যায় যে,ফর্মুলা দুধ হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। আর তাই আপনার ফর্মুলা দুধ খাওয়া শিশুটি যদি একটু দেরি করেও খেতে চায়,এজন্য খুব একটা দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। 

ফর্মুলা দুধে আপনার নবজাতকের অ্যালার্জি থাকতে পারে   

বেশিরভাগ শিশুই খুব সহজে এবং তৃপ্তি সহকারে ফর্মুলা দুধ খেয়ে হজম করতে পারে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। কেননা ফর্মুলা দুধে ব্যাবহার করা হয় গরুর দুধের প্রোটিন,এবং কিছু কিছু শিশুর মধ্যে এর অ্যালার্জিক  রিয়েকশন দেখা যায়। তবে এটা জেনে রাখা ভালো যে, দুধের প্রোটিন সহ্য না হওয়া আর ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স দুটো একই ব্যাপার নয়।

শিশুর মলত্যাগ থেকেই আপনি ধারনা করে ফেলতে পারবেন যে আপনার শিশুর কি ফর্মুলা দুধে অ্যালার্জি রয়েছে কিনা। তাই আপনার যদি সন্দেহ হয় যে, আপনার শিশুর ফর্মুলা দুধে অ্যালার্জি রয়েছে, তাহলে একটু দেখুন যে শিশুর মলে কি রক্ত অথবা মিউকাস রয়েছে কিনা। সাধারণত এগুলো ফর্মুলা দুধে অ্যালার্জির লক্ষণ হিসেবে পরিলক্ষিত করা হয়।

এছাড়াও ডায়রিয়া,ঘন ঘন বমি, খাদ্যগ্রহণের সময় অস্থিরতা ও শরীরে ছোপ ছোপ লাল দাগ বা র‍্যাশও অ্যালার্জির লক্ষণ হিসেবে ধারনা করা হয়।

আপনি যদি শিশুর মধ্যে নিয়মিত অস্বস্তি দেখেন তাহলে জেনে রাখুন, এটাও অ্যালার্জির একধরনের লক্ষণ। তবে যে সব শিশুরা “কলিক”  তাদেরবাবা-মা রা বেশ ভালোভাবেই জানেন যে শিশুর সবসময় কাঁদা মানেই এটা এলার্জির লক্ষণ না।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মরিস এ সম্পর্কে জোর দিয়ে বলেন, “যদি কোন শিশু বেশিরভাগ সময়েই কান্না করতে থাকে, তবে হয়ত এর অন্যতম একটা কারণ হতে পারে অ্যালার্জি । তাই এমতাবস্থায় দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া খুবই জরুরী”

দুধ থেকে প্রস্তুতকৃত ফর্মুলা দুধে যদি আপনার শিশুর এলার্জি থেকে থাকে, তাহলে  ডাক্তার সয়া ফরমুলার দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিতে পারেন। তবে আপনার শিশুর যদি সয়াতেও এলার্জি থেকে থাকে তাহলে “এক্সট্রা হাইড্রোলাইজড ফরমুলা” দুধ খাওয়ার জন্য পরামর্শ দিতে পারেন । এধরনের দুধে প্রোটিনকে এমনভাবে ভেঙ্গে দেয়া হয় যাতে শিশু এটা খুব সহজেই হজম করতেপারে।

একজন মা আমাদের বলেন,“হঠাত করে আমার বাচ্চার ঘাড়ে,মুখে ও গলায় লাল লাল দাগ দেখা যাচ্ছিল”তিনি আরো বলেন, “যখনইডাক্তারের পরামর্শে আমি বাচ্চাকে সয়া ফরমুলার দুধ খাওয়াই, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তার সেই লাল লালদাগগুলো মিলিয়ে যায়”

প্রত্যেকটি শিশুরই খাওয়ার পরিমাণ ভিন্ন

আপনারা (মায়েরা) যখন একসাথে বসে গল্প করেন একজন আরেকজনের সাথে, তখন আপনি হয়ত দেখতে পারেন যে আপনার বান্ধবীর বাচ্চাটি যেখানে মাত্র তিন আউন্স ফর্মুলা দুধ খাচ্ছে সেখানে আপনার শিশু প্রায় সাত আউন্স করে খাচ্ছে।

শিশু বিশেষজ্ঞ মরিসের মতে, প্রত্যেকটা শিশুর খাদ্যাভ্যাস আলাদা, তাই এমনটা হতেই পারে। তিনি এটা ব্যাখ্যা করে বলেন, “যেহেতু সবার ক্যালোরি চাহিদা এক নয়, তাই স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য একটি শিশুর কম খাদ্য লাগতে পারে, ঠিক একই রকম ভাবে আরেকটি শিশুর বেশি খাবার লাগতেই পারে”

এছাড়াও,শিশুর ফর্মুলা দুধ খাবার পরিমাণ একেক বেলায় একেক রকমও হতে পারে। ঠিক যেমনটা আপনার ক্ষেত্রেও হয়। যেখানে সকালে হয়ত আপনি সামান্য রুটি খাচ্ছেন কিন্তু দুপুরে একদম ভরপেট ভাত খাচ্ছেন। তাই আপনার শিশু যদি একবেলা ৪ আউন্স খায় আবার পরের বেলা ছয় আউন্স খায় তাহলে খুব একটা অবাক হবেন না।

প্রত্যেকটা শিশুর খাদ্যাভ্যাস আলাদা হলেও কিছু সাধারণ নিয়মকানুন তো আমাদের সবাইকেই মেনে চলতে হয়। সাধারণত, যে সব শিশুরা এখনো অন্যান্য খাবার গ্রহণ শুরু করেনি তারা প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় তাদের শরীরের ওজন অনুযায়ী প্রতি এক পাউন্ডে আড়াই আউন্স ফর্মুলা দুধ খায়।

অর্থাৎ, যদি আপনার শিশুর ওজন ৬ পাউন্ড হয়ে থাকে তাহলে তাকে নুন্যতম ১৫ আউন্স ফর্মুলা দুধ খাওয়ান। যদিতার ওজন ১০ পাউন্ড হয় তাহলে তাকে প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় নুন্যতম ২৫ আউন্স দিন।

তবে নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যেয়ে শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে ভুলবেন না একদমই।

[ আরও পড়ুনঃ বয়স ও ওজন অনুযায়ী আপনার শিশুর কতটুকু ফর্মুলা দুধ দরকার? ]

বেশিরভাগ ফর্মুলা দুধ একই রকম হয়ে থাকে

আপনার নিকটস্থ দোকানের শেলফে অনেক অনেক কোম্পানির ফর্মুলা দুধ দেখে কিছুটা বিব্রত হওয়া এবং এত কোম্পানির মধ্যে আপনার শিশুর জন্য কোনটা সবচাইতে সেরা, এটা কীভাবে নির্ধারণ করবেন, এমন ভাবনা জেগে ওঠা আপনার জন্য খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তবে বেশীরভাগ বাবা-মা ই এটা জেনে নিশ্চিন্ত হবেন যে, বেশিরভাগ ফর্মুলা দুধের পুষ্টি গত উপাদান প্রায় একই রকম।

কেননা সবগুলো ফর্মুলা দুধ, Food and Drug Administration (FDA) এর দ্বারা পরিচালিতএবং গুনগত মান পরীক্ষা করা হয়। যেখানে প্রত্যেকটা কোম্পানির জন্য ২৯টি পুষ্টি উপাদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির ভিন্ন ভিন্ন নাম এবং মোড়ক থাকতে পারে তবে গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোন কোম্পানি কোন প্রকার পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেনা। 

তবে DHA নামক ফ্যাটি এসিড সবগুলো ফর্মুলা দুধের মধ্যে দেখা যায় না। কিছু গবেষণায় এটা উঠে এসেছে যে, এই উপাদান শিশুর জ্ঞান এবং বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এখনকার সময়ে বেশিরভাগ ফর্মুলা দুধের মধ্যেই এই উপাদান রয়েছে, তবে সবগুলোর মধ্যে নেই। আর তাই ফর্মুলা দুধ কেনার ক্ষেত্রে এই উপাদান রয়েছে কি না তা দেখে নিতেপারেন।

তবে, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের ফর্মুলা দুধও বাজারে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কিছু ফর্মুলা দুধ রয়েছে যেটা বিশেষ ভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে প্রি-ম্যাচিউর বেবি’র জন্য। এবং এলার্জি আক্রান্ত শিশুর জন্যও প্রস্তুত হয়ে থাকে ভিন্ন ধরনের ফর্মুলা দুধ। এছাড়াও, যে সকল বাবা-মা অরগানিক খাবারের ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তাদের জন্য প্রস্তুত হয় একদম অরগানিক ফর্মুলা দুধ।  

সবশেষে এটা বলা যায় যে, আপনি যদি এখনো ফর্মুলা দুধ নির্ধারণের ক্ষেত্রে দ্বিধায় ভুগেন যে কোনটা আপনার শিশুর জন্য সবচাইতে ভালো হবে তাহলে আপনার নিকটস্থ শিশু রোগবিশেষজ্ঞ আপনাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারেন। 

  সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts