গর্ভাবস্থায় দুইজনের জন্য খেতে হবে বলতে আসলে কি বোঝায়?

গর্ভবতী মায়েদের গর্ভধারণের শুরু থেকে বেশি বেশি খেতে বলা হয়। কারণ, এখন আপনাকে যে দুজনের জন্য খেতে হবে ! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি আদৌ সত্যি, নাকি কোনো উপকথা?

গর্ভাবস্থায় আপনাকে কি দুইজনের সমপরিমাণ খাবার খেতে হবে?

সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর, না দিয়েই দিতে হবে। তবে মাঝেমধ্যে আপনার দুইজনের সমপরিমাণ খাবার খেতে ইচ্ছে হতে পারে, তবে এটা মনে রাখবেন ডাক্তার আপনাকে “দুইজনের জন্য খাবার খাবেন” বলতে দুইজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের সমপরিমাণ খাবার খাওয়ার কথা বলেন নি।

অনেকের মতে, একজন গর্ভবতী মাকে দুজনের খাবার খাওয়া উচিত। এটা ঠিক নয়। কারণ অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের সঙ্গে মুটিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। অতিরিক্ত ওজনের মায়েদের ক্ষেত্রে মৃত সন্তান অথবা ছোট শিশুর জন্মদানের ঘটনা বেশি।

তবে খাবার যেমনই হোক না কেন, সেটা হতে হবে পুষ্টিকর। এ জন্য গর্ভবতী মায়ের খাবারে খাদ্যের সব কয়টি উপাদানের উপস্থিতি থাকতে হবে।

গর্ভাবস্থায় আপনার শরীরের বিভিন্ন কার্যকরীতা অনেক বৃদ্ধি পায় এবং আপনি যে খাবার গ্রহণ করেন সেগুলো থেকে সর্বচ্চ পরিমাণ পুষ্টিগুণ আপনার শরীর গ্রহণ করতে পারে। আর তাই, দুইজনের সমপরিমাণ খাবার খাওয়ার মাধ্যমে আপনি কিন্তু সন্তানের সুস্থ ও স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা দিগুণ করে ফেলতে পারবেন না।

তবেএর ফলে যেটা হবে যে, আপনার শরীরের ওজন অতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পাবে, আর গর্ভকালীন সময়ে অতিরিক্ত ওজনের জন্য আপনাকে অনেক ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হতে হবে।

অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, পিঠে ব্যথা হতে পারে এবং নর্মাল ডেলিভারির বদলে আপনাকে সি সেকশন (Cesarean Section) এ যেতে হতে পারে। কারণ, আপনার বাচ্চা আকারে বড়। এছাড়া অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির কারণে আপনার অনাগত সন্তান বুদ্ধিস্বল্পতা, খাদ্যগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমস্যা, এমনকি মানসিক সমস্যা নিয়ে জন্মাতে পারে!

[ আরও পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় ওজন বৃদ্ধি : কতটুকু বাড়া স্বাভাবিক ? ]

গর্ভাবস্থায় সঠিক খাদ্যাভ্যাসের দিক নির্দেশনাগুলোর মধ্যে বেশ পার্থক্য দেখা যায়, তবে ইন্সটিটিউট অফ মেডিসিনের মতে আপনার ওজন যদি স্বাভাবিক থাকে তাহলে গর্ভধারণের প্রথম ট্রাইমেস্টারে আপনাকে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করতে হবে না।

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে আপনাকে ৩৪০ ক্যালোরি এবং তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে ৪৫০ ক্যালোরি অতিরিক্ত গ্রহণ করতে হবে। তবে আপনার ওজন যদি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি অথবা কম হয় তাহলে আপনার শরীরের অবস্থা অনুযায়ী কম অথবা বেশি পরিমাণে ক্যালোরি গ্রহণ করতে হতে পারে।

আপনার এই অতিরিক্ত ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করতে হলে যে আপনাকে অনেক বেশি খেতে হবে, ব্যাপারটা তা নয়। কয়েক গ্লাস লো ফ্যাট দুধ এবং কিছু সূর্যমুখীর বীচি অথবা একটা টুনা স্যান্ডউইচই তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে আপনার এই অতিরিক্ত ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করে দিতে পারবে।

তবে এক্ষেত্রে একটা ব্যাপার খেয়াল রাখবেন, আপনার গর্ভে যদি একের অধিক সন্তান থাকে তাহলে আপনাকে এই পরিমাণ থেকে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করতে হবে।

[ আরও পড়ুনঃ গর্ভবতী মায়ের খাবার ও পুষ্টি ]

গর্ভাবস্থায় প্রচুর পরিমাণ ক্যালোরি গ্রহণ করা ছাড়াই আপনি কীভাবে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান পেতে পারেন?

নিম্নে গর্ভকালীন সময়ে সর্বচ্চ পরিমাণে পুষ্টি উপাদান গ্রহণের ব্যাপারে কিছু পরামর্শ প্রদান করা হলঃ

গর্ভাবস্থায় আপনার দৈনিক প্রোটিন, ক্যালোরি, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন এবং মিনারেল এর প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন ধরনের খাবার খান। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, এমনকি নির্দিষ্ট ধরনের খাবার যেমন সবজীর মধ্যেও আপনাকে বিভিন্ন ধরনের ও রঙের সবজী খেতে হবে।

যে সব খাবারে প্রচুর পরিমাণ ক্যালোরি আছে কিন্তু খুব অল্প পরিমাণে পুষ্টিগুণ আছে সেই ধরনের খাবার যতটা সম্ভব কম করে খাবেন। যেমন মিষ্টি জাতীয় পানীয়, ভাজি করা খাবার এবং অতিরিক্ত মিষ্টি ও ফ্যাট জাতীয় খাবার। এগুলোর পরিবর্তে আপনাকে এমন ধরনের খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঝুঁকতে হবে যে ধরনের খাবারের প্রতি ক্যালোরিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান।

পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ খাবার যেমন দই, নাট, সিদ্ধ ডিম, তাজা ফল এবং সবজী ইত্যাদি খাবার আপনার দৈনিক খাদ্য তালিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিন। এভাবেই আপনি আপনার গর্ভের শিশুর জন্য সঠিক পরিমাণে পুষ্টি এবং ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করতে পারবেন।

যে সকল খাবার আপনি নির্ধারণ করবেন, সেই খাবারগুলো পূর্ণ পুষ্টি সমৃদ্ধ অবস্থায় গ্রহণ করার চেষ্টা করুন। যেমন পরিশোধিত সাদা পাউরুটি অথবা সাদা চালের পরিবর্তে হোল গ্রেইন পাউরুটি অথবা বাদামী চাল গ্রহণ করুন এবং চিনির সিরাপের মধ্যে রাখা কৌটাযাত ফল না খেয়ে বরং আপনি তাজা ফল ফলাদি গ্রহণ করার ব্যাপারে সচেষ্ট হন।

ফ্যাট, তেল এবং মিষ্টি খুব অল্প পরিমাণে গ্রহণ করুন এবং খেয়াল রাখবেন যাতে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণ করেন।

এছাড়া আপনি কি রিচ ফুড অথবা জাংক ফুড থেকে নিজেকে কোনভাবেই বিরত রাখতে পারছেন না? তাহলে এই ধরনের খাবারের স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু বিকল্প খাবার সম্পর্কে জেনে নিন।

আপনার গ্রহণ করা খাবার থেকে আপনার ও শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি কীভাবে বিভক্ত হয়?

আপনার খাদ্য থেকে আপনার জন্য ও শিশুর জন্য পুষ্টি ঠিক কীভাবে প্রয়োজন অনুসারে বিভক্ত হয়ে থাকে সেটা ডাক্তাররা সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম নন। আপনার গর্ভের শিশু তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি আপনার খাদ্যাভ্যাস থেকে এবং হাড় ও কোষে সঞ্চিত পুষ্টি থেকে গ্রহণ করে থাকে।

অতীতে এটা বিশ্বাস করা হত যে মায়ের খাদ্যাভ্যাস যাই হোক না কেন, গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশু তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান তার মায়ের শরীর থেকে গ্রহণ করতে পারে। এই শ্রুতি অনুসারে আপনার খাদ্যাভ্যাসে যদি উদাহারনসরূপ ভিটামিন সি এর ঘাটতি থাকে তাহলে গর্ভের বাচ্চার তাতে কোন সমস্যা হবেনা । কেননা শিশু আপনার শরীর থেকেই তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারছে।

তবে জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রণী ভূমিকার সাথে সাথে বিশেষজ্ঞরা এখন বলেন যে, মায়ের খাদ্যাভ্যাসে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান না থাকলে গর্ভের শিশু পুষ্টি শুন্যতায় ভুগবে এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হবে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের খাদ্যাভ্যাসে যদি প্রয়োজনীয় পরিমাণ পুষ্টি উপাদান না থাকে তবে গর্ভের শিশুকে সারা জীবন তার ফলাফল ভোগ করতে হতে পারে।

অল্প কথায় বলতে গেলে—গর্ভধারণের আগে ও গর্ভাবস্থায় আপনার খাদ্যাভ্যাস এবং আপনার গর্ভের শিশুর পুষ্টি জোগান একে অপরের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। 

আপনি কি খাচ্ছেন সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যখনই আপনার খুব বেশি পরিমাণে খাবার খেতে ইচ্ছে করবে তখন ভাববেন যে, আদতে আপনাকে একটা শিশুর জন্য অতিরিক্ত খাবার খেতে হচ্ছে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের জন্য নয়। আর তাই খাবারের পরিমাণের উপর নির্ভর না করে গুণগত মানের উপর নির্ভর করুন।

পরিশেষ

পরিবারের সদস্যদের হবু মায়ের সুস্বাস্থ্য এবং সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে পাঁচ মাস থেকে ভ্রূণের যথাযথ বৃদ্ধির জন্য গর্ভবতী মায়ের খাবার হওয়া চাই সুষম। সঙ্গে আমিষ, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং পর্যাপ্ত পানি যাতে থাকে। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts