গর্ভাবস্থায় সায়াটিকার ব্যথা (Sciatica Pain)

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

গর্ভাবস্থায় অনাগত সন্তানের জন্য মায়ের দুশ্চিন্তার যেমন শেষ নেই, তেমনি শারীরিক বিভিন্ন জটিলতাও এতে যোগ করে নতুন মাত্রা।  এরকমই একটি রোগ সায়াটিকা।  গর্ভাবস্থায় প্রায় ৫০%  মহিলা এই সমস্যায় পড়েন৷  গর্ভাবস্থায় সায়াটিকা এবং এ সমস্যায় করণীয়   নিয়েই আজকের আলোচনা।  

সায়াটিকা কি?

সায়াটিকা এক ধরণের ব্যাকপেইন যেখানে রোগী পিঠে বা পশ্চাৎদেশে তীক্ষ্ণ ব্যাথা অনুভব করেন এবং এই ব্যাথা কোমর থেকে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। এই ব্যাথাটি সায়াটিক স্নায়ুর সাথে সম্পর্কিত। 

বিজ্ঞাপণ

সায়াটিক নার্ভ শরীরের সবচেয়ে বড় স্নায়ু যা মেরুদন্ডের নিচের দিক থেকে শুরু হয়ে একেবারে পা পর্যন্ত পৌছে গেছে। শরীরের কোন সমস্যার কারণে এই নার্ভের উপর চাপ পড়ে সংকুচিত হয়ে গেলে  সায়াটিকার সমস্যা দেখা দেয়। 

সায়াটিক নার্ভ
সায়াটিক নার্ভ

বিভিন্ন কারণে সায়াটিকার সমস্যা হতে পারে৷ তবে প্রেগ্নেন্সিতে সায়াটিকা একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা। গর্ভাবস্থায় জরায়ুতে বাচ্চার বৃদ্ধিতে যে স্ফীতাবস্থা তৈরী হয়, তাতে এই স্নায়ুর উপর চাপ বৃদ্ধি পায়।  তখন প্রেগনেন্ট মহিলারা সায়াটিকার ব্যাথা অনুভব করতে শুরু করেন।

এই ব্যাথা অনেক্ষণ থাকতে পারে আবার ক্রমাগত আসা যাওয়া করতে পারে । পায়ে ঝি ঝি ধরা অনুভূতি, দুর্বল ভাব, অসাড় লাগা নানারকম অভিযোগ পাওয়া যায় সায়াটিকায় আক্রান্ত মায়েদের কাছ থেকে।

যেসব কারণে গর্ভবতী মা আক্রান্ত হতে পারেন সায়াটিকাতে

সহজ ভাষায় সায়াটিক নার্ভের উপর চাপ বৃদ্ধি পেলে সায়াটিকার সমস্যা দেখা দেয়। বিভিন্ন কারণে এই চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।

  • ওজন বৃদ্ধি বা শরীরে পানি জমে যাওয়ায় সায়াটিক স্নায়ুর ওপর চাপ পড়তে পারে।
  • ক্রমাগত আকৃতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকা গর্ভবতী জরায়ু মেরুদন্ডের নিচের দিকে সায়াটিক স্নায়ুর ওপর চাপ বাড়ায়।
  • পেট বা স্তনের ক্রমাগত আকৃতি বেড়ে যাওয়ার শরীরের মধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র সরে যায়, এর ফলে পশ্চাৎদেশ এবং কটিদেশের পেশিগুলো টাইট হয়ে সায়াটিক স্নায়ুর ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়।
  • গর্ভাবস্থায় বাচ্চার পজিশনের কারণে বাচ্চার মাথা এমন অবস্থানে থাকতে পারে যে তা সায়াটিক স্নায়ুর উপর চাপ বাড়িয়ে দেয়।
  • মেরুদন্ডের ডিস্কে হার্নিয়া থেকেও সায়াটিক নার্ভের উপর প্রেশার পড়তে পারে। আর্থ্রাইটিসের সমস্যা যাদের আছে তারাও সায়াটিকার ঝুকিতে রয়েছেন।
  • ক্রমাগত বসে থাকার অভ্যাস যাদের আছে তাদের ক্ষেত্রেও এই সায়াটিকা দেখা দিতে পারে।
  • গর্ভাবস্থায় নিঃসৃত রিলাক্সিন হরমোন পেলভিসের লিগামেন্ট সমূহকে শিথিল করে ফেলে।  ফলে সায়াটিক নার্ভ সরে গিয়ে সায়াটিকার ব্যাথা তৈরী করে।
  • অনেক সময় মাসল স্পাজম বা পেশিতে খিঁচ ধরার কারণে সায়াটিকার ব্যাথা তৈরী হয়। 

সায়াটিকার ঝুঁকি রয়েছে যেসব ক্ষেত্রে

সায়াটিকার ঝুকি সবচেয়ে বেশি থাকে প্রেগন্যান্সির তৃতীয় ট্রাইমেস্টারেদ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারেও সায়াটিকা হতে দেখা যায়।সায়াটিকার ঝুকিতে উল্লেখযোগ্য হল দৈনন্দিন জীবনাচার।  এক্ষেত্রে যারা ঝুঁকিতে রয়েছেন : 

  • যারা দীর্ঘসময় বসে কাটান। 
  • যেসব ব্যাক্তি অধিক ভারবহনের কাজ করেন যাতে পেশি মোচড় খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে 
  • নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে যাদের, তাদের ক্ষেত্রে সায়াটিকার সমস্যা দেখা দিতে পারে। 
  • দৈহিক ব্যায়াম হতে বিরত থাকা ব্যাক্তিরা সায়াটিকার শিকার হতে পারেন৷ 

সায়াটিকার উপসর্গ 

সায়াটিকার ব্যাথা বিভিন্ন রকম হতে পারে।  এই ব্যাথা মূলত সায়াটিক স্নায়ুর কাছাকাছিই অনূভুত হয়।  অর্থাৎ,পশ্চাতদেশ থেকে এই ব্যাথা উরু এবং পা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।  অসাড় অনুভুতি,  পায়ে ঝি ঝি ধরা,  তীক্ষ্ণ ব্যাথা সায়াটিকার ক্ষেত্রে সচরাচর হয়ে থাকে। ব্যাথা এমন পর্যায়েও যেতে পারে যে দৈনন্দিন জীবন যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়ে যায়।  ব্যাথা এক পায়ে বা উভয় পায়ে হতে পারে। উপসর্গগুলো হল: 

  • ক্ষণিক অথবা দীর্ঘসময়ের জন্য পশ্চাৎদেশ বা পায়ে ব্যাথা
  • পশ্চাৎদেশ হতে উরু হয়ে পা পর্যন্ত তীক্ষ্ণ ব্যাথার অনুভুতি 
  • পায়ে দুর্বল বা ঝিনঝিনে অনুভূতি 
  • হাটা বসা বা দাঁড়িয়ে থাকায় সমস্যা হওয়া 
  • জ্বলুনীর মত অনুভুতি।
  • হাঁটা, দাঁড়ানো এমনকি বসতেও অসুবিধা বোধ হওয়া।

সায়াটিকা দূরীকরণে ঘরোয়া চিকিৎসা

ব্যায়াম

সঠিক এবং নিরাপদ ব্যায়াম সায়াটিকার ক্ষেত্রে ভাল ফলাফল এনে দেয়। এতে প্রদাহ কমে এবং রক্তচলাচল বাড়ে। প্রেগ্নেন্সিতে সব ধরণের ব্যায়াম করার সুযোগ নেই৷ প্রেগ্নেন্সিতে শরীরকে প্রসব উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য রিলাক্সিন হরমোন ক্ষরিত হয় যা পেলভিসের বিভিন্ন লিগামেন্টকে শিথিল করে ফেলে। অযাচিত নড়াচড়া এই লিগামেন্টে সমস্যা তৈরী করতে পারে৷  এজন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এবং প্রেগ্নেন্সির অবস্থা বিবেচনা করে নিজের জন্য সঠিক এক্সারসাইজ বেছে নিতে হবে৷ 

সাঁতার কাটা শ্রেষ্ঠ ব্যায়ামগুলোর মধ্যে অন্যতম৷  নিয়মিত সাতার কাটার সুযোগ থাকলে রোগীর জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। এর সাথে ক্যাগেল এক্সারসাইজ করলে পেলভিক ফ্লোরের মাসলের জন্যও তা খুবই ইতিবাচক। 

ইয়োগা প্রেগ্নেন্সিতে বিপদজনক হলেও প্রফেশনালদের অধীনে ইয়োগা করার সুযোগ থাকলে করা যায়। ইয়োগা শরীরকে পুননির্মাণে সাহায্য করে এবং স্নায়ুর সংকোচন দূর করে। 

মাসাজ থেরাপি

যেকোন ব্যাথার ক্ষেত্রেই ম্যাসাজ খুবই উপকারী।   সায়াটিকার ক্ষেত্রেও ম্যাসাজ থেরাপী খুবই ভালো কাজ দেয়।  তবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বা গর্ভকালীন মাসাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন থেরাপীস্টদের কাছেই ম্যাসাজ নেয়া উত্তম।

আকুপাংচার

আকুপাংচার ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাচীন চিকিৎসা। এখানে রোগীর শরীরে একটি পাতলা সুঁই প্রবেশ করানো হয়। শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় উদ্দীপনা দেয়ার ফলে বিভিন্ন ধরণের হরমোন এবং নিউরোট্রান্সিটার রিলিজ হয়। এতে শরীরের পেশী ও স্নায়ু শিথিল হয় এবং ব্যাথাও কমে যায়। তবে সায়াটিকার ব্যথার ক্ষেত্রে আকুপাংচার কতটা কার্যকরী তার সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই।

ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট

ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ু কার্যক্রমের মূল উপাদানগুলোর মধ্যে একটি। যদিও দৈনন্দিন বিভিন্ন খাবারে ম্যাগনেসিয়াম যথেষ্ট থাকলেও অনেকের ক্ষেত্রে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি হয়ে থাকে। সুতরাং ডাক্তারের পরামর্শে ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ সায়াটিকার ব্যাথা কমাতে সাহায্য করতে পারে। 

বিজ্ঞাপণ

বিশ্রাম

সায়াটিকায় আক্রান্ত পা কে যথেষ্ট পরিমাণ বিশ্রাম দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়।  যেমন: ডান পায়ে ব্যাথা হলে বামে কাত হয়ে শোয়া, বাম পায়ে ব্যাথা হলে ডানে কাত হয়ে শোয়া। ঘুমানোর সময় পায়ের নিচে বা দুপায়ের মাঝে বালিশ দেয়া যায়।  এতে আরামবোধ অনেকটা বাড়বে এবং সায়াটিক স্নায়ুর উপর চাপ কমবে ।

শোয়ার বিছানা বা ম্যাট্রেস যদি অস্বস্তি বোধ তৈরী করে তবে তা পরিবর্তন করুন। শক্ত ম্যাট্রেস বেছে নিন, তবে অতিরিক্ত শক্ত নয়, আবার বেশি নরম হলে এটি আপনাক ব্যাক সাপোর্ট দিবে না৷  

দৈনন্দিন জীবনাচারে পরিবর্তন

বসার টেবিল ও চেয়ারের উচ্চতা নিজের সুবিধামত করে নেয়া উচিত।  দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা পরিহার করতে হবে। শুধু বসে থাকাই নয়, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা হাটার সময়ে বিরতি দিতে হবে। নরম এবং আরামদায়ক জুতা পরিধান করতে হবে। 

ঠান্ডা ও গরম থেরাপী

ব্যাথার স্থানে হালকা গরম ও ঠান্ডা প্রয়োগ করলে ব্যাথা কমে। এক্ষেত্রে ঠান্ডা বা গরম প্রয়োগে পুনরাবৃত্তি ঘটাতে হবে। এতে স্নায়ুর আশেপাশে প্রদাহ থাকলে তা কমে যাবে। মাত্র ১৫ মিনিটের ঠান্ডা ও গরম থেরাপীর পুনরাবৃত্তি যথেষ্ট ভাল ফল দেয়। এই কাজে হিটিং প্যাড ও আইস প্যাক ব্যাবহার করা যেতে পারে৷ 

প্রেগ্নেন্সি গার্ডল পরিধান

যদিও এটি শুনতেই অস্বস্তিকর, তবুও প্রেগ্নেন্সি গার্ডল পরিধানে শরীরের ওজনের বেশ সুন্দর বন্টন হয়।  মেরুদন্ডে ওজনের অতিরিক্ত চাপ কমে যাওয়ায় সায়াটিকার সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়া সহজ হয়। 

স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ

অনেক সময় পেশীতে খিচ ধরে যাওয়ার কারণেও সায়াটিকার ব্যাথা বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ করলে সমস্যাটি কমতে পারে। 

ওজন বৃদ্ধির ব্যাপারে সচেতন হোন

প্রেগ্নেন্সিতে স্বাভাবিক ভাবেই ওজন বৃদ্ধি পায়।  তবে অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির ফলে সায়াটিক স্নায়ুর ওপর চাপ বেড়ে সায়াটিকার সমস্যা তৈরী হতে পারে। সাধারণত প্রেগ্নেন্সিতে ২৫-৩৫ পাউন্ডের বেশি ওজনবৃদ্ধি না হওয়া উচিত। খেয়াল রাখতে হবে গর্ভাবস্থায় ওজন যাতে হঠাৎ করে খুব বেশি বেড়ে না যায়। ধীরে ধীরে ওজন বৃদ্ধি পেলে এ সমস্যার ঝুঁকি অনেকটা কম থাকে।

ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া

যদি উপসর্গগুলো ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে তবে রোগীর উচিত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া। সঠিক ভাবে সায়াটিকা নির্ণয় করার জন্য এটি জরুরী।  কারণ আরও বিভিন্ন রোগেও এ ধরণের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

বিজ্ঞাপণ

ব্যাথার ক্ষেত্রে ডাক্তাররা অনেকসময় মা ও গর্ভের শিশুর জন্য নিরাপদ ঔষধ দিয়ে থাকেন। যেকোন ধরণের ব্যাথার ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ ব্যাতীত গ্রহণ করা উচিত নয়। এতে নানাবিধ সমস্যা হতে পারে।

সায়াটিকার কারণে বাচ্চার কি ক্ষতি হয়? 

না, এক্ষেত্রে বাচ্চার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।  তবে ক্রমাগত ব্যাথা আপনার শরীরের উপর স্ট্রেস ফেলতে পারে।  প্রেগ্নেন্সিতে নিজেকে স্ট্রেসমুক্ত রেখে সুস্থ এবং সক্রিয় থাকতে হবে।

প্রসবের পর কি সায়াটিকার ব্যাথা ঠিক হয়ে যায়

প্রসবের পর যেহেতু গর্ভকালীন বিভিন্ন পরিবর্তন স্বাভাবিক হতে শুরু করে তাই এসময় সায়াটিকার সমস্যাও কমে আসতে থাকে। তবে বেশিরভাগ মায়দের ক্ষেত্রে এটা সত্যি হলেও কিছু কিছু মায়েদের প্রসবের পরও এ সমস্যা থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারকে জানাতে হবে।

সায়াটিকার কারণ প্রেগন্যান্সি ছাড়াও অন্য কিছু হতে পারে। তাই সমস্যাটা কোথায় সেটা নির্ণয় করা জরুরী। মনে রাখতে হবে সব সমস্যার তড়িৎ সমাধান সম্ভব নয়৷  তাই এসব নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়াই ভালো। নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর জন্ম হোক সুন্দর ও জটিলতামুক্ত। 

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts