গর্ভাবস্থায় কৃমি | কারণ, উপসর্গ এবং প্রতিরোধ

আপনি জানেন কি সারা বিশ্বে প্রায় ২০ কোটি মানুষ কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হয়? তাদের মধ্যে ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ শুধু আমেরিকা এবং কানাডারই অধিবাসী। 

এসব কৃমি সাধারণত শিশুদের আক্রমণ করে। তবে মাঝে মাঝে বয়োবৃদ্ধ এবং গর্ভবতী নারীরাও আক্রান্ত হতে পারেন। ঘন ঘন চুলকানির কারণে কৃমি সংক্রমণ নিদ্রাহীন রাতযাপনে বাধ্য করে যা গর্ভাবস্থায় খুবই বিরক্তিকর এবং অশান্তিদায়ক একটি ব্যাপার। 

যাই হোক, এটা ক্ষতিকর কিছু না এবং গর্ভাবস্থায় হওয়া অন্যান্য সাধারণ ইনফেকশনের মতো এটাও প্রতিরোধ করা যায়। গর্ভাবস্থায় কৃমি ঘটিত ইনফেকশনের কারণ, এর উপসর্গ এবং কিভাবে প্রতিরোধ করা যায় তা জানতে আর্টিকেলটি পড়তে থাকুন।

কৃমি কি

কৃমি হল ছোট সাদা পরজীবী জাতীয় কীট, যা মানুষের মলদ্বার ও মলাশয়ে বাস করে ও ডিম দেয়। এরা লম্বায় আধা ইঞ্চির মত হয় এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন আক্রমণ করে। এরা সহজেই ছড়িয়ে যায় এবং অন্ত্র এবং অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। এসব কৃমির ডিমগুলো দেখতে জেলির মতো, আঠালো এবং খালি চোখে দেখা যায় না। 

এসব কৃমি চুলকানি ও অস্বস্তির সৃষ্টি করে। তাই শরীর থেকে এগুলো যত দ্রুত সম্ভব দূর করা উচিত। কৃমি ঘটিত ইনফেকশন সংক্রামকও বটে, ফলে আপনি আপনার পরিবারের সদস্য, সহকর্মী বা বন্ধু থেকে আক্রান্ত হতে পারেন।

কৃমির আরো কিছু নাম রয়েছে, যেমন, ফিতাকৃমি (threadworm), সূচকৃমি(seatworm), অক্সিউরিয়াসিস (oxyuriasis) এবং এন্টারোবায়াসিস (enterobiasis)।

গর্ভাবস্থায় কি কৃমির সংক্রমণ হতে পারে? 

হ্যাঁ, গর্ভাবস্থাতেও কৃমি সংক্রমণ ঘটতে পারে। তবে আপনি এতোটুকু নিশ্চিত থাকতে পারেন যে আপনার শিশুর ভ্রূণ এটা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। যাই হোক, যেকোনো উপায়ে, সময় থাকতে এটা আপনার শরীরে ছড়িয়ে, সংখ্যায় বহুগুণ বেড়ে আপনাকে আরো বেশি অস্বস্তিতে ফেলার আগেই চিকিৎসা করাতে হবে। 

গর্ভাবস্থায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার অভাবে সাধারণত সুতাক্রিমির আক্রমণ হতে পারে। চলুন তাহলে গর্ভাবস্থায় কৃমি হবার কারণ জেনে নেয়া যাক।

গর্ভাবস্থায় কৃমি সংক্রমণ হবার কারণ

অপরিষ্কার থাকা কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই আপনি যখন গর্ভবতী, আপনাকে তখন এ বিষয়ে আরো বেশি সতর্ক থাকা উচিত। 

  • খাবার বা অন্যান্য উপাদান আদান-প্রদানের মাধ্যমে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যজনদের মাঝে কৃমির ডিম ছড়াতে পারে। 
  • স্ত্রী কৃমিগুলো সাধারণত মলদ্বারের চারিপাশে ডিম দেয়, এবং একারণেই এগুলো পরিধানের কাপড়, এমনকি তোয়ালের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। 
  • যখন আপনি আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে একই কার্পেট, বিছানার চাদর, এবং বালিশ শেয়ার করেন তখন তার ইনফেকশন দ্বারা আপনারও আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। 
  • কৃমি চুলকানি জাতীয় সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। আক্রান্ত অংশ চুলকানোর পর মিউকাস আপনার হাতের দ্বারা যেকোনো জায়গায় বা জিনিসপত্রে স্থানান্তরিত হয়, যেখান থেকে আবার অন্য মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

কিন্তু আপনি কিভাবে বুঝবেন যে আপনি আক্রান্ত? জানতে হলে নিচের অংশটি পড়ুন।

গর্ভাবস্থায় কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হলে যেসব চিহ্ন এবং উপসর্গ দেখা যায় 

যদি কৃমি খুব ছোট এবং সংখ্যায় কম হয়, তাহলে কোন ধরণের চিহ্ন বা উপসর্গ নাও দেখা যেতে পারে। যাই হোক, যখন তারা ছড়িয়ে পড়ে এবং বড় হয়, তখন আপনি নিম্নোক্ত ব্যাপার গুলো অনুভব করতে পারবেন –

  • মলদ্বার ও যৌনাঙ্গের আশেপাশে চুলকানি হওয়া
  • ঘুমাতে সমস্যা হওয়া  
  • বিরক্তি ও অস্বস্তি লাগা
  • বমি ও পেটে ব্যথা হওয়া

পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর, ডাক্তার কৃমি দূর করার জন্য কিছু ঔষধ সুপারিশ করবেন। 

গর্ভাবস্থায় কৃমিনাশক ঔষধ কি নিরাপদ

গর্ভাবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ সুতাকৃমির হাত থেকে রক্ষা করতে ভালই কাজ করে। তবে সেগুলো গর্ভকালীন প্রথম তিন মাসে গ্রহণ করা উচিত নয়। বেনজিমাইডেজল (Benzimidazole) গর্ভবতী নারীদের সহ্যক্ষমতা, কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তার মত বিষয়গুলো বিবেচনা করে কৃমিনাশক ঔষধ হিসেবে দেয়া হয়। অ্যালবেনডাজোল (Albendazole) ৪০০ মিগ্রা আইপি ডোজে সুপারিশ করা হয়। 

এছাড়াও, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী, মেবেনডাজোল (mebendazole) এবং পাইর‍্যানটেল প্যামোআট (pyrantel pamoate) সীমিত মাত্রায় নেয়া যেতে পারে। তবে সেটাও শুধুমাত্র দ্বিতীয় বা তৃতীয় ট্রাইমেস্টার সময়কালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। 

কোনভাবেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া গর্ভাবস্থায় কৃমির ওষুধ সেবন করা যাবেনা। 

ঔষধের সাহায্য ছাড়াই সুস্থ থাকতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করুন। কারণ আক্রান্ত হবার আগেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা সঠিক সিদ্ধান্ত। 

কৃমি সংক্রমণ কিভাবে রোধ করবেন?

মানুষের মধ্যে ফিতাকৃমি গুলো তিন থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত বাস করে। কিন্তু সঠিক স্বাস্থ্যবিধি তাদের ডিম দেওয়া এবং বংশ বিস্তারের চক্রকে ভাঙতে সাহায্য করবে। নিম্নে কৃমি সংক্রমন রোধে যা যা করা উচিত তা দেওয়া হল।

১. আপনার শোবার ঘরে কিছু খাবেন না, বিশেষ করে বিছানায়।

২. আপনার ঘরটি পরিষ্কার এবং ধুলাবালি মুক্ত রাখুন, বিশেষ করে আপনার শোবার ঘর অথবা সেই জায়গা যেখানে আপনি প্রায়শই ঘুমান।

৩. বাথরুম এবং রান্নাঘর নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত।

৪. তোয়ালে এবং পোশাকগুলি ভাগাভাগি করবেন না বিশেষত করে অভ্যন্তরীণ পোশাকগুলো।

৫.  টয়লেট আসন থেকে আপনার টুথব্রাশগুলি দূরে রাখুন এবং ব্যবহারের পূর্বে ধুয়ে নিন।

৬. নিয়মিত আপনার বিছানার চাদর, বালিশের কভার এবং এমনকি রাতের কাপড়গুলো ও ধুয়ে নিবেন এবং পরিবর্তন করবেন।

৭. আপনার হাত পরিষ্কার রাখার জন্য প্রায়শই হাত ধোবেন।

৮. প্রতিদিন গোসল করুন এবং নিজেকে পরিষ্কার রাখুন।

৯. আপনার নখগুলি ছোট রাখুন এবং পায়ুপথের অঞ্চলটি চুলকানো থেকে বিরত থাকুন।

১০. টয়লেট ব্যবহারের পর প্রতিবার হাত ধোবেন।

চুলকানি এবং জ্বালাপোড়া যদি গুরুতর হয়ে উঠে, আপনি ডাক্তারের সাথে দেখা করতে পারেন এবং  নিজের চিকিৎসা করাতে পারেন। গর্ভাবস্থায় কৃমি সংক্রামণটি এতটা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নয়, তবুও আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে আপনি স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করছেন। গর্ভাবস্থা অনেক সুন্দর এবং সহজ হয়ে যায় যদি যে কোন সংক্রামণকে দুরে রাখা হয়।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts