গর্ভধারণের চেষ্টার পূর্বেই কেন ডাক্তারের কাছে যাবেন এবং এর প্রয়োজনীয়তা কি?

Updated on

নবজাতক শিশু খুব সুন্দর ও স্বাভাবিকভাবে এই পৃথিবীতে আগমন করুক এটা সব বাবা মায়েরই ইচ্ছে। আর এই ইচ্ছেটাই পূরণ করার জন্য গর্ভধারণের পূর্বেই নিজের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে আপনার উচিৎ ডাক্তারের কাছ থেকে একটা চেকআপ করিয়ে নেয়া। 

গর্ভধারণের পূর্বে নিজের শরীরের প্রতি সঠিক যত্ন নেয়াটাকে, গর্ভকালীন সময়ে বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় ভোগার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার জন্য এক ধরনের প্রতিরোধমূলক ওষুধ হিসেবে গণ্য করুন। আর তাই যখনই আপনি গর্ভধারণ করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন, ঠিক তখন থেকেই নিজের প্রতি একটু বিশেষ যত্ন নেয়া শুরু করুন।

গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে কয়েক মাস বা বছর খানেক আগে একটি পরিপূর্ণ ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়ে নেয়ে ভালো। গর্ভধারণের পূর্বে এই ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন আপনি কি শারীরিক এবং মানসিক ভাবে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত কি না অথবা গর্ভধারণ করার জন্য আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো কি হতে পারে?

এছাড়াও বিগত বছরের স্বাস্থ্যগত বিবরণ এবং পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তার এটাও বুঝতে পারবেন যে গর্ভকালীন সময়ে আপনার জন্য ঠিক কি ধরনের বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হতে পারে।

আসুন জেনে নেয়া যাক গর্ভধারণের আগের ডাক্তারি চেক আপ কেমন হতে পারে এবং এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে।

আপনার মেডিকেল হিস্ট্রি জানা এবং সে অনুযায়ী পরামর্শ প্রদান

ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরপরই আপনার স্বাস্থ্যগত এবং কীভাবে আপনি জীবন যাপন করেন এই বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করবেন। (তবে ডাক্তার যদি ইতোপূর্বেই আপনার পরিচিত হয়ে থাকে, তাহলে আপনার সম্পর্কে তিনি হয়ত অনেক কিছুই জানবেন। তবুও যদি আপনার সম্পর্কে কোন কিছু জানার থাকে তাহলে তিনি আপনাকে সেই সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন)।

এত সব প্রশ্ন করার মাধ্যমে আদতে ডাক্তার বুঝতে চাইবেন যে আপনার অতীতের অথবা বর্তমানের কোন ধরনের শারীরিক অবস্থা কি আপনার গর্ভধারণের পূর্বে অথবা গর্ভধারণের সময় কোন ধরনের প্রভাব বিস্তার করবে কি না।

আপনার স্বাস্থ্যগত যদি কোন উদ্বেগ থেকে থাকে তাহলে তিনি সেটা আপনাকে জানাবেন এবং সেই সব সমস্যা সমাধানের জন্য আপনাকে সাহায্য করবেন। এছাড়াও তিনি সেই সময় আপনার যাবতীয় প্রশ্নেরও উত্তর দিবেন যাতে করে আপনি খুব সহজেই নিজের সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে বুঝতে পারেন।

স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত তথ্য (Gynecological history) 

ডাক্তার এই সময়ে আপনার মাসিক সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। (আপনি যদি আপনার মাসিক সংক্রান্ত ক্যালেন্ডার অর্থাৎ কবে মাসিক শুরু হচ্ছে এবং কবে শেষ হচ্ছে এই ধরনের যাবতীয় হিসেব না রাখেন তাহলে এই ধরনের হিসেবগুলো রাখা শুরু করে দিন)।

এছাড়াও ডাক্তার আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন যে আপনি কি কোন ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি গ্রহণ করছেন কি না। কেননা Depo-provera বা এই ধরনের পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে থাকলে আপনার উর্বরতা ফিরে আসতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে। তাই আপনি যদি গর্ভধারণ করতে ইচ্ছুক হন তাহলে এই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকলে সেগুলো পরিবর্তনের জন্য ডাক্তারের সাথে আলাপ করে নিন।

এরপরে Pap smears অর্থাৎ আপনার সারভিক্সের অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে এক ধরনের বিশেষ পরীক্ষা বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইবেন। এছাড়াও তিনি এই সময়ে যৌন বাহিত কোন ধরনের অসুখ কি ইতোপূর্বে আপনার হয়েছে কি না সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইবেন।

একটা বিষয় জেনে রাখুন অনেক ধরনের যৌন বাহিত রোগ আছে যেগুলোর তেমন কোন লক্ষণ না থাকলেও সেগুলো গর্ভধারণের সময় অনেক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি pelvic inflammatory ধরনের রোগ আপনার উর্বরতার উপরেও বেশ প্রভাব বিস্তার করতে পারে।আর তাই এখনই আপনার যৌন বাহিত রোগ আছে কি না সে বিষয়ে যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করা উচিৎ।

পূর্ববর্তী গর্ভধারণ ও এ সম্পর্কিত স্বাস্থ্যগত বিবরণ (Obstetric history) 

আপনার ডাক্তার আপনাকে প্রশ্ন করবেন যে আপনি অতীতে কখনো গর্ভধারণ করেছেন কি না। (যদি পূর্বে এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি অথবা গর্ভপাত হয়ে থাকে সেগুলো সম্পর্কেও বিস্তারিত ডাক্তারকে জানিয়ে দিন)। কেননা আপনার যদি অতীতে এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি হয়ে থাকে তাহলে সেটা আপনাকে অনুর্বর করে তুলতে পারে। এছাড়া একবার এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি হলে আপনি পুনরায় গর্ভধারণের পরে আবারও এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি হয়েছে কি না সে ব্যাপারে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।

আপনার যদি বেশ কয়েকবার গর্ভপাত (recurrent miscarriage) হয়ে থাকে তাহলে ক্রোমোজোম জনিত কোন সমস্যায় ভুগছেন কি না সে ব্যাপারেও বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।

এছাড়া ডাক্তার আরো জানতে চাইবেন যে ইতোপূর্বে যদি গর্ভধারণ করে থাকেন তাহলে গর্ভাবস্থায় কোন ধরনের জটিলতা হয়েছিল কি না এবং গর্ভের সন্তানের ঠিক কীভাবে প্রসব হয়েছিল ও প্রসবের পরেও কি কোন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল কি না।

ইতোপূর্বে গর্ভধারণ করে থাকলে গর্ভধারণের সময় অথবা প্রসব পরবর্তী কোন বিষণ্ণতা ছিল কি না সে ব্যাপারেও ডাক্তার বিস্তারিত জানতে চাইবেন।

পরিশেষে, আপনার শিশুর জন্মের পরে তার কি কোন ধরনের সমস্যা দেখা গিয়েছে কি না সেটাও জানতে চাইবেন। আপনার পূর্বের শিশুর যদি জন্মগত কোন neural tube defect অর্থাৎ মস্তিষ্কে, স্পাইনাল কর্ড অথবা মেরুদণ্ডে সমস্যা থেকে থাকে তাহলে পরবর্তী প্রসবের পূর্বে প্রতিদিন একটু বেশি পরিমাণ ফলিক এসিড গ্রহণের মাধ্যমে একই ধরনের সমস্যা পুনরায় ঘটার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।   

আপনার অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিবরণ (Medical history) 

আপনার ডাক্তার জানতে চাইবেন আপনার কি হাঁপানি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ অথবা থাইরয়েডের মত কোন রোগ আছে কি না যেগুলো আপনার গর্ভকালীন সময়কে জটিল করে তুলতে পারে।

আপনার যদি স্বাস্থ্যগত কোন গুরুতর অবস্থা থেকে থাকে তাহলে ডাক্তার আপনাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন অথবা তিনি সেই অসুখের উপর বিশেষজ্ঞ কোন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে আপনাকে পরামর্শ দিবেন।

তবে একটি ব্যাপার মনে রাখবেন, আপনার গুরুতর শারীরিক অবস্থার কারণে আপনি যেই ওষুধই গ্রহণ করেন না কেন গর্ভধারণের পূর্বে এবং গর্ভকালীন সময়ে ওষুধ সেবনের মাত্রাতে কিছু পরিবর্তন আনতে হতে পারে। (তবে কোন অবস্থাতেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেয়া যাবে না)।

ডাক্তার আরো জানতে চাইবেন অতীতে কোন কারণে অপারেশন হয়েছে কি না এবং আপনার উপর চেতনা-নাশক ওষুধ ব্যবহার করার কারণে কোন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল কি না।

ওষুধ এবং অ্যালার্জি সম্পর্কিত তথ্য (Medications and allergies) 

ডাক্তার আপনার কাছে জানতে চাইতে পারেন আপনার অ্যালার্জি জনিত কোন সমস্যা আছে কিনা।  এছাড়াও আপনি কি কি ধরণের ওষুধ সেবন করছেন সে বিষয়েও বিস্তারিত জানতে চাইবেন।  

ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগেই আপনি কি কি ওষুধ সেবন করছেন সেটার একটা সম্পূর্ণ লিস্ট তৈরি করে রাখাটা খুবই বুদ্ধিমানের মত কাজ হবে। তবে আপনি চাইলে ডাক্তারের সাথে দেখা করার সময় আপনার ওষুধগুলো সাথে করে নিয়ে যেতে পারেন।

এই ধরনের তথ্য আপনার ডাক্তারকে সাহায্য করবে, কেননা তিনি এই ধরনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে বুঝতে পারবেন যে আপনি এখন এমন কোন ওষুধ সেবন করছেন কি না যার কারণে আপনার গর্ভধারণ এবং গর্ভকালীন সময়ে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।

এছাড়াও কোন ওষুধ কি আপনি মাত্রাতিরিক্ত সেবন করে ফেলছেন কি না সে ব্যাপারেও ডাক্তার এই সময়ে সুনিশ্চিত হবেন। (উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন এ সেবন করলে সেটা গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।)

আপনি যদি ইতোমধ্যেই ফলিক এসিড গ্রহণ না করে থাকেন তাহলে ডাক্তার আপনাকে দৈনিক ৪০০ গ্রাম ফলিক এসিড সেবনের ব্যাপারে পরামর্শ দিবেন। আর এই ফলিক এসিড আপনাকে গর্ভধারণের চেষ্টা শুরু করার নুন্যতম এক মাস আগে থেকে সেবন করা শুরু করতে হবে। গর্ভধারণের এক মাস পূর্ব থেকেই ফলিক এসিড সেবন করার মাধ্যমে neural tube birth defects এর মত বেশ কিছু গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

তবে যেহেতু আমাদের অনেক গর্ভধারণই অপরিকল্পিত ভাবে হয়ে থাকে, তাই বিশেষজ্ঞদের মতে যে সকল নারীদের গর্ভধারণের নুন্যতম সম্ভাবনা রয়েছে তাদের উচিৎ দৈনিক ৪০০ মিলিগ্রাম করে ফলিক এসিড সেবন করা।

 টিকা গ্রহণ সম্পর্কিত তথ্য (Vaccination history) 

গর্ভকালীন সময়ে বেশ কয়েকটি রোগ আপনার শিশুর স্বাস্থ্যহানি সহ জন্মগত অনেক ধরনের গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।  তাই আগে যদি আপনি টিকা নিয়ে থাকেন তাহলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় তার বিবরণ সাথে রাখবেন, যাতে করে ডাক্তার বুঝতে পারে যে আপনার সকল ধরনে টিকা নেয়া হয়েছে কি না অথবা আবারও টিকা গ্রহণে সময় হয়ে গিয়েছে কি না।

নিম্নোক্ত কয়েকটি টিকা গ্রহণ করার জন্য সাধারণত পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে-  

  • Rubella ভাইরাস। আপনার যদি রুবেলার টিকা দেয়ার তথ্য না থাকে তাহলে আপনার শরীর রুবেলা ভাইরাস প্রতিরোধী কি না সেটা পরীক্ষা করে দেখা হবে। রুবেলা ভাইরাসের টিকা গ্রহণের পর গর্ভধারণের জন্য চেষ্টা শুরু করার আগে অন্তত এক মাস আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে ।
  • চিকেন পক্স। আপনি যদি ইতোমধ্যে চিকেন পক্সের টিকা না নিয়ে থাকেন বা আপনার যদি চিকেনপক্স না হয়ে থাকে তাহলে আপনাকে চিকেন পক্সের জন্য পরীক্ষা করা হবে। জেনে রাখতে পারেন যে, চিকেন পক্স এর টিকা চার থেকে আট সপ্তাহ ব্যবধানে দুইবারে দিতে হয়। এছাড়াও শেষ টিকা গ্রহণের পর গর্ভধারণ এর চেষ্টা শুরু করার আগে অন্তত এক মাস আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।
  • Tdap টিকা। এই টিকার মধ্যে একইসাথে হুপিং কাশি, টিটেনাস এবং ডিপথেরিয়ার টিকা থাকে।
  • আপনার বয়স যদি ২৬ অথবা তার থেকে কম হয়ে থাকে এবং আপনার HPV টিকা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে ডাক্তার আপনাকে এখনই একটা টিকা গ্রহণ করার ব্যাপারে পরামর্শ দিবেন।
  • হ্যাপাটাইটিস বি। আপনার যদি হ্যাপাটাইটিজ বি এর টিকা গ্রহণ করা না হয়ে থাকে এবং এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে তাহলে তাৎক্ষনিক ভাবে আপনাকে এই টিকা গ্রহণ করতে পরামর্শ দেয়া হবে।

এছাড়া আপনি যদি অতি শীঘ্রই অথবা গর্ভকালীন সময়ে দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন তাহলে সে ব্যাপারে ডাক্তারকে জানিয়ে রাখুন। যদি আপনি পৃথিবীর অন্য কোন অংশে ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক থাকেন তাহলে সেখানের পরিস্থিতি এবং অবস্থা অনুযায়ী আপনাকে হয়ত আরো কিছু টিকা গ্রহণ করতে হতে পারে।

মানসিক এবং সামাজিক অবস্থা (Emotional and social history) 

আপনি যদি ইতোপূর্বে বিষণ্ণতা অথবা খাওয়া দাওয়া জনিত অস্বাভাবিকতায় ভুগে থাকেন তাহলে ডাক্তার আপনাকে সেই ব্যাপারে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করবেন।

এই ধরনের অসুস্থতার জন্য আপনি যদি কোন ওষুধ সেবন করে থাকেন, তাহলে আপনাকে এখন ওষুধ পরিবর্তন করতে হতে পারে। এছাড়া আরেকটি ব্যাপার মনে রাখতে হবে যে, গর্ভধারণ করার চেষ্টা এবং এমনকি গর্ভাবস্থাতেও আপনি মানসিক বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারেন। আর তাই এমতাবস্থায় ডাক্তার যদি আপনার অনুভূতিগুলো সম্পর্কে অবগত থাকেন তাহলে তিনি এই ব্যাপারে আপনাকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারবেন।

এছাড়া ডাক্তার আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনি কি কোন ধরনের পারিবারিক সহিংসতার শিকার কি না অথবা বর্তমানে আপনার সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক কি অনেক খারাপ যাচ্ছে কি না। জেনে রাখা ভালো যে, খারাপ সম্পর্ক বিভিন্ন ধরনের হতে পারে—এটা হতে পারে শারীরিক (মারামারি, চড় দেয়া, লাথি দেয়া ইত্যাদি), মৌখিক (গালাগালি করা) অথবা মানসিক (প্রতিনিয়ত হুমকি দেয়া, তাচ্ছিল্য করা ইত্যাদি), যৌন অথবা বর্ণীত খারাপ সম্পর্কগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি একসাথেও হতে পারে।

এই ধরনের খারাপ সম্পর্ক প্রতিনিয়ত অনেক নারীদের উপর প্রভাব ফেলছে। এই ধরনের সম্পর্কগুলোর স্বরূপ উন্মোচন করা কিছুটা বিব্রতকর বটে, তবে এসব ব্যাপারে সচেতন থাকা খুবই জরুরী। কেননা, গর্ভকালীন সময়ে সাধারণত এই ধরনের সম্পর্কের আরো অনেক অবনতি হয়ে থাকে। (একটা গবেষণায় এমনটাও দেখা গেছে , যে সকল সঙ্গী সঙ্গিনীর মধ্যে সম্পর্ক অনেক গালিগালাজ পূর্ণ হয়ে থাকে তারা বাবা মা হিসবেও ঠিক এমনটাই হয়ে থাকেন)।

এই ধরনের সমস্যাতেও ডাক্তার আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণ সাহায্য করতে পারবেন। যেমন আপনার যদি আইনি, সামাজিক অথবা পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক যোগাযোগের প্রয়োজন পরে তাহলে ডাক্তার আপনাকে এই বিষয়ে বিস্তারিত সহযোগিতা করতে পারবেন।

আপনার জীবন যাপন নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ (Lifestyle questions) 

আপনি পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করছেন কি না সেটা জানার জন্য এই সময়ে ডাক্তার আপনার খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করবেন। এছাড়া ডাক্তার আপনাকে কোন ব্যায়ামের ক্লাসে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়ে থাকবেন।

আর আপনি যদি অতিরিক্ত মোটা অথবা শুকনো হয়ে থাকেন তাহলে গর্ভধারণের পূর্বে আপনার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য তিনি আপনার খাদ্যাভ্যাসে যথেষ্ট পরিমাণ পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেন।

কোন কোন মাছে প্রচুর পরিমাণে মার্কারি থাকে, তাই মার্কারি যুক্ত মাছ খাওয়া থেকে ডাক্তার আপনাকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকবেন। এবং Listeriosis এবং toxoplasmosis এর মত ইনফেকশন থেকে কীভাবে নিজেকে সুস্থ রাখতে হবে সে সম্পর্কে ডাক্তার আপনাকে পরামর্শ দিবেন, কেননা এই ধরনে ইনফেকশন আপনার শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে অন্যান্য পরিবর্তন নিয়ে আসার সাথে আরেকটু জেনে রাখা ভালো যে, এই সময়ে অপাস্তুরিত দুধ অথবা চিজের সাথে সাথে হালকা সিদ্ধ হওয়া মাছ, মাংস অথবা ডিম খাওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরী।

ডাক্তার আপনাকে চা এবং কফি পান করা কমিয়ে দেয়ার জন্য পরামর্শ দিবেন। কেননা এক গবেষণায় উঠে এসেছে, গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যের উপর অতিরিক্ত ক্যাফেইন ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে।

এছাড়া এই সময়ে ধূমপান, মদ্যপান সহ অন্যান্য সকল নেশা জাতিয় দ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকা অতীব প্রয়োজনীয়। এক্ষেত্রে আপনার যদি বিশেষ ধরনের কোন সাহায্যের প্রয়োজন হয় তাহলে ডাক্তারের সাথে এই ব্যাপারে আলোচনা করুন।

ডাক্তার আরো জানতে চাইবেন যে আপনি অথবা আপনার সঙ্গী ঘরে বা অফিসে কোন ধরনের পরিবেশগত দূষণের সম্মুখীন হন কি না। কেননা, এই ধরনের বিষাক্ত কোন উপাদান আপনার গর্ভকালীন সময়ে জটিলতা এবং শিশুর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বৃদ্ধি করে থাকে। এছাড়া আপনার কর্মস্থলে কোন কিছুর জন্য যদি স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে থাকেন তাহলে সেটা নিয়ে সুনিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তারের সাথে আলাপ করুন।

এই সময়ে আপনি কি গরম পানি দিয়ে অথবা বাষ্প গোসল (saunas) করেন কি না, এই বিষয়ে ডাক্তার আপনাকে প্রশ্ন করবেন। কেননা গর্ভকালীন সময়ে প্রাথমিক অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট পরিমাণ থেকে যদি বেড়ে যায় তাহলে গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এছাড়া এর কারণে গর্ভধারণ করাও কিছুটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

আপনার মুখের সুস্বাস্থ্য রক্ষার দিকেও বিশেষ মনযোগী হওয়ার জন্য ডাক্তার আপনাকে পরামর্শ দিবেন। গর্ভকালীন সময়ে দাঁতের মাড়িতে সমস্যা হতে পারে, তাই এই সময়ে নিয়মিত ব্রাশ করা বিশেষ জরুরী। এছাড়া একটা গবেষণায় উঠে এসেছে যে, নারীরা যদি দাঁতের মাড়ি জনিত সমস্যায় ভুগে থাকেন তাহলে গর্ভের শিশু সঠিক সময়ের পূর্বেই জন্মগ্রহণ করার ঝুঁকি থাকে। আর তাই আপনি যদি দীর্ঘদিন ধরেই দাঁতের ডাক্তারের কাছে না গিয়ে থাকেন তাহলে এখনই একজন দাঁতের ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার সঠিক সময়।

বংশগত রোগের বিবরণ (Genetic carrier screening) 

গর্ভধারণের চেষ্টা শুরু করার আগেই ডাক্তার আপনাকে বংশগত রোগের বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন এটা দেখার জন্য যে আপনি অথবা আপনার সঙ্গী কি আদৌ cystic fibrosis, sickle cell অথবা অন্য কোন জটিল ধরনের বংশগত রোগে আক্রান্ত বা এগুলোর বাহক কি না। যদি আপনি এবং আপনার সঙ্গী উভয়েই এই ধরনের রোগর বাহক হয়ে থাকেন তাহলে আপনার শিশুও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

এমতাবস্থায় আপনি একজন বংশগত রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে পারেন, যিনি আপনাকে এই গর্ভধারণের ব্যাপারে আরো বিষদ ভাবে সাহায্য করতে পারবেন। সুস্বাস্থ্য সম্পন্ন একটি শিশুর জন্য এই পদক্ষেপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর এই ধরনের পরীক্ষায় আপনার ও সঙ্গীর মুখের একটু লালা এবং রক্ত পরীক্ষা করাই যথেষ্ট।

শারীরিক ও স্ত্রীরোগ নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা

আপনার ডাক্তার হয়ত নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করবেনঃ

  • আপনি যদি কিছুদিনের মধ্যেই পরীক্ষা না করে থাকেন তাহলে সাধারণত যে সকল শারীরিক পরীক্ষা করা হয় সবই করা হবে, এর মধ্যে উচ্চতা, ওজন ও উচ্চ রক্তচাপও অন্তর্গত থাকবে।
  • কোন ইনফেকশন অথবা অন্য কোন সমস্যা আছে কি না সেটা জানার জন্য আপনার যৌনাঙ্গ এবং তার আশেপাশের অংশ খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করা হবে।
  • আপনার যদি অস্বাভাবিক স্রাব, চুলকানি অথবা জালাপোড়া হয়, তাহলে আপনার যৌনাঙ্গে কোন ইনফেকশন অথবা কোন ছত্রাকজনিত ইনফেকশন আছে কি না তা পরীক্ষা করা হবে।
  • আপনার যৌনাঙ্গে speculum প্রবেশ করিয়ে যৌনাঙ্গ এবং সার্ভিক্স পরীক্ষা করা হবে।
  • Pap smear পরীক্ষার মাধ্যমে সারভিক্স ক্যানসার অথবা কোন অস্বাভাবিক কোষের পরিবর্তন সহ গনোরিয়া এবং chlamydia এর পরীক্ষা করা হবে।
  • কোন ধরনের জটিলতা বা অস্বাভাবিকতা আছে কি না সেটা দেখার জন্য pelvic পরীক্ষা অর্থাৎ জরায়ু, ডিম্বাশয় এবং সারভিক্স পরীক্ষা করে দেখা হবে।

প্রস্রাব পরীক্ষা

আপনার প্রস্রাব পরীক্ষা করে দেখা হবে। আর আপনার যদি প্রস্রাবে সুগার থেকে থাকে তাহলে glucose tolerance পরীক্ষা করে দেখা হবে যে আপনার ডায়াবেটিস আছে কি না।  রক্তে অনিয়ন্ত্রিত সুগার থাকলে সেটা শিশুর উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, তাই আপনার যদি ডায়াবেটিস থেকে থাকে তাহলে গর্ভধারণ করার চেষ্টা করার আগে একজন ডায়াবেটিক বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া খুবই জরুরী।

এছাড়া আপনার যদি মূত্রনালিতে কোন ধরনের সংক্রমণ থেকে থাকে (যেমন জ্বালাপোড়া, অতিরিক্ত প্রস্রাব অথবা প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া) তাহলে ডাক্তার আপনার প্রস্রাব পরীক্ষা করে দেখবেন।

রক্ত পরীক্ষা

আপনার ডাক্তার হয়ত নিম্নোক্ত পরামর্শগুলো দিতে পারেনঃ

  • complete blood count (CBC) পরীক্ষা করে দেখবেন যে আপনার আয়রন সাপলিমেন্ট সেবনের প্রয়োজন আছে কি না। (কেননা গর্ভধারণ করার পর আয়রনের ঘাটতি জনিত এনিমিয়া থাকলে সেটা আরো প্রবল আকার ধারণ করার সম্ভাবনা থাকে)।
  • আপনি কি রুবেলা এবং চিকেন পক্স থেকে ঝুঁকি মুক্ত কি না সেটা যথেষ্ট বুঝা না গেলে আপনার রক্ত পরীক্ষা করে দেখা হবে।
  • Syphilis পরীক্ষা করা হবে।
  • HIV পরীক্ষা করে দেখা হবে।
  • আপনার সঙ্গীর যদি অতীতে হার্পিস হয়ে থাকে তখন আপনার মধ্যে এর লক্ষণ না দেখা গেলেও পরীক্ষা করতে হবে।
  • হেপাটাইটিস বি এর ঝুঁকি থাকলে তার জন্য পরীক্ষা করে দেখা হবে।

আপনার শরীরে cytomegalovirus এর এন্টিবডি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে কি না সেটাও পরীক্ষা করে দেখা হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে আপনার যদি আগের একটি শিশু প্রায়ই ডে-কেয়ার সেন্টারে থাকে। কেননা, সেখান থেকে শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সেটা আপনাকেও সংক্রমণ করতে পারে।

আপনার যাবতীয় প্রশ্ন

গর্ভধারণের চেষ্টার আগেই যখন আপনি ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করতে যাবেন তখনই আপনার মনের যাবতীয় প্রশ্ন এবং উদ্বেগের কথা ডাক্তারের সাথে আলাপ করুন।

আপনার প্রশ্নটি যতই বিব্রতকর হোক না কেন, সেটা করা থেকে কখনও বিরত থাকবেন না এবং লজ্জা পাবেন না। কেননা এই ধরনের সকল ব্যাপার আপনার ডাক্তার প্রতিনিয়তই দেখে আসছেন এবং রোগীদের সাহায্য করছেন। তাই তিনি আপনাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারবেন এবং যদি আপনাকে কোন বিশেষজ্ঞের আছে শরণাপন্ন হতে হয় তাহলে সে ব্যাপারেও তিনি আপনাকে পরামর্শ দিবেন। 

সবার জন্য শুভকামনা। 

Related posts

Leave a Comment